২০২৫ সালের ২৫ মে, রোববার সকালে টাঙ্গাইলে পাঁচ লাখ গাছের চারা রোপণের একটি কর্মসূচির উদ্বোধন করেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। জাগো নিউজ ২৪ জানায়, জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সামনের জনসেবা চত্বরে বেলুন উড়িয়ে তিনি কর্মসূচির সূচনা করেন। এর আগে তিনি সেখানে দুটি গাছের চারা রোপণ করেন।
অনুষ্ঠানে টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক শরীফা হক, পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান এবং বন বিভাগের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

দেশীয় প্রজাতির পাঁচ লাখ চারা
উপদেষ্টা জানান, কর্মসূচিতে যে পাঁচ লাখ গাছ লাগানো হবে, সেগুলো দেশীয় প্রজাতি থেকে বাছাই করা হয়েছে। তাঁর ভাষায়, "এই গাছগুলো প্রচুর পরিমাণে প্রাণীদের আশ্রয় দেবে।" তিনি বলেন, এসব গাছ শুধু সবুজ করার জন্য নয়; এতে ভালো অক্সিজেন পাওয়া যাবে, দূষণ কমবে এবং পাখির আশ্রয় হবে।
তিনি আরও বলেন, যাঁরা এই গাছগুলো লাগাবেন, গাছের সঙ্গে তাঁদের একটি আত্মিক সম্পর্ক তৈরি হবে। "আমরা গাছগুলো লাগিয়েই বসে থাকবো না, সেগুলোর যত্ন ও পরিচর্যা করবো," বলেন উপদেষ্টা। ধ্বংসাত্মক উন্নয়ন প্রক্রিয়া থেকে সরিয়ে নতুন প্রজন্মকে প্রকৃতিবান্ধব উন্নয়ন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত করার কথাও বলেন তিনি।

গাছ কেটে বেশি গাছ লাগানোর প্রতিশ্রুতি নিয়ে সমালোচনা
বক্তব্যে উপদেষ্টা গাছ কেটে পরে আরও বেশি গাছ লাগানোর প্রতিশ্রুতির সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, প্রকৃতিকে বিরক্ত করে নানা কর্মকাণ্ডে গাছ কেটে বলা হয়, ‘২০ হাজার গাছ কেটে ৪০ হাজার গাছ লাগাবো।’ তাঁর মতে, এ কারণেই বড় বড় বিপত্তি ঘটে। "আপনি কিছু প্রাকৃতিক অবস্থায় ফেরত আনতে পারেন, কিন্তু সবটা ফেরত আনতে পারবেন না," বলেন তিনি।
উপদেষ্টার মতে, বাংলাদেশ একসময় প্রাকৃতিক সম্পদে এতটাই ভরপুর ছিল যে এখানে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির দরকারই হওয়ার কথা ছিল না; প্রকৃতির ওপর অত্যাচারের কারণে এখন তা সংশোধনের কাজ করতে হচ্ছে। ধ্বংস হয়ে যাওয়া বা ধ্বংসের মুখে থাকা প্রকৃতিকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিজেদের স্বার্থেই নিতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
দেশি গাছে জোর, দুই বিদেশি প্রজাতিতে নিষেধাজ্ঞা
এর আগে, ২০২৫ সালের ১৫ মে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এক প্রজ্ঞাপনে সরকারি, বেসরকারি ও ব্যক্তিগত পর্যায়ের বৃক্ষরোপণে ইউক্যালিপটাস ও আকাশমণি গাছের চারা তৈরি, রোপণ ও বিক্রি নিষিদ্ধ করে বলে প্রথম আলো জানায়। প্রজ্ঞাপনে কারণ হিসেবে পরিবেশ, প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার পূরণের কথা বলা হয়। মন্ত্রণালয়ের বন-১ অধিশাখার উপসচিব তুষার কুমার পাল তখন বলেন, নানা গবেষণায় দেখা গেছে এসব গাছের পানি শোষণক্ষমতা বেশি এবং এরা মাটিকে রুক্ষ করে তোলে; তাই আগ্রাসী প্রজাতির বদলে দেশি প্রজাতির ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছের চারা লাগিয়ে বনায়নের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সের অধ্যাপক কামাল হোসেন প্রথম আলোকে জানান, ১৯২১ সালে সিলেটের চা-বাগানে সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য অস্ট্রেলিয়া থেকে প্রথম ইউক্যালিপটাস আনা হয়; বড় আকারে ইউক্যালিপটাস ও আকাশমণি আসে ১৯৭৭ ও ১৯৭৮ সালের দিকে। তাঁর ব্যাখ্যায়, ইউক্যালিপটাস দ্রুত বাড়ে বলে পানি বেশি শোষণ করে এবং প্রচুর বীজ ছড়ায়, ফলে আশপাশে অন্য প্রজাতির গাছ জন্মানোর সুযোগ পায় না।

টাঙ্গাইল ও মধুপুরের শালবন
টাঙ্গাইল দেশের মধ্যাঞ্চলের একটি জেলা। এর আয়তন ৩ হাজার ৪১৪.২৮ বর্গকিলোমিটার, আয়তনে এটি ঢাকা বিভাগের সবচেয়ে বড় জেলা। এ জেলার মধুপুর উপজেলায় রয়েছে দেশের অন্যতম পুরোনো জাতীয় উদ্যান, মধুপুর জাতীয় উদ্যান, যার আয়তন ৮ হাজার ৪৩৬ হেক্টর। উদ্যানের প্রায় ৪০ শতাংশ এলাকা শালগাছে ঢাকা, আর মধুপুরের বনকে দেশের সেরা শালবনগুলোর একটি ধরা হয়। শাল (Shorea robusta) ভারত, বাংলাদেশ, নেপালসহ হিমালয় অঞ্চলের দেশীয় গাছ।
সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান পেশায় আইনজীবী ও পরিবেশবাদী। বাংলাদেশের জাহাজভাঙা শিল্পের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কাজের জন্য তিনি পরিচিত; ২০০৯ সালে গোল্ডম্যান এনভায়রনমেন্টাল প্রাইজ এবং ২০১২ সালে র্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কার পান।
ছবি: Antar Kubi / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, প্রথম আলো (১৫ মে ২০২৫), উইকিপিডিয়া (টাঙ্গাইল জেলা, মধুপুর জাতীয় উদ্যান, শাল, সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান)





মন্তব্য
(০)