ভারতের মেঘালয় রাজ্যে টানা ভারী বর্ষণের মধ্যে পূর্ব খাসি পাহাড় জেলার মাওসিনরামে মাত্র ২৪ ঘণ্টায় ৫৩০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। ২০২৬ সালের ২১ জুন জাগো নিউজ ভারতের ইন্ডিয়া টুডে নর্থ-ইস্টের বরাতে এ খবর দেয়। বিশেষজ্ঞদের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়, উজানে এমন অস্বাভাবিক বৃষ্টি বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের, অর্থাৎ সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগের সীমান্তবর্তী নদীগুলোর পানি দ্রুত বাড়িয়ে বন্যার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
ভারতীয় আবহাওয়াবিদরা জানান, মাওসিনরামে এক রাতে যে পরিমাণ বৃষ্টি হয়েছে, তা রাজস্থানের যোধপুর বা বিকানেরের মতো শুষ্ক অঞ্চলের শহরে ছয় মাসেরও বেশি সময়ে হওয়া মোট বৃষ্টির সমান।
মেঘালয়ের কোথায় কত বৃষ্টি
ভারতের আবহাওয়া বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, মেঘালয়ের অন্য এলাকাতেও উল্লেখযোগ্য বৃষ্টি হয়। আরকেএম সোহরায় ৪৭০ মিলিমিটার এবং মাওকিরওয়াটে ৩৯০ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়। এ ছাড়া শেল্লায় ১০০ মিলিমিটার, উইলিয়ামনগর ও মাওরিংকনেংয়ে ৯০ মিলিমিটার করে, জোয়াইয়ে ৮০ মিলিমিটার এবং বারাপানি ও রাতাচেরায় ৭০ মিলিমিটার করে বৃষ্টি হয়।
মাওসিনরাম রাজ্যের রাজধানী শিলং থেকে ৬৯ কিলোমিটার দূরের একটি জনপদ। এটি ভারতের সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপ্রবণ এলাকা এবং পৃথিবীর সবচেয়ে আর্দ্র স্থান হিসেবে পরিচিত; এখানে বছরে গড়ে ১১,৮৭২ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়। ২০২২ সালের ১৭ জুন মাওসিনরামে ২৪ ঘণ্টায় ১,০০৩.২ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছিল, যা সেখানকার এক দিনের সর্বোচ্চ রেকর্ড।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতের আবহাওয়া অধিদপ্তর (আইএমডি) মে মাসে প্রকাশিত মৌসুমি পূর্বাভাসে বলেছিল, জুন থেকে সেপ্টেম্বরের বর্ষায় সারা ভারতে স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টি হতে পারে, তবে আসাম ও মেঘালয়সহ উত্তর-পূর্ব ভারতে বৃষ্টি স্বাভাবিক থাকতে পারে। এবারের ভারী বর্ষণ এসেছে বর্ষা মৌসুমের শুরুতে।

শিলং-ডাউকি মহাসড়কের অংশ ভেসে যায়
টানা বর্ষণে অবকাঠামোরও ক্ষতি হয়। শিলং থেকে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের ডাউকি পর্যন্ত জাতীয় মহাসড়কের একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, শিলং থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দক্ষিণে লাইটলিংকট শহরের নিচের অংশে বৃষ্টির পানির তোড়ে সড়কের একটি অংশ ভেসে যায়।
এ ঘটনায় কেউ হতাহত হননি, তবে ডাউকির সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হয় এবং ওই পথে যান চলাচল বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। ন্যাশনাল হাইওয়েজ অ্যান্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন লিমিটেডের (এনএইচআইডিসিএল) দল ও ঠিকাদারেরা যোগাযোগ পুনরুদ্ধারের কাজে নামে। রাজ্যের একাধিক এলাকায় ভারী বৃষ্টির প্রভাব বাড়তে থাকায় কর্তৃপক্ষ আবহাওয়ার ওপর নিবিড় নজর রাখছিল।

বাংলাদেশের হাওরাঞ্চলের জন্য কেন উদ্বেগ
মেঘালয়ের দক্ষিণ সীমানায় বাংলাদেশের ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগ। বিশেষজ্ঞদের বরাতে জাগো নিউজ জানায়, মেঘালয়ের পাহাড় থেকে নেমে আসা পানি সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা ও মৌলভীবাজারের নদ-নদী ও হাওরে গিয়ে পড়ে। তাই উজানে এমন বৃষ্টি চলতে থাকলে সীমান্তবর্তী নদীর পানি দ্রুত বাড়তে পারে।
হাওর হলো বাটি বা পিরিচের মতো নিচু জলাভূমি, যা বর্ষায় নদী ও খালের পানিতে ভরে বিশাল জলরাশিতে পরিণত হয়। সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সিলেট, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোনাজুড়ে বিস্তৃত এই হাওর অববাহিকার প্রধান নদী সুরমা ও কুশিয়ারা; যাদুকাটা, পিয়াইন ও কংসের মতো উপনদী খাসি ও জয়ন্তিয়া পাহাড় থেকে প্রচুর পানি বয়ে আনে। শুকনো মৌসুমে এখানকার জমিতে বোরো ধান চাষ হয়, আর বর্ষায় হাওর মাছের প্রজননক্ষেত্র হয়ে ওঠে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, তখনো বন্যার কোনো আনুষ্ঠানিক সতর্কতা জারি হয়নি। তবে স্বল্প সময়ে কয়েকশ মিলিমিটার বৃষ্টি উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জন্য উদ্বেগের কারণ বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। পরের দিনগুলোতেও একই রকম ভারী বর্ষণ চললে নিম্নাঞ্চল ও হাওরে আকস্মিক বন্যা বা জলাবদ্ধতার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে তাঁরা সতর্ক করেন। এ অঞ্চল আগেও এমন বিপদ দেখেছে: ২০২২ সালের মে মাসে শুরু হওয়া বন্যায় উত্তর-পূর্ব ভারত ও বাংলাদেশে ৯০ লাখের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।

ছবি: Donvikro / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, নিউজপয়েন্ট, উইকিপিডিয়া (মাওসিনরাম, মেঘালয়, হাওর, ২০২২ সালের ভারত-বাংলাদেশ বন্যা)





মন্তব্য
(০)