২০২৫ সালের ২৮ মে অনলাইন সংবাদমাধ্যম জাগো নিউজ ২৪ যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও কলাম লেখক শাহানা হুদা রঞ্জনার একটি মতামত প্রকাশ করে, শিরোনাম ছিল ‘মানুষ অকারণে কেন পশুপাখি হত্যা করে?’। ২৭ মে লেখা ওই কলামের পেছনে ছিল সেই মাসেই সংবাদমাধ্যমে আসা দুটি ঘটনা: ভারতের সীমান্ত পেরিয়ে পঞ্চগড়ে আসা একটি আহত নীলগাইয়ের মৃত্যু, আর তিন হাজারের বেশি কবর খোঁড়া কিশোরগঞ্জের গোরখোদক মনু মিয়ার ঘোড়া হত্যা। লেখকের যুক্তি ছিল, প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা কেবল একজন মানুষ আর একটি প্রাণীর ব্যক্তিগত বিষয় নয়। এতে প্রাণীর ক্ষতি হয়, সমাজে বড় ধরনের সহিংসতার ইঙ্গিতও মেলে, আর তা ঠেকাতে শিক্ষা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও আইনকে একসঙ্গে কাজ করতে হয়।
নিচে রয়েছে সে সময় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত দুই ঘটনার বিবরণ, নীলগাই ও সংশ্লিষ্ট এলাকার পটভূমি, লেখক যেসব গবেষণার উল্লেখ করেছেন সেগুলোর তথ্য, এবং ২০২৫ সালের মে মাসে এ ধরনের কাজের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে যে আইন প্রযোজ্য ছিল তার বিবরণ।
পঞ্চগড়ে আসা নীলগাইটি
দ্য ডেইলি স্টারের বাংলা সংস্করণের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১১ মে রোববার দুপুরের দিকে পঞ্চগড় সদর উপজেলার গরিনাবাড়ী ইউনিয়নের সরকারপাড়া গ্রামের একটি ভুট্টাখেতের কাছে প্রাণীটিকে দেখা যায়। পাশের একটি মরিচখেতে মরিচ তুলছিলেন কয়েকজন নারী শ্রমিক, তাঁরাই প্রথম নীলগাইটিকে দেখেন। প্রায় দুই ঘণ্টা ভুট্টাখেতসহ বিভিন্ন ফসলের খেতে ছোটাছুটির পর পুরুষ শ্রমিকেরা প্রাণীটিকে ধরে ফেলেন। খবর পেয়ে বন বিভাগের কর্মকর্তারা প্রাণীটিকে উদ্ধার করে পঞ্চগড় সামাজিক বনায়ন ও নার্সারি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে নিয়ে চিকিৎসা দেন বলে জানান কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হরিপদ দেবনাথ। প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া পঞ্চগড় সদর উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর ও ভেটেরিনারি হাসপাতালের ভেটেরিনারি ফিল্ড অ্যাসিস্ট্যান্ট রেজাউল করিম জানান, স্ত্রী নীলগাইটির বয়স আনুমানিক দুই বছর, পাসহ শরীরের নানা জায়গায় গভীর ক্ষত, আর ক্ষতগুলো দেখে অন্তত ছয়-সাত দিন আগের বলে মনে হয়। স্থানীয় বাসিন্দা ও বন বিভাগের কর্মকর্তাদের ধারণা, ভারত থেকে সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়া পেরোনোর সময় প্রাণীটি আঘাত পেয়েছিল।
প্রথম আলো ১৩ মে জানায়, স্থানীয় লোকজন নীলগাইটিকে তাড়া করে ধরে ফেলেন, পরে বন বিভাগের কর্মীরা আহত অবস্থায় সেটিকে উদ্ধার করে বিভাগের স্টাফ কোয়ার্টারের একটি কক্ষে রেখে চিকিৎসা দেন। ১৫ মে নীলগাইটিকে কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার ডুলাহাজারা সাফারি পার্কে হস্তান্তর করা হয়, সেখানে পার্কের বন্যপ্রাণী হাসপাতালে তার চিকিৎসা চলছিল। ২৪ মে শনিবার ভোরে সেখানেই প্রাণীটি মারা যায়। সেদিন দুপুরে চকরিয়া উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আরিফ উদ্দিন ও পার্কের ভেটেরিনারি সার্জন খাতেম জুলকারনাইন ময়নাতদন্ত করেন, পরে পার্কের ভেতরেই মরদেহ মাটিচাপা দেওয়া হয়।
ভেটেরিনারি সার্জন প্রথম আলোকে বলেন, হস্তান্তরের সময়ই প্রাণীটির চার পাসহ শরীরের বিভিন্ন জায়গায় আঘাতের চিহ্ন ছিল। সামনের ডান পায়ের জয়েন্ট ভেঙে ক্ষত তৈরি হয়ে পুঁজ বের হচ্ছিল। তাঁর ভাষ্য, ক্ষতস্থানে জীবাণুর আক্রমণে নীলগাইটি রোগ প্রতিরোধের শারীরিক সক্ষমতা হারিয়ে ফেলে, সে কারণেই মৃত্যু। পার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মঞ্জুর আলম জানান, এই মৃত্যুর পর পার্কে দুটি নীলগাই রইল: ১৪ এপ্রিল পঞ্চগড় থেকে আনা একটি স্ত্রী নীলগাই এবং তার সঙ্গী হিসেবে গাজীপুরের সাফারি পার্ক থেকে আনা একটি পুরুষ নীলগাই, দুটিই সুস্থ।
কলামে শাহানা হুদা রঞ্জনা লেখেন, স্থানীয় কিছু মানুষ কোনো কারণ ছাড়াই, কেবল অবদমিত হিংস্রতা থেকে নীলগাইটিকে পিটিয়ে আহত করেছিল, আর বাংলাদেশ থেকে হারিয়ে যাওয়া প্রাণীটি সীমান্ত পেরিয়ে এ দেশে এলে আমরা তাকে বাঁচতে দিইনি। সে সময়ের প্রতিবেদনগুলোতে দেখা যায়, গ্রামবাসী প্রাণীটিকে তাড়া করে ধরেছিলেন এবং এর ক্ষতের অন্তত একটি অংশ কর্মকর্তারা সীমান্তের বেড়ার সঙ্গে যুক্ত করেছেন; কোন আঘাত কার কারণে হয়েছিল, প্রতিবেদনগুলো তা নিশ্চিত করেনি।

নীলগাই কেমন প্রাণী
নীলগাই (Boselaphus tragocamelus) এশিয়ার সবচেয়ে বড় অ্যান্টিলোপ এবং নিজের গণের একমাত্র জীবিত সদস্য; ১৭৬৬ সালে পিটার সাইমন প্যালাস প্রথম এর বৈজ্ঞানিক বর্ণনা দেন। নামের অর্থ ‘নীল গাভি’ হলেও এটি গরু নয়। বাংলায় একে প্রায়ই হরিণ বলা হয়, কলামেও একে এশিয়ার সর্ববৃহৎ হরিণ শ্রেণির প্রাণী বলা হয়েছিল; তবে চট্টগ্রাম বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মকর্তা নূরজাহান প্রথম আলোকে বলেন, প্রকৃতপক্ষে এটি অ্যান্টিলোপ জাতীয় প্রাণী। প্রাপ্তবয়স্ক নীলগাই কাঁধ পর্যন্ত ১ থেকে ১.৫ মিটার উঁচু হয়। পুরুষের ওজন ১০৯ থেকে ২৮৮ কেজি, স্ত্রীর ১০০ থেকে ২১৩ কেজি। স্ত্রী ও পুরুষ দেখতে আলাদা: প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের গায়ের রং নীলচে-ধূসর, মাথায় ১৫ থেকে ২৪ সেন্টিমিটার লম্বা মসৃণ শিং; স্ত্রী ও বাচ্চাদের রং কমলা থেকে হালকা বাদামি, তাদের শিং থাকে না। পিঠ ঢালু, পা সরু, গলায় সাদা ছোপ আর মুখে সাদা দাগ এর চেনার চিহ্ন।
নীলগাই মূলত দিনের বেলায় সক্রিয় থাকে, প্রধানত ঘাস ও লতাগুল্ম খায়, তবে কাষ্ঠল গাছের পাতাও খায়। ছোট ঝোপ ও বিক্ষিপ্ত গাছ আছে এমন এলাকা, ঝোপঝাড়ের বন ও তৃণভূমি এর পছন্দ; কৃষিজমিতে প্রায়ই দেখা যায়, ঘন বনে কম। এরা ছোট দলে থাকে: বাচ্চাসহ এক বা দুটি স্ত্রী, বাচ্চাসহ তিন থেকে ছয়টি প্রাপ্তবয়স্ক ও এক বছর বয়সী স্ত্রী, অথবা দুই থেকে আঠারোটি পুরুষের দল। সাধারণত শান্ত এই প্রাণী তাড়া খেলে বা ভয় পেলে তিনশো মিটার বা তার বেশি দূরে ছুটে পালায়। স্ত্রী নীলগাই প্রায় দুই বছরে প্রজননক্ষম হয়, পুরুষ চার-পাঁচ বছরের আগে নয়। গর্ভকাল আট থেকে নয় মাস; সাধারণত একটি বাচ্চা হয়, কখনো যমজ বা তিনটিও। আয়ু প্রায় দশ বছর।
প্রাণীটি ভারত, নেপাল ও পাকিস্তানে বাস করে; বড় অংশটি থাকে হিমালয়ের পাদদেশের তরাই অঞ্চলে, আর উত্তর ভারতজুড়ে এদের সংখ্যা প্রচুর। ২০০১ সালে ভারতে নীলগাইয়ের সংখ্যা আনুমানিক ১০ লাখ ধরা হয়েছিল। প্রকৃতি সংরক্ষণের আন্তর্জাতিক সংস্থা আইইউসিএন বৈশ্বিকভাবে একে ‘ন্যূনতম উদ্বেগজনক’ শ্রেণিতে রেখেছে। উত্তর ভারতের কয়েকটি রাজ্যে এদের সংখ্যা এত বেশি যে দলবদ্ধ নীলগাই ফসলের খেত তছনছ করায় কৃষকেরা সরকারের কাছে এদের সংখ্যা কমানোর দাবি জানিয়েছেন।
বাংলাদেশের চিত্র ভিন্ন। আইইউসিএন বাংলাদেশের ২০০০ সালের লাল তালিকার বরাত দিয়ে বাংলাপিডিয়া গত শতকে দেশ থেকে হারিয়ে যাওয়া এক ডজনের বেশি বন্যপ্রাণীর তালিকায় নীলগাইকে রেখেছে; সেই তালিকায় আছে একশৃঙ্গ, জাভা ও সুমাত্রার গন্ডার, গৌর, বানতেং, বুনো মহিষ, বারাশিঙা, নেকড়ে, গোলাপি-মাথা হাঁস, ময়ূর ও মিঠাপানির কুমির। প্রথম আলো জানায়, শত বছর আগে দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড়ে প্রচুর নীলগাই দেখা যেত। চট্টগ্রামের বন্যপ্রাণী কর্মকর্তা নূরজাহানের ভাষ্য, ১৯৪০ সালের আগে ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, দিনাজপুর, নওগাঁ ও জয়পুরহাটের বনে প্রাণীটির দেখা মিলত; বাসস্থান ও খাদ্যের অভাবসহ প্রতিকূল পরিবেশে সেগুলো হারিয়ে যায়। এখন মাঝেমধ্যে যে কয়েকটি নীলগাই উদ্ধারের খবর আসে, সেগুলো মূলত ভারত থেকে আসা, আর বেশির ভাগই স্থানীয় লোকজনের হাতে আক্রান্ত হয় অথবা সীমান্তের কাঁটাতারে আঘাত পায়।
২০১৬ সালের ২২ জুন ঢাকায় আইইউসিএন ‘রেড লিস্ট অব বাংলাদেশ ২০১৫’ প্রকাশ করে। তাতে সাতটি দলের ১ হাজার ৬১৯ প্রজাতির প্রাণীর অবস্থা মূল্যায়ন করা হয়: স্তন্যপায়ী ১৩৮, পাখি ৫৬৬, সরীসৃপ ১৬৭, উভচর ৪৯, মিঠাপানির মাছ ২৫৩, ক্রাস্টেসিয়ান ১৪১ এবং প্রজাপতি ৩০৫। এর মধ্যে ৩৯০টিকে হুমকির মুখে থাকা প্রজাতি হিসেবে চিহ্নিত করা হয় (৫৬টি মহাবিপন্ন, ১৮১টি বিপন্ন ও ১৫৩টি সংকটাপন্ন), ২৭৮টির বিষয়ে পর্যাপ্ত তথ্য নেই বলে উল্লেখ করা হয়, আর ৩১টি প্রজাতিকে দেশ থেকে আঞ্চলিকভাবে বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। নীলগাইয়ের মৃত্যুর খবরে প্রথম আলো যেমন উল্লেখ করেছে, নীলগাই সেই ৩১ প্রজাতির একটি।
সাত বছরে নয়টি নীলগাই
পঞ্চগড়ের নীলগাইটি প্রথম নয়। প্রথম আলোর হিসাবে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৫ সালের ১১ মে পর্যন্ত পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁওয়ে নয়টি নীলগাই দেখা গেছে। বেশির ভাগ পাঠানো হয়েছে বিভিন্ন সাফারি পার্কে, কোনোটি মারা পড়েছে জনতার হাতে। পঞ্চগড়ে ২০২১ সালের ১৭ মার্চ আটোয়ারী উপজেলার মির্জাপুর এলাকায় গ্রামবাসীর তাড়া খেয়ে একটি নীলগাই মারা যায়; ২০২৩ সালের ২১ মে আটোয়ারীর একটি ভুট্টাখেতে আরেকটি দেখা দিলেও সেটিকে ধরা যায়নি, পরে সেটি চলে যায়। পাশের জেলা ঠাকুরগাঁওয়ে ২০১৮ সালের ৪ সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৩ সালের ১৩ নভেম্বর পর্যন্ত পাঁচটি নীলগাই পাওয়া যায়: রানীশংকৈল উপজেলায় একটি স্থানীয়দের তাড়া খেয়ে মারা যায়, আরেকটিকে স্থানীয় লোকজন জবাই করেন, বাকি তিনটি আহত অবস্থায় উদ্ধার হয়। ২০২২ সালের ১২ মে দ্য ডেইলি স্টার বাংলা জানায়, ঠাকুরগাঁওয়ে আড়াই ঘণ্টা ধাওয়ার পর একটি নীলগাই হত্যা করা হয়েছে। নাটোর, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জেও বিভিন্ন সময় নীলগাই উদ্ধারের খবর পাওয়া গেছে।
মে মাসের ঘটনার মাত্র এক মাস আগে, ২০২৫ সালের ৯ এপ্রিল, পঞ্চগড় সদর উপজেলার চাকলাহাট ইউনিয়নের ভারতীয় সীমান্তঘেঁষা পূর্ব জয়ধরভাঙ্গা এলাকায় গ্রামবাসী তাড়া করে আরেকটি স্ত্রী নীলগাই ধরেন। দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় তিন কিলোমিটার ধাওয়ার পর প্রাণীটি স্থানীয় পাঙ্গা নদীতে ঝাঁপ দিলে গ্রামবাসী সেটিকে ঘিরে ফেলেন। পরে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) স্থানীয় ক্যাম্পের সদস্যরা নীলগাইটিকে উদ্ধার করেন এবং উপজেলা নির্বাহী অফিসার বন বিভাগকে জানান। প্রাথমিক চিকিৎসার পর ১২ এপ্রিল রাতে একটি কাঠের খাঁচায় ভরে ট্রাকে করে প্রাণীটিকে ডুলাহাজারায় পাঠানো হয়। পার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তখন জানিয়েছিলেন, পশু চিকিৎসক পরীক্ষা করে দেখেছেন শরীরে হালকা কিছু আঁচড় ছাড়া প্রাণীটি সুস্থ, আর গাজীপুরের সাফারি পার্ক থেকে একটি পুরুষ নীলগাই এনে এর সঙ্গী করা হবে। বন বিভাগ সূত্র পত্রিকাটিকে জানায়, ২০১৮ সাল থেকে ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড়ে অন্তত ছয়টি নীলগাই দেখা গেছে; চারটি জীবিত উদ্ধার করা গেলেও গ্রামবাসীর ধাওয়া ও মারধরে দুটি প্রাণ হারায়।
রাজশাহী বিভাগীয় বন কর্মকর্তার কার্যালয়ের বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ প্রথম আলোকে জানায়, গত কয়েক বছরে উত্তরাঞ্চল থেকে অন্তত পাঁচটি নীলগাই গাজীপুর সাফারি পার্কে পাঠানো হয়েছে, সেখানে বাচ্চা জন্মানোর পর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে বারোটিতে। পত্রিকাটির সঙ্গে কথা বলা বন কর্মকর্তা ও প্রাণিবিশেষজ্ঞদের মতে, খাবারের সন্ধানে বের হয়ে, দলছুট হয়ে কিংবা কোনো প্রতিকূল পরিস্থিতিতে পড়ে নীলগাই ভারত থেকে সীমান্ত পেরিয়ে আসে, আর কাঁটাতারের বেড়া পার হতে গিয়ে বেশির ভাগই আহত হয়। বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকায় বিচরণের মতো অনুকূল পরিবেশ না পেয়ে সেগুলো লোকালয়ে ঢুকে পড়ে এবং ফসলের খেতে আশ্রয় নেয়।
পঞ্চগড় সরকারি মহিলা কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের প্রভাষক মো. শরীফ হোসেন পত্রিকাটিকে বলেন, নীলগাই দেশের বিলুপ্ত প্রাণী, কোনো কারণে প্রাণীটি দেশে এলে তা জীববৈচিত্র্যকে সমৃদ্ধ করবে; সে জন্য স্থানীয় সরকারের সহায়তায় বন বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর উচিত সীমান্ত এলাকার মানুষকে সচেতন করতে কর্মসূচি নেওয়া। হরিপদ দেবনাথ জানান, সীমান্ত জেলা হওয়ায় পঞ্চগড়ে মাঝেমধ্যেই নীলগাইসহ নানা বন্যপ্রাণী ধরা পড়ে, কিন্তু বন্যপ্রাণী উদ্ধার বা সংরক্ষণের জন্য বন বিভাগের সেখানে আলাদা কোনো কর্মকর্তা নেই। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা প্রথম আলোকে বলেন, সীমান্তবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের নিয়ে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণবিষয়ক সভা-সেমিনার করা প্রয়োজন।
কিশোরগঞ্জে এক গোরখোদকের ঘোড়া
দ্বিতীয় ঘটনাটি প্রথম আলো প্রকাশ করে ২০২৫ সালের ১৭ মে। কিশোরগঞ্জের ইটনা উপজেলার জয়সিদ্ধি ইউনিয়নের আলগাপাড়া গ্রামের ৬৭ বছর বয়সী মনু মিয়া ৫০ বছর ধরে কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই কবর খুঁড়ে আসছিলেন; তাঁর ডায়েরির হিসাবে সংখ্যাটি ৩ হাজার ৫৭। কারও মৃত্যুসংবাদ কানে এলেই খুন্তি, কোদালসহ প্রয়োজনীয় সব সরঞ্জাম নিয়ে ঘোড়ায় চড়ে কবরস্থানে ছুটে যেতেন তিনি। দূরের যাত্রায় দ্রুত পৌঁছাতে কয়েক বছর আগে নিজের ধানি জমি বিক্রি করে ঘোড়াটি কিনেছিলেন। নিঃসন্তান মনু মিয়া রোগে শয্যাশায়ী হয়ে পড়লে ১৪ মে তাঁকে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়; সেখানে সংকটাপন্ন অবস্থায় তাঁর চিকিৎসা চলছিল, পাশে ছিলেন স্ত্রী।
দুজনই বাড়িতে না থাকায় ঘোড়াটির দেখাশোনার কেউ ছিল না। ১৬ মে শুক্রবার সকালে পাশের মিঠামইন উপজেলার হাশিমপুর ছত্রিশ গ্রামের একটি মাদ্রাসার পাশে পানির মধ্যে ঘোড়াটির মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখেন এলাকাবাসী; ঘোড়াটির বুকে ছিল ধারালো অস্ত্রের আঘাত। মনু মিয়ার শারীরিক ও মানসিক অবস্থার কথা ভেবে স্ত্রী ও স্বজনেরা খবরটি তাঁর কাছে গোপন রাখেন। মুঠোফোনে তাঁর স্ত্রী প্রথম আলোকে বলেন, মনু মিয়া জীবনে কারও ক্ষতি করেননি, এত দিন তাঁরা জানতেন মানুষ তাঁকে ভালোবাসে; তাঁর এমন খারাপ অবস্থায় কী করে মানুষ তাঁর প্রিয় ঘোড়াটিকে মেরে ফেলতে পারল, তা তিনি বুঝতে পারছেন না। এক প্রতিবেশী ঘটনাটিকে নিন্দনীয় বলে এর বিচার দাবি করেন।
কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপারের দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) মুকিত সরকার পত্রিকাটিকে জানান, মিঠামইন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) এ বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, অভিযোগ পাওয়ামাত্র প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রতিবেদনে কোনো সন্দেহভাজনের নাম ছিল না, কলাম প্রকাশের সময়ও প্রকাশ্যে কাউকে অভিযুক্ত করা হয়নি।
প্রথম আলো জানায়, দুর্গম হাওর উপজেলা ইটনা, মিঠামইন, শাল্লা, আজমিরীগঞ্জসহ আশপাশের এলাকায় তো বটেই, রাজধানীর বনানী কবরস্থানসহ দেশের নানা প্রান্তে দক্ষ গোরখোদক হিসেবে মনু মিয়ার সুনাম রয়েছে; যাঁদের কবর তিনি খুঁড়েছেন, তাঁদের মৃত্যুর দিন-তারিখও তিনি ডায়েরিতে লিখে রাখেন। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, কিশোরগঞ্জের উত্তর-পূর্বে অবস্থিত ইটনা উপজেলার আয়তন ৪০১.৯৩ বর্গকিলোমিটার; সুরমা, ধনু, বাউলাই ও কালনী নদী এবং কয়েকটি বড় হাওর ও বিল এর মধ্যে পড়েছে। ইটনা থানা গঠিত হয় ১৯১৭ সালে, উপজেলা হয় ১৯৮৩ সালে।
শাহানা হুদা রঞ্জনা লেখেন, খবরটি পড়ার পর থেকে তিনি ভাবছেন, গোরখোদকের সঙ্গে কারও কি শত্রুতা ছিল, ঘোড়াটিরই বা কী অপরাধ ছিল। ঘোড়াটি মনু মিয়ার কাছে ছিল সন্তানের মতো; হয়তো তাঁকে কষ্ট দেওয়ার জন্যই কেউ এমনটা করেছে। লেখকের যুক্তি, মানুষের মনে হিংসা ও বিদ্বেষ ভর করলে মানুষ দানব হয়ে যায়, যার প্রতি ক্রোধ জন্মায় তার ভালোবাসার ধন, সম্পত্তি, পশুপাখি মেরে শান্তি পায়। হিংসার আরও উদাহরণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন একজনের কলাবাগান কেটে তছনছ করা, আরেকজনের পুকুরের সব মাছ বিষ দিয়ে মেরে ফেলা, আর রাজশাহীতে একটি আমবাগানের প্রতিটি গাছ আমসহ উপড়ে ফেলার ঘটনা; বাগানের মালিক যখন কাঁদছেন, তখন হয়তো অসুস্থ মানসিকতার কেউ তাতে আনন্দ পাচ্ছে, লিখেছেন তিনি।

নিষ্ঠুরতা ও সহিংসতা নিয়ে গবেষণা কী বলে
এমন আচরণের ব্যাখ্যা খুঁজতে লেখক গবেষণার আশ্রয় নেন। শুরু করেন চার্লস ডারউইন দিয়ে, যিনি ‘দ্য ডিসেন্ট অব ম্যান’ (১৮৭১) বইয়ে লিখেছিলেন, মানসিক ক্ষমতার দিক থেকে মানুষ ও উচ্চতর স্তন্যপায়ী প্রাণীর মধ্যে কোনো মৌলিক পার্থক্য নেই। লেখকের ভাষায়, প্রাণীরা যুক্তি দিতে পারে না, নিজের পক্ষে কথা বলতে পারে না, কিন্তু তারা অনুভব করে, আনন্দিত হয়, কষ্ট পায়, নিবেদিতভাবে মালিকের প্রতি দায়িত্ব পালন করে; তবু অসহায় বলেই মানুষের সহিংসতার শিকার হয়। শুধু রাস্তার প্রাণী নয়, অনেকে নিজের পোষা প্রাণীর সঙ্গেও খারাপ আচরণ করে, আর চিড়িয়াখানা, সার্কাস, সাফারি, খামার ও পোষা প্রাণীর দোকানের প্রাণীরা প্রায়ই রূঢ় আচরণের শিকার হয়।
কসাইখানা ও অপরাধের সম্পর্ক নিয়ে ২০০৯ সালের একটি গবেষণার কথা উল্লেখ করেন তিনি। ‘অর্গানাইজেশন অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট’ সাময়িকীতে প্রকাশিত অ্যামি ফিটজেরাল্ড, লিন্ডা কালোফ ও টমাস ডিয়েটজের ‘স্লটারহাউসেস অ্যান্ড ইনক্রিজড ক্রাইম রেটস’ শীর্ষক গবেষণাটি যুক্তরাষ্ট্রের ‘রাইট-টু-ওয়ার্ক’ আইন থাকা অঙ্গরাজ্যগুলোর ৫৮১টি অমহানগর কাউন্টির ১৯৯৪ থেকে ২০০২ সালের তথ্য বিশ্লেষণ করে। এতে দেখা যায়, অন্য শিল্পের তুলনায় কসাইখানায় কর্মসংস্থান আশপাশের এলাকায় মোট গ্রেপ্তারের হার, সহিংস অপরাধে গ্রেপ্তার, ধর্ষণের দায়ে গ্রেপ্তার এবং অন্যান্য যৌন অপরাধে গ্রেপ্তার বাড়িয়ে দেয়। গবেষণাটি কাউন্টিভিত্তিক গ্রেপ্তারের হার মেপেছে, কলামের ভাষ্যমতো আলাদা আলাদা কসাইখানাকর্মীর রেকর্ড নয়।
লেখক নরওয়েজিয়ান সেন্টার ফর ভায়োলেন্স অ্যান্ড ট্রমাটিক স্ট্রেস স্টাডিজের জরিপের কথাও বলেন। ২০২২ সালে ‘জার্নাল অব ইন্টারপারসোনাল ভায়োলেন্স’-এ প্রকাশিত দেশব্যাপী ওই বিদ্যালয়ভিত্তিক জরিপে ১২ থেকে ১৬ বছর বয়সী ৯ হাজার ২৪০ জন কিশোর-কিশোরী অংশ নেয়। এদের ৪ শতাংশ পরিবারের পোষা প্রাণীর প্রতি মা-বাবার কাউকে সহিংস হতে দেখেছে, আর ১ শতাংশের অভিজ্ঞতা হলো পরিবারের কোনো প্রাপ্তবয়স্ক পোষা প্রাণীর ক্ষতি করার হুমকি দিয়েছেন। গবেষকেরা পোষা প্রাণী নির্যাতন ও শিশু নির্যাতনের মধ্যে ‘যথেষ্ট মিল’ পান, যা সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে মানসিক নির্যাতন ও তুলনামূলক কম গুরুতর শারীরিক নির্যাতনের সঙ্গে। ঝুঁকির কারণগুলোও পারিবারিক নির্যাতনের মতোই: নিম্ন আর্থসামাজিক অবস্থা, মা-বাবার মাদকাসক্তি, মানসিক অসুস্থতা বা কারাবাসের ইতিহাস।
পোষা ও ছোট প্রাণীর ওপর নির্যাতনের ইতিহাসকে বলা হয় ‘জুস্যাডিজম’; মনোরোগবিদ্যায় একে অ্যান্টিসোশ্যাল পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডারসহ কিছু মানসিক ব্যাধির লক্ষণ হিসেবে ধরা হয়। কলামে দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের বরাতে বলা হয়, এফবিআই দেখেছে প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতার ইতিহাস সিরিয়াল ধর্ষক ও খুনিদের রেকর্ডে নিয়মিত দেখা যাওয়া বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি, আর মানসিক রোগ নির্ণয়ের প্রচলিত ম্যানুয়ালে প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতাকে আচরণগত ব্যাধি বা কন্ডাক্ট ডিসঅর্ডারের একটি নির্ণায়ক মানদণ্ড হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। সিরিয়াল কিলারদের নিয়ে গবেষণা করা এফবিআইয়ের আচরণগত বিজ্ঞান ইউনিটের এজেন্ট রবার্ট কে. রেসলার ১৯৯১ সালে পত্রিকাটিকে বলেছিলেন, জেফরি ডাহমারের মতো খুনিরা প্রায়ই ছোটবেলায় প্রাণী হত্যা ও নির্যাতনের মধ্য দিয়ে শুরু করে।
এফবিআই নিজেও ২০১৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে তাদের ন্যাশনাল ইনসিডেন্ট-বেজড রিপোর্টিং সিস্টেমে প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতাকে আলাদা অপরাধ হিসেবে গণনা শুরু করে; এর মধ্যে আছে চরম অবহেলা, নির্যাতন, সংঘবদ্ধ নিপীড়ন ও যৌন নির্যাতন। এর আগে এসব অপরাধ ‘অন্যান্য সব অপরাধ’ শ্রেণিতে গোনা হতো। সংস্থাটির অপরাধ পরিসংখ্যান শাখার একজন কর্মকর্তা তখন বলেছিলেন, কিছু গবেষণা অনুযায়ী প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা বড় অপরাধের পূর্বলক্ষণ। এই পরিবর্তনের পক্ষে প্রচার চালানো ন্যাশনাল শেরিফস অ্যাসোসিয়েশন পারিবারিক সহিংসতা ও শিশু নির্যাতনের সঙ্গে এর মিলের কথা তুলে ধরে।
কলামে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অ্যালান আর. ফেলথাউসের একটি জরিপের কথাও আছে: বারবার কুকুর-বিড়াল নির্যাতন করা মানসিক রোগীদের সবাই মানুষের প্রতিও ছিলেন অত্যন্ত আক্রমণাত্মক, তাঁদের একজন একটি ছেলেকে হত্যা করেছিলেন। হিউম্যান সোসাইটি অব দ্য ইউনাইটেড স্টেটসের উদ্ধৃত দুটি আলাদা গবেষণায় পারিবারিক নির্যাতনের শিকার পরিবারগুলোর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জানিয়েছে, অন্তত একটি শিশু কোনো পোষা প্রাণীকে আঘাত করেছে বা মেরে ফেলেছে। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, যে শিশুরা প্রাণী নির্যাতন করে, তারা প্রায়ই নিজেরা নির্যাতন দেখেছে বা তার শিকার হয়েছে। লেখকের মতে, এ কারণেই নিষ্ঠুরতা দেখে শেখা আচরণ: শিশুরা যদি দেখে প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতার জন্য কেউ বকে না, কারও শাস্তি হয় না, তাহলে তারা একে গ্রহণযোগ্য ভাবতে পারে।
প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা আর মানুষের প্রতি সহিংসতার এই যোগসূত্রকে মনোবিজ্ঞানে বলা হয় ‘দ্য লিংক’। লেখকের যুক্তি, যাদের সহানুভূতির অভাব রয়েছে, যেমন অ্যান্টিসোশ্যাল পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডারে আক্রান্তরা, তারা ক্ষমতা দেখাতে বা মানসিক চাপ কমাতে প্রাণীকে আঘাত করতে পারে; আবার কেউ কেউ দমিয়ে রাখা ক্রোধ ঝাড়ে প্রাণীর ওপর, কারণ প্রাণী দুর্বল, প্রতিরোধ করতে পারে না। তবে তিনি হেলেন গ্যাভিনের ‘ক্রিমিনোলজিক্যাল অ্যান্ড ফরেনসিক সাইকোলজি’ (২০১৩) বই থেকে একটি সতর্কতাও যোগ করেন: অপরাধীদের মধ্যে প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা সর্বজনীন বৈশিষ্ট্য নয়। গ্যাভিনের উদাহরণ ডেনিস নিলসেন, সাবেক এই সরকারি কর্মচারী ১৯৭৮ থেকে ১৯৮৩ সালের মধ্যে উত্তর লন্ডনের দুটি ঠিকানায় অন্তত বারোজন তরুণকে হত্যা করেন; ছয়টি হত্যা ও দুটি হত্যাচেষ্টার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়ে ১৯৮৩ সালের ৪ নভেম্বর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পান। অথচ তিনি তাঁর কুকুর ব্লিপকে খুব ভালোবাসতেন; গ্রেপ্তারের পর কুকুরটিকেও থানায় নেওয়া হলে তিনি তাকে নিয়ে খুব চিন্তিত ছিলেন। কলামে নিহতের সংখ্যা ‘অন্তত ১৫’ বলা হয়েছিল; সাধারণত বারো থেকে পনেরোজন বলা হয়, পনেরো সেই হিসাবের সর্বোচ্চ।
ঘরের কাছের নিষ্ঠুরতা
লেখকের ভাষায়, বাংলাদেশে রাস্তায় কুকুর-বিড়ালকে লাথি মারা, পাথর ছোড়া, গরম পানি ঢেলে দেওয়া বা বিষ দিয়ে মেরে ফেলার ঘটনা ঘটেই চলেছে। তিনি কয়েকটি ঘটনার উল্লেখ করেন: সিলেটে কিছু তরুণ টিলার ওপর আশ্রয় নেওয়া শিয়াল ও বাগডাশ মেরে বনবিড়ালের চামড়া নিয়ে মিছিল করেছে; বন্যার সময় ঘরে আশ্রয় নেওয়া একটি হরিণ খেয়ে ফেলা হয়েছে; আরেক দল একটি মা গন্ধগোকুলকে মেরে তার বাচ্চাদের নিরাশ্রয় করেছে; কোথাও কুকুরের পা ভেঙে দেওয়া হয়েছে, বিড়ালকে দড়িতে ঝুলিয়ে মারা হয়েছে, আহত শামুকখোল পাখি রান্না করে খাওয়া হয়েছে, বিষ দিয়ে মাছ, বানর ও পাখি মারা হয়েছে। তাঁর যুক্তি, যারা বিনা প্রয়োজনে প্রাণী হত্যা করতে পারে, তারা কাল মানুষও খুন করতে পারে; কারণে-অকারণে মানুষের হাতে মানুষ খুনের ঘটনা দেশ এখন প্রতিদিনই দেখছে।
তিনি আলাদা করে ঢাকার কাঁটাবনের পোষা প্রাণীর বাজারের কথা বলেন, যেখানে তাঁর ভাষায় প্রাণীদের মানবেতর পরিবেশে রাখা হয় এবং কোভিডের সময় অসংখ্য প্রাণী মারা গেছে। ঘটনাটি তখন সংবাদমাধ্যমে এসেছিল। ২০২১ সালের জুলাইয়ের কঠোর লকডাউনে বার্তা সংস্থা এএফপি বাজারের দোকান মালিক সমিতির এক মুখপাত্রের বরাতে জানায়, ১ জুলাই বাজার বন্ধ হওয়ার পর থেকে প্রায় ৪০০ পাখি এবং কয়েক ডজন কুকুর, বিড়াল, খরগোশ, ইঁদুর ও গিনিপিগ মারা গেছে, যা সেখানকার প্রাণীর অন্তত ২০ শতাংশ। মৃত্যুর খবর দেশজুড়ে আলোচনায় এলে সরকার পুলিশকে নির্দেশ দেয়, বাজারের ৭৫টি ছোট দোকান যেন সকালে দুই ঘণ্টা ও বিকেলে দুই ঘণ্টা খোলা রাখা যায়। প্রাণী অধিকার সংগঠন অভয়ারণ্যের প্রধান রুবাইয়া আহমেদ এএফপিকে বলেন, সেখানে প্রাণীদের আগে থেকেই চরম অমানবিক অবস্থায় রাখা হতো, আর যেখানেই প্রাণীদের বন্দী রাখা হয়, অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় মূল্য তারাই আগে দেয়।
লেখকের মতে, চিড়িয়াখানাও একটি বন্দিশালা, যেখানে অযত্ন, অপুষ্টি, তৃষ্ণা ও অপরিচ্ছন্নতায় প্রাণীরা কষ্ট পায়; আর কক্সবাজার ও ঢাকার গুলিস্তানে ঘোড়ার গাড়ির মালিক ও চালকেরা ঘোড়াকে অতিরিক্ত ভার বহনে বাধ্য করেন, মারধর করেন, ঠিকমতো খেতে দেন না। কক্সবাজারের সমস্যাটি আগেও সংবাদমাধ্যমে এসেছে। ২০২১ সালের জুনে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড জানায়, ঘোড়া মালিক সমিতির হিসাবে মহামারি শুরুর পর থেকে সৈকতের ২৬টি ঘোড়া মারা গেছে, এর ২০টি ২০২০ সালে ও ৬টি ২০২১ সালে। মালিকেরা পর্যটকদের কাছ থেকে আয় বন্ধ হওয়াকে দায়ী করেন; অন্যদিকে অভিযোগ ছিল, অনেক মালিক ঘোড়াকে খাবার না দিয়ে শহরে ছেড়ে দেন, ফলে কোনো কোনো ঘোড়া রাস্তার পাশের ডাস্টবিনের পচা খাবার খেয়ে অসুস্থ হয়, কোনোটি খাবারের খোঁজে রাস্তা পার হতে গিয়ে গাড়ির ধাক্কায় আহত হয়।
২০২২ সালের জুনে দ্য ডেইলি স্টার বাংলা জানায়, কক্সবাজারের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ হাসানুজ্জামান ঘোড়ার মালিকদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় ঘোষণা দেন, সৈকতের ঘোড়ার প্রতি অমানবিক আচরণ করলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পত্রিকাটি লেখে, দিনের বেলায় পর্যটকদের বিনোদনে ভাড়ায় খাটানো ঘোড়াগুলোকে রাতে মালিকেরা বেওয়ারিশের মতো যত্রতত্র ছেড়ে দেন, আর পর্যটন মৌসুম ছাড়া বছরের বাকি সময় খাবার, চিকিৎসা ও আশ্রয়ের দিকে নজর না দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে মালিকদের বিরুদ্ধে; ফলে ঘোড়াগুলো পুষ্টিহীনতা ও অসুস্থতায় ভোগে।
লেখক লেখেন, প্রাণীর প্রতি ভালোবাসা না থাকলে শিশু কঠিন মন নিয়ে বড় হয়। প্রাণীর প্রতি সহানুভূতি ও সচেতনতার অভাব, নৈতিক শিক্ষার ঘাটতি এবং নির্মম আচরণ শিশু-কিশোরদের মধ্যে সহিংসতা বাড়িয়ে তোলে; প্রকৃতি, প্রাণী ও মানুষের প্রতি ভালোবাসা ছাড়া যারা বড় হয়, তারা পরিবার, সমাজ ও দেশকেও ভালোবাসতে পারে না। তাঁর মতে, নিষ্ঠুরতা প্রতিরোধে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও আইনি ব্যবস্থার সমন্বয় দরকার।

২০২৫ সালের মে মাসে আইন কী বলত
কলামে বর্ণিত ধরনের কাজগুলো দুটি আইনের আওতায় পড়ে। প্রাণিকল্যাণ আইন, ২০১৯ (২০১৯ সনের ১২ নং আইন, ১০ জুলাই ২০১৯) ১৯২০ সালের দ্য ক্রুয়েলটি টু অ্যানিমেলস অ্যাক্ট রহিত করে প্রণীত হয়। এ আইনে ‘প্রাণি’ বলতে বোঝায় মানুষ ছাড়া সব স্তন্যপায়ী প্রাণী, পাখি, সরীসৃপ, মাছ ছাড়া অন্যান্য জলজ প্রাণী এবং সরকার গেজেট প্রজ্ঞাপনে ঘোষিত অন্য যেকোনো প্রাণী। আইনের কর্তৃপক্ষ প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বা তাঁর কাছ থেকে ক্ষমতাপ্রাপ্ত অধিদপ্তরের কোনো ভেটেরিনারি সার্জন। ধারা ৪ অনুযায়ী, প্রত্যেক প্রাণীর মালিক বা তত্ত্বাবধানকারীর দায়িত্ব যৌক্তিক কারণ ছাড়া প্রাণীর প্রতি কল্যাণকর ও মানবিক আচরণ করা এবং নিষ্ঠুর আচরণ থেকে বিরত থাকা।
ধারা ৬-এ যেসব আচরণকে প্রাণীর প্রতি অপ্রয়োজনীয় নিষ্ঠুরতা হিসেবে গণ্য করা হয়েছে, তার কয়েকটি হলো:
- কোনো কাজ করা বা না করার কারণে প্রাণী অসুস্থ হওয়া;
- প্রাণীকে দিয়ে অতিরিক্ত পরিশ্রম করানো বা অপ্রয়োজনীয়ভাবে প্রহার করা;
- প্রয়োজনীয় পরিমাণে খাদ্য ও পানি না দেওয়া, অথবা জোর করে অতিরিক্ত খাওয়ানো;
- এমনভাবে বেঁধে, আটকে বা বহন করা যাতে প্রাণী স্বাভাবিকভাবে দাঁড়াতে, বসতে বা শুতে পারে না;
- নিয়ন্ত্রণের জন্য ধারালো ধাতব বস্তু দিয়ে প্রহার বা আঘাত করা;
- অসুস্থ অবস্থায় বা মৃত্যু ঘটানোর জন্য প্রাণীকে লোকালয়ে ছেড়ে দেওয়া;
- প্রাণীকে লড়াইয়ে প্ররোচিত করা, টোপ হিসেবে ব্যবহার করা বা উত্ত্যক্ত করা;
- কুকুরকে চলাফেরার সুযোগ না দিয়ে টানা চব্বিশ ঘণ্টা বা তার বেশি বেঁধে বা আটকে রাখা;
- চিকিৎসা না করিয়ে কষ্টে থাকা প্রাণীকে বিক্রির জন্য দেওয়া।
ধারা ৭ অনুযায়ী, আইনে উল্লিখিত কারণ ছাড়া মালিকবিহীন কোনো প্রাণী নিধন বা অপসারণ করা যাবে না, আর তেমন প্রাণী হত্যা অপরাধ। ধারা ৮ শারীরিকভাবে অনুপযুক্ত প্রাণীকে পরিবহনে বাহক হিসেবে ব্যবহার এবং কোনো প্রাণী দিয়ে মাত্রাতিরিক্ত যাত্রী বা মালামাল বহন নিষিদ্ধ করেছে। ধারা ১১ অনুযায়ী, বিষাক্ত বা অনিষ্টকর জেনেও কোনো ওষুধ বা খাবার খাওয়ানো বা বিষ প্রয়োগের ফলে প্রাণীর মৃত্যু, স্থায়ী অঙ্গহানি বা স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা নষ্ট হলে তা অপরাধ; তবে যুক্তিসংগত প্রয়োজনে ভেটেরিনারি সার্জনের লিখিত পরামর্শে অজ্ঞান করা বা ব্যথাহীন মৃত্যু ঘটানো অপরাধ নয়।
ধারা ১৬ অনুযায়ী, ধারা ৬, ৭ বা ৮-এর অধীন অপরাধে অনধিক ছয় মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা অনধিক ১০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে। ধারা ১০-এর অধীন অঙ্গহানি এবং ধারা ১১-এর অধীন বিষ প্রয়োগের অপরাধে অনধিক দুই বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড। ধারা ১৯ অনুযায়ী এ আইনের সব অপরাধ অ-আমলযোগ্য ও জামিনযোগ্য।
নীলগাইয়ের মতো বন্যপ্রাণীর ক্ষেত্রে তখন প্রযোজ্য ছিল বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২। এর ধারা ৬ অনুযায়ী, এই আইনের অধীন লাইসেন্স বা পারমিট ছাড়া কেউ কোনো বন্যপ্রাণী শিকার করতে পারবেন না; আর আইনে ‘শিকার’ বলতে বোঝানো হয়েছে বন্যপ্রাণী হত্যা করা, ধরা, বিষ প্রয়োগ করা, এসব উদ্দেশ্যে তাড়িয়ে নেওয়া এবং বন্যপ্রাণীকে আহত বা ক্ষতি করা। ধারা ৩৯ অনুযায়ী, ধারা ৬ লঙ্ঘনে সর্বোচ্চ এক বছরের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড, আর একই অপরাধের পুনরাবৃত্তিতে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে। ধারা ৩০ সরকারকে আহত, জব্দ করা, বাজেয়াপ্ত, পরিত্যক্ত বা দান করা বন্যপ্রাণীর চিকিৎসা, খাদ্য, আশ্রয় ও নিরাপত্তার জন্য উদ্ধারকেন্দ্র স্থাপন এবং সেখান থেকে প্রাণীকে প্রকৃতিতে অবমুক্ত করার নির্দেশিকা প্রণয়নের ক্ষমতা দিয়েছে।
ছবি: Bernard Gagnon / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, প্রথম আলো, দ্য ডেইলি স্টার বাংলা, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, এএফপি (জিও নিউজ), আইইউসিএন, বাংলাপিডিয়া, বাংলাদেশের আইন (লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগ), ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন, অর্গানাইজেশন অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট, জার্নাল অব ইন্টারপারসোনাল ভায়োলেন্স (ইউরোপ পিএমসি), উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)