রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার ৬৫ বছর বয়সী এক ব্যক্তি ২০২৬ সালের ১৯ জুলাই, রোববার দিনগত রাত দেড়টার দিকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সাপের কামড়ে মারা যান। পরদিন সোমবার, ২০ জুলাই, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি ছড়িয়ে পড়ে যে আর্জেন্টিনার সমর্থক এই ব্যক্তি সাপের কামড় খেয়েও চিকিৎসা নিতে না গিয়ে ফুটবল খেলা দেখছিলেন। জাগো নিউজ ২৪ সেদিন সন্ধ্যায় জানায়, এ দাবির কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) সদস্যের ভাষ্য অনুযায়ী, খেলা চলার সময় তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন এবং সেখানেই মারা যান।
জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী মারা যাওয়া ব্যক্তির নাম হাবিবুর রহমান। তিনি মিঠাপুকুর উপজেলার লতিবপুর ইউনিয়নের আব্দুল্লাহপুর গ্রামের মৃত আব্দুর রহমানের ছেলে। ভুয়া দাবিটির কারণে ঘটনাটি আলোচনায় আসে, কিন্তু ইউপি সদস্যের বর্ণনায় যে ঘটনা উঠে আসে তা অনেক বেশি পরিচিত: সন্ধ্যার পর বাড়ি ফেরার পথে গ্রামের এক মানুষকে সাপে কামড়ায়, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে তাকে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়, আর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তিনি মারা যান। চিকিৎসক, সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বহু বছর ধরে বাংলাদেশে এই চিত্রের কথা নথিভুক্ত করে আসছে।
ইউপি সদস্য যা বলেছেন
লতিবপুর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আব্দুল মতিন বাদল জাগো নিউজকে মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তার বর্ণনা অনুযায়ী, হাবিবুর রহমান রোববার রাতে বাড়ির পাশে সেচ পাম্প দেখতে যান। রাত সাড়ে ৮টার দিকে সেচ ঘর থেকে বাড়ি ফেরার পথে তাকে সাপে কামড় দেয়। তাকে প্রথমে মিঠাপুকুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এবং রাত সাড়ে ১০টার দিকে সেখান থেকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত দেড়টার দিকে তিনি মারা যান।
আর্জেন্টিনার খেলা দেখা অবস্থায় মৃত্যুর দাবি প্রসঙ্গে ইউপি সদস্য জাগো নিউজকে বলেন, 'তিনি তো ওই সময় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তাহলে খেলা দেখলেন কখন?'
প্রতিবেদনে সাপটি কোন প্রজাতির ছিল তা বলা হয়নি, আর দেওয়া চিকিৎসা নিয়ে হাসপাতালের কোনো বক্তব্যও নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টগুলো কিসের ভিত্তিতে ছড়ানো হয়েছিল, তাও প্রতিবেদনে বলা হয়নি। প্রতিবেদনের ভিত্তি ইউপি সদস্যের নিশ্চিতকরণ, আর সেই বর্ণনা অনুযায়ী তিনি চিকিৎসার বদলে খেলা বেছে নিয়েছিলেন, এমন দাবি টেকে না: কামড়ের পর তাকে একে একে দুটি সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নেওয়া হয় এবং দ্বিতীয়টিতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।

সে রাতের খেলা
আলোচিত খেলাটি ছিল ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপের ফাইনাল, যা ১৯ জুলাই, রোববার, যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির ইস্ট রাদারফোর্ডে মেটলাইফ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশে খেলাটি দেখা গেছে রাতে। বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) জানায়, বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারায় স্পেন; অতিরিক্ত সময়ের ১০৬তম মিনিটে বদলি খেলোয়াড় ফেররান তোরেস গোলটি করেন। দ্বিতীয়ার্ধের যোগ করা সময়ে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন আর্জেন্টিনার এনজো ফার্নান্দেজ, আর গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজ ১০টি সেভ করেন, যাকে এপি বিশ্বকাপ ফাইনালের রেকর্ড বলেছে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোজুড়ে আয়োজিত ৪৮ দলের এই বিশ্বকাপের ১০৪তম ও শেষ ম্যাচ ছিল এটি।
জাগো নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খেলা চলাকালীন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। অর্থাৎ ইউপি সদস্যের ভাষ্য অনুযায়ী ফাইনালের সময় তিনি টেলিভিশনের সামনে নয়, ছিলেন হাসপাতালের শয্যায়।
মিঠাপুকুর: রংপুরের কৃষিপ্রধান উপজেলা
মিঠাপুকুর রংপুর জেলার আটটি উপজেলার একটি। এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ প্রকাশিত জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী উপজেলাটির আয়তন ৫১৫.৬২ বর্গকিলোমিটার এবং ২০১১ সালের আদমশুমারিতে জনসংখ্যা ৫,০৮,১৩৩। ১৮৮৫ সালে এটি থানা হয় এবং ১৯৮৪ সালের ১ ফেব্রুয়ারি উপজেলায় উন্নীত হয়। এর উত্তরে রংপুর সদর ও পীরগাছা, দক্ষিণে পীরগঞ্জ ও সাদুল্লাপুর, পূর্বে পীরগাছা ও সুন্দরগঞ্জ এবং পশ্চিমে বদরগঞ্জ ও দিনাজপুর জেলার নবাবগঞ্জ উপজেলা। উপজেলার নদী যমুনেশ্বরী ও ঘাঘট।
এখানকার জীবনের ভিত্তি কৃষি। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী উপজেলার ৬৯.৪৭ শতাংশ মানুষের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি; প্রধান ফসল ধান, গম, আলু, আখ ও শাকসবজি, আর প্রধান ফল আম, কাঁঠাল, জাম, পেঁপে ও কলা। উপজেলায় ১৭টি ইউনিয়ন, একটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ১১টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও ১৭টি ইউনিয়ন পরিবার পরিকল্পনা কেন্দ্র রয়েছে। বাংলাপিডিয়ার ইংরেজি সংস্করণে এই ইউনিয়নের নাম লেখা হয়েছে লতিফপুর; সংবাদ প্রতিবেদনে নামটি লতিবপুর।
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী পুরো রংপুর জেলার আয়তন ২,৪০০.৫৬ বর্গকিলোমিটার, আর জেলার ৬২.৯৯ শতাংশ মানুষের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি। জেলার নদীগুলোর মধ্যে আছে তিস্তা, যমুনেশ্বরী, ঘাঘট, করতোয়া, চিকলী ও আখিরা। বাংলাপিডিয়া রংপুর মেডিকেল কলেজের প্রতিষ্ঠাকাল ১৯৬৬ সাল উল্লেখ করেছে; মিঠাপুকুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে তাকে এই কলেজের হাসপাতালেই নেওয়া হয়েছিল।
বাংলাদেশে সাপের কামড় কতটা সাধারণ
এই ঘটনার আগে দেশে সাপের কামড় নিয়ে সবচেয়ে বড় জাতীয় জরিপ প্রকাশ করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ন্যাশনাল সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল (এনসিডিসি), ২০২৩ সালের জুনে। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ২০২৩ সালের আগস্টে জানায়, ২০২১-২২ সময়কাল নিয়ে করা 'ন্যাশনাল সার্ভে অন অ্যানুয়াল ইনসিডেন্স অ্যান্ড এপিডেমিওলজি অব স্নেকবাইট ইন বাংলাদেশ' শীর্ষক এই জরিপের হিসাবে দেশে বছরে প্রায় ৪ লাখ ৩ হাজার মানুষকে সাপে কামড়ায় এবং ৭ হাজার ৫১১ জন মারা যান। একই জরিপের বরাতে ঢাকা ট্রিবিউন ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে জানায়, প্রতি এক লাখ মানুষের মধ্যে বছরে প্রায় ২৪৪ জনকে বিষধর সাপে কামড়ায়, দিনে চার থেকে পাঁচজন মারা যান এবং আক্রান্তদের ৯৫ শতাংশই গ্রামের মানুষ। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্ষায় সাপের কামড় বাড়ে, কারণ রাস্তা ও বসতির আশপাশে পানি জমলে বিষধর সাপ তাদের স্বাভাবিক আবাস ছেড়ে বেরিয়ে আসে।
এর আগের একটি জাতীয় জরিপ সরকার ও বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে হয়েছিল; ২০১০ সালের অক্টোবরে পিএলওএস নেগলেক্টেড ট্রপিক্যাল ডিজিজেস সাময়িকীতে প্রকাশিত সেই গবেষণায় (রহমান ও সহকর্মীরা) গ্রামীণ বাংলাদেশে প্রতি এক লাখ ব্যক্তি-বছরে ৬২৩.৪টি সাপের কামড়ের হিসাব দেওয়া হয়; বছরে ৫ লাখ ৮৯ হাজার ৯১৯ জন সাপের কামড়ের শিকার হন এবং ৬ হাজার ৪১ জন মারা যান বলে অনুমান করা হয়। সেই গবেষণার খুঁটিনাটি এই ঘটনার পরিস্থিতির সঙ্গে অনেকটাই মিলে যায়:
- ৩৬ শতাংশ কামড়ের ঘটনা ঘটেছে রাতে, ৩২ শতাংশ সকালে এবং ৩২ শতাংশ বিকেলে।
- ৭১ শতাংশ কামড় ছিল পা ও পায়ের পাতায়।
- ২৭ শতাংশ মানুষকে পানিতে এবং ২৪ শতাংশকে মাঠে সাপে কামড়েছে; আক্রান্তদের অর্ধেক কামড় খেয়েছেন মাঠে বা পানিতে কাজ করার সময়।
- সবচেয়ে বেশি কামড়ের ঘটনা ঘটেছে অক্টোবরে (২২ শতাংশ) ও জুলাইয়ে (১৫ শতাংশ)।
- কামড়ের পর ৮৬ শতাংশ আক্রান্ত প্রথমে গেছেন সাপুড়ে বা ওঝার কাছে; প্রথমেই নিবন্ধিত চিকিৎসক বা হাসপাতালে গেছেন মাত্র ৩ শতাংশ।
ডব্লিউএইচওর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া আঞ্চলিক কার্যালয় ২০১৬ সালে সাপের কামড় ব্যবস্থাপনার নির্দেশিকার দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশ করে। সেখানে বাংলাদেশের পুরোনো গবেষণাগুলোর সারাংশ দেওয়া আছে। ২০০৩ সালে ১২টি জেলার প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার খানায় করা জরিপে দেশে বছরে ১৫ হাজার ৩৭২টি কামড় ও ১ হাজার ৭০৯টি মৃত্যুর হিসাব পাওয়া যায়; গ্রামে ঝুঁকি শহরের ১০.৫৪ গুণ বলে দেখা যায় এবং ৬১ শতাংশ আক্রান্ত প্রথমে প্রথাগত চিকিৎসকের কাছে যান। ১৯৮৮-৮৯ সালের এক গবেষণায় ৭৬৪টি কামড় ও ১৬৮টি মৃত্যুর নথি মেলে। আক্রান্তদের ৪৫ শতাংশ কৃষক বলে উল্লেখ আছে, আর ২০০৭ সালের জুলাই-আগস্টের বড় বন্যায় সাপের কামড়ের ৭৬টি ঘটনায় ১৩ জনের মৃত্যু হয়। নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, অনেক রোগী প্রথাগত চিকিৎসকের কাছে চিকিৎসা নেন বলে প্রকাশিত বেশির ভাগ পরিসংখ্যান অসম্পূর্ণ; তাই সাপের কামড়কে বাধ্যতামূলকভাবে জানাতে হয় এমন রোগের তালিকায় আনার সুপারিশ করা হয়েছে।
সাপের বিষক্রিয়া নিয়ে ডব্লিউএইচওর তথ্যপত্রের ২০২৫ সালের সংস্করণ অনুযায়ী বিশ্বে বছরে আনুমানিক ৫৪ লাখ মানুষকে সাপে কামড়ায়, বিষক্রিয়া হয় ১৮ লাখ থেকে ২৭ লাখ জনের, মারা যান ৮১ হাজার ৪১০ থেকে ১ লাখ ৩৭ হাজার ৮৮০ জন, আর এর প্রায় তিন গুণ মানুষের অঙ্গহানি বা স্থায়ী প্রতিবন্ধিতা হয়। তথ্যপত্রে বলা হয়েছে, কৃষিশ্রমিক ও শিশুরাই সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়, আর এশিয়ায় বছরে ২০ লাখ পর্যন্ত মানুষ সাপের বিষক্রিয়ার শিকার হন।

যে সাপগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে
হাবিবুর রহমানকে কোন সাপ কামড়েছিল, তা প্রতিবেদনে বলা হয়নি। ডব্লিউএইচওর ২০১৬ সালের নির্দেশিকায় বাংলাদেশের চিকিৎসাগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিষধর সাপ হিসেবে কমন ক্রেইট বা কালাচ (Bungarus caeruleus), গ্রেটার ব্ল্যাক ক্রেইট (B. niger), ওয়ালস ক্রেইট (B. walli), মনোকলড কোবরা (Naja kaouthia), স্পেকটাকলড কোবরা (N. naja), রাসেলস ভাইপার বা চন্দ্রবোড়া (Daboia russelii) এবং সাদা ঠোঁটের সবুজ বোড়া (Trimeresurus erythrurus) উল্লেখ করা হয়েছে।
একই নির্দেশিকা অনুযায়ী বাংলাদেশে অনেক কামড় ও মৃত্যুর জন্য দায়ী ক্রেইট বা কালাচজাতীয় সাপ। হিসাব অনুযায়ী ক্রেইটের কামড়ের প্রায় ৪০ শতাংশ ঘটায় ওয়ালস ক্রেইট, আর গ্রেটার ব্ল্যাক ক্রেইট ও কমন ক্রেইট প্রত্যেকে প্রায় ২৮ শতাংশ। লেসার ব্ল্যাক ক্রেইট বাংলাদেশে কেবল উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে পাওয়া গেছে। মনোকলড কোবরা সারা দেশে আছে এবং কোবরার কামড়ের বেশির ভাগই এর; স্পেকটাকলড কোবরা পাওয়া যায় ঢাকার আশপাশে এবং রাজধানীর পশ্চিম ও উত্তরে। রাসেলস ভাইপারকে দেশের পশ্চিম ও দক্ষিণাঞ্চলে সীমাবদ্ধ বলা হয়েছে, রাজশাহী অঞ্চল থেকে এর বিষক্রিয়ার খবর এসেছে। সবুজ বোড়া অনেককে কামড়ালেও মৃত্যু ঘটায় কম। ক্রেইটসহ অনেক প্রজাতি মূলত রাতে শিকার করে।
কামড়ের পরিস্থিতি থেকে চিকিৎসকেরা কী বুঝতে পারেন, নির্দেশিকায় তাও বলা আছে: রাতে ঘুমের মধ্যে কামড় খেলে সাপটি সম্ভবত ক্রেইট; ধানখেতে কামড় খেলে কোবরা বা রাসেলস ভাইপার; মিঠা পানিতে হাঁটার সময় কামড় খেলে কোবরা। এ কারণে ডব্লিউএইচও বলে, সাপটি আগেই মারা পড়ে থাকলে রোগীর সঙ্গে হাসপাতালে নিয়ে যেতে, অথবা ছবি তুলে রাখতে; কিন্তু সাপ মারার বা খালি হাতে ধরার চেষ্টা কেউ যেন না করেন, কারণ বিচ্ছিন্ন মাথাও কামড়াতে পারে।
দেশে সাপের প্রজাতির সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন হিসাব পাওয়া যায়। ২০১৮ সালে ডব্লিউএইচওর বাংলাদেশ কার্যালয় জানায়, দেশে ৮২ প্রজাতির সাপ আছে, যার ২৭টি বিষধর। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ২০২৩ সালে জানায়, জাতীয় নির্দেশিকায় প্রায় ১০০ প্রজাতির সাপের কথা আছে, যার ৩৭টি বিষধর: ১৬টি সামুদ্রিক সাপ, তিন ধরনের কোবরা, পাঁচ ধরনের ক্রেইট, দুই ধরনের প্রবাল সাপ, ছয় ধরনের সবুজ বোড়া এবং একটি প্রকৃত ভাইপার, রাসেলস ভাইপার।

সাপে কাটলে কী করতে বলে ডব্লিউএইচও
প্রথাগত প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে ডব্লিউএইচওর ২০১৬ সালের নির্দেশিকা স্পষ্ট: প্রচলিত বেশির ভাগ পদ্ধতি অকেজো, এমনকি সরাসরি বিপজ্জনক বলে প্রমাণিত হয়েছে। এর মধ্যে আছে কামড়ের জায়গা কাটা বা খোঁচানো, মুখ দিয়ে বিষ চুষে বের করার চেষ্টা, কালো 'সাপের পাথর', শক্ত বাঁধন বা টুর্নিকেট, বৈদ্যুতিক শক এবং ক্ষতে রাসায়নিক, ভেষজ বা বরফ লাগানো। নির্দেশিকা বলছে, ভেষজ চিকিৎসার ওপর স্থানীয় মানুষের গভীর আস্থা থাকতে পারে, কিন্তু তার কারণে চিকিৎসায় দেরি বা ক্ষতি হতে দেওয়া যাবে না।
নির্দেশিকায় সুপারিশ করা প্রাথমিক চিকিৎসা সহজ; এর লক্ষ্য আক্রান্তকে জীবিত অবস্থায় চিকিৎসার কাছে পৌঁছে দেওয়া:
- আক্রান্তকে আশ্বস্ত করুন। অনেক কামড়ে বিষ ঢোকে না, আর গুরুতর বিষক্রিয়া সাধারণত ধীরে ধীরে তৈরি হয়, ফলে চিকিৎসার সময় পাওয়া যায়।
- আক্রান্তকে শুইয়ে দিন, সম্ভব হলে বমির আশঙ্কায় বাঁ কাত করে রিকভারি পজিশনে, এবং কামড় খাওয়া হাত বা পা স্প্লিন্ট বা স্লিং দিয়ে স্থির রাখুন; হাঁটাসহ যেকোনো নড়াচড়ায় বিষ দ্রুত ছড়ায়।
- ক্ষত কাটবেন না, ঘষবেন না, মালিশ করবেন না বা জোরে পরিষ্কার করবেন না; ক্ষতে ভেষজ বা রাসায়নিক লাগাবেন না।
- কখনো শক্ত টুর্নিকেট বাঁধবেন না; এভাবে গ্যাংগ্রিন হয়ে বহু মানুষের হাত-পা কেটে ফেলতে হয়েছে।
- আগেই শক্ত বাঁধন দেওয়া থাকলে রোগী হাসপাতালে পৌঁছানো, চিকিৎসাকর্মী ও পুনরুজ্জীবনের সরঞ্জাম প্রস্তুত থাকা এবং অ্যান্টিভেনম চিকিৎসা শুরু হওয়ার আগে তা খুলবেন না, কারণ হঠাৎ খুললে রোগী আকস্মিকভাবে নেতিয়ে পড়তে পারেন।
- সাপ মারার চেষ্টা করবেন না; নিরাপদ হলে ছবি তুলে রাখুন।
- যত দ্রুত ও নিরাপদে সম্ভব, নড়াচড়া যথাসম্ভব কম রেখে আক্রান্তকে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিন।
নির্দেশিকা অনুযায়ী হাসপাতালে পৌঁছানোর আগে সবচেয়ে বড় বিপদ শ্বাসের পেশি অবশ হয়ে যাওয়া, বিশেষ করে কিছু ইলাপিড সাপের কামড়ে, যে পরিবারে ক্রেইট ও কোবরা রয়েছে। তাই দ্রুত পরিবহনের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, অ্যাম্বুলেন্স না থাকলে গ্রামের মোটরসাইকেল স্বেচ্ছাসেবকের সাহায্যেও। কামড় গুরুতর হওয়ার প্রাথমিক লক্ষণও নির্দেশিকায় দেওয়া আছে: সাপটি বড় বা খুব বিপজ্জনক হওয়া, ফোলা দ্রুত ছড়িয়ে পড়া, শুরুতেই বমি, অজ্ঞান হয়ে পড়া, তীব্র মাথাব্যথা, চোখের পাতা ভারী হয়ে নেমে আসা, অস্বাভাবিক ঘুম ঘুম ভাব, রক্তপাত, প্রস্রাব বন্ধ হয়ে যাওয়া অথবা গাঢ় বাদামি বা কালো প্রস্রাব। সাপের যেকোনো কামড়কেই জরুরি অবস্থা হিসেবে দেখে নিকটতম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বা হাসপাতালে যেতে হবে এবং সেখানে চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলতে হবে।
সন্ধ্যার পর ঝুঁকি কমানোর উপায়
ডব্লিউএইচওর নির্দেশিকায় সাপের কামড়কে মূলত গ্রামাঞ্চলের পরিবেশগত, পেশাগত ও আবহাওয়াজনিত ঝুঁকি বলা হয়েছে; বেশির ভাগ কামড় লাগে কৃষিশ্রমিক ও তাদের পরিবারের সদস্যদের পায়ের নিচের অংশ, গোড়ালি ও পায়ের পাতায়। বৃষ্টির পর, বন্যার সময়, ফসল কাটার মৌসুমে, রাতে এবং ভোরের আগে ও সন্ধ্যার পর মাঠে যাওয়া-আসার সময় বিশেষ সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। গ্রামের মানুষের জন্য নির্দেশিকার পরামর্শের মধ্যে আছে:
- রাতে বাইরে হাঁটার সময়, বিশেষ করে ভারী বৃষ্টির পর, টর্চ বা বাতি ব্যবহার করুন এবং সামনের মাটিতে লাঠি দিয়ে খোঁচা দিয়ে এগোন।
- খালি পায়ে বা স্যান্ডেল পরে না হেঁটে উপযুক্ত জুতা বা বুট ও লম্বা প্যান্ট পরুন, বিশেষ করে অন্ধকারে বা ঝোপঝাড়ে।
- উঁচু বিছানায় ভালোভাবে গুঁজে দেওয়া মশারির ভেতরে ঘুমান, কারণ দক্ষিণ এশিয়ায় ক্রেইটের প্রায় সব কামড়ই লাগে ঘরে ঘুমিয়ে থাকা মানুষের।
- ঘরের আশপাশ থেকে আবর্জনা, উইয়ের ঢিবি ও ঝোপঝাড় পরিষ্কার রাখুন, শস্যের গোলা ঘর থেকে দূরে রাখুন এবং খাবার ইঁদুর ঢুকতে পারে না এমন পাত্রে রাখুন, কারণ ইঁদুর সাপকে আকৃষ্ট করে।
- কখনো সাপ ধরবেন না, ভয় দেখাবেন না বা আক্রমণ করবেন না; গর্ত বা লুকানো জায়গায় হাত ঢোকাবেন না, যেখানে সাপ থাকতে পারে।
নির্দেশিকা আরও জানায়, জনসচেতনতা কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়েছে: নেপালের তরাই অঞ্চলে স্থানীয় নেতা, স্বাস্থ্য স্বেচ্ছাসেবক ও প্রথাগত চিকিৎসকদের যুক্ত করে সচেতনতা কার্যক্রম চালানোর পর লক্ষ্যভুক্ত গ্রামগুলোতে প্রতি এক লাখ মানুষে সাপের কামড় ৫০২টি থেকে কমে ৩১৫টিতে নামে, অথচ কার্যক্রমের বাইরে থাকা গ্রামগুলোতে তা একই থাকে।

অ্যান্টিভেনম ও উপজেলা পর্যায়ের ঘাটতি
ডব্লিউএইচওর তথ্যপত্রে মানসম্পন্ন অ্যান্টিভেনমকে সাপের বিষের বেশির ভাগ প্রভাব ঠেকানো বা উল্টে দেওয়ার সবচেয়ে কার্যকর চিকিৎসা বলা হয়েছে। এটি ডব্লিউএইচওর অত্যাবশ্যক ওষুধের তালিকায় আছে এবং যেখানে সাপের কামড়ের ঘটনা ঘটে, সেখানকার প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার অংশ হওয়া উচিত। তথ্যপত্র অনুযায়ী, নিরাপদ ও কার্যকর অ্যান্টিভেনম আরও সহজলভ্য করা গেলে সাপের কামড়ে বেশির ভাগ মৃত্যু ও গুরুতর পরিণতি পুরোপুরি প্রতিরোধযোগ্য।
বাংলাদেশে সমস্যা হলো সময়মতো অ্যান্টিভেনম পর্যন্ত পৌঁছানো। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড জানায়, ২০১৯ সালের অক্টোবরে ঢাকায় অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির এক সেমিনারে তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, জেলা পর্যায়ের প্রতিটি হাসপাতালে অ্যান্টিভেনম আছে, কিন্তু উপজেলা পর্যায়ের বেশির ভাগ হাসপাতালে নেই; তিনি প্রতিটি উপজেলা হাসপাতালে অ্যান্টিভেনম পাঠানোর ঘোষণা দেন। সেই সেমিনারে 'স্নেকবাইট ট্রিটমেন্ট গাইডলাইন ২০১৯' উন্মোচন করা হয় এবং দেশে অ্যান্টিভেনম তৈরির প্রথম ধাপ হিসেবে সরকারি অর্থায়নে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থাপিত ভেনম রিসার্চ সেন্টারের কাজ তুলে ধরা হয়। তৎকালীন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বলেন, যে ভারত থেকে অ্যান্টিভেনম আমদানি হয়, সে দেশের সাপের সঙ্গে বাংলাদেশের সাপের কিছুটা পার্থক্য আছে, তাই দেশেই অ্যান্টিভেনম তৈরি হওয়া উচিত।
ডব্লিউএইচওর বাংলাদেশ কার্যালয় ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে জানায়, দেশজুড়ে মূল্যায়নের পর তারা জাতীয় 'গাইডলাইনস ফর দ্য ম্যানেজমেন্ট অব স্নেকবাইট' হালনাগাদে সহায়তা করেছে, সে বছরের শুরুতে সারা দেশে ৫ হাজার ডোজ অ্যান্টিভেনম বিতরণ করা হয়েছে এবং ২০১৮ সালের অক্টোবর ও নভেম্বরে বিভাগীয় মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোর ৩৫২ জন চিকিৎসককে সাপের কামড়ের চিকিৎসায় প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
২০২৩ সালের প্রতিবেদনগুলো দেখায়, ঘাটতি তখনো রয়ে গেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একটি সূত্রের বরাতে ঢাকা ট্রিবিউন জানায়, ২০২২ সালের শুরু পর্যন্ত মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সিভিল সার্জন কার্যালয়, জেলা হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৪১ হাজার ৪৭০ ডোজ বিতরণ করা হয়েছিল, কিন্তু সব উপজেলা হাসপাতালে অ্যান্টিভেনম ছিল না এবং মজুতের বড় অংশ অব্যবহৃত অবস্থায় মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজের অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম পত্রিকাটিকে বলেন, উপজেলা পর্যায়ের চিকিৎসকেরা কখনো কখনো অ্যান্টিভেনম দিতে চান না, কারণ কিছু রোগীর শ্বাসকষ্টসহ এমন জটিলতা দেখা দেয়, যার জন্য নিবিড় পরিচর্যা দরকার, যা উপজেলায় নেই।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ২০২৩ সালের আগস্টে জানায়, বাংলাদেশে ব্যবহৃত পলিভ্যালেন্ট অ্যান্টিভেনম আসে ভারত থেকে, ২০২০-২১ সালে সরকার ৫০ হাজার ভায়াল বিতরণ করে, আর একজন রোগীর সাধারণত ১০টি ভায়াল লাগে, যা ফার্মেসি থেকে কিনলে খরচ পড়ে ১৪ হাজার থেকে ১৬ হাজার টাকা; আগের গবেষণার বরাতে পত্রিকাটি জানায়, চিকিৎসার মোট খরচ ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা। পত্রিকাটির তথ্যে শুধু চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেই ২০২০ সালে ৭৫৫ জন, ২০২১ সালে ৮৬৪ জন এবং ২০২২ সালে ১ হাজার ৪৫৭ জন সাপে কাটা রোগী চিকিৎসা নেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডা. রোবেদ আমিন পত্রিকাটিকে বলেন, আমদানি করা অ্যান্টিভেনম বাংলাদেশের সাপের বিরুদ্ধে কতটা কার্যকর, সে বিষয়ে কোনো বৈজ্ঞানিক গবেষণা নেই; সাপ বিশেষজ্ঞ আবু সাঈদ বলেন, উপজেলা পর্যায়ের চিকিৎসকদের অভিজ্ঞতা কম এবং তারা অ্যালার্জিজনিত প্রতিক্রিয়ার ভয় পান, আর দেরির কারণে রোগীরা প্রায়ই জটিলতা নিয়ে আসেন।
ডব্লিউএইচও ২০১৭ সালের জুনে সাপের বিষক্রিয়াকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের অবহেলিত গ্রীষ্মমণ্ডলীয় রোগের তালিকায় তোলে; সংস্থাটির কর্মপরিকল্পনার লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে সাপের কামড়ে মৃত্যু ও প্রতিবন্ধিতা ৫০ শতাংশ কমানো। একই তথ্যপত্র সতর্ক করেছে, সরকারি হিসাবে প্রকৃত সংখ্যার চেয়ে কম আসে, কারণ অনেক আক্রান্ত কখনো স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পৌঁছান না এবং অনেকে হাসপাতালের বদলে প্রথাগত পদ্ধতি বেছে নেন।
ছবি: Sultan Ahmed Niloy / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস, বাংলাপিডিয়া (এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ), বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (সাপের বিষক্রিয়া বিষয়ক তথ্যপত্র; সাপের কামড় ব্যবস্থাপনার নির্দেশিকা, দ্বিতীয় সংস্করণ, ২০১৬; ডব্লিউএইচও বাংলাদেশ, ডিসেম্বর ২০১৮), পিএলওএস নেগলেক্টেড ট্রপিক্যাল ডিজিজেস (রহমান ও অন্যান্য, ২০১০), দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, ঢাকা ট্রিবিউন





মন্তব্য
(০)