দেশের নদ-নদীর বেশিরভাগ দখল ও দূষণে মৃত বা অর্ধমৃত হয়ে পড়েছে, তাই এখনই সেগুলো উদ্ধারের সময়। ২০২৫ সালের ১২ জানুয়ারি জাগো নিউজে প্রকাশিত এক মতামত নিবন্ধে এ কথা লেখেন গবেষক ও সাবেক অধ্যক্ষ ড. ফোরকান আলী। নিবন্ধে তিনি অঞ্চলভিত্তিক নদীর তালিকা তুলে ধরে নদী দখল ও দূষণের কারণ ব্যাখ্যা করেন এবং অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে সবাইকে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান।
লেখকের মতে, দেশের প্রায় সব শহর, নগর ও বাণিজ্যকেন্দ্র নদীর তীরে গড়ে উঠেছে: ঢাকা বুড়িগঙ্গার তীরে, নারায়ণগঞ্জ শীতলক্ষ্যার তীরে, চট্টগ্রাম কর্ণফুলীর তীরে এবং ময়মনসিংহ পুরাতন ব্রহ্মপুত্রের তীরে। যেসব এলাকায় সড়ক ও রেলপথ নেই, সেখানে নদীপথই যোগাযোগ ও পরিবহনের প্রধান মাধ্যম বলে তিনি উল্লেখ করেন।
দেশে নদী কয়টি
নিবন্ধে লেখক দেশে ছোট-বড় ২৩০টি নদ-নদীর (নদী ও উপনদী মিলিয়ে ৭০০টি) কথা বলেন এবং লেখেন, এর বেশিরভাগই এখন মৃত বা অর্ধমৃত। তবে নদীর সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে ভিন্ন হিসাব পাওয়া যায়। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী উপনদীসহ দেশে প্রায় ৭০০টি নদী আছে এবং সব নদী, প্রবাহ, খাঁড়ি ও চ্যানেলের মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ২৪,১৪০ কিলোমিটার। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাকায় এক সেমিনারে দেশে মোট ১,০০৮টি নদীর তথ্য প্রকাশ করে; সেই হিসাবে প্রতিটি জেলায় ২০টির বেশি নদী বয়ে গেছে এবং সবচেয়ে বেশি, ৯৭টি নদী, সুনামগঞ্জ জেলায়।
লেখক ৫৭টি নদীকে দুই দেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত বলে উল্লেখ করেন। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী এই অভিন্ন বা আন্তঃসীমান্ত নদীর মধ্যে ৫৪টি ভারত থেকে এবং ৩টি (সাঙ্গু, মাতামুহুরী ও নাফ) মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে।
অঞ্চলভিত্তিক নদীর তালিকা
লেখক জানান, নদীর নামকরণে কোনো নীতিমালা মানা হয় না; একই নদী বা তার শাখা এলাকাভেদে ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিত। দক্ষিণাঞ্চলের নদীগুলো এত শাখা-প্রশাখায় বিভক্ত যে আলাদা নামে চিহ্নিত করাও সব সময় সম্ভব হয় না। এই সীমাবদ্ধতা মেনে তিনি অঞ্চলভিত্তিক একটি তালিকা দেন। তাঁর হিসাবে দিনাজপুরে ১৮টি, রাজশাহীতে ১০টি, বগুড়ায় ৭টি, ঢাকা অঞ্চলে ১৮টি, সিলেটে ৩৬টি, কুষ্টিয়ায় ৪টি, বৃহত্তর ফরিদপুরে ৬টি এবং খুলনা অঞ্চলে ৭১টি নদ-নদী রয়েছে।
তালিকায় ঢাকা অঞ্চলের বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু, ধলেশ্বরী ও শীতলক্ষ্যা; সিলেটের সুরমা, কুশিয়ারা, মনু ও খোয়াই; রাজশাহীর মহানন্দা ও গঙ্গা; বগুড়ার করতোয়া ও বাঙালি; কুষ্টিয়ার মাথাভাঙ্গা ও গড়াই; ফরিদপুরের মধুমতি ও আড়িয়াল খাঁ এবং খুলনা অঞ্চলের রূপসা, পশুর, শিবসা ও কপোতাক্ষের মতো নদী রয়েছে।

দখলে সংকুচিত নদী
লেখকের ভাষায়, দেশে জমি ও চরের মতো নদীও দখল হয়। তিনি লেখেন, কর্ণফুলী, সুরমা, কীর্তনখোলা, করতোয়া ও রূপসাসহ শহরসংলগ্ন বহু ছোট-বড় নদী দখলের শিকার হয়েছে এবং দেশ নদীশূন্য হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে। নিবন্ধে তিনি সরকারের নদী উদ্ধার অভিযান চলমান থাকার কথাও উল্লেখ করেন।
দখলের মাত্রা বোঝাতে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের একটি তালিকা উল্লেখযোগ্য। প্রথম আলোর ২০১৯ সালের আগস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কমিশন সারা দেশে নদী দখলকারী ৪২,৪২৩ জনের একটি তালিকা তৈরি করেছিল।

দূষণের উৎস
লেখক দখলের পাশাপাশি দূষণকেও নদীর বড় বিপদ হিসেবে দেখান। তাঁর মতে, কৃষিজমিতে দেওয়া রাসায়নিক সার বৃষ্টি ও বন্যার পানির সঙ্গে নদীতে যায়; লঞ্চ, স্টিমার ও ইঞ্জিনচালিত নৌকা থেকে তেল পড়ে; আর অপরিকল্পিত পয়ঃনিষ্কাশন, নদীতীরের শিল্পকারখানা ও ট্যানারির বর্জ্য পানি দূষিত করে। তিনি লেখেন, দূষণে নদীর বহু প্রজাতির মাছ ও জলজ উদ্ভিদ হারিয়ে গেছে, আর গ্রামাঞ্চলের নদীগুলোও একই পথে যাচ্ছে।
বাংলাপিডিয়াও বলছে, দেশের ভূপৃষ্ঠের পানি শিল্প ও নগরবর্জ্য, কৃষিরাসায়নিক, পয়ঃবর্জ্য এবং লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশে ব্যাপকভাবে দূষিত, আর বুড়িগঙ্গা এর একটি সাধারণ উদাহরণ। মাত্র ২৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এই নদী লঞ্চ ও নৌকায় ঢাকার নৌ-যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ পথ; বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী শুষ্ক মৌসুমে এর পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন খুব কমে যায় বা প্রায় থাকেই না।

নিবন্ধের শেষে ড. ফোরকান আলী লেখেন, দেশের বেশিরভাগ মানুষের জীবন, জীবিকা ও উন্নতি নদীর ওপর নির্ভর করে, তাই নদীভিত্তিক সমস্যার সমাধান করতে হবে দীর্ঘমেয়াদে। নদ-নদীর অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে কথা বলার এখনই সময় বলে তিনি মত দেন এবং নদী উদ্ধারে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
ছবি: David Brewer / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 2.0)
সূত্র: জাগো নিউজ, বাংলাপিডিয়া, দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, প্রথম আলো





মন্তব্য
(০)