কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার সাবরাং ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের আচারবুনিয়া এলাকার একটি স'মিল থেকে ২০২৪ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি, শনিবার, মেছো বাঘের দুটি বাচ্চা উদ্ধার করে উপকূলীয় বন বিভাগ। জাগো নিউজ সেদিনই জানায়, বাচ্চা দুটিকে বিকেলে একই জেলার চকরিয়া উপজেলার ডুলাহাজারায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্কে পাঠানো হয়েছে। পার্কটি বন অধিদপ্তর পরিচালিত সরকারি সাফারি পার্ক। মেছো বাঘ, যাকে মেছো বিড়ালও বলা হয়, জলাভূমির এক বুনো বিড়াল। ২০১৫ সালের বাংলাদেশের জাতীয় লাল তালিকায় প্রাণীটি 'বিপন্ন' এবং বৈশ্বিক আইইউসিএন লাল তালিকায় 'সংকটাপন্ন' (ভালনারেবল) হিসেবে তালিকাভুক্ত ছিল, আর বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২ অনুযায়ী এটি একটি রক্ষিত প্রাণী।
আচারবুনিয়ার স'মিলে যা ঘটেছিল
জাগো নিউজকে টেকনাফ উপকূলীয় রেঞ্জ কর্মকর্তা বশির আহমেদ বলেন, সকালে আচারবুনিয়ার স'মিলে কাজ করতে গিয়ে এক শ্রমিক একটি গাছের পাশে দুই ছানাসহ একটি বড় মেছো বাঘ দেখতে পান। তিনি কাছে যাওয়ার চেষ্টা করলে মা মেছো বাঘটি পালিয়ে যায়, আর বাচ্চা দুটি ধরা পড়ে। জাগো নিউজের হিসাবে উদ্ধারের সময় ছিল সকাল ৭টার দিকে। এরপর বন বিভাগ বাচ্চা দুটিকে নিজেদের তত্ত্বাবধানে নেয় এবং প্রতিবেদন অনুযায়ী বিকেলে ডুলাহাজারার সাফারি পার্কে পাঠায়। রেঞ্জ কর্মকর্তার ধারণা, খাবারের সন্ধানে বাচ্চা নিয়ে ঘুরতে ঘুরতে মা মেছো বাঘটি ওই এলাকায় চলে এসেছিল।
একই দিন বিকেল ৫টা ২৬ মিনিটে প্রকাশিত বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের টেকনাফ প্রতিনিধির প্রতিবেদনে সকালের ঘটনার বিবরণ কিছুটা ভিন্ন। ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, মোস্তাক আহমেদ নামে এক ব্যক্তির স'মিলে সকাল ১০টার দিকে শ্রমিকেরা কাঠের স্তূপের ভেতরে বাচ্চা দুটি দেখতে পান। তাঁরা মালিককে জানান, বাচ্চা দুটি ধরেন এবং বন বিভাগকে খবর দেন। টেকনাফ উপকূলীয় বন বিভাগের বিট কর্মকর্তা আহসানুল কবির বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, বনকর্মীরা স'মিলে গিয়ে বাচ্চা দুটি উদ্ধার করে রেঞ্জ কার্যালয়ে নিয়ে আসেন। দৈনিক ইত্তেফাক, আজকের পত্রিকা ও সময়ের আলোও ২০২৪ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি টেকনাফে মেছো বাঘের দুটি বাচ্চা উদ্ধারের খবর প্রকাশ করে।
দুই বিবরণে সময়ের পার্থক্য থাকলেও স্থান, বাচ্চার সংখ্যা, উপকূলীয় বন বিভাগের ভূমিকা এবং গন্তব্য নিয়ে কোনো অমিল নেই। জাগো নিউজ জানায়, বাচ্চা দুটি সাফারি পার্কে পাঠানো হয়েছে; আর দিনের আগের ভাগে লেখা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিবেদনে বলা হয়, বিভাগীয় বন কর্মকর্তার নির্দেশনা পেলে বাচ্চা দুটিকে ডুলাহাজারার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্কে হস্তান্তর করা হবে।
পাহাড়ে না ছেড়ে কেন সাফারি পার্কে
আহসানুল কবির বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, বাচ্চা দুটি এখনো খুব ছোট, তাই পাহাড়ে ছেড়ে দেওয়া ঠিক হবে না; বনকর্মীরা ওদের মাছ ও মুরগির মাংস খাওয়াচ্ছেন। তাঁর ধারণা, বন উজাড় হওয়ায় খাবারের সংকটে পড়ে প্রাণীগুলো লোকালয়ে চলে আসছে। রেঞ্জ কর্মকর্তা বশির আহমেদও জাগো নিউজকে প্রায় একই কথা বলেন: মা মেছো বাঘটি সম্ভবত খাবারের খোঁজে এলাকায় এসেছিল।
খুব ছোট বাচ্চা মায়ের ওপর নির্ভরশীল। বিড়াল-গবেষক মেল ও ফিওনা সানকুইস্ট ২০০২ সালে প্রকাশিত তাঁদের সহায়ক গ্রন্থ 'ওয়াইল্ড ক্যাটস অব দ্য ওয়ার্ল্ড'-এ মাঠ ও চিড়িয়াখানার গবেষণার যে সারসংক্ষেপ দিয়েছেন, তাতে দেখা যায়, জন্মের সময় মেছো বাঘের বাচ্চার ওজন প্রায় ১৭০ গ্রাম। প্রায় এক মাস বয়সে বাচ্চারা সক্রিয়ভাবে চলাফেরা শুরু করে, দুই মাস বয়সে পানিতে খেলতে ও শক্ত খাবার খেতে শেখে, আর প্রায় ছয় মাসে মায়ের দুধ ছাড়ে। সাড়ে আট মাসের মতো বয়সে পূর্ণবয়স্কের আকার পায়, আর প্রায় ১১ মাসে পূর্ণবয়স্কের শ্বদন্ত গজায়। দুধ ছাড়ার অনেক আগে মা থেকে বিচ্ছিন্ন বাচ্চা নিজে শিকার করতে পারে না। এ কারণেই বাংলাদেশে উদ্ধার হওয়া ছোট বাচ্চাদের প্রায়ই একা ছেড়ে না দিয়ে সাফারি পার্ক, চিড়িয়াখানা বা উদ্ধারকেন্দ্রে নেওয়া হয়।
উদ্ধার করা মেছো বাঘ কোথায় ছাড়া হয়, তা নিয়েও সংরক্ষণবিদেরা প্রশ্ন তুলেছেন। আইইউসিএনের স্পিসিস সারভাইভাল কমিশনের (এসএসসি) বিড়াল বিশেষজ্ঞ দলের নিউজলেটার ক্যাটনিউজে ২০১৫ সালে প্রকাশিত এক নিবন্ধে সায়েম ইউ. চৌধুরী ও সহলেখকেরা উল্লেখ করেন, মৌলভীবাজার জেলায় উদ্ধার হওয়া বাচ্চাসহ ১৩টি মেছো বাঘের সবকটিকে বন বিভাগ ১,২৫০ হেক্টরের আধা-চিরসবুজ বন লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে ছেড়ে দিয়েছিল। তাঁদের মতে, জলাভূমির সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত এই বিড়ালের জন্য এমন বন আদর্শ আবাস না-ও হতে পারে, আর ধরা পড়ার জায়গা থেকে দূরে ছেড়ে দিলে প্রাণীর মৃত্যুও হতে পারে। তাঁরা সুশৃঙ্খল ও দ্রুত উদ্ধার-অবমুক্তির জন্য প্রশিক্ষণের সুপারিশ করেন।
ডুলাহাজারার সাফারি পার্ক
কক্সবাজার জেলার চকরিয়া উপজেলায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্ক, যা সাধারণভাবে ডুলাহাজারা সাফারি পার্ক নামেও পরিচিত, বন্দরনগরী চট্টগ্রাম থেকে প্রায় ১০৭ কিলোমিটার দূরে। এটি দেশের প্রথম সাফারি পার্ক এবং বন অধিদপ্তর এটি পরিচালনা করে। উইকিপিডিয়ার নিবন্ধে পার্কটির প্রতিষ্ঠাকাল ১৯৯৯ সাল এবং এর উদ্দেশ্য হিসেবে প্রকৃতি পর্যটন, গবেষণা, বিনোদন এবং প্রাকৃতিক পরিবেশে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে।
দ্য ডেইলি স্টারের 'স্টার চিটাগং' ক্রোড়পত্রে ২০০৫ সালের ২৯ জুন প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে পার্কটি গড়ে ওঠার বিবরণ আছে। ১৯৯৮-৯৯ সালে ৯ কোটি ৯০ লাখ টাকা ব্যয়ে ৩০০ হেক্টর জমিতে কাজ শুরু হয়; দ্বিতীয় পর্যায়ে আরও ৬০০ হেক্টর যুক্ত হয়ে ২০০৫ সালে কাজ শেষ হয়, ফলে পার্কের আয়তন দাঁড়ায় প্রায় ৯০০ হেক্টরে। প্রতিবেদনে পার্কের ভেতরে আলাদা করে রাখা এলাকাগুলোর হিসাব ছিল এমন:
- বাঘ ও সিংহের জন্য ৬০ হেক্টর চারণভূমি;
- হরিণ (সাম্বার, চিত্রা ও পাড়া হরিণ) ও গয়ালের জন্য ৫০ হেক্টর;
- উভচর প্রাণী ও পরিযায়ী পাখির জন্য আটটি জলাধারসহ ৫০ হেক্টর;
- ভালুকের জন্য ২০ হেক্টর;
- হাতির জন্য ১০০ হেক্টর;
- কুমিরের জন্য ১০ হেক্টর।
একই প্রতিবেদন অনুযায়ী পার্কের ঘোষিত লক্ষ্য ছিল বন্যপ্রাণীকে বিলুপ্তি থেকে রক্ষা করা, বাঘ, হরিণ ও হাতির মতো বড় প্রাণীর প্রজননে সহায়তা, পরিযায়ী পাখির অভয়াশ্রম ও তৃণভোজী প্রাণীর চারণভূমি তৈরি, এবং প্রকৃতি পর্যটন, শিক্ষা ও গবেষণায় সহায়তা। প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারতের মাদ্রাজ ক্রোকোডাইল ব্যাংক ট্রাস্ট থেকে আনা ৪০টি মিঠাপানির কুমিরের মধ্যে ২৯টি সেখানে ছাড়া হয়েছে। ২০০৭ সালে দ্য ডেইলি স্টার জানায়, বিভিন্ন বাড়ি ও প্রতিষ্ঠান থেকে উদ্ধার এবং দান হিসেবে পাওয়া চিত্রা হরিণ, মায়া হরিণ, সাম্বার, কুমির, কালো ভালুক, অজগর ও ময়ূরসহ নানা প্রাণী পার্কটিতে পাঠানো হয়েছে।

টেকনাফ ও সাবরাং: যেখানে পাওয়া গেল বাচ্চা দুটি
টেকনাফ মূল ভূখণ্ডের বাংলাদেশের সবচেয়ে দক্ষিণের উপজেলা। এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ প্রকাশিত জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, উপজেলাটির আয়তন ৩৮৮.৬৬ বর্গকিলোমিটার, অবস্থান কক্সবাজার শহর থেকে ৮৬ কিলোমিটার দক্ষিণে। এর উত্তরে উখিয়া উপজেলা, দক্ষিণ ও পশ্চিমে বঙ্গোপসাগর, আর পূর্বে প্রধান নদী নাফের ওপারে মিয়ানমারের আরাকান (রাখাইন) রাজ্য। উপজেলায় ছয়টি ইউনিয়ন: টেকনাফ, বাহারছড়া, সাবরাং, হ্নীলা, হোয়াইক্যং ও সেন্ট মার্টিন দ্বীপ।
বাংলাপিডিয়ায় টেকনাফের প্রধান ফসল হিসেবে ধান, পান ও আলু এবং প্রধান ফল হিসেবে আম, কাঁঠাল, কলা, পেঁপে, নারকেল ও সুপারির উল্লেখ আছে। পরিবারের আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস কৃষি, ৪৪.৯৫ শতাংশ; এরপর বাণিজ্য, ২১.৮৮ শতাংশ। বাংলাপিডিয়া উপজেলার প্রধান হাটবাজারের তালিকায় সাবরাং হাট, শাহপরীর দ্বীপ হাট, হোয়াইক্যং বাজার ও কিলা বাজারের নাম দিয়েছে।
টেকনাফ উপদ্বীপের পাহাড়ি বনের বড় অংশ টেকনাফ বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য হিসেবে সংরক্ষিত, যা ১৯৮৩ সালে টেকনাফ গেম রিজার্ভ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। পূর্বে নাফ নদী ও পশ্চিমে বঙ্গোপসাগরের মাঝে ১১,৬১৫ হেক্টরের এই অভয়ারণ্য উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নে বিস্তৃত: বাহারছড়া, হ্নীলা, সাবরাং, টেকনাফ সদর ও হোয়াইক্যং। বাংলাদেশের যে অল্প কয়েকটি জায়গায় এখনো বুনো এশীয় হাতি দেখা যায়, এটি তার একটি। মেছো বাঘ নিয়ে আইইউসিএনের ২০১৬ সালের মূল্যায়নে পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রাণীটির উপস্থিতির তথ্য থাকলেও উল্লেখ করা হয়, সেখানকার এক গবেষণায় মাত্র তিনটি সম্ভাব্য রেকর্ড মিলেছিল; অর্থাৎ দক্ষিণ-পূর্বের পাহাড়ি এলাকায় এর সংখ্যা সম্পর্কে তথ্য ছিল খুব কম।

মেছো বাঘ কেমন প্রাণী
মেছো বাঘ (Prionailurus viverrinus) দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মাঝারি আকারের বুনো বিড়াল। নামে 'বাঘ' থাকলেও এটি বাঘ নয়; আকারে গৃহপালিত বিড়ালের প্রায় দ্বিগুণ এবং নিজের গণের সবচেয়ে বড় সদস্য। মাথাসহ দেহের দৈর্ঘ্য ৫৭ থেকে ৭৮ সেন্টিমিটার, লেজ ২০ থেকে ৩০ সেন্টিমিটার। পুরুষের ওজন ৮ থেকে ১৭ কেজি, স্ত্রীর ৫ থেকে ৯ কেজি। গায়ের রং গাঢ় হলদেটে ধূসর, তাতে কালো রেখা ও ছোপ; প্রতিটি গালে দুটি আর চোখের ওপরে দুটি ডোরা। ছোট ঘন ভেতরের লোম পানিতে শরীর শুকনো ও উষ্ণ রাখতে সাহায্য করে, পায়ের থাবা আংশিক জোড়া-পর্দাযুক্ত, আর নখ পুরোপুরি খাপে ঢোকে না।
নাম থেকেই বোঝা যায়, এর বাস পানির কাছে। ধীরগতির পানির আশপাশের ঘন ঝোপঝাড়ভরা জলাভূমি, যেমন জলাবন, বিল, মরা নদী, জোয়ারভাটার খাল ও ম্যানগ্রোভ বনে এদের দেখা মেলে, বেশির ভাগই নিচু এলাকায়। এরা প্রধানত নিশাচর এবং দক্ষ সাঁতারু, পানির নিচেও সাঁতরাতে পারে। পানির কিনারা ধরে শিকার করে, দূরের শিকার ধরতে ডুব দেয়, আর অনেকটা সময় ওত পেতে অপেক্ষা করে কাটায়। ভারতের কেওলাদেও জাতীয় উদ্যানের এক গবেষণায় এদের খাদ্যের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ ছিল মাছ। আইইউসিএনের ২০১৬ সালের মূল্যায়ন অনুযায়ী এরা নানা রকম খাবার খায়, যেমন ইঁদুরজাতীয় প্রাণী, পাখি ও মাছ; পশ্চিমবঙ্গের হাওড়া জেলার এক গবেষণার হিসাবে প্রতিটি মেছো বাঘ বছরে ৩৬৫ থেকে ৭৩০টি ইঁদুর খায়।
আইইউসিএন বাংলাদেশের ২০১৫ সালে প্রকাশিত জাতীয় লাল তালিকায় এ দেশের মেছো বাঘকে নিশাচর, একাকী ও লাজুক প্রাণী বলা হয়েছে, যা ভোর ও সন্ধ্যায় সবচেয়ে সক্রিয়। এরা জলাভূমি, বিল ও হাওর এলাকা পছন্দ করে এবং গ্রামাঞ্চলে নদীর ধারে, জলাশয়ের কাছে ও জলাভূমির পাড়ের ঝোপে থাকে। মূল্যায়নটি বলছে, এরা প্রধানত মাছ খায়, তবে লোকালয়ের কাছে মুরগি, হাঁস, রাজহাঁস এবং ছাগল বা ভেড়ার ছানার মতো ধরতে পারা ছোট প্রাণীও মেরে ফেলে।
বাচ্চা না থাকলে পূর্ণবয়স্ক মেছো বাঘ একা থাকে। নেপালের চিতওয়ান জাতীয় উদ্যানে রেডিও-কলার দিয়ে চালানো এক গবেষণায় স্ত্রী মেছো বাঘের বিচরণক্ষেত্র ছিল ৪ থেকে ৬ বর্গকিলোমিটার, আর একটি পুরুষের ১৬ থেকে ২২ বর্গকিলোমিটার। বুনো পরিবেশে এদের প্রজনন মূলত জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে হয় বলে ধারণা করা হয়, আর বাচ্চা বেশি দেখা যায় মার্চ ও এপ্রিলে। বন্দী অবস্থায় গর্ভকাল ৬৩ থেকে ৭০ দিন, এক প্রসবে এক থেকে চারটি বাচ্চা হয়, সাধারণত দুই বা তিনটি। প্রায় ১৫ মাস বয়সে এরা প্রজননক্ষম হয়, আর বন্দী অবস্থায় ১০ বছর পর্যন্ত বাঁচার নজির আছে।

দেশে ও বিশ্বে সংকটে থাকা এক বিড়াল
বাচ্চা দুটি উদ্ধারের সময় মেছো বাঘের বৈশ্বিক অবস্থা নির্ধারিত ছিল আইইউসিএন লাল তালিকার ২০১৬ সালের মূল্যায়ন দিয়ে (মূল্যায়নকারী এস. মুখার্জি ও সহকর্মীরা, তারিখ ২১ জুন ২০১৬), যেখানে প্রজাতিটিকে 'সংকটাপন্ন' (ভালনারেবল) ধরা হয়। ২০০৮ ও ২০১০ সালে এটি ছিল 'বিপন্ন' (এনডেঞ্জারড) তালিকায়; মূল্যায়নকারীরা ব্যাখ্যা দেন, এই পরিবর্তন তথ্যের মান বাড়ার ফল, প্রাণীটির অবস্থার উন্নতির কারণে নয়। মূল্যায়নে শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ এবং হিমালয়ের পাদদেশের তরাই-ডুয়ার্স অঞ্চলকে মেছো বাঘের পরিচিত বৈশ্বিক শক্ত ঘাঁটি বলা হয়। আবাস হারানো আর মানুষের হাতে হত্যার কারণে আগের ১৫ বছরে, অর্থাৎ তিন প্রজন্মে, বিশ্বে এদের সংখ্যা ৩০ শতাংশ বা তার বেশি কমেছে বলে ধারণা করা হয়।
একই মূল্যায়নে আশঙ্কা করা হয়, পরের ১৫ বছরে বাংলাদেশের বেশির ভাগ এলাকা নিয়ে গঠিত গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র বদ্বীপে মেছো বাঘের আবাসের প্রায় ৩০ শতাংশ স্থায়ীভাবে হারিয়ে যেতে পারে এবং বৈশ্বিক সংখ্যা আরও ৩০ শতাংশ কমতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ায় প্রধান হুমকি হিসেবে চিহ্নিত হয় নগরায়ণ, শিল্প, কৃষি এবং চিংড়িঘেরসহ জলজ চাষের কারণে আবাস হারানো ও খণ্ডিত হওয়া। বাংলাদেশে সুন্দরবন, ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার অরক্ষিত জলাভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রাণীটির উপস্থিতি নথিভুক্ত হয়, আর সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ ও উত্তর-পূর্বের জলাবনে এরা তুলনামূলক নিরাপদ বলে মূল্যায়ন করা হয়। বন্যপ্রাণীর আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের চুক্তি সাইটিসের পরিশিষ্ট ২-এ মেছো বাঘ তালিকাভুক্ত, আর বাংলাদেশে এর শিকার নিষিদ্ধ।
দেশের ভেতরের চিত্র আরও খারাপ। আইইউসিএন বাংলাদেশ ২০১৫ সালে 'রেড লিস্ট অব বাংলাদেশ, খণ্ড ২: স্তন্যপায়ী' প্রকাশ করে, যেখানে মোহাম্মদ মোস্তফা ফিরোজের মূল্যায়নে মেছো বাঘকে 'বিপন্ন' ঘোষণা করা হয়; ২০০০ সালের জাতীয় তালিকাতেও এটি একই শ্রেণিতে ছিল। মূল্যায়ন অনুযায়ী প্রাণীটি দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকলেও এদের ঘনত্ব কম; আগের দুই দশকে এদের সংখ্যা ৫০ শতাংশের বেশি কমেছে বলে ধারণা করা হয়, আর এদের বিচরণক্ষেত্র ও আবাসের মান এখনো কমছে। সবচেয়ে বড় সংখ্যা সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বনে; গ্রামাঞ্চল ও অন্যান্য বনে ছোট ছোট গোষ্ঠী টিকে আছে এবং সেগুলো কমছে।
মানুষের সঙ্গে সংঘাত
বাংলাদেশে মেছো বাঘের বড় হুমকি মানুষের হাতে হত্যা। ২০১৫ সালের ক্যাটনিউজ নিবন্ধে চৌধুরী ও সহলেখকেরা ২০১০ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৩ সালের মার্চ পর্যন্ত দ্য ডেইলি স্টার, প্রথম আলো ও স্থানীয় পত্রিকায় প্রকাশিত মেছো বাঘ-সংক্রান্ত খবর বিশ্লেষণ করেন। তাঁরা ৮২টি খবর পান, যার মধ্যে ৩০টি মৃত্যু নিশ্চিত, ১৪টি বন বিভাগের অবমুক্তি, আর ৩৮টি ক্ষেত্রে প্রাণীটির পরিণতি জানা যায়নি। প্রায় সব মৃত্যুর কারণ ছিল মানুষ: গ্রামবাসীর দলবদ্ধ পিটুনি, শ্বাসরোধ, ফাঁদ, কিংবা আটকে রাখার পর না খেতে পেয়ে মৃত্যু। লেখকদের ধারণা, গবাদিপশু, মাছ ও হাঁস-মুরগি খেয়ে ফেলে, এই বিশ্বাস থেকে মানুষ মেছো বাঘ মারে, আর অনেক সময় এদের বাঘের বাচ্চা বা অন্য মাংসাশী প্রাণী ভেবে ভুল করা হয়। তাঁরা লিখেছেন, স্থানীয়রা প্রায়ই মেছো বাঘ, বিশেষ করে এর বাচ্চাকে, ভুলভাবে শনাক্ত করে।
একই গবেষণায় দেখা যায়, ৯০.৬ শতাংশ খবর এসেছে নভেম্বর থেকে মে পর্যন্ত শুকনো মৌসুমে। লেখকদের ধারণা, তখন জলাশয় সংকুচিত হয়ে যাওয়ায় মেছো বাঘ লোকালয় ও মাছের পুকুরের কাছে শিকার খুঁজতে বাধ্য হয়। দেশের প্রতিটি বিভাগ থেকেই মেছো বাঘের খবর মিলেছে। লেখকেরা এই সংঘাতকে জলাভূমি হারানোর সঙ্গে যুক্ত করেন: দেশের জলাভূমির প্রায় ৪৫ শতাংশ অন্য কাজে রূপান্তরিত হয়েছে, বাকিগুলোও ক্ষয়ের মুখে। তাঁদের মতে, আবাস সংকুচিত হওয়া ও খাদ্যসংকট সম্ভবত মেছো বাঘকে লোকালয়ে ঠেলে দিয়েছে। তাঁরা মেছো বাঘের সংখ্যা জরিপ, জলাভূমির পাশের গ্রামগুলোতে সচেতনতামূলক শিক্ষা কার্যক্রম, গ্রামবাসী যাতে বন্যপ্রাণী কর্তৃপক্ষকে খবর দিতে পারেন সেই ব্যবস্থা এবং ক্ষতি কমাতে হাঁস-মুরগি পালনের উন্নত পদ্ধতির সুপারিশ করেন।
মানুষ কেন মেছো বাঘ মারে, তা নিয়ে পরে আরেকটি গবেষণা হয়। মেহেরুন সুলতানা ও সহলেখকেরা ২০২২ সালের ২৬ অক্টোবর জার্নাল অব থ্রেটেনড ট্যাক্সায় প্রকাশিত নিবন্ধে উত্তর-পূর্ব বাংলাদেশের বিশাল জলাভূমি হাকালুকি হাওরের আশপাশের মানুষের সাক্ষাৎকারের ফল তুলে ধরেন। তাঁরা দেখেন, সেখানে বেশির ভাগ মেছো বাঘ মারা হয়েছে ১০ থেকে ১৫ জনের দল বেঁধে, হাতের কাছে যা পাওয়া যায় তা দিয়ে; মৃতদেহ পরে কোনো কাজে লাগানো হয়নি, আর হত্যার সবচেয়ে বড় কারণ ছিল ভয়। লেখকদের উপসংহার, শুধু অর্থনৈতিক সমাধান দিয়ে এই হত্যা ঠেকানো যাবে না; প্রাণীটির প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে।
আইন কী বলত
উদ্ধারের সময় বাংলাদেশে বন্যপ্রাণী সুরক্ষার আইন ছিল বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২ (২০১২ সনের ৩০ নং আইন, তারিখ ১০ জুলাই ২০১২)। আইনের তফসিল ১, অর্থাৎ রক্ষিত বন্যপ্রাণীর তালিকায় বিড়ালগোত্রের প্রাণীদের মধ্যে 'মেছো বিড়াল' নামে মেছো বাঘ অন্তর্ভুক্ত। আইনের ৬ ধারা অনুযায়ী আইনের অধীন লাইসেন্স বা পারমিট ছাড়া কোনো ব্যক্তি কোনো বন্যপ্রাণী শিকার করতে পারেন না। আর আইনে 'শিকার'-এর সংজ্ঞা ব্যাপক: কোনো বন্যপ্রাণীকে হত্যা করা, ধরা, বিষ প্রয়োগ করা বা অনুরূপ উদ্যোগ; এসব উদ্দেশ্যে তাড়া করা; কিংবা আহত বা ক্ষতি করা।
৬ ধারা লঙ্ঘনের শাস্তি নির্ধারিত ছিল ৩৯ ধারায়: সর্বোচ্চ এক বছর কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড; একই অপরাধের পুনরাবৃত্তিতে সর্বোচ্চ দুই বছর কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড। বাঘ ও হাতির ক্ষেত্রে (৩৬ ধারা) এবং চিতা বাঘ, লাম চিতা, উল্লুক, সাম্বার হরিণ, কুমির, ঘড়িয়াল, তিমি ও ডলফিনের ক্ষেত্রে (৩৭ ধারা) শাস্তি আরও কঠোর। ৪১ ধারা অনুযায়ী অপরাধে সহায়তা বা প্ররোচনা দিলে সহায়তাকারী বা প্ররোচনাকারীও একই দণ্ড পাবেন। আইনে 'বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্র'-এর সংজ্ঞাও আছে: সরকার অনুমোদিত কেন্দ্র, যেখানে বিরল, বিপন্ন বা মহাবিপদাপন্ন প্রজাতির বন্যপ্রাণী আটক বা উদ্ধার করে পুনর্বাসনের জন্য রেখে বংশবৃদ্ধি করা হয়।
টেকনাফ ও অন্যত্র আগের উদ্ধার
আচারবুনিয়ার ঘটনার দশ দিন আগে টেকনাফে আরেকটি মেছো বাঘ উদ্ধার হয়েছিল। দ্য ডেইলি স্টার বাংলা ও বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের খবর অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ২৪ জানুয়ারি, বুধবার, টেকনাফ পৌরসভার বাসস্টেশন এলাকায় একটি পানের দোকানে লুকিয়ে থাকা একটি অল্পবয়সী মেছো বাঘ দেখে স্থানীয়রা সেটি ধরে ফেলেন। বনকর্মীরা প্রাণীটিকে রেঞ্জ কার্যালয়ে নিয়ে মাছ ও মুরগি খাওয়ান এবং সেদিন বিকেলে টেকনাফ বন রেঞ্জের নার্সারি পার্ক এলাকার সংরক্ষিত বনে ছেড়ে দেন। রেঞ্জ কর্মকর্তা মিজানুর রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, প্রাণীটি পুরুষ, বয়স এক থেকে দেড় বছরের মতো, আর তাঁর ধারণা বন উজাড় হওয়ায় খাবারের অভাবে সেটি লোকালয়ে চলে আসে।
অন্যত্রও এমন ঘটনার খবর এসেছে। ২০২৩ সালের ২৩ জানুয়ারি দ্য ডেইলি স্টার বাংলা জানায়, ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু উপজেলার রঘুনাথপুর গ্রামে খালপাড়ে একটি বাঁশের ফাঁদে বাচ্চাসহ একটি মেছো বাঘ আটকা পড়ে। কয়েক দিন ধরে হাঁস-মুরগি হারানোর পর এক স্থানীয় কৃষক ফাঁদটি পেতেছিলেন। খুলনা বন বিভাগের কর্মকর্তা মফিজুর রহমান বলেন, স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকদের সহায়তায় মা ও বাচ্চাকে উদ্ধার করে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে সংরক্ষিত বনে ছেড়ে দেওয়া হয়। ২০১৫ সালের ক্যাটনিউজ গবেষণাতেও ঝিনাইদহের নাম আসে; সেখানে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ২২টি মেছো বাঘ হত্যার খবরের উল্লেখ আছে।
ছবি: Anirnoy / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, দৈনিক ইত্তেফাক, আজকের পত্রিকা, সময়ের আলো, দ্য ডেইলি স্টার, আইইউসিএন লাল তালিকা (মেছো বাঘের ২০১৬ সালের মূল্যায়ন), আইইউসিএন বাংলাদেশ: রেড লিস্ট অব বাংলাদেশ খণ্ড ২: স্তন্যপায়ী (২০১৫), ক্যাটনিউজ (আইইউসিএন এসএসসি বিড়াল বিশেষজ্ঞ দল), জার্নাল অব থ্রেটেনড ট্যাক্সা, বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২ (bdlaws.minlaw.gov.bd), বাংলাপিডিয়া, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)