মাগুরা সদর উপজেলার জগদল ইউনিয়নের মাঝিপাড়া এলাকায় ২০২৬ সালের জুনের শেষ সপ্তাহে একটি বন্যপ্রাণীকে ঘিরে গ্রামবাসীর মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ২০ জুন শনিবার রাত আনুমানিক ১১টার দিকে গ্রামের পাকা সড়কের পাশের ঝোপঝাড়ে প্রাণীটিকে দেখা যায়, আর পরদিন রোববার (২১ জুন) ফেসবুকে প্রাণীটির প্রায় সাত সেকেন্ডের একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। অনেকে একে বাঘ বা চিতা বাঘ ভেবে ভয় পান। তবে মাগুরা জেলা বন বিভাগের কর্মকর্তা তপেনন্দ্রনাথ ঠাকুর ভিডিও দেখে জানান, প্রাণীটি বাঘ বা চিতা বাঘ নয়, এটি একটি মেছো বাঘ, যার প্রচলিত বাংলা নাম মেছো বিড়াল। জাগো নিউজ ২৪ ও প্রথম আলো ২২ জুন এ খবর প্রকাশ করে।
রাতের সড়কে প্রাণী, তারপর ভিডিও
জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্থানীয় এক যুবক শনিবার রাতে বাজার থেকে বাড়ি ফেরার পথে রাস্তার পাশের ঝোপঝাড় থেকে হঠাৎ একটি বন্যপ্রাণী তাঁর সামনে চলে আসে। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, প্রাণীটি রাস্তার পাশের একটি গাছ থেকে লাফিয়ে তাঁর সামনে পড়ে। আতঙ্কিত হলেও তিনি মুঠোফোনের ফ্ল্যাশলাইট জ্বালিয়ে প্রায় সাত সেকেন্ডের একটি ভিডিও ধারণ করেন। তাঁর দাবি ছিল, প্রাণীটি দেখতে অনেকটা চিতা বাঘের মতো।
পরে তিনি স্থানীয় বাজারে গিয়ে ঘটনাটি জানান। প্রথমে অনেকে বিশ্বাস করেননি, কিন্তু ভিডিও দেখার পর এলাকায় চাঞ্চল্য তৈরি হয়। প্রথম আলো জানায়, গ্রামবাসী লাঠিসোঁটা নিয়ে প্রাণীটিকে খুঁজতে বের হন, কিন্তু রাতের অন্ধকারে সেটির আর সন্ধান পাওয়া যায়নি। রোববার রাতেও এলাকার বাসিন্দারা লাঠিসোঁটা হাতে প্রাণীটি খুঁজতে বের হয়েছিলেন।
প্রাণীটি নিয়ে এলাকায় নানা জল্পনা চলছিল। কেউ বলছিলেন চিতা বাঘ, কেউ মেছো বাঘ। মাঝিপাড়ার বাসিন্দা ইদ্রিস আলী জাগো নিউজকে বলেন, প্রথমে তিনি ভাতিজার কথা বিশ্বাস করেননি; ভিডিও দেখার পর তাঁরা ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রাণীটিকে দেখতে পান, তবে চেষ্টা করেও ধরতে পারেননি। তিনি আরও দাবি করেন, ওই রাতে পাশের একটি বাড়ি থেকে চারটি মুরগি নিখোঁজ হয়েছে এবং এলাকাবাসীর ধারণা, প্রাণীটিই মুরগিগুলো খেয়ে ফেলেছে। মুরগি নিখোঁজ হওয়ার সঙ্গে প্রাণীটির সম্পর্ক কোনো কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেনি।
উদ্বেগ বেশি ছিল স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের মধ্যে, কারণ প্রাণীটি যেখানে দেখা গেছে তার আশপাশে কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা রহিমা বেগম ২২ জুন প্রথম আলোকে বলেন, ‘এখন বর্ষার সময়। চারপাশে ঝোপঝাড় বাড়ে। এর মধ্যে এই বাঘের গল্প শুনে শিশুদের মধ্যে কিছুটা ভয় তৈরি হয়েছে।’
বন বিভাগ ও জনপ্রতিনিধি যা বলেন
মাগুরা জেলা বন বিভাগের কর্মকর্তা তপেনন্দ্রনাথ ঠাকুর ভিডিওটি পর্যালোচনা করে জানান, ভিডিওতে দেখা প্রাণীটি একটি মেছো বাঘ। জাগো নিউজকে তিনি বলেন, বাংলাদেশের বিভিন্ন গ্রামীণ এলাকায় এখনো মেছো বাঘের দেখা মেলে, আর সাধারণত ঝোপঝাড়, জলাশয় ও পুকুরপাড় এলাকায় এরা বাস করে। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, মেছো বাঘ সাধারণত জলাশয়ের কাছাকাছি থাকে এবং ছোট মাছ বা ক্ষুদ্র প্রাণী খেয়ে বেঁচে থাকে; এরা মানুষের কোনো ক্ষতি করে না, বরং প্রকৃতি সংরক্ষণে অবদান রাখে।
বন বিভাগের এই কর্মকর্তা আরও জানান, মেছো বাঘ একটি বিপন্ন প্রাণী। তাই স্থানীয় মানুষকে সচেতন করা হচ্ছিল, যাতে কেউ এটিকে পিটিয়ে বা ধরে মেরে না ফেলে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছিল, যাতে প্রাণীটিকে উদ্ধার করে নিরাপদ ও বসবাসযোগ্য কোনো স্থানে ছেড়ে দেওয়া যায়। তিনি জানান, বন বিভাগের পক্ষ থেকে এলাকায় নজরদারিও বাড়ানো হয়েছিল। প্রথম আলোর ভাষায়, বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলছিলেন, প্রাণীটি পরিবেশের জন্য উপকারী, এর প্রধান খাবার মাছ, আর বিশ্বব্যাপী সংকটাপন্ন মেছো বিড়াল দেশের আইনেও সংরক্ষিত।
জগদল ইউনিয়ন পরিষদের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মো. কামাল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘সেদিন রাতের পর আর ওই প্রাণীটিকে দেখা যায়নি। আমাদের এলাকায় এটি পরিচিত বাঘডাশ নামে। এগুলো মাঝেমধ্যেই দেখা যায়।’ তিনি জানান, যে এলাকায় প্রাণীটি দেখা গিয়েছিল সেখানে তাঁর মাছের ঘের আছে, আর পরদিন সকালে গিয়ে তিনি মানুষকে স্বাভাবিক কাজকর্ম করতে দেখেছেন।
মেছো বিড়াল কেমন প্রাণী
মেছো বিড়াল বা মেছো বাঘ (বৈজ্ঞানিক নাম Prionailurus viverrinus) দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মাঝারি আকারের একটি বুনো বিড়াল। এর গায়ের লোম গাঢ় হলদে-ধূসর, তার ওপর কালো ডোরা ও ছোপ। গালে দুটি এবং চোখের ওপর থেকে ঘাড় পর্যন্ত দুটি ডোরা থাকে, কাঁধের ছোপ লম্বাটে আর শরীরের পাশে, পায়ে ও লেজে ছোপগুলো গোল। কান ছোট ও গোলাকার, কানের পেছনে সাদা দাগ। লেজ ছোট, মাথা ও শরীরের দৈর্ঘ্যের অর্ধেকেরও কম। এই ডোরা ও ছোপের কারণেই রাতের আবছা আলোয় বা মুঠোফোনের ছোট ভিডিওতে একে বাঘ বা চিতা বাঘ বলে ভুল হতে পারে।
প্রাপ্তবয়স্ক মেছো বিড়ালের মাথা থেকে শরীরের দৈর্ঘ্য ৫৭ থেকে ৭৮ সেন্টিমিটার, লেজ ২০ থেকে ৩০ সেন্টিমিটার। পুরুষের ওজন ৮ থেকে ১৭ কেজি, স্ত্রীর ৫ থেকে ৯ কেজি। আকারে এটি গৃহপালিত বিড়ালের প্রায় দ্বিগুণ। পায়ের পাতা আংশিক জালযুক্ত, আর ঘন দুই স্তরের লোম পানিতে শরীরকে শুকনো ও উষ্ণ রাখতে সাহায্য করে বলে মনে করা হয়। এরা দক্ষ সাঁতারু, দীর্ঘ পথ এমনকি পানির নিচেও সাঁতরাতে পারে।
মেছো বিড়াল মূলত নিশাচর। এরা ঘন গাছপালা ঘেরা জলাভূমির আশপাশে থাকে: ধীরগতির নদী, খাল, বিল, অশ্বখুরাকৃতি হ্রদ, জলাভূমি ও ম্যানগ্রোভ বন। ভারতের কেওলাদেও জাতীয় উদ্যানে মল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এর খাবারের প্রায় চার ভাগের তিন ভাগ মাছ; বাকিটা পাখি, ছোট ইঁদুরজাতীয় প্রাণী ও পোকামাকড়। শামুক, সরীসৃপ, ব্যাঙ ও মৃত গবাদিপশুর মাংসও এরা খায়। জলাশয়ের কিনারে ওত পেতে থেকে পানি থেকে শিকার তুলে নেয়, কখনো পানিতে ঝাঁপিয়েও মাছ ধরে।
বাচ্চা ও প্রজনন নিয়েও তথ্য আছে। বুনো মেছো বিড়াল সাধারণত জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে মিলিত হয়, তবে জুন পর্যন্তও মিলনের খবর পাওয়া যায়। আবদ্ধ অবস্থায় গর্ভকাল ৬৩ থেকে ৭০ দিন, একবারে গড়ে দুই থেকে তিনটি বাচ্চা হয়। প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ ও বাচ্চাহীন স্ত্রী বিড়াল একা থাকে; স্ত্রী বিড়াল ৪ থেকে ৬ বর্গকিলোমিটার আর পুরুষ ১৬ থেকে ২২ বর্গকিলোমিটার এলাকায় চলাফেরা করে বলে জানা যায়।

বাঘ ও চিতা বাঘ এখন কোথায় টিকে আছে
গ্রামবাসীর ভয় ছিল বাঘ বা চিতা বাঘ নিয়ে। কিন্তু বাংলাদেশে এই দুই বড় বিড়ালের বিস্তার এখন খুবই সীমিত। আইইউসিএন বাংলাদেশের ২০১৫ সালের লাল তালিকায় (রেড লিস্ট অব বাংলাদেশ, স্তন্যপায়ী খণ্ড) রয়েল বেঙ্গল টাইগারকে ‘মহাবিপন্ন’ ধরা হয়েছে। মূল্যায়ন অনুযায়ী, দেশের বেশির ভাগ বনে বাঘ প্রায় পুরোপুরি হারিয়ে গেছে; উত্তরে শেষ বাঘটি গুলি করে মারা হয় ১৯৬২ সালে পঞ্চগড়ের বাংলাবান্ধায়। এখন টেকসই জনসংখ্যা আছে কেবল দক্ষিণ-পশ্চিমের সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বনে; পার্বত্য চট্টগ্রাম ও বৃহত্তর সিলেটের সীমান্তবর্তী এলাকায় দেখা মেলে ‘খুবই কদাচিৎ’।
সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা নিয়ে সর্বশেষ জরিপের ফল প্রকাশিত হয় ২০২৪ সালের অক্টোবরে। মংগাবের ১৭ অক্টোবর ২০২৪ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের মার্চ পর্যন্ত দুই দফায় ৬০৫টি স্থানে ১ হাজার ২১০টি ক্যামেরা বসিয়ে জরিপ চালানো হয়। তাতে সুন্দরবনে ১২৫টি প্রাপ্তবয়স্ক বাঘ গণনা করা হয়, প্রতি ১০০ বর্গকিলোমিটারে ২.৬৪টি। এর আগে ২০১৮ সালে সংখ্যা ছিল ১১৪ এবং ২০১৫ সালে ১০৬। সুন্দরবনের মোট ১০ হাজার ২৭৭ বর্গকিলোমিটারের মধ্যে ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার বাংলাদেশে।
চিতা বাঘ বা লেপার্ডের অবস্থা আরও সংকটময়। একই লাল তালিকায় একে ‘মহাবিপন্ন’ ধরা হয়েছে, কারণ ১৯৪০ সালের পর থেকে এর বিস্তারের এলাকা ৯০ শতাংশের বেশি কমে গেছে। মূল্যায়নে বলা হয়েছে, ১৯৪০ সাল পর্যন্তও প্রাণীটি সারা দেশে প্রায় সব ধরনের আবাসে ছিল; কিন্তু এখন এটি ৯০ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমার পশ্চিমে আর দেখা যায় না, মধুপুর জাতীয় উদ্যানে শেষ দেখা গিয়েছিল ১৯৬২ সালে। এখন কেবল দক্ষিণ-পূর্বের পার্বত্য চট্টগ্রাম ও উত্তর-পূর্বের রেমা-কালেঙ্গা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের মতো অল্প কয়েকটি এলাকায় এর দেখা মেলে।
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী মাগুরা জেলা ৮৯ ডিগ্রি ১৫ মিনিট থেকে ৮৯ ডিগ্রি ৪২ মিনিট পূর্ব দ্রাঘিমার মধ্যে, অর্থাৎ লাল তালিকায় চিতা বাঘের বর্তমান বিস্তারের সীমার পশ্চিমে। অন্যদিকে মেছো বিড়াল দেশের গ্রামাঞ্চলে, বসতবাড়ির আশপাশের ঝোপে ও জলাভূমিতে ছড়িয়ে আছে। এই প্রেক্ষাপটে বন বিভাগের শনাক্তকরণ ছিল মেছো বিড়াল, আর কোনো কর্তৃপক্ষ এলাকায় বাঘ বা চিতা বাঘ থাকার কথা নিশ্চিত করেনি।

বাংলাদেশে মেছো বিড়ালের অবস্থা
আইইউসিএন বাংলাদেশের ২০১৫ সালের মূল্যায়নে মেছো বিড়ালকে দেশে ‘বিপন্ন’ শ্রেণিতে রাখা হয়েছে। মূল্যায়নে বলা হয়েছে, প্রাণীটি দেশজুড়ে গ্রামাঞ্চলের বসতবাড়ির বনে এবং সব ধরনের প্রাকৃতিক বন ও জলাভূমিতে ছড়িয়ে আছে। একসময় সবচেয়ে বড় জনসংখ্যা ছিল সুন্দরবনে, কিন্তু সেখানেও সংখ্যা কমছে। দুই দশকে সংখ্যা ৫০ শতাংশের বেশি কমেছে বলে ধারণা করা হয়েছে; আবাসের আয়তন ও মান দুই-ই কমছে। বসতির কাছে হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশু শিকার করতে গিয়ে মানুষের সঙ্গে সংঘাতও হয়।
বৈশ্বিক পর্যায়ে আইইউসিএনের লাল তালিকায় মেছো বিড়াল ২০১৬ সাল থেকে ‘সংকটাপন্ন’ (ভালনারেবল)। ২০১০ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে এর বৈশ্বিক জনসংখ্যা প্রায় ৩০ শতাংশ কমেছে বলে ধারণা করা হয়। জলাভূমি ধ্বংস এবং স্থানীয় মানুষের হাতে হত্যা এর প্রধান হুমকি। প্রাণীটি বন্যপ্রাণী বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের আন্তর্জাতিক চুক্তি সাইটিসের পরিশিষ্ট ২-এ আছে, আর বাংলাদেশসহ বিস্তারের বেশির ভাগ দেশে এর শিকার নিষিদ্ধ। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য প্রাণী মেছো বিড়াল।
বাংলাদেশে মানুষ ও মেছো বিড়ালের সংঘাত নিয়ে একটি গবেষণা ২০১৫ সালে আইইউসিএন ক্যাট স্পেশালিস্ট গ্রুপের সাময়িকী ক্যাটনিউজে প্রকাশিত হয়। সায়েম ইউ চৌধুরী ও সহকর্মীরা ২০১০ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৩ সালের মার্চ পর্যন্ত দ্য ডেইলি স্টার, প্রথম আলো ও কয়েকটি স্থানীয় পত্রিকায় প্রকাশিত মেছো বিড়ালের ৮২টি খবর বিশ্লেষণ করেন। তাতে ৩০টি মেছো বিড়ালের মৃত্যু নিশ্চিত হয়, ৩৮টির পরিণতি জানা যায়নি। প্রায় সব মৃত্যুর কারণ ছিল মানুষের হাতে সরাসরি হত্যা, ফাঁদ বা ধরার পর না খেয়ে মারা যাওয়া।
গবেষকেরা লেখেন, গবাদিপশু, মাছের খামার ও হাঁস-মুরগির ক্ষতি করবে এই ধারণা থেকেই মূলত মেছো বিড়াল মারা হয়, আর অনেক ক্ষেত্রে ভয়ে বা কৌতূহলে একে বাঘের বাচ্চা বা অন্য মাংসাশী প্রাণী ভেবে ভুল করা হয়। তাঁদের হিসাবে ৯০.৬ শতাংশ খবর ছিল নভেম্বর থেকে মে মাসের শুকনো মৌসুমের। সব বিভাগেই মেছো বিড়ালের খবর পাওয়া গেছে; সিলেট বিভাগ থেকে ১৭টি এবং খুলনা ও ঢাকা বিভাগ থেকে ১৪টি করে খবর ছিল। গবেষকেরা মনে করেন, জলাভূমির অবক্ষয় ও খাবারের সংকট প্রাণীটিকে লোকালয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
মাগুরা ও আশপাশে আগের ঘটনা
মাগুরায় মেছো বিড়াল লোকালয়ে আসার খবর এবারই প্রথম নয়। রাইজিংবিডি ২০২১ সালের ২৯ নভেম্বর জানায়, জেলার মহম্মদপুর উপজেলার পলাশবাড়ীয়া ইউনিয়নের যশবন্তপুর গ্রামে একটি কবুতরের খামারে পাতা ফাঁদে একটি মেছো বাঘ ধরা পড়ে। স্থানীয় এক প্রধান শিক্ষক তখন বলেছিলেন, গ্রামের মানুষ কিছুদিন ধরে মেছো বাঘ আতঙ্কে ছিলেন, আর প্রাণীটি একের পর এক হাঁস-মুরগি ও কবুতর ধরছিল বলে তাঁদের অভিযোগ। প্রাণীটিকে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ে হস্তান্তর করা হয়।
মহম্মদপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. নাসির উদ্দিন সরকার তখন রাইজিংবিডিকে বলেন, প্রাণীটি বিরল প্রজাতির; স্থানীয়ভাবে মেছো বাঘ বলা হলেও এর নাম মেছো বিড়াল। তিনি জানান, বন বিভাগের মাধ্যমে প্রাণীটিকে সুন্দরবনে অবমুক্ত করার কথা ছিল।
পাশের ঝিনাইদহ জেলায় পরিণতি ছিল দুঃখজনক। বিডিনিউজ২৪ ২০২৪ সালের ১৩ নভেম্বর জানায়, শৈলকুপা উপজেলার খন্দকবাড়ীয়া গ্রামে একটি মেছো বাঘ জালে আটকা পড়ার পর গ্রামবাসী সেটিকে পিটিয়ে মেরে ফেলে। গ্রামবাসীর দাবি ছিল, প্রাণীটি আগের রাতে এক কৃষকের গোয়ালঘরে ঢুকে দুটি ছাগল মেরেছিল এবং পরের রাতে মুরগির ঘরে ঢুকেছিল। শৈলকুপা উপজেলা বন কর্মকর্তা মখলেসুর রহমান বলেন, বন্যপ্রাণী হত্যা দণ্ডনীয় অপরাধ; ঘটনায় থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়। চৌধুরী ও সহকর্মীদের ২০১৫ সালের গবেষণাতেও ঝিনাইদহের বিভিন্ন উপজেলা থেকে মেছো বিড়াল হত্যার খবর উঠে এসেছিল।
আইন কী বলে
প্রথম আলোর ২২ জুনের প্রতিবেদনে বন বিভাগের কর্মকর্তারা স্পষ্ট করে বলেন, মেছো বিড়াল দেশের আইনে সংরক্ষিত প্রাণী। দেশের বন্যপ্রাণী সুরক্ষার আইনি কাঠামো সে সময় সদ্য বদলেছিল। প্রথম আলোর ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ ‘বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা অধ্যাদেশ’ অনুমোদন করে; পত্রিকাটি বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২-এর সঙ্গে তুলনা করে এর পরিবর্তনগুলো তুলে ধরে। বিডিনিউজ২৪ জানায়, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে অধ্যাদেশটি জারি হয়, আর দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ১৪ এপ্রিল ২০২৬ জানায়, এটি সংসদে পাস হয়ে বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০২৬ হয়েছে।
প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন কাঠামোয় তফসিল-১ তিন ভাগে ভাগ করা হয়। তফসিল-১(ক)-তে বাঘ ও হাতি, তফসিল-১(খ)-তে ২৫০ প্রজাতি, তফসিল-১(গ)-তে ১২৭ প্রজাতি এবং তফসিল-২-এ ১ হাজার ২০৭ প্রজাতির বন্যপ্রাণী সুরক্ষা পায়। গাছসহ মোট ১ হাজার ৫৯৯ প্রজাতি সুরক্ষার আওতায় আসে, যার মধ্যে স্তন্যপায়ী প্রাণী ১৩৩ প্রজাতি। আগের আইনে শুধু বাঘ ও হাতি হত্যা জামিন অযোগ্য ছিল; নতুন অধ্যাদেশের ৪৬ ধারায় তফসিল-১-এর (ক) ও (খ) ভাগের প্রাণী হত্যাকে আমলযোগ্য ও জামিন অযোগ্য অপরাধ করা হয়। আমলযোগ্য অপরাধে বন কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরোয়ানা ছাড়াই সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করতে পারেন।
বাঘ বা হাতি হত্যার জন্য প্রথমবার ২ থেকে ৭ বছর কারাদণ্ড ও ১ লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড, আর দ্বিতীয়বারে সর্বোচ্চ ১২ বছর কারাদণ্ড ও ১৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ডের আগের বিধানও বহাল থাকে। মেছো বিড়াল কোন তফসিলে আছে এবং এর হত্যার নির্দিষ্ট শাস্তি কী, তা এই প্রতিবেদনে পাওয়া সূত্রগুলোতে আলাদা করে উল্লেখ নেই; তবে বন বিভাগ বারবার বলে আসছে, বন্যপ্রাণী হত্যা দণ্ডনীয় অপরাধ।
মাগুরা সদর ও জগদল: জলাভূমির জনপদ
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী মাগুরা জেলার আয়তন ১ হাজার ৩৯.১০ বর্গকিলোমিটার। এর উত্তরে রাজবাড়ী, দক্ষিণে যশোর ও নড়াইল, পূর্বে ফরিদপুর এবং পশ্চিমে ঝিনাইদহ। জেলায় চারটি উপজেলা: মাগুরা সদর, মহম্মদপুর, শালিখা ও শ্রীপুর। প্রধান নদী গড়াই-মধুমতী, নবগঙ্গা ও কুমার। ১৯৮৪ সালের ১ মার্চ মহকুমা থেকে জেলায় উন্নীত হয় মাগুরা। ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী জেলার জনসংখ্যা ১০ লাখ ৩৩ হাজার ১১৫, যার মধ্যে মাগুরা সদর উপজেলায় ৪ লাখ ২৬ হাজার ৩৯৬ জন।
মাগুরা সদর উপজেলার আয়তন ৪০১.৫৮ বর্গকিলোমিটার, ইউনিয়ন ১৩টি; জগদল তার একটি। উপজেলার ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে গড়াই, নবগঙ্গা, মুচিখালী, কুমার ও ফটকি নদী। বাংলাপিডিয়া এখানকার উল্লেখযোগ্য জলাশয় হিসেবে সিরিজদিয়া বাঁওড় এবং তারাখাল, বাওরি, রাউয়া, পদ্মা, কুমার, কাশিয়াডাঙ্গা, গজার গড়িয়া ও হাতুড়া বিলের নাম দেয়। প্রধান ফসল ধান, পাট, গম, সরিষা, ছোলা, মসুর, আখ ও শাকসবজি। ২০১১ সালের হিসাবে উপজেলার মানুষের ৬০.৫২ শতাংশের প্রধান জীবিকা কৃষি।
নদী, বিল, বাঁওড়, পুকুর আর মাছের ঘেরে ভরা এমন এলাকাই মেছো বিড়ালের পছন্দের আবাস। চৌধুরী ও সহকর্মীদের গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, দেশের মোট ভূমির প্রায় অর্ধেক নদী, মোহনা, হাওর, বাঁওড়, বিল, মাছের পুকুর ও মৌসুমি প্লাবনভূমির মতো জলাভূমি; কিন্তু দেশের জলাভূমির প্রায় ৪৫ শতাংশ অন্য কাজে রূপান্তরিত হয়েছে এবং বাকিগুলোও মানুষের চাপে অবক্ষয়ের মুখে। জগদলে প্রাণীটি যেখানে দেখা গিয়েছিল, সেখানে মাছের ঘের থাকার কথা ইউপি সদস্য নিজেই জানিয়েছেন।

মেছো বিড়াল দেখলে কী করবেন
মাগুরার বন কর্মকর্তা স্থানীয় মানুষকে অনুরোধ করেছিলেন, কেউ যেন মেছো বিড়ালকে পিটিয়ে বা ধরে মেরে না ফেলেন; প্রাণীটি উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে ছেড়ে দেওয়ার দায়িত্ব বন বিভাগের। শৈলকুপার বন কর্মকর্তাও ২০২৪ সালে গ্রামবাসীকে একই সতর্কবার্তা দিয়েছিলেন। প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়, এ প্রাণী মানুষের ক্ষতি করে না বলে জানিয়েছেন মাগুরার বন কর্মকর্তা।
২০১৫ সালের গবেষণায় সংঘাত কমাতে কয়েকটি পরামর্শ ছিল, যা গ্রামের মানুষের জন্যও প্রাসঙ্গিক:
- জলাভূমির পাশের গ্রামগুলোতে মেছো বিড়ালের বাস্তুসংস্থান ও গুরুত্ব নিয়ে ব্যাপক সচেতনতা কার্যক্রম চালানো।
- হাঁস-মুরগি রাখার ব্যবস্থা উন্নত করে শিকারের ক্ষতি কমানো।
- গ্রামবাসী যাতে মেছো বিড়াল দেখা গেলে বন্যপ্রাণী কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় সংরক্ষণকর্মীদের দ্রুত জানাতে পারেন, সে ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
- উদ্ধার ও অবমুক্তির কাজ দ্রুত ও নিয়মমাফিক করতে বন বিভাগের কর্মীদের বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনার প্রশিক্ষণ দেওয়া।
গবেষকেরা আরও সতর্ক করেন, উদ্ধার করা মেছো বিড়ালকে যে জলাভূমি থেকে ধরা হয়েছে তার বদলে দূরের অনুপযুক্ত বনে ছাড়লে প্রাণীটি মারা যেতে পারে, কারণ এটি জলাভূমিনির্ভর প্রাণী।
ছবি: Sultan Sunnny / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, প্রথম আলো, আইইউসিএন বাংলাদেশ (রেড লিস্ট অব বাংলাদেশ ২০১৫, স্তন্যপায়ী খণ্ড), আইইউসিএন ক্যাট স্পেশালিস্ট গ্রুপের ক্যাটনিউজ (২০১৫), মংগাবে, বাংলাপিডিয়া, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জনশুমারি ২০২২, রাইজিংবিডি, বিডিনিউজ২৪, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)