দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলায় দুই দিনের ব্যবধানে সাপের কামড়ে তিন গৃহবধূ মারা গেছেন। ২০২৫ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর সোমবার রাতে কাজিহাল ইউনিয়নে একজন এবং পরদিন ১৬ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার সকালে কাজিহাল ও শিবনগর ইউনিয়নে আরও দুজনের মৃত্যু হয়। তিনজনই ঘরের কাজ করার সময় সাপের কামড়ের শিকার হন। জাগো নিউজ ২৪ ১৬ সেপ্টেম্বর এ খবর প্রকাশ করে।
মারা যাওয়া তিনজন হলেন কাজিহাল ইউনিয়নের রামেশ্বরপুর গ্রামের প্রয়াত দেলোয়ার হোসেনের স্ত্রী বুলবুলি বেগম (৩৫), একই ইউনিয়নের পুকুরি সিংপাড়া গ্রামের শ্যামল রায়ের স্ত্রী বিনা রানী (৪৫) এবং শিবনগর ইউনিয়নের রাজারামপুর গোয়ালপাড়া গ্রামের কৃষ্ণ চন্দ্রের স্ত্রী কনিকা রানী (৪৫)। কাজিহাল ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান কাঞ্চন মিয়া ও শিবনগর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সামিদুল ইসলাম সাপের কামড়ে তাঁদের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
ঘরের কাজের সময় সাপের কামড়
সোমবার রাত ৮টার দিকে পুকুরি সিংপাড়া গ্রামে বিনা রানী মাটির ঘরের ভেতরে একটি ইঁদুরের গর্তের মুখ বন্ধ করছিলেন। তখন গর্তের ভেতরে থাকা একটি সাপ তাঁকে কামড় দেয়। কিছুক্ষণ পরেই তিনি মারা যান।
মঙ্গলবার সকালে রাজারামপুর গোয়ালপাড়া গ্রামে কনিকা রানী রান্না করছিলেন। এ সময় জ্বালানির খড়ির ভেতর থেকে একটি সাপ বেরিয়ে তাঁকে কামড় দেয়। তাঁকে ফুলবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে চিকিৎসক দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান। সেখানে নেওয়ার পথে তিনি মারা যান।
একই দিন সকালে রামেশ্বরপুর গ্রামে মাটির চুলা থেকে ছাই তুলতে গিয়ে সাপের কামড়ে আহত হন বুলবুলি বেগম। তাঁকেও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই পথে তিনি মারা যান। কোন প্রজাতির সাপ তিনজনকে কামড়েছিল, প্রতিবেদনে তা জানা যায়নি।

উপজেলা হাসপাতালে অ্যান্টিভেনম মজুত ছিল
ফুলবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) নুরে আলম জাগো নিউজকে জানান, হাসপাতালে অ্যান্টিভেনম মজুত আছে। তবে রোগীর উপসর্গ দেখে এবং কোন সাপে কামড়েছে তা নির্ণয় করে এই ইনজেকশন দেওয়া হয়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, যে রোগীরা এসেছিলেন তাঁদের অবস্থা খুবই গুরুতর ছিল, আর একজনের ক্ষেত্রে সাপে কাটার সঠিক উপসর্গও পাওয়া যায়নি। তাই উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁদের দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
ফুলবাড়ী রংপুর বিভাগের দিনাজপুর জেলার একটি উপজেলা। একটি পৌরসভা ও সাতটি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এই উপজেলায় ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী ১,৯৪,৫৬৯ জন মানুষের বাস। কাজিহাল ও শিবনগর এর দুটি ইউনিয়ন।

দেশে ও বিশ্বে সাপের কামড়ের চিত্র
২০২৩ সালের ১৮ জুন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক অনুষ্ঠানে সাপের কামড় নিয়ে ২০২১-২০২২ সালের একটি জাতীয় সমীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয়। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সমীক্ষায় দেখা যায় বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় চার লাখ মানুষ সাপের কামড়ের শিকার হন এবং মারা যান সাড়ে সাত হাজারের বেশি মানুষ। সাপের কামড়ের ৯৫ শতাংশ ঘটনা ঘটে গ্রামে। সমীক্ষার সময় দেশে কোনো অ্যান্টিভেনম উৎপাদন হতো না।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) হিসাবে, বিশ্বে প্রতিবছর আনুমানিক ৫৪ লাখ মানুষ সাপের কামড়ের শিকার হন এবং মারা যান ৮১ হাজার ৪১০ থেকে ১ লাখ ৩৭ হাজার ৮৮০ জন। কৃষিশ্রমিক ও শিশুরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সংস্থাটি বলছে, মানসম্পন্ন অ্যান্টিভেনমই সাপের বিষের বেশির ভাগ ক্ষতি ঠেকানো বা সারানোর সবচেয়ে কার্যকর চিকিৎসা। ডব্লিউএইচও ২০১৭ সালের জুনে সাপের কামড়কে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের অবহেলিত গ্রীষ্মমণ্ডলীয় রোগের তালিকায় যুক্ত করে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে এতে মৃত্যু ও পঙ্গুত্ব ৫০ শতাংশ কমানোর লক্ষ্য ঠিক করে।

ডব্লিউএইচওর পরামর্শ: প্রাথমিক করণীয় ও সতর্কতা
ডব্লিউএইচওর পরামর্শ অনুযায়ী, সাপে কামড়ানো মানুষকে একেবারে নড়াচড়া করতে না দিয়ে স্থির রাখতে হবে এবং দেরি না করে অস্থায়ী স্ট্রেচারে করে চিকিৎসাকেন্দ্রে নিতে হবে; সম্ভব হলে তাঁকে কাত করে শোয়ালে শ্বাসপথ সুরক্ষিত থাকে। সংস্থাটি সতর্ক করেছে, সরু করে শক্ত বাঁধন দেওয়া, ক্ষতস্থান কাটা, পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেটের মতো রাসায়নিক লাগানো বা গরম কাচের পাত্র দিয়ে বিষ টেনে বের করার চেষ্টা বিপজ্জনক ও অকার্যকর। ঘরবাড়িতে কামড় কমাতে সংস্থাটির পরামর্শ:
- বাড়ির আশপাশে আবর্জনা ও পুরোনো জিনিসপত্রের স্তূপ সরিয়ে ফেলা এবং ঘাস ছোট করে ছেঁটে রাখা, কারণ এসব জায়গায় সাপ লুকিয়ে থাকে।
- রাতে বাইরে চলাফেরার সময় আলো ব্যবহার করা।
- ঘরে সাপ ঢোকার পথ বন্ধ করা; তা সম্ভব না হলে উঁচু বিছানায় ভালোভাবে গুঁজে দেওয়া মশারির ভেতরে ঘুমানো।
- সাপ থাকতে পারে এমন জায়গায় খালি পায়ে না হাঁটা; ডব্লিউএইচওর তথ্যে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কামড় লাগে হাঁটুর নিচে, পায়ে।
ছবি: Rocky Masum / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)