টানা বৃষ্টিতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় ২০২৬ সালের জুলাইয়ে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলায় সাপের উপদ্রব বেড়ে যায়। জাগো নিউজ ২৪ ২২ জুলাই জানায়, বিষধর ও নির্বিষ দুই ধরনের সাপই তখন প্রায় প্রতিদিন ঘরবাড়ি, আঙিনা, ফসলের মাঠ ও বসতবাড়ির আশপাশে দেখা যাচ্ছিল। কোথাও বসতঘরে, কোথাও রান্নাঘরে, কোথাও গোয়ালঘরে সাপ ঢুকে পড়ায় এলাকায় আতঙ্ক ছড়ায়।
রূপগঞ্জ ঢাকা বিভাগের নারায়ণগঞ্জ জেলার একটি উপজেলা, আয়তন ১৭৬.৪৮ বর্গকিলোমিটার। ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী এখানে ৭ লাখ ৪ হাজার ৮৬৯ জন মানুষের বাস। উপজেলায় কাঞ্চন ও তারাবো নামে দুটি পৌরসভা এবং সাতটি ইউনিয়ন রয়েছে; শীতলক্ষ্যা ও বালু নদী এর ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে।
জলাবদ্ধ এলাকায় কেন সাপ বাড়ছিল
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বছরের বেশির ভাগ সময় সাপ লোকালয় থেকে দূরে থাকে এবং সচরাচর চোখে পড়ে না। কিন্তু বর্ষায় টানা বৃষ্টিতে মাঠ ও নিচু জমি পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় সাপ নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে লোকালয়ে উঠে আসছিল। ঝোপঝাড়, পরিত্যক্ত জায়গা, অপরিষ্কার ড্রেন ও জমে থাকা পানি সাপের চলাচল আরও বাড়িয়ে দিচ্ছিল।
ভুক্তভোগীরা জাগো নিউজকে জানান, জলাবদ্ধ এলাকার মধ্যে ছিল কাঞ্চন হাটাবো টেকপাড়া, কালাদি, নলপাথর, নরাবো, কুশাব, বরপা, ভুলতা, গোলাকান্দাইল, তারাবো পৌরসভার তেঁতলাবো, শান্তিনগর ও যাত্রামুড়া এবং রূপসী ও ইসলামপুরসহ আরও অনেক এলাকা।
উপজেলার নিচু এলাকার অনেক বাসিন্দা তখন সন্ধ্যার পর প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হচ্ছিলেন না। অনেক পরিবার রাতে ঘুমানোর আগে পুরো ঘর খুঁজে দেখে তারপর শুতে যাচ্ছিল। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতি বর্ষায় এ সমস্যা প্রকট হয়, কিন্তু সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ তাঁদের চোখে পড়ে না। প্রতিবেদনে এ অভিযোগের বিষয়ে কোনো কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ছিল না।

বাসিন্দারা যা বললেন
তেতলাব খালপার এলাকার আল আমিন শেখ জাগো নিউজকে বলেন, “রাতে দেখি দুটি সাপ বাড়িতে ঢুকতে চেষ্টা করছে। এসময় আমি ‘সাপ সাপ’ বলে চিৎকার করলে আশপাশের সবাই ছুটে আসে। চার হাত লম্বা একটি সাপ মারতে পারলেও অন্যটি চলে যায়।”
শান্তিনগর এলাকার গৃহবধূ আছিয়া আক্তার বলেন, ‘রাতে টয়লেটে যেতেও ভয় লাগে। কয়েক দিন আগে রান্নাঘরে একটি সাপ দেখা যায়। এরপর থেকে সন্তানদের একা কোথাও যেতে দিচ্ছি না।’ তিনি আরও বলেন, ‘আগে বছরে দু-একবার সাপ দেখতাম, এখন প্রায় প্রতিদিনই খবর শুনছি।’
কর্ণগোপ এলাকার বাসিন্দা সেলিম ভূঁইয়া জাগো নিউজকে জানান, ১৭ জুলাই দুপুরে তাঁর ভাগনের বাড়িতে একটি সাপ ঢুকে পড়ে; চিৎকার শুনে প্রতিবেশীরা ছুটে এসে সাড়ে পাঁচ ফুট লম্বা সাপটি মেরে ফেলেন। তাঁর মতে, শুধু বর্ষার পানি নয়, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জলাভূমি ভরাট ও প্রাকৃতিক আবাসস্থল ধ্বংসের কারণেও সাপ বসতির কাছে চলে আসছে, এবং এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা রাখা উচিত।

সাপে কাটলে দেরি নয়, হাসপাতালে যান
রূপগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. তানসিভ জুবায়ের জাগো নিউজকে বলেন, বর্ষায় সাপে কাটার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি থাকে, কিন্তু সচেতনতার অভাবে অনেকে এখনো ঝাড়ফুঁক বা কুসংস্কারের ওপর নির্ভর করেন; এতে হাসপাতালে পৌঁছাতে দেরি হয় এবং রোগীর জীবন ঝুঁকিতে পড়ে। তিনি বলেন, ‘সাপে কাটলে আক্রান্ত ব্যক্তিকে শান্ত রেখে দ্রুত স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে আসতে হবে। হাসপাতালে পর্যাপ্ত অ্যান্টিভেনম রয়েছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকও রয়েছেন। সময়মতো অ্যান্টিভেনম দিলে সাপে কাটা রোগীকে বাঁচানো যায়।’
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, সাপের বিষক্রিয়ার সবচেয়ে কার্যকর চিকিৎসা মানসম্মত অ্যান্টিভেনম, এবং সাপে কাটায় বেশির ভাগ মৃত্যু ও গুরুতর ক্ষতি প্রতিরোধযোগ্য। সংস্থাটির হিসাবে বিশ্বে প্রতিবছর আনুমানিক ৫৪ লাখ মানুষ সাপের দংশনের শিকার হন। বাংলাদেশে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের (এনসিডিসি) ২০২১-২২ সালের জাতীয় জরিপের বরাতে ২০২৩ সালের জুনে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড জানায়, দেশে বছরে প্রায় চার লাখ মানুষ সাপের দংশনের শিকার হন এবং ৭ হাজার ৫১১ জন মারা যান; এসব ঘটনার ৯৫ শতাংশ গ্রামাঞ্চলে।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিনের স্বাস্থ্যতথ্য সেবা মেডলাইনপ্লাসের প্রাথমিক চিকিৎসা নির্দেশনার মূল কথা:
- আক্রান্ত ব্যক্তিকে শান্ত রাখুন এবং যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসা নিন; উপসর্গ দেখা দেওয়ার অপেক্ষা করবেন না।
- আংটি বা আঁটসাঁট কিছু খুলে ফেলুন, কারণ জায়গাটি ফুলে যেতে পারে; আক্রান্ত অঙ্গে ঢিলা করে স্প্লিন্ট দিয়ে নড়াচড়া কমান।
- আক্রান্ত ব্যক্তিকে হাঁটিয়ে ক্লান্ত করবেন না, প্রয়োজনে বহন করে নিন।
- শক্ত বাঁধন (টর্নিকেট) দেবেন না, ক্ষত কাটবেন না, মুখ দিয়ে বিষ চুষে বের করার চেষ্টা করবেন না, বরফ দেবেন না।
- মুখে কিছু খাওয়াবেন না।
- সাপ ধরা বা আটকানোর চেষ্টা করবেন না; নিরাপদ হলে দূর থেকে ছবি তুলে রাখতে পারেন।
সাপে কাটলে ওঝা বা ঝাড়ফুঁকের কাছে সময় নষ্ট না করে নিকটস্থ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বা হাসপাতালে যেতে হবে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলতে হবে।

ছবি: Thomas Jaehnel / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 2.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, মেডলাইনপ্লাস (ইউএস ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিন), উইকিপিডিয়া (রূপগঞ্জ উপজেলা; গোখরা সাপ; ঢোঁড়া সাপ)





মন্তব্য
(০)