চট্টগ্রামের বন্যাকবলিত এলাকায় পানিবাহিত রোগের পাশাপাশি সাপের কামড়ের ঘটনা বেড়েছে। ২০২৬ সালের ১২ জুলাই (রোববার) চট্টগ্রামের জেলা সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম জানান, চলমান বন্যায় জেলায় এ পর্যন্ত সাপের কামড়ে ৭৫ জন আক্রান্ত হয়েছেন। একই সময়ে ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়েছেন আরও ২০ থেকে ২৫ জন। জাগো নিউজ সেদিন এ খবর প্রকাশ করে।
আশ্রয়কেন্দ্র ও বসতঘরে সাপের উপদ্রব
সিভিল সার্জন বলেন, বন্যার কারণে আশ্রয়কেন্দ্র ও বসতবাড়িতে সাপের উপদ্রব বেড়ে যাওয়ায় সাপের কামড়ের ঘটনাও বেড়েছে। এ পর্যন্ত ৭৫ জন আক্রান্তকে শনাক্ত করা হয়েছে, তাঁদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে সাপে কাটা রোগীর চিকিৎসার প্রস্তুতি রাখা হয়েছে।
তিনি জানান, বন্যাদুর্গত এলাকায় স্বাস্থ্য বিভাগের বিশেষ মেডিকেল টিম কাজ করছে। দলগুলো দুর্গত এলাকায় গিয়ে চিকিৎসা দিচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ ও খাবার স্যালাইন বিতরণ করছে। প্লাবিত এলাকায় কোনো অন্তঃসত্ত্বা নারী বা অসুস্থ শিশু থাকলে তাদের দ্রুত নৌকায় করে হাসপাতালে নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
ডা. জাহাঙ্গীর আলমের ভাষ্য, পরিস্থিতি তখনো উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছায়নি। তবে বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর দূষিত পানি, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও স্যানিটেশনের সমস্যায় পানিবাহিত রোগ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে।

চট্টগ্রাম অঞ্চলে বন্যার বিস্তার
দ্য ডেইলি স্টার ২০২৬ সালের ১০ জুলাই জানায়, টানা চার দিনের ভারী বৃষ্টি ও উজানের পাহাড়ি ঢলে দক্ষিণ চট্টগ্রামের সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, বাঁশখালী, চন্দনাইশ, পটিয়া ও বোয়ালখালী উপজেলা প্লাবিত হয়। সাঙ্গু ও ডলু নদীর পানি লোকালয়ে ঢোকে।
১২ জুলাই পত্রিকাটির প্রতিবেদনে বলা হয়, চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার আগের দিন জানিয়েছেন, ভূমিধস, জোয়ারের জলোচ্ছ্বাস ও পানিতে ডুবে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়িতে ৪৩ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছেন আরও ৩৯ জন। এই পাঁচ জেলায় ৮ লাখ ৬৬ হাজারের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হন; খোলা হয় ১ হাজার ৭২৭টি আশ্রয়কেন্দ্র, যেখানে ৩৭ হাজার ৫৫ জন আশ্রয় নেন। সাতকানিয়া উপজেলার ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ এলাকা তখন পানির নিচে ছিল।
বাংলাদেশে সাপের কামড়ের চিত্র
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (ডিজিএইচএস) জাতীয় জরিপের বরাতে ঢাকা ট্রিবিউন ২০২৩ সালে জানায়, দেশে প্রতিবছর ৪ লাখের বেশি মানুষ সাপের কামড়ের শিকার হন এবং অন্তত ৭ হাজার ৫১১ জন মারা যান। আক্রান্তদের ৯৫ শতাংশই গ্রামের মানুষ। সব উপজেলা পর্যায়ের সরকারি হাসপাতালে অ্যান্টিভেনম না থাকায় অনেক রোগীকে শহরের হাসপাতালে যেতে হয়, এতে চিকিৎসায় দেরি হয়।
গ্রামীণ বাংলাদেশে সাপের কামড় নিয়ে ২০১০ সালে পিএলওএস নেগলেক্টেড ট্রপিক্যাল ডিজিজেস সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, অক্টোবর (২২ শতাংশ) ও জুলাই (১৫ শতাংশ) মাসে সবচেয়ে বেশি কামড়ের ঘটনা ঘটে। গবেষকেরা লেখেন, বর্ষার ভরা মৌসুমে রাতের বেলা কালাচ বা ক্রেইট সাপ শিকারের খোঁজে ঘরে ঢোকে, আর দিনের বেলার কামড়ের একটি সাধারণ উৎস গোখরা। ওই গবেষণায় আক্রান্তদের ৮৬ শতাংশ প্রথমে সাপুড়ের কাছে যান; সরাসরি চিকিৎসক বা হাসপাতালে যান মাত্র ৩ শতাংশ।

সাপে কাটলে কী করবেন, কী করবেন না
চট্টগ্রামের স্বাস্থ্য বিভাগ বন্যাদুর্গত এলাকার বাসিন্দাদের রাতে চলাফেরায় সতর্ক থাকতে, পানিতে নামার আগে লাঠি দিয়ে জায়গা পরখ করতে এবং সাপে কাটলে ঝাড়ফুঁক বা অন্য কোনো কারণে দেরি না করে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে যেতে বলে। পাশাপাশি নিরাপদ পানি পান, স্যানিটেশন বজায় রাখা এবং অসুস্থ হলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বলছে, প্রাণঘাতী সাপের কামড়ের সবচেয়ে কার্যকর চিকিৎসা সঠিক অ্যান্টিভেনম, এবং কামড়ের পর যত দ্রুত সম্ভব দিলে এটি সবচেয়ে ভালো কাজ করে, কারণ বিষের অনেক প্রভাব আর ফেরানো যায় না। ডব্লিউএইচও এবং যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিনের মেডলাইনপ্লাসের পরামর্শ:
- আক্রান্ত ব্যক্তিকে শান্ত রাখুন এবং নড়াচড়া যতটা সম্ভব বন্ধ রাখুন।
- কামড়ানো অঙ্গ ফুলে যেতে পারে, তাই আংটি, চুড়ি বা আঁটসাঁট পোশাক খুলে ফেলুন; ঢিলেঢালা স্প্লিন্ট বা কাঠি দিয়ে অঙ্গটি স্থির রাখুন।
- দেরি না করে রোগীকে হাসপাতালে নিন; বহনের সময় কাত করে শুইয়ে রাখলে শ্বাসপথ সুরক্ষিত থাকে।
- শক্ত বাঁধন (টুর্নিকেট) দেবেন না, ক্ষত কাটবেন না, মুখ দিয়ে বিষ চুষে বের করার চেষ্টা করবেন না, বরফ লাগাবেন না।
- রোগীকে মুখে কিছু খেতে দেবেন না এবং সাপ ধরতে যাবেন না।

ছবি: Owais Al Qarni / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, দ্য ডেইলি স্টার, ঢাকা ট্রিবিউন, পিএলওএস নেগলেক্টেড ট্রপিক্যাল ডিজিজেস, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), মেডলাইনপ্লাস, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)