সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ১৬ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা২৬°পরিষ্কার আকাশআর্দ্রতা ৭৩%বাতাস ৩ কিমি/ঘ

অপরিপক্ব ফল সংগ্রহে রাবি প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা, পাকা ফলে হবে মধুফল উৎসব

২০২৬ সালের ২০ এপ্রিলের এক বিজ্ঞপ্তিতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের আম, লিচু, কাঁঠালসহ বিভিন্ন ফল অপরিপক্ব অবস্থায় সংগ্রহে নিষেধাজ্ঞা দেয়; জানায়, পাকা ফল 'মধুফল উৎসব'-এর মাধ্যমে সবার মধ্যে সমানভাবে বণ্টন করা হবে।

অপরিপক্ব ফল সংগ্রহে রাবি প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা, পাকা ফলে হবে মধুফল উৎসব
ফল

জ্যৈষ্ঠ মাসের ফলের মৌসুম সামনে রেখে ২০২৬ সালের এপ্রিলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) প্রশাসন ক্যাম্পাসে অপরিপক্ব ফল সংগ্রহে নিষেধাজ্ঞা দেয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের গাছে ধরা আম, লিচু, কাঁঠালসহ বিভিন্ন ফল কাঁচা অবস্থায় পাড়া যাবে না। বিশ্ববিদ্যালয় জানায়, ফল পাকা পর্যন্ত সুরক্ষিত রাখা হবে এবং পরিপক্ব হলে 'মধুফল উৎসব' আয়োজনের মাধ্যমে তা সবার মধ্যে সমানভাবে বণ্টন করা হবে। সোমবার, ২০ এপ্রিল ২০২৬ বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তরের এক বিজ্ঞপ্তিতে এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়; জাগো নিউজ ২৪ পরদিন ২১ এপ্রিল সন্ধ্যায় খবরটি প্রকাশ করে।

বিজ্ঞপ্তিতে যা বলা হয়


বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও শিক্ষার্থীদের সমন্বিত উদ্যোগে একটি সক্রিয় উচ্চতর কমিটি গঠন করা হবে। পরে নির্ধারিত তারিখে গাছ থেকে পরিপক্ব ফল সংগ্রহ করে বিশেষ বুথ স্থাপনের মাধ্যমে সবার জন্য সুষ্ঠু বণ্টনের ব্যবস্থা করা হবে। এজন্য সব শিক্ষার্থী এবং প্রতিষ্ঠান-সংশ্লিষ্ট সবাইকে অপরিপক্ব ফল নষ্ট না করতে এবং নিজ উদ্যোগে ফল সংগ্রহ না করতে অনুরোধ জানানো হয়।

বিজ্ঞপ্তিতে উৎসবের নির্দিষ্ট কোনো তারিখ দেওয়া হয়নি; উৎসবকে বাঁধা হয়েছিল ফল পাকার সময়ের সঙ্গে, আর বিজ্ঞপ্তির সময়টিই এর কারণ বুঝিয়ে দেয়। বিজ্ঞপ্তিটি আসে বৈশাখে, যা বাংলা বছরের এবং বাংলা গ্রীষ্মের প্রথম মাস। বিশ্ববিদ্যালয় যে জ্যৈষ্ঠ মাসের কথা বলেছে, তা আসে এর পরে। বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া গ্রীষ্ম ঋতুকে বৈশাখ ও জ্যৈষ্ঠ, এই দুই মাস হিসেবে বর্ণনা করেছে, যার বিস্তার মধ্য এপ্রিল থেকে মধ্য জুন। এপ্রিলের শেষ দিকে রাজশাহীর গাছের বেশির ভাগ ফল তখনও ছোট ও সবুজ ছিল।

নিষেধাজ্ঞাটি কেবল ক্যাম্পাসের গাছের ফলের জন্য। রাজশাহী জেলার বাগান ও বাজারের সঙ্গে এর সম্পর্ক ছিল না; সেগুলো নিজস্ব সংগ্রহ-ব্যবস্থা মেনে চলে। প্রকাশিত খবর অনুযায়ী বিজ্ঞপ্তিতে কোনো জরিমানা বা শাস্তির কথাও ছিল না। এটি ছিল একটি পরিকল্পনাসহ অনুরোধ: ফল পাকা পর্যন্ত গাছেই থাকুক, তারপর সবাই মিলে ভাগ করে নেওয়া হবে।

মধুফল উৎসবের পরিকল্পনা


উৎসবের বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র উপদেষ্টা ড. আমিরুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের গাছগুলোতে প্রায়ই বিশৃঙ্খলার মাধ্যমে ফল নষ্ট হতে দেখা যায়। এ উৎসবের মাধ্যমে যেমন সবাই মধুফল খেয়ে মিষ্টিমুখ করতে পারবে, তেমনি ক্যাম্পাসে একটি উৎসবমুখর পরিবেশও সৃষ্টি হবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, শিক্ষার্থীরা যদি সহযোগিতা করে এবং ফলগুলো নষ্ট না করে, তাহলে এই উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।

ছাত্র উপদেষ্টা আরও বলেন, আয়োজনটি হলভিত্তিক করা যেতে পারে। প্রতিটি আবাসিক হলে প্যান্ডেল করে বুথের মাধ্যমে ফল পরিবেশনের পরিকল্পনাও রয়েছে। তাঁর মতে, এ উৎসবের মাধ্যমে যেমন সারা দেশে সাড়া ফেলা সম্ভব, তেমনি শিক্ষার্থীদের মধ্যেও শৃঙ্খলা ফিরে আসবে।

ততদিন ফল সংরক্ষণের বিষয়ে তিনি জানান, সতর্কতার জন্য মাইকিং করা হবে। পাশাপাশি যেসব গাছ ইজারা (টেন্ডার) দেওয়া আছে সেগুলো আলাদা করে চিহ্নিত করা হবে এবং শিক্ষার্থীদের জন্য উন্মুক্ত গাছগুলোর একটি তালিকা প্রস্তুত করা হবে। মৌসুমের জন্য ফলের গাছ ইজারা দেওয়া রাজশাহী অঞ্চলে একটি প্রচলিত রীতি: ২০২৫ সালের জুনে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের এক প্রতিবেদনে চাঁপাইনবাবগঞ্জের এক ব্যবসায়ীর কথা বলা হয়, যিনি ৮০০টির বেশি আমগাছ ইজারা নিয়েছিলেন।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. ফরিদুল ইসলাম বলেন, জ্যৈষ্ঠ মাসে ফল দেয় এমন গাছের সংখ্যা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক। পরিপক্ব ফল দিয়েই এ উৎসব আয়োজন করা হবে। কাঁচা অবস্থায় ফল নষ্ট হওয়া রোধ করতেই এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

মতিহারের সবুজ ক্যাম্পাস


বাংলাপিডিয়ার ভাষায়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিশ্ববিদ্যালয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় আইন ১৯৫৩ গেজেট আকারে প্রকাশিত হয় ১৯৫৩ সালের ১৬ জুন, আর রাজশাহী কলেজের তৎকালীন অধ্যক্ষ ড. ইতরাত হোসেন জুবেরী হন এর প্রথম উপাচার্য। শুরুতে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ চলত শহরের বিভিন্ন ভবনে, যার মধ্যে ছিল সার্কিট হাউস ও ওলন্দাজ আমলের বড়কুঠি। বর্তমান ক্যাম্পাস শহর থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার দূরে মতিহারে, এ জন্য অধিগ্রহণ করা ২৯৮.২ হেক্টর জমিতে। স্থপতি জন এ জোমানেকের নকশা করা মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী সেখানে নির্মাণকাজ শুরু হয় ১৯৫৮ সালে, আর সব দপ্তর ও শিক্ষা ইউনিটের জন্য প্রথম পর্যায়ের কাজ শেষ হয় ১৯৬৪ সালে। বিশ্ববিদ্যালয়টি এখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় আইন ১৯৭৩ অনুযায়ী পরিচালিত হয়।

বাংলাপিডিয়ার হিসাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ১,১৫০ জন শিক্ষক ও ৩৮,২৯১ জন শিক্ষার্থী রয়েছেন, আর ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষে নয়টি অনুষদে বিভাগ ছিল ৫৯টি। ২০০০ সালে একটি স্থানীয় কৃষি কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্ভুক্ত হলে কৃষি অনুষদ গঠিত হয়; এর বিভাগগুলো কৃষি অনুষদ ভবনে, আর ব্যবহারিক কাজ হয় নারিকেলবাড়িয়া ক্যাম্পাসে।

সবুজের জন্য ক্যাম্পাসটির খ্যাতি আছে। এর সবচেয়ে পরিচিত সড়ক প্যারিস রোড জুবেরী ভবনের কাছ থেকে পূর্ব দিকে আমবাগান, কাজলা পুকুর ও উপাচার্যের বাসভবনের পাশ দিয়ে এগিয়ে গেছে। ক্যাম্পাসের পূর্ব প্রান্তে আছে মতিহার উদ্যান নামের একটি কৃত্রিম বন, আর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় বোটানিক্যাল গার্ডেনে আছে কিছু দুর্লভ প্রজাতির গাছ ও উদ্ভিদ। ক্যাম্পাসে দুটি বড় লেক ও প্রায় পঞ্চাশটি পুকুর রয়েছে, আর প্রাণিবিদ্যা বিভাগ পরিচালনা করে 'জাঙ্গল জিনোম প্রজেক্ট' নামের একটি পাখির অভয়ারণ্য।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের প্যারিস রোড, ছবিটি ২০১৩ সালের মার্চে তোলা। ছবি: Grambangla / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের প্যারিস রোড, ছবিটি ২০১৩ সালের মার্চে তোলা। ছবি: Grambangla / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

জ্যৈষ্ঠ, ফলের মধুমাস


'মধুফল' মানে মধুর মতো মিষ্টি ফল, আর এ ফলের মৌসুমকে বাংলায় বলা হয় মধুমাস। বাংলাপিডিয়ার 'ফল' ভুক্তিতে বলা হয়েছে, দেশের অধিকাংশ ফলেরই উৎপাদন হয় মধুমাসে, আর মধুমাসে উৎপাদিত ফলগুলোর মধ্যে আম, কাঁঠাল, লিচু ও আনারস অন্যতম। একই সূত্রে মে, জুন ও জুলাইকে দেশের ফল উৎসবের মাস বলা হয়েছে, যখন প্রায় সব প্রধান ও অপ্রধান ফল পরিপক্ব হয়ে বাজারে আসে।

বাংলাদেশে ফলের উৎপাদন মৌসুমভিত্তিক। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ় ও শ্রাবণ, এই চার মাসে দেশের মোট ফল উৎপাদনের শতকরা ৫৪ ভাগ উৎপাদিত ও বাজারজাত হয়, বাকি শতকরা ৪৬ ভাগ হয় অবশিষ্ট আট মাসে। দেশে সাধারণত ৯টি প্রধান ও ৪৮টি অপ্রধান ফল উৎপাদিত হয়; প্রধান ফলগুলোর মধ্যে আম, কলা, কাঁঠাল, আনারস, পেঁপে, লিচু ও কুল ফল চাষের প্রায় শতকরা ৭৯ ভাগ জমি দখল করে আছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞপ্তি ছোট পরিসরে যে অপচয় ঠেকাতে চেয়েছিল, একই ভুক্তি তার বড় চিত্রও দেখায়। সেখানে বলা হয়েছে, উপযুক্ত সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের অভাবে শতকরা প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ ভাগ ফল পচে নষ্ট হয়ে যায়। সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য দৈনিক মাথাপিছু কমপক্ষে ৮৫ গ্রাম ফল খাওয়া প্রয়োজন, অথচ দেশে দৈনিক গড় প্রাপ্যতা মাত্র ৩৫ গ্রাম; এর বণ্টনও সুষম নয়, গরিবদের অনেকেই তা পায় না। কাঁচা অবস্থায় নষ্ট হওয়া ফল কারও কাছেই পৌঁছায় না।

আম, রাজশাহীর পরিচয়ের ফল


বাংলাপিডিয়ার তথ্যমতে, আম (Mangifera indica) বাংলাদেশ, আসাম ও মিয়ানমারসহ ভারতীয় উপমহাদেশের পূর্বাঞ্চলের স্থানীয় ফল বলে মনে করা হয়। এ দেশের আম মূলত দুই ধরনের: জোড়কলম ও অন্যান্য অঙ্গজ পদ্ধতিতে বংশবিস্তার করা উন্নত বা অভিজাত জাত, আর বীজের চারা থেকে জন্মানো স্থানীয় 'দেশি' বা 'গুটি' আম। উন্নত জাতের বেশির ভাগ জন্মে রাজশাহী, নবাবগঞ্জ (বর্তমান চাঁপাইনবাবগঞ্জ) ও দিনাজপুরে; এর মধ্যে আছে ফজলি, ল্যাংড়া, গোপালভোগ, হিমসাগর, ক্ষীরসাপাত, আশ্বিনা, কিষানভোগ, লক্ষ্মণভোগ ও মোহনভোগ। দেশে প্রায় ১০০ রকমের আমের জাত পাওয়া যায়। জোড়কলমের গাছে সাধারণত রোপণের চতুর্থ বছরে প্রথম ফল আসে এবং প্রায় ৪৫তম বছর পর্যন্ত ফলন থাকে; বীজের চারার গাছ ৬০ বছর বা তারও বেশি সময় ফল দিতে পারে।

গাছের প্রতিটি ফল আসলে দীর্ঘ বাছাইয়ের পর টিকে থাকা ফল। বাংলাপিডিয়া জানায়, আমের একটি মঞ্জরিতে ১০০ থেকে ২৫০টি মুকুল থাকতে পারে, কিন্তু প্রায় এক হাজার মুকুলের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ ফলে রূপ নেয় মাত্র এক-দুটি; একটি মঞ্জরিতে দুই বা তিনটি ফল হলেই ফলন সন্তোষজনক ধরা হয়। এই জ্ঞানকোষের হিসাবে ২০০৫-০৬ সালে দেশে প্রায় ৬ লাখ ৪১ হাজার ৫২৫ একর জমি থেকে প্রায় ৬ লাখ ৩৯ হাজার ৮২০ টন আম উৎপাদিত হয়েছিল। কম ফলনের কারণ হিসেবে এতে বলা হয়েছে পুরোনো অনুৎপাদনশীল গাছ, পরিচর্যার অভাব, পোকামাকড় ও রোগের আক্রমণ এবং ফলবান গাছ কেটে ফেলার কথা। বাংলাদেশে প্রায় তিন ডজন পোকা আমগাছ আক্রমণ করে, যার মধ্যে আছে আমের হপার পোকা, আঁটির পোকা (উইভিল) ও ফলের মাছি; আক্রান্ত ফল আগেভাগে ঝরে পড়ে বা খাওয়ার অনুপযোগী হয়ে যায়। লিচুর ক্ষেত্রে বাংলাপিডিয়া লিচুর মাকড় ও ফল ছিদ্রকারী পোকাকে সবচেয়ে মারাত্মক বালাই বলেছে।

এ অঞ্চলে আমের ইতিহাসও দীর্ঘ। বাংলাপিডিয়া লিখেছে, ৬৩২ থেকে ৬৪৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ভারত ভ্রমণে আসা চীনা পর্যটক হিউয়েন সাং-ই আমকে প্রথম বহির্বিশ্বে পরিচিত করান বলে ধারণা করা হয়, আর মুগল সম্রাট আকবর দারভাঙ্গার কাছে প্রায় এক লাখ আমগাছ লাগিয়ে যে বাগান গড়েছিলেন, সেটিকে উপমহাদেশের প্রথম সুসংগঠিত আমবাগান বলে মনে করা হয়।

২০১০ সালের ১৫ নভেম্বর মন্ত্রিসভা আমগাছকে বাংলাদেশের জাতীয় বৃক্ষ ঘোষণা করে। বিডিনিউজ২৪ ডটকমের সেদিনের খবরে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিবের বরাতে বলা হয়, দেশের কোনো জাতীয় বৃক্ষ ছিল না, তাই আমগাছকে জাতীয় বৃক্ষ ঘোষণা করা হলো।

আমের বাণিজ্যে রাজশাহীর অবস্থান বড়। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ২০২৫ সালের জুনে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তথ্য উদ্ধৃত করে জানায়, রাজশাহীতে ১৯,৬০০ হেক্টর জমিতে প্রায় ৩৩ লাখ ৬৪ হাজার আমগাছ রয়েছে, হেক্টরপ্রতি প্রত্যাশিত ফলন ১৩ টনের বেশি, আর রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের সম্ভাব্য উৎপাদন ২ লাখ ৪৫ হাজার টন। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের আমের মোটামুটি ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ আসে রাজশাহী থেকে, আর রাজশাহী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির হিসাবে অঞ্চলের আম বাণিজ্যের বাজারমূল্য প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা। পুঠিয়া উপজেলার বানেশ্বর এ অঞ্চলের সবচেয়ে বড় আমের হাট।

২০২৫ সালের ওই প্রতিবেদনে রাজশাহীর আম মৌসুমের ধারাও তুলে ধরা হয়: ফেব্রুয়ারির শেষ থেকে মার্চ পর্যন্ত মুকুল, এপ্রিলে গুটি ধরা, মে মাসে ব্যাগিং ও পরিচর্যা, আর মে মাসের শেষ থেকে আগস্ট পর্যন্ত সংগ্রহ। সে বছর গোপালভোগ বাজারে আসে ২২ মে থেকে, রানীপছন্দ ও লক্ষ্মণা ২৫ মে থেকে, ক্ষীরসাপাত (হিমসাগর) ৩০ মে থেকে এবং ল্যাংড়া জুনের মাঝামাঝি থেকে; এরপর আসে ফজলি, বারি-৪, আশ্বিনা, গৌড়মতি ও ইলামতির মতো নাবি জাত। এই হিসাবে এপ্রিলে বিজ্ঞপ্তি দেওয়ার সময় ক্যাম্পাসের আম পাকতে তখনও কয়েক সপ্তাহ বাকি ছিল।

এ অঞ্চলে আম নিয়ে গবেষণারও একটি কেন্দ্র আছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) তাদের উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের অধীনে ১৯৮৫ সালে নবাবগঞ্জে আম গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করে; বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী সেখানে প্রায় ৬৫টি জাতের ৩০০টির বেশি আমগাছ রয়েছে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠে একটি আমগাছ, ছবিটি ২০১৭ সালের নভেম্বরে তোলা। ছবি: Kritzolina / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠে একটি আমগাছ, ছবিটি ২০১৭ সালের নভেম্বরে তোলা। ছবি: Kritzolina / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

ফল কেন পেকে তবেই পাড়া উচিত


আম কখন পাড়ার উপযোগী হয়, ফলবিজ্ঞানীরা তার স্পষ্ট লক্ষণ বর্ণনা করেছেন। উদ্ভিদবিজ্ঞানী জুলিয়া এফ. মর্টন তাঁর 'ফ্রুটস অব ওয়ার্ম ক্লাইমেটস' (১৯৮৭) গ্রন্থে, যা যুক্তরাষ্ট্রের পারডিউ বিশ্ববিদ্যালয় অনলাইনে প্রকাশ করেছে, লিখেছেন যে মুকুল আসার চার থেকে পাঁচ মাস পর আম সাধারণত পরিপক্ব হয়। তাঁর ভাষায়, আম পূর্ণ আকার পেয়ে পাড়ার উপযোগী হলে হালকা টানেই বোঁটা সহজে ভেঙে যায়; আর জোরে টানতে হলে বুঝতে হবে ফলটি এখনও কিছুটা অপরিপক্ব, তা পাড়া উচিত নয়।

অযত্নে পাড়লে ফল কীভাবে নষ্ট হয়, মর্টন তাও লিখেছেন। মাটিতে পড়লে আম থেঁতলে যায় এবং পরে পচে, তাই লম্বা লাঠির মাথায় থলে লাগিয়ে আম পাড়া হয়। কেটে পাড়ার সময় প্রায় ১০ সেন্টিমিটার বোঁটা রাখা ভালো, যাতে দুধের মতো কষ ছিটকে না বেরোয়; কারণ বোঁটা থেকে চুইয়ে পড়া কষ খোসা পুড়িয়ে কালো দাগ ফেলে, যা থেকে পচন ধরে। আগেভাগে পাড়া আম ঠিকমতো পাকেও না: মর্টন উল্লেখ করেছেন, রং ধরাতে যে আমে ৪৮ ঘণ্টার বেশি ইথিলিন প্রয়োগ লাগে, সেটি অপরিপক্ব অবস্থায় পাড়া হয়েছে এবং বাজারের উপযোগী নয়।

আগাম ক্ষতির একটি প্রাকৃতিক কারণের কথাও বাংলাপিডিয়ায় আছে। ফল বড় হওয়ার সময় হালকা বৃষ্টি উপকারী, কিন্তু ঝড়, বিশেষ করে শিলাবৃষ্টিতে প্রায়ই অপরিপক্ব আম ঝরে পড়ে। ক্যাম্পাসে হাতে টেনে কাঁচা ফল পাড়া সেই ক্ষতির সঙ্গে যোগ হয়; ছাত্র উপদেষ্টা বিশৃঙ্খলভাবে ফল নষ্ট হওয়ার যে কথা বলেছেন, তা এই অপচয়েরই চিত্র।

এ অঞ্চলে অপরিপক্ব আম পাড়ার একটি বাণিজ্যিক দিকও আছে, যদিও রাবির বিজ্ঞপ্তি সে বিষয়ে ছিল না। ২০১৬ সালের মে মাসে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের জেলা প্রশাসন প্রাকৃতিকভাবে পাকার সময় দিতে ২৫ মে পর্যন্ত আম পাড়া ও বাজারজাতকরণ নিষিদ্ধ করে বলে বাসসের বরাতে প্রথম আলো জানায়। কারণ হিসেবে বলা হয় ক্ষতিকর রাসায়নিক দিয়ে অপরিপক্ব আম কৃত্রিমভাবে পাকানোর কথা; রাজশাহী জেলায় প্রায় ৮০০ কেজি কার্বাইড মেশানো আম ধ্বংস করা হয়েছিল, আর ট্রাক ও বাস মালিকদের ওই সময়ে আম পরিবহন না করতে বলা হয়। একই মাসে দ্য ডেইলি স্টার জানায়, নাটোরে ২৫০ কেজি আমে কার্বাইড দেওয়ার দায়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত এক ব্যবসায়ীকে এক লাখ টাকা জরিমানা করেছেন, এবং নাটোরের জেলা প্রশাসক বলেছেন, ল্যাংড়া ১৫ জুনের আগে এবং ক্ষীরসা ১২ জুনের আগে পাড়া যাবে না।

লিচু ও কাঁঠাল, ক্যাম্পাসের আরও দুই ফল


বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী লিচুর (Litchi chinensis) আদি নিবাস চীন; সতেরো শতকের শেষ দিকে এটি বার্মা ও ভারতে পৌঁছায়। বাংলাদেশের সব জেলায় লিচু জন্মাতে পারে, তবে প্রধানত চাষ হয় রাজশাহী, রংপুর, দিনাজপুর, যশোর, কুষ্টিয়া, ময়মনসিংহ ও নারায়ণগঞ্জে; দেশের গাছের ফলের মধ্যে উৎপাদনে আমের পরেই লিচুর স্থান। বাংলাদেশে লিচুর নামকরা কোনো নির্দিষ্ট জাত নেই, তবে দেশি ও বোম্বাই, এই দুই প্রধান ধরনের মধ্যে বাণিজ্যিক গুণসম্পন্ন অনেক স্থানীয় নির্বাচিত গাছ আছে। লিচুর খাওয়ার উপযোগী অংশ ফলের ওজনের ৫০ থেকে ৭৫ শতাংশ।

বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ডিএইর তথ্য উদ্ধৃত করে জানায়, রাজশাহী অঞ্চলের চার জেলায় ১,৭০১ হেক্টর জমিতে লিচুর চাষ হচ্ছে, যার ৫২৮ হেক্টর রাজশাহী জেলায়। ফেব্রুয়ারির শুরুতে গাছে মুকুল আসে, আর মে মাসের শেষ বা জুনের প্রথম সপ্তাহে ফল বাজারে যাওয়ার উপযোগী হয়। ডিএই রাজশাহী অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক ড. আজিজুর রহমান বলেন, স্বাদ ও ঘ্রাণের জন্য রাজশাহীর লিচুর সুনাম আছে, আবহাওয়া অনুকূল থাকলে এবার বাম্পার ফলনের আশা করা হচ্ছে। চাষিরা বাসসকে জানান, ২০২৪ সালের খরা ও ২০২৫ সালের ভারী বৃষ্টিতে তাঁদের ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।

পাড়ার পর লিচু বেশিদিন ভালো থাকে না। মর্টন লিখেছেন, ঘরে খাওয়া বা স্থানীয় বাজারের জন্য লিচু পুরো রং ধরলে তবেই পাড়া হয়; তাজা রাখতে থোকাগুলো কিছুটা ডাল ও কয়েকটি পাতাসহ কেটে নেওয়া হয়; আর সদ্য পাড়া লিচু সাধারণ তাপমাত্রায় মাত্র তিন থেকে পাঁচ দিন রং ও মান ধরে রাখে। একটি একটি করে টেনে ছিঁড়লে খোসা ফেটে যায় এবং লিচু দ্রুত নষ্ট হয়।

রাজশাহীর লিচু, ছবিটি ২০১১ সালের জুনে তোলা। ছবি: Nakib Ahmed / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 3.0)
রাজশাহীর লিচু, ছবিটি ২০১১ সালের জুনে তোলা। ছবি: Nakib Ahmed / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 3.0)

কাঁঠাল (Artocarpus heterophyllus) বাংলাদেশের জাতীয় ফল। বাংলাপিডিয়া বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০০০-২০০৭ সালের তথ্য উদ্ধৃত করে জানায়, দেশে ২৫,১১০ হেক্টর জমিতে কাঁঠালের চাষ হয় এবং বছরে উৎপাদন ৪ লাখ ৬৯ হাজার ৫০০ টন, যা দেশের মোট ফল উৎপাদনের প্রায় ২২ শতাংশ; জমির দিক থেকে ফলের মধ্যে এর স্থান তৃতীয়, উৎপাদনে দ্বিতীয়। খাওয়ার উপযোগী ফলের মধ্যে এটি অন্যতম বৃহৎ, আর এর সংগ্রহের সময় জুন থেকে সেপ্টেম্বর। আম ও লিচুর সঙ্গে পার্থক্য হলো, কাঁচা কাঁঠালেরও নিজস্ব ব্যবহার আছে: অপরিপক্ব কাঁঠালের শাঁস সবজি হিসেবে রান্না করা হয়, আর পাকা কাঁঠাল তাজা খাওয়া হয়।

গাছে ঝুলছে বাংলাদেশের জাতীয় ফল কাঁঠাল, ছবিটি ২০১১ সালের এপ্রিলে তোলা। ছবি: Balaram Mahalder / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
গাছে ঝুলছে বাংলাদেশের জাতীয় ফল কাঁঠাল, ছবিটি ২০১১ সালের এপ্রিলে তোলা। ছবি: Balaram Mahalder / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)

ছবি: Tanvir Rahat / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বাংলাপিডিয়া (এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ), দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), প্রথম আলো, দ্য ডেইলি স্টার, বিডিনিউজ২৪ ডটকম, জুলিয়া এফ. মর্টন, ফ্রুটস অব ওয়ার্ম ক্লাইমেটস (পারডিউ বিশ্ববিদ্যালয়), উইকিপিডিয়া (রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়)

অনলাইন ডেস্কদা এগ্রো নিউজ

ফল

সম্পর্কিত খবর

ফল

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি চারটি তাজা আপেলের একটি যায় বিদেশে, রপ্তানি আয় রেকর্ড

২০২৫/২৬ বিপণন বছরে যুক্তরাষ্ট্র ১৮৭ কোটি পাউন্ড তাজা আপেল রপ্তানি করেছে, যা মোট তাজা উৎপাদনের প্রায় ২৬ শতাংশ। রপ্তানি আয় রেকর্ড ১১৬ কোটি ডলারে পৌঁছেছে; বড় ক্রেতা মেক্সিকো ও কানাডা।

ers_usda১৬ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া
ফল

রাজবাড়ীর বাজিতপুরে দুই একরে চার হাজার ড্রাগন গাছ, দিনে উঠছে ৫০ মণ ফল

রাজবাড়ী সদরের বসন্তপুর ইউনিয়নের বাজিতপুরে জেলার সবচেয়ে বড় ড্রাগন বাগানে গাছপ্রতি ১০-১২ কেজি ফল ধরেছে; ভরা মৌসুমে দিনে প্রায় দুই হাজার কেজি ফল উঠছে, পাইকারি দর কেজি ১৫০ টাকা।

ঢাকা মেইল১৫ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া
ফল

আপেলগাছের গোড়ায় লালচে গুঁড়া? সতর্ক করছে বিরল কাণ্ড ছিদ্রকারী পোকা

কানাডার ম্যানিটোবার কৃষি বিভাগ ফলচাষিদের রাউন্ডহেডেড অ্যাপল ট্রি বোরার নিয়ে সতর্ক থাকতে বলছে। এই লম্বা-শুঙ্গ গুবরে পোকার কীড়া জীবন্ত আপেল ও সাস্কাটুন গাছের ভেতরে তিন বছর পর্যন্ত সুড়ঙ্গ কাটে; কাণ্ডের গোড়ায় লালচে গুঁড়াই সবচেয়ে স্পষ্ট লক্ষণ।

Manitoba Co-operator১৫ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)