পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলা পরিষদ চত্বরে মা কুকুরের অজ্ঞাতে আটটি ছানাকে বস্তায় ভরে পুকুরে ডুবিয়ে হত্যার ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি আইনে ব্যবস্থা নিতে ২০২৫ সালের ২ ডিসেম্বর, মঙ্গলবার সংশ্লিষ্টদের প্রতি লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো হয়। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার সজীব মাহমুদ আলম এই নোটিশ পাঠান। নোটিশে ঈশ্বরদী উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) ও উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাকে বিবাদী করা হয়েছে বলে সেদিন সন্ধ্যায় জাগো নিউজ ২৪ জানায়।
আইনজীবী সজীব মাহমুদ আলম বলেন, আটটি ছানাকে বস্তায় ভরে পুকুরে ডুবিয়ে হত্যার ঘটনায় অপরাধীদের বিরুদ্ধে তখনো কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, সে কারণেই তিনি লিগ্যাল নোটিশ পাঠিয়েছেন। এর আগের দিন, ১ ডিসেম্বর সোমবার সকালে ছানাগুলোকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। ঘটনার ছবি দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয় এবং জড়িতদের আইনের আওতায় এনে শাস্তির দাবি ওঠে।
লিগ্যাল নোটিশে কী চাওয়া হয়েছে
জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নোটিশটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদ্দেশে পাঠানো হয় এবং এতে ছানাগুলো হত্যার জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি আইনে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়। নোটিশের দুই বিবাদী এ ঘটনার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত দুই কর্মকর্তা: ইউএনও, যাঁর প্রশাসনের দপ্তর সেই পরিষদ চত্বরেই, যেখানে ছানাগুলো মারা যায়; এবং উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা, যাঁর দপ্তর মা কুকুরটির চিকিৎসা দিয়েছিল এবং বিষয়টি পুলিশকে জানিয়েছিল। জবাব দেওয়ার জন্য নোটিশে কোনো সময়সীমা দেওয়া হয়েছিল কি না, ২ ডিসেম্বরের প্রতিবেদনে তা উল্লেখ নেই।
প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাকে বিবাদী করার পেছনে বাংলাদেশে প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতার মামলা আদালতে পৌঁছানোর নিয়মটি গুরুত্বপূর্ণ। প্রাণিকল্যাণ আইন, ২০১৯ অনুযায়ী, ‘কর্তৃপক্ষ’-এর লিখিত অভিযোগ ছাড়া কোনো আদালত এই আইনের অধীন অপরাধ বিচারার্থে গ্রহণ করবেন না। আইনে ‘কর্তৃপক্ষ’ বলতে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বা তাঁর কাছ থেকে ক্ষমতাপ্রাপ্ত ওই অধিদপ্তরের কোনো ভেটেরিনারি সার্জনকে বোঝানো হয়েছে। ১ ডিসেম্বর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আকলিমা খাতুন জাগো নিউজকে বলেছিলেন, তিনি নিজে মামলা করতে পারেন কি না তা তাঁর জানা নেই, তবে করা গেলে অবশ্যই করবেন।
নোটিশ পাঠানোর সময় আইনজীবীর বক্তব্য ছিল, কাউকে জবাবদিহির আওতায় আনতে তখনো কিছুই করা হয়নি। তবে এর মধ্যেই প্রতিবেদনে উল্লিখিত পরিবারের বিরুদ্ধে উপজেলা প্রশাসন একটি পদক্ষেপ নিয়েছিল: তাদের সরকারি বাসা ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়, যার বিবরণ নিচে দেওয়া হলো।
উপজেলা পরিষদ চত্বরে যা ঘটেছিল
১ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় প্রকাশিত জাগো নিউজের ঈশ্বরদী প্রতিনিধির প্রতিবেদন অনুযায়ী, উপজেলা পরিষদের একটি আবাসিক ভবনে একটি মা কুকুর সম্প্রতি আটটি ছানা প্রসব করে। স্থানীয় লোকজন ও উপজেলা প্রশাসন সূত্রের বরাতে ২ ডিসেম্বর প্রথম আলো জানায়, প্রায় এক সপ্তাহ আগে প্রতিবেদনে উল্লিখিত কর্মকর্তার সরকারি বাসভবনের আঙিনায় কুকুরটি ছানাগুলোর জন্ম দেয়।
ইউএনওর বাসভবনের এক কেয়ারটেকার জাগো নিউজকে জানান, ৩০ নভেম্বর রোববার সন্ধ্যার পর ছানাগুলোকে দেখতে না পেয়ে মা কুকুরটি হন্যে হয়ে এদিক-সেদিক খুঁজতে থাকে এবং জোরে জোরে কাঁদতে থাকে। সারা রাত কুকুরটিকে অফিসার্স ক্লাব এবং আবাসিক এলাকার বিভিন্ন বাসার দরজায় দরজায় ঘুরতে দেখা যায়। এ সময় তাকে খাবার দেওয়া হলেও সে কিছু খায়নি।
১ ডিসেম্বর সোমবার সকালে উপজেলা পরিষদের পুকুরপাড় থেকে বস্তাবন্দি ছানাগুলো উদ্ধার করা হয়। কেয়ারটেকারের ভাষ্য, বস্তাটি পুকুরে ভাসছিল; তুলে এনে বস্তার মুখ খুলে দেখা যায়, ভেতরের ছানাগুলো মারা গেছে। প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বেলা সাড়ে ১১টার দিকে পুকুরে একটি বস্তা ভাসতে দেখা যায় এবং সেটির ভেতরে আটটি মৃত কুকুরছানা পাওয়া যায়।
জাগো নিউজ জানায়, উপজেলা পরিষদের আবাসিক ভবনে বসবাসরত ক্ষুদ্র কৃষক ফাউন্ডেশনের এক কর্মকর্তার স্ত্রী ছানাগুলোকে বস্তায় ভরে পুকুরে ফেলে দেন। প্রতিবেদনে ওই কর্মকর্তার নাম হাসানুর রহমান নয়ন এবং তাঁর স্ত্রীর নাম নিশি বেগম বলা হয়েছে; ২ ডিসেম্বরের প্রতিবেদনের একটি অনুচ্ছেদে তাঁর নাম নিশি খাতুন লেখা হয়েছে। এটি প্রতিবেদনগুলোর বিবরণ; নোটিশ পাঠানোর সময় পর্যন্ত কোনো আদালত অভিযোগটি পরীক্ষা করেননি।
জাগো নিউজ জানায়, বক্তব্য জানতে অভিযুক্ত নারীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। তবে তাঁর স্বামীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেন এবং বলেন, এ ঘটনায় তিনি মানসিকভাবে চরম বিপর্যস্ত, এর বেশি কিছু বলতে পারছেন না। ২ ডিসেম্বর প্রথম আলোর কাছে ওই কর্মকর্তা, যাঁর নাম পত্রিকাটি হাসানুল রহমান লিখেছে, দুঃখ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, সন্তানদের নিরাপত্তার কথা ভেবে তাঁর স্ত্রী ছানাগুলোকে সরিয়ে দিতে বলেছিলেন; কিন্তু সেগুলো যে মারা যাবে, তা তিনি ভাবেননি। এ ঘটনায় তিনি লজ্জিত ও দুঃখিত।
প্রথম আলো জানায়, ২ ডিসেম্বরও মা কুকুরটিকে আর্তনাদ করতে দেখা যায়। সকাল থেকে সেটি উপজেলা পরিষদের দ্বিতীয় তলায় ইউএনওর কক্ষের সামনে ঘোরাঘুরি করছিল; কয়েকজন কর্মচারী সরানোর চেষ্টা করেও পারেননি। দুপুর ১২টার দিকে কয়েকজন আদর করে কুকুরটিকে নিচে নামান, তবে বিকেল পর্যন্ত সেটিকে পরিষদের আশপাশে ঘুরতে দেখা যায়। উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ১ ডিসেম্বর জাগো নিউজকে বলেন, মা কুকুরটি এরই মধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়েছে এবং তাঁর দপ্তরের লোকজন তাকে চিকিৎসা দিয়েছেন।

উপজেলা প্রশাসনের পদক্ষেপ
১ ডিসেম্বর ঈশ্বরদীর ইউএনও জাগো নিউজকে বলেন, পরিষদ চত্বরে সংঘটিত এ ঘটনায় তিনি চরমভাবে মর্মাহত। সেদিন সকালে পরিষদে অফিসারদের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা হয়েছে, তদন্ত চলছে এবং দোষীর বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।
পরদিন সকালে উপজেলা প্রশাসন ওই কর্মকর্তাকে সরকারি বাসা ছাড়ার নির্দেশ দেয়। ইউএনও প্রথম আলোকে বলেন, ছানাগুলোকে এভাবে হত্যা করা চরম অমানবিক ও নিষ্ঠুর কাজ; শাস্তিস্বরূপ অভিযুক্ত কর্মকর্তাকে এক দিনের মধ্যে সরকারি কোয়ার্টার ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জাগো নিউজ জানায়, উপজেলা প্রশাসন ওই কর্মকর্তা ও তাঁর স্ত্রীকে আবাসিক ভবন ছেড়ে দেওয়ার নোটিশ দেয় এবং নোটিশ পেয়ে ২ ডিসেম্বর মঙ্গলবার তাঁরা উপজেলা পরিষদের আবাসিক ভবন ছেড়ে যান।
ঈশ্বরদীর একজন সাবেক ইউএনওও ঘটনার প্রতিবাদ জানান। প্রথম আলোর উদ্ধৃত ১ ডিসেম্বরের এক পোস্টে তিনি লেখেন, তাঁর সাবেক কর্মস্থলে কয়েকটি কুকুর ছিল, যার একটির নাম লাল্টু; সেটিকে তিনি জন্ম থেকে লালনপালন করেছেন। তিনি জানান, ছানাগুলো হত্যার বিচার চেয়ে তিনি সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছেন।
পুলিশ, প্রাণিসম্পদ দপ্তর ও প্রাণিকল্যাণ সংগঠন
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, আইন অনুযায়ী ছানাগুলো হত্যা একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তাঁর দপ্তর বিষয়টি পুলিশকে জানিয়েছে এবং আইনগত প্রক্রিয়া চলছে বলে তিনি জানান। ঈশ্বরদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা একই পত্রিকাকে বলেন, পুলিশ বিষয়টি তদন্ত করছে, উপজেলা প্রশাসন ও প্রাণিসম্পদ বিভাগের সঙ্গে কথা হয়েছে এবং আইনগত বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন।
২ ডিসেম্বরের প্রতিবেদনে আকলিমা খাতুন জাগো নিউজকে আরও বলেন, ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর ঢাকা থেকে ‘অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার’ নামে একটি সংগঠনের প্রতিনিধিরা ঈশ্বরদীর উদ্দেশে রওনা দিয়েছেন। তাঁরা এ বিষয়ে আইনি ব্যবস্থা নিতে আসছেন বলে প্রাথমিকভাবে জানিয়েছেন; ঈশ্বরদীতে এসে তাঁরা ইউএনওর সঙ্গে বৈঠক করবেন এবং তারপর তাঁদের সিদ্ধান্ত জানাবেন।
প্রকৃতি ও বন্যপ্রাণী নিয়ে কাজ করা একটি স্থানীয় সংগঠনের সভাপতি প্রথম আলোকে বলেন, জীবজন্তু রক্ষায় দেশে আইন আছে, কিন্তু প্রয়োগ নেই। মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করতে হলে এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনা প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন।
প্রাণিকল্যাণ আইন, ২০১৯-এ যা আছে
বাংলাদেশে প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা নিয়ন্ত্রণ করে প্রাণিকল্যাণ আইন, ২০১৯ (২০১৯ সনের ১২ নং আইন), যার তারিখ ২০১৯ সালের ১০ জুলাই। এই আইন দ্য ক্রুয়েলটি টু অ্যানিমেলস অ্যাক্ট, ১৯২০ রহিত করে তার জায়গা নেয়। আইনের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা প্রতিরোধ, সদয় আচরণ প্রদর্শন ও দায়িত্বশীল প্রতিপালনের মাধ্যমে প্রাণিকল্যাণ নিশ্চিত করা এবং সে লক্ষ্যে সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোর জন্য আইনটি করা হয়েছে।
আইনে ‘প্রাণি’ বলতে মানুষ ছাড়া সব স্তন্যপায়ী প্রাণী, পাখি, সরীসৃপ, মাছ ছাড়া অন্যান্য জলজ প্রাণী এবং সরকার গেজেট প্রজ্ঞাপনে ঘোষিত অন্য যেকোনো প্রাণীকে বোঝানো হয়েছে। ‘মালিকবিহীন প্রাণি’ বলতে বোঝায় মালিকানা বা দাবিদারবিহীন প্রাণী, অথবা যুক্তিসংগত অনুসন্ধানের পরও যে প্রাণীর মালিক বা তত্ত্বাবধানকারীকে পাওয়া যায় না। আইনের ৪ ধারা অনুযায়ী, প্রত্যেক প্রাণীর মালিক বা তত্ত্বাবধানকারীর দায়িত্ব যৌক্তিক কারণ ছাড়া প্রাণীটির প্রতি কল্যাণকর ও মানবিক আচরণ করা এবং নিষ্ঠুর আচরণ থেকে বিরত থাকা।
৬ ধারায় প্রাণীর প্রতি ‘অপ্রয়োজনীয় নিষ্ঠুর আচরণ’ হিসেবে গণ্য কাজের তালিকা দেওয়া আছে। এর মধ্যে রয়েছে এমন কোনো কাজ বা কাজ থেকে বিরত থাকা, যা প্রাণীর অসুস্থতার কারণ হয়; প্রাণীকে অতিরিক্ত পরিশ্রম করানো বা অপ্রয়োজনীয়ভাবে প্রহার করা; প্রয়োজনীয় খাদ্য ও পানি না দেওয়া; এবং অসুস্থ অবস্থায় বা মৃত্যু ঘটানোর জন্য প্রাণীকে লোকালয়ে ছেড়ে দেওয়া। সরকার গেজেট প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে আরও আচরণকে এ তালিকায় যোগ করতে পারে। এ ধরনের নিষ্ঠুর আচরণ করা বা তাতে সহযোগিতা করা এই আইনের অধীন অপরাধ।
একই ধারায় কিছু পরিস্থিতিকে অপ্রয়োজনীয় নিষ্ঠুর আচরণ হিসেবে গণ্য না করার কথাও বলা হয়েছে, যেমন:
- নিষ্ঠুরতাটি সৎ উদ্দেশ্যে, অর্থাৎ ওই প্রাণী বা অন্য প্রাণীর উপকারে অথবা কোনো ব্যক্তি বা অন্য প্রাণীর প্রাণসংশয়ের হুমকি দূর করতে করা হলে;
- নিশ্চিতভাবে জলাতঙ্কগ্রস্ত বা মানুষ ও অন্য প্রাণীতে সংক্রমণ ঘটাতে পারে এমন অনিরাময়যোগ্য সংক্রামক রোগে আক্রান্ত প্রাণীকে সরকার বা সরকার-অনুমোদিত কর্তৃপক্ষ জনকল্যাণার্থে, বিশ্ব প্রাণিস্বাস্থ্য সংস্থার (ওআইই) মানদণ্ড মেনে ব্যথাহীন ও মানবিক উপায়ে মৃত্যু নিশ্চিত করলে;
- খাদ্যের জন্য জবাই ও ধর্মীয় উদ্দেশ্যে উৎসর্গের সময় যেকোনো ধর্মাবলম্বী ব্যক্তি নিজ ধর্মীয় আচার অনুযায়ী কোনো কার্যক্রম গ্রহণ করলে;
- সরকার-স্বীকৃত শিক্ষা বা গবেষণা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা বা গবেষণার উদ্দেশ্যে, চিড়িয়াখানা পরিচালনার প্রযোজ্য আইন, বিধি বা নীতিমালার অধীনে এবং বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২-এর অধীনে কোনো কার্যক্রম বা ব্যবস্থা নেওয়া হলে।
৭ ধারা মালিকবিহীন প্রাণী নিয়ে। এতে বলা হয়েছে, এই আইনে উল্লিখিত কোনো কারণ ছাড়া মালিকবিহীন কোনো প্রাণী নিধন বা অপসারণ করা যাবে না, এবং কোনো ব্যক্তি মালিকবিহীন কোনো প্রাণী হত্যা করলে তা এই আইনের অধীন অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।
দণ্ডের বিধান রয়েছে ১৬ ধারায়। ৬ ধারার উপধারা (৩), ৭ ধারার উপধারা (২) এবং আরও কয়েকটি বিধানের অধীন অপরাধ করলে বা তাতে সহায়তা করলে অনধিক ছয় মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা অনধিক ১০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে। ১০ ধারার উপধারা (১)-এর অধীন অঙ্গহানি এবং ১১ ধারার উপধারা (১)-এর অধীন বিষ প্রয়োগের দণ্ড বেশি: অনধিক দুই বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড। কোনো নির্দিষ্ট ঘটনায় এর কোন বিধান প্রযোজ্য, তা নির্ধারণ করবে কর্তৃপক্ষ ও আদালত।
প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতার মামলা আদালতে নিতে পারে কে
এই আইনে সিদ্ধান্তমূলক ভূমিকা প্রাণিসম্পদ বিভাগের। ১৮ ধারায় বলা হয়েছে, কর্তৃপক্ষের লিখিত অভিযোগ ছাড়া কোনো আদালত এই আইনের অধীন কোনো অপরাধ বিচারার্থে গ্রহণ করবেন না। আর ২ ধারার দফা (৪) অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ হলো প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বা তাঁর কাছ থেকে ক্ষমতাপ্রাপ্ত ওই অধিদপ্তরের কোনো ভেটেরিনারি সার্জন। আইনে ভেটেরিনারি সার্জন বলতে বাংলাদেশ ভেটেরিনারি কাউন্সিলে নিবন্ধিত ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের অধীনে কর্মরত যেকোনো ভেটেরিনারিয়ান এবং আইনের উদ্দেশ্য পূরণে কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত নিবন্ধিত ভেটেরিনারিয়ানকে বোঝানো হয়েছে।
১৯ ধারা অনুযায়ী এই আইনের অধীন সব অপরাধ অ-আমলযোগ্য ও জামিনযোগ্য। ২০ ধারায় বলা হয়েছে, মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯-এর তফসিলভুক্ত হওয়া সাপেক্ষে এই আইনের অধীন অপরাধ মোবাইল কোর্টে বিচার করা যাবে।
প্রাণী রক্ষায় কর্তৃপক্ষের কিছু ক্ষমতাও আছে। ১৪ ধারা অনুযায়ী, কোনো প্রাণী সংকটাপন্ন অবস্থায় আছে বলে কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতীয়মান হলে বা কারও কাছ থেকে এমন খবর পেলে কর্তৃপক্ষ সংকট প্রশমনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারে, প্রাণীর মালিক বা তত্ত্বাবধানকারীকে সে পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দিতে পারে, অথবা প্রাণীটিকে উদ্ধারে থানা, ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সহায়তা নিতে পারে। ১৫ ধারা অনুযায়ী, এই আইনের অধীন অপরাধের শিকার প্রাণীকে, সংকটাপন্ন অবস্থায় থাকুক বা না থাকুক, কর্তৃপক্ষ আটক করে আগ্রহী কোনো ব্যক্তির তত্ত্বাবধানে দিতে পারে, অথবা চিকিৎসা ও পরিচর্যার জন্য সরকারি ভেটেরিনারি হাসপাতাল বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠাতে পারে। প্রাণীটি সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত চিকিৎসা, খাদ্য ও পানির খরচ সংশ্লিষ্ট এলাকার ভেটেরিনারি সার্জন নির্ধারণ করবেন এবং তা মালিক বা তত্ত্বাবধানকারী বহন করবেন; তত্ত্বাবধানকারীকে পাওয়া না গেলে খরচ বহন করবে কর্তৃপক্ষ বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষ।
আইনে ‘স্থানীয় কর্তৃপক্ষ’-এর তালিকায় সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, জেলা পরিষদ, ইউনিয়ন পরিষদ ও ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের সঙ্গে উপজেলা পরিষদের নামও আছে। ঈশ্বরদীর ঘটনাটি ঘটেছে উপজেলা পরিষদের চত্বরেই, আর নোটিশে নাম আসা দুই কর্মকর্তাই উপজেলা পর্যায়ে কর্মরত।
নিধন থেকে টিকা: পথকুকুর ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ
বাংলাদেশের সরকারি নীতিতে কুকুর নিধনের দীর্ঘ ইতিহাস আছে। ২০১৫ সালে পিএলওএস নেগলেক্টেড ট্রপিক্যাল ডিজিজেস সাময়িকীতে প্রকাশিত টেনজিন ও সহকর্মীদের এক গবেষণায় বলা হয়, ২০১১ সালের শেষ দিক পর্যন্ত জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণের ব্যর্থ চেষ্টায় দেশের বড় শহরগুলোতে ব্যাপকভাবে কুকুর নিধন করা হতো। গবেষণা অনুযায়ী, ২০০৩ থেকে ২০০৮ সালের মধ্যে পাঁচটি বড় শহরে (ঢাকা, খুলনা, রাজশাহী, সিলেট ও টঙ্গী) ১ লাখ ৩৯ হাজার ৩৯১টি পথকুকুর নিধন করা হয়, যার ৮০ শতাংশই ঢাকা শহরে; তবু জলাতঙ্ক স্থানীয়ভাবে বিদ্যমান থেকে যায়।
একই গবেষণায় বলা হয়, অভয়ারণ্য-বাংলাদেশ অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের প্রচারণার পর ২০১২ সালের জানুয়ারি থেকে ঢাকা শহরে ব্যাপক কুকুর নিধন বন্ধ হয় এবং জাতীয় জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে সেখানে ধরা, বন্ধ্যাকরণ, টিকা দেওয়া ও ছেড়ে দেওয়ার (সিএনভিআর) মানবিক কর্মসূচি শুরু হয়। ২০১২ থেকে ২০১৩ সালে শহরের ৯২টি ওয়ার্ডের মধ্যে ২৯টিতে ৬ হাজার ৬৬৫টি কুকুরকে বন্ধ্যাকরণ ও জলাতঙ্কের টিকা দেওয়া হয়। গবেষণায় ঢাকা শহরে মুক্তভাবে চলাফেরা করা কুকুরের সংখ্যা আনুমানিক ১৮ হাজার ৫৮৫টি, অর্থাৎ প্রতি বর্গকিলোমিটারে প্রায় ৫২টি বলে হিসাব করা হয়।
কুকুর ব্যবস্থাপনা জনস্বাস্থ্যের বিষয় হওয়ার মূল কারণ জলাতঙ্ক। ২০১৫ সালের গবেষণাটি যেসব হিসাব উদ্ধৃত করেছে, সে অনুযায়ী বাংলাদেশে বছরে আনুমানিক ২ হাজার থেকে আড়াই হাজার মানুষ জলাতঙ্কে মারা যান, যা দেশটিকে ভারত ও চীনের পর বিশ্বে তৃতীয় অবস্থানে রাখে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাসহ গবেষকদের ২০২৪ সালে দ্য ল্যানসেট রিজিওনাল হেলথ: সাউথইস্ট এশিয়ায় প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়, বাংলাদেশে মানুষের জলাতঙ্কজনিত মৃত্যুর প্রায় ৯৬ শতাংশের উৎস কুকুর।
ওই গবেষণা অনুযায়ী, সরকার ২০১১ সালে ‘ওয়ান হেলথ’ পদ্ধতিতে জাতীয় জলাতঙ্ক নির্মূল কর্মসূচি চালু করে, যাতে জনসচেতনতা, কুকুরের কামড়ের আধুনিক চিকিৎসা, ব্যাপকহারে কুকুরকে টিকাদান এবং কুকুরের সংখ্যা ব্যবস্থাপনা যুক্ত রয়েছে। ব্যাপকহারে কুকুরকে টিকাদান ২০১১ সালে কক্সবাজার পৌরসভায় শুরু হয় এবং পরে দেশের ৬৪টি জেলাতেই অন্তত এক দফা করে সম্প্রসারিত হয়; টিকাদান দলে টিকাদাতা দেয় প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। সবচেয়ে বেশি কুকুরকে টিকা দেওয়া হয় ২০১৯ সালে, ৬ লাখ ২৫ হাজার ২০৮টি। গড়ে প্রতিবছর প্রতি জেলায় আনুমানিক ২৬ হাজার ৬৫টি কুকুরের মধ্যে ২১ হাজার ২৯৫টিকে টিকা দেওয়া হয়েছে।
গবেষণাটিতে সেই লক্ষ্যের কথাও বলা হয়েছে, যা বাংলাদেশ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, বিশ্ব প্রাণিস্বাস্থ্য সংস্থা, এফএও এবং গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর র্যাবিস কন্ট্রোলের সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছে: ২০৩০ সালের মধ্যে কুকুরবাহিত জলাতঙ্কে মানুষের মৃত্যু শূন্যে নামিয়ে আনা, যা ‘জিরো বাই থার্টি’ নামে পরিচিত।

যে উপজেলায় ঘটনাটি ঘটেছে: ঈশ্বরদী
ঈশ্বরদী পাবনা জেলার একটি উপজেলা। বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী এর আয়তন ২৫০.৮৯ বর্গকিলোমিটার। উপজেলাটির উত্তরে লালপুর ও বড়াইগ্রাম উপজেলা, দক্ষিণে গঙ্গা (পদ্মা) নদী, কুষ্টিয়া সদর ও মিরপুর উপজেলা, পূর্বে পাবনা সদর ও আটঘরিয়া উপজেলা এবং পশ্চিমে গঙ্গা নদী ও ভেড়ামারা উপজেলা। ২০১১ সালের আদমশুমারিতে এর জনসংখ্যা ছিল ৩ লাখ ১৩ হাজার ৯৩২।
ঈশ্বরদী থানা গঠিত হয় ১৯৪৯ সালে এবং ১৯৮৩ সালে এটি উপজেলায় রূপান্তরিত হয়। উপজেলাটি পরিচিত ১৯১২ সালে পদ্মার ওপর নির্মিত ৫ হাজার ৯৪০ ফুট দীর্ঘ রেলসেতু হার্ডিঞ্জ ব্রিজ এবং লালন শাহ সেতুর জন্য। এখানে কয়েকটি কৃষি গবেষণা কেন্দ্রও রয়েছে, যার মধ্যে আছে আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্র, ডাল গবেষণা কেন্দ্র এবং দেশের একমাত্র ইক্ষু গবেষণা কেন্দ্র।
ঈশ্বরদীর মানুষের আয়ের সবচেয়ে বড় একক উৎস কৃষি: বাংলাপিডিয়ার হিসাবে ৩৩.৬৩ শতাংশের প্রধান আয়ের উৎস কৃষি, এরপর ব্যবসা ২০.৯০ শতাংশ এবং চাকরি ১৩.৮৬ শতাংশ। প্রধান ফসল ধান, গম, আখ, পান, আলু, পেঁয়াজ ও সবজি; উপজেলা থেকে বাইরে পাঠানো পণ্যের মধ্যে রয়েছে পান, পেঁয়াজ, পেঁপে ও আখের গুড়।
ছবি: nasir khan from Dhaka, Bangladesh / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 2.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪ (২ ডিসেম্বর ২০২৫ এবং ১ ডিসেম্বর ২০২৫-এর ঈশ্বরদী প্রতিবেদন), প্রথম আলো (২ ডিসেম্বর ২০২৫), প্রাণিকল্যাণ আইন, ২০১৯ (বাংলাদেশ আইন, লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগ), বাংলাপিডিয়া, পিএলওএস নেগলেক্টেড ট্রপিক্যাল ডিজিজেস (টেনজিন ও সহকর্মী, ২০১৫), দ্য ল্যানসেট রিজিওনাল হেলথ: সাউথইস্ট এশিয়া (ঘোষ ও সহকর্মী, ২০২৪)





মন্তব্য
(০)