কলকারখানা থেকে বেরোনো কার্বন ডাই অক্সাইড দিয়ে কি বিছানার গদি, খাবারের পাত্র কিংবা কাটলারির প্লাস্টিক বানানো যায়? ২০২০ সালের জানুয়ারিতে বিবিসি বাংলা এই প্রশ্নের পেছনের বিজ্ঞান নিয়ে একটি ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাতে বলা হয়, নতুন কিছু প্রযুক্তি নির্গত কার্বন ডাই অক্সাইডকে প্লাস্টিকে পরিণত করে বায়ুমণ্ডলে ছাড়া গ্যাসের পরিমাণ কমানোর সম্ভাবনা দেখাচ্ছিল। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে বিবিসি আর্থে বিজ্ঞান সাংবাদিক জোয়ি কর্মিয়ারের প্রতিবেদন এবং আগের গবেষণা ও শিল্প প্রতিবেদন মিলিয়ে বিষয়টি এখানে তুলে ধরা হলো।
বিবিসি আর্থের প্রতিবেদনে বলা হয়, বিংশ শতাব্দীতে প্লাস্টিক মানুষের জীবনে বিপ্লব ঘটিয়েছে। প্লাস্টিক ছাড়া গান ও চলচ্চিত্র রেকর্ড করা সম্ভব হতো না; আধুনিক চিকিৎসা রক্তের ব্যাগ, সিরিঞ্জ ও নমনীয় টিউবের ওপর নির্ভরশীল; গাড়ির যন্ত্রাংশ, হালকা উড়োজাহাজ, কম্পিউটার, ফোন ও ইন্টারনেট প্রযুক্তিও প্লাস্টিকনির্ভর।
প্লাস্টিক বর্জ্যের হিসাব কী বলে
সংরক্ষিত লেখায় ভূমি ও সমুদ্রে ছড়িয়ে থাকা প্লাস্টিকের যে পরিমাণ লেখা ছিল, তা কোনো গবেষণার সঙ্গে মেলেনি। এ বিষয়ে বহুল উদ্ধৃত হিসাবটি এসেছে ২০১৭ সালের জুলাইয়ে সায়েন্স অ্যাডভান্সেস সাময়িকীতে প্রকাশিত রোল্যান্ড গেয়ার, জেনা জ্যামবেক ও কারা ল-এর গবেষণা থেকে। তাঁদের হিসাবে তখন পর্যন্ত বিশ্বে ৮ হাজার ৩০০ মিলিয়ন মেট্রিক টন নতুন প্লাস্টিক তৈরি হয়েছিল। ২০১৫ সাল পর্যন্ত প্রায় ৬ হাজার ৩০০ মিলিয়ন টন প্লাস্টিক বর্জ্য তৈরি হয়, যার প্রায় ৯ শতাংশ পুনর্ব্যবহার হয়েছে, ১২ শতাংশ পোড়ানো হয়েছে এবং ৭৯ শতাংশ জমেছে ভাগাড়ে বা প্রকৃতিতে। উৎপাদন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ধারা একই থাকলে ২০৫০ সালের মধ্যে প্রায় ১২ হাজার মিলিয়ন টন প্লাস্টিক বর্জ্য ভাগাড়ে বা প্রকৃতিতে জমবে বলে গবেষকেরা হিসাব দেন।
সমস্যা শুধু ফেলে দেওয়া প্লাস্টিকে নয়, এর কাঁচামালেও। বেশির ভাগ প্লাস্টিক তৈরি হয় প্রাকৃতিক গ্যাস ও পেট্রোলিয়াম থেকে। বিবিসি আর্থের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিবছর ব্যবহৃত তেল ও গ্যাসের প্রায় ৪ শতাংশ যায় পলিমার উৎপাদনে, ফলে প্লাস্টিক শিল্প জীবাশ্ম জ্বালানি উত্তোলন ও জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
পলিমার কী, কার্বন ডাই অক্সাইড কীভাবে কাঁচামাল হয়
প্লাস্টিক মূলত পলিমার দিয়ে তৈরি কৃত্রিম বা আধা কৃত্রিম পদার্থ। পলিমার হলো অনেক বড় অণু, যা মনোমার নামের ছোট অণু থেকে আসা একই একক বারবার শিকলের মতো জুড়ে তৈরি হয়। কার্বন ডাই অক্সাইড সহজে বিক্রিয়া করে না, তাই একে প্লাস্টিকের কাঁচামাল বানানোর মূল চাবি হলো অনুঘটক, অর্থাৎ এমন পদার্থ যা নিজে খরচ না হয়ে রাসায়নিক বিক্রিয়ার গতি বাড়ায়।
যুক্তরাজ্যের শেফিল্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও ইউকে সেন্টার ফর কার্বন ডাই অক্সাইড ইউটিলাইজেশনের পরিচালক পিটার স্টাইরিং বিবিসি আর্থকে বলেন, জীবাশ্ম জ্বালানির বদলে রাসায়নিক কৌশলে বর্জ্য কার্বন ডাই অক্সাইডকে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করলে পেট্রোকেমিক্যাল খাতে বিপ্লব ঘটবে। স্টাইরিংয়ের ভাষায়, "কার্বন ডাই অক্সাইড থেকে নাইলন বানানো যায়, ভাবলে সত্যিই অবাক লাগে, কিন্তু আমরা তা করেছি।"

গদির ফোম থেকে খাবারের পাত্র
জার্মান প্রতিষ্ঠান কোভেস্ট্রোর বিজ্ঞানীরা এমন অনুঘটক খুঁজে পান, যার সাহায্যে কার্বন ডাই অক্সাইড ইপোক্সাইডের সঙ্গে বিক্রিয়া করে পলিইথার পলিকার্বোনেট পলিওল তৈরি করে। এটিই পলিইউরেথেনের ভিত্তি, যা গদি, কুশন ও ফ্রিজের তাপনিরোধকে থাকে। দ্য কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারের ২০১৬ সালের ১৭ জুনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেদিন জার্মানির ডরমাগেনে প্রতিষ্ঠানটির কারখানা পাশের একটি রাসায়নিক কারখানা থেকে ধরা কার্বন ডাই অক্সাইড দিয়ে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করে। সেখানে পলিওল তৈরিতে তেলজাত প্রোপিলিন অক্সাইডের প্রায় ২০ শতাংশের জায়গায় কার্বন ডাই অক্সাইড ব্যবহার হয়; কারখানার বার্ষিক উৎপাদনক্ষমতা ছিল ৫ হাজার টন, খরচ ১৫ মিলিয়ন ইউরো। প্রথম ফোম ব্যবহারের কথা ছিল গদি ও গদিওয়ালা আসবাবে। বিবিসি আর্থ জানায়, এই গদি কার্ডিয়ন নামে তৈরি হচ্ছিল।
যুক্তরাজ্যের প্রতিষ্ঠান ইকোনিকও কার্বন ডাই অক্সাইড থেকে পলিইউরেথেন তৈরি করছিল। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, বিশ্বের সব পলিওলের ৩০ শতাংশ কার্বন ডাই অক্সাইড থেকে তৈরি হলে ৯০ মিলিয়ন টন কার্বন ডাই অক্সাইড সাশ্রয় হবে। ইকোনিকের হিসাবে প্রতি টন কার্বন ডাই অক্সাইডের দাম প্রায় ১০০ ডলার, যেখানে প্রচলিত কাঁচামাল প্রোপিলিন অক্সাইডের দাম প্রায় ২ হাজার ডলার।
খাবারের পাত্রের দিকেও গবেষণা চলছিল। বিবিসি আর্থের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যের বাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক আঁতোয়ান বুশারের দল কার্বন ডাই অক্সাইডের সঙ্গে জাইলোজের মতো চিনি মিলিয়ে পলিকার্বোনেট তৈরির উপায় বের করেছিল। পলিকার্বোনেট দিয়ে শিশুর দুধের বোতলের মতো বারবার ব্যবহারযোগ্য পাত্র হয়। প্রচলিত পদ্ধতিতে বিষাক্ত গ্যাস ফসজিন ও বিসফেনল-এ ব্যবহৃত হয়, তাই চিনিভিত্তিক পলিকার্বোনেট তৈরি ও ব্যবহারে বেশি নিরাপদ হবে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।

জৈব প্লাস্টিক কেন সহজ সমাধান নয়
আলু থেকে তৈরি একবার ব্যবহারের কাটলারি বা ভুট্টা থেকে তৈরি বোতলের মতো জৈব প্লাস্টিককে অনেকে বিকল্প ভাবেন। তবে বিবিসি আর্থের প্রতিবেদনে বলা হয়, এগুলো নাম শুনে যত সহজে পচবে মনে হয় তত সহজে পচে না, সাধারণত শিল্প পর্যায়ের কম্পোস্ট ব্যবস্থা লাগে। শেফিল্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা বিভিন্ন উপাদানের প্লাস্টিক বোতলের পরিবেশগত প্রভাব তুলনা করে দেখেন, সার, পরিবহন ও ফসল তোলার খরচ ধরলে জৈব উৎসের প্লাস্টিকের ফল সবচেয়ে খারাপ। এ কারণেই রসায়নবিদেরা এক দশকের বেশি সময় ধরে কার্বন ডাই অক্সাইড থেকে প্লাস্টিক তৈরির পথ খুঁজছিলেন।

ছবি: Johan / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: বিবিসি বাংলা, বিবিসি আর্থ, সায়েন্স অ্যাডভান্সেস, দ্য কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)