খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা উপজেলায় ২০২৬ সালের ৫ মে, মঙ্গলবার, বিপন্ন ও বিরল প্রজাতির একটি আহত লজ্জাবতী বানর উদ্ধার করে বন বিভাগ ও স্থানীয় বন্যপ্রাণী উদ্ধারকারী টিম। উপজেলার গোমতি ইউনিয়নের শান্তিপুর এলাকা থেকে প্রাণীটি উদ্ধার করা হয় এবং পরদিন সকালে পশু হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হয় বলে ৬ মে জাগো নিউজ ২৪ জানায়। খাগড়াছড়ি বন বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা ফরিদ মিঞা উদ্ধারের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
শান্তিপুরে যেভাবে পাওয়া গেল প্রাণীটিকে
বন্যপ্রাণী উদ্ধারকারী টিমের সদস্য মো. আহসান জাগো নিউজকে বলেন, স্থানীয়রা আহত অবস্থায় বানরটিকে দেখতে পেয়ে উদ্ধারকারী টিম ও বন বিভাগকে খবর দেন। পরে উদ্ধারকারী টিম ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রাণীটিকে নিরাপদে উদ্ধার করে নিয়ে আসে। প্রাণীটি কীভাবে আহত হয়েছিল, কিংবা নজরে পড়ার আগে কতক্ষণ আহত অবস্থায় ছিল, প্রতিবেদনে তা জানানো হয়নি।
মাটিরাঙ্গা বন বিভাগের কর্মচারী মো. হাসান বলেন, 'উদ্ধার করা বানরটিকে বুধবার (৬ মে) সকালে পশু হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। এটির চোখে ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে।'
তিনি আরও জানান, বিরল প্রজাতির প্রাণীটিকে আপাতত পিটাছড়া বন এলাকায় একটি নিরাপদ স্থানে রাখা হয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী আবার চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেওয়া হবে। আঘাতের ধরন বা কী চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে প্রতিবেদনে আর কোনো বিস্তারিত তথ্য ছিল না।
বিভাগীয় বন কর্মকর্তা যা বললেন
বিভাগীয় কর্মকর্তা ফরিদ মিঞা বলেন, বিরল প্রজাতির লজ্জাবতী বানর অত্যন্ত সংবেদনশীল প্রাণী। এ ধরনের বানর সাধারণত ঘন বনাঞ্চলে বসবাস করে এবং মানুষের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলে। তাঁর ভাষ্য, অবৈধ শিকারসহ বিভিন্ন মানবসৃষ্ট কারণে এই প্রজাতির অস্তিত্ব হুমকির মুখে। বন বিভাগ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে প্রাণীটির চিকিৎসা দিচ্ছে, আর সুস্থ হয়ে উঠলে এটিকে তার প্রাকৃতিক আবাসস্থলে অবমুক্ত করা হবে।
বন বিভাগ আরও জানায়, লজ্জাবতী বানর আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘের (আইইউসিএন) লাল তালিকায় বিপন্ন প্রজাতি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত। বাংলাদেশে যে লজ্জাবতী বানর পাওয়া যায়, তার বৈজ্ঞানিক নাম Nycticebus bengalensis, ইংরেজিতে বেঙ্গল স্লো লরিস। দেশের জাতীয় লাল তালিকায় এই প্রজাতিরই মূল্যায়ন করা হয়েছে, আর দেশের বন্যপ্রাণী আইনের তফসিলেও এই প্রজাতির নাম রয়েছে।
বন অধিদপ্তর বাংলাদেশের বন ও বন্যপ্রাণী রক্ষা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি সংস্থা। ব্রিটিশ শাসনামলে ১৮৭০ সালে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়, এর প্রধান কার্যালয় ঢাকার মহাখালীতে।
লজ্জাবতী বানর: ধীরগতির নিশাচর প্রাইমেট
লজ্জাবতী বানর, যাকে উত্তরাঞ্চলীয় স্লো লরিসও বলা হয়, স্ট্রেপসিরাইন গোত্রের একটি প্রাইমেট। বাংলাদেশ, উত্তর-পূর্ব ভারত, কম্বোডিয়া, লাওস, মিয়ানমার, ভিয়েতনাম, দক্ষিণ চীন ও থাইল্যান্ডে এর বাস। স্লো লরিসের যত প্রজাতি আছে, তার মধ্যে এর বিস্তৃতির এলাকাই সবচেয়ে বড়। দীর্ঘদিন একে সুন্দা স্লো লরিসের (Nycticebus coucang) একটি উপপ্রজাতি হিসেবে ধরা হতো; ২০০১ সালে প্রাইমেট বিশেষজ্ঞ কলিন গ্রোভস একে আলাদা প্রজাতি হিসেবে স্বীকৃতি দেন।
স্লো লরিসদের মধ্যে এটিই সবচেয়ে বড়। মাথা থেকে লেজ পর্যন্ত এর দৈর্ঘ্য ২৬ থেকে ৩৮ সেন্টিমিটার, ওজন ১ থেকে ২.১ কেজি। শরীরের লোম ঘন ও পশমের মতো; পিঠের দিক বাদামি-ধূসর, পেটের দিক সাদা, আর পিঠ বেয়ে মাথার চূড়া পর্যন্ত উঠে গেছে একটি স্পষ্ট গাঢ় রেখা। অন্য স্লো লরিসদের মতো এরও মাথা গোল, মুখ চ্যাপ্টা, চোখ বড়, কান ছোট, নাক ভেজা আর লেজ প্রায় নেই বললেই চলে। অন্ধকারে এর চোখ উজ্জ্বল কমলা আভা ফেরায়। পেছনের পায়ের দ্বিতীয় আঙুলে একটি বাঁকা নখ থাকে, যা দিয়ে প্রাণীটি গা চুলকায় ও লোম পরিষ্কার করে।
লজ্জাবতী বানরের প্রতিটি কনুইয়ের ভেতরের দিকে ব্র্যাকিয়াল গ্ল্যান্ড নামে একটি ছোট ফোলা অংশ আছে। এখান থেকে তীব্র গন্ধযুক্ত, স্বচ্ছ, তৈলাক্ত একটি বিষাক্ত রস বের হয়, যা প্রাণীটি তার চিরুনির মতো সামনের দাঁতে মেখে নেয়। এক রাসায়নিক গবেষণায় দেখা গেছে, এই তেলে থাকা কয়েক ডজন যৌগের প্রায় অর্ধেকই ঘনিষ্ঠ আত্মীয় পিগমি স্লো লরিসের তেলে নেই। গবেষকদের ধারণা, এই তেল এক লরিস থেকে আরেক লরিসে লিঙ্গ, বয়স, স্বাস্থ্য ও সামাজিক অবস্থানের তথ্যও পৌঁছে দিতে পারে। ২০২০ সালের এক প্রতিবেদনে মোঙ্গাবে ইন্ডিয়া জানায়, স্লো লরিসই একমাত্র পরিচিত বিষধর প্রাইমেট, আর এদের কামড়ে মানুষের শরীরে মারাত্মক অ্যানাফাইল্যাকটিক শক বা তীব্র অ্যালার্জিজনিত প্রতিক্রিয়া হতে পারে।

প্রাণীটি নিশাচর ও বৃক্ষবাসী। দিনের বেলা ঘন ঝোপঝাড়ে বা গাছের কোটরে বলের মতো কুণ্ডলী পাকিয়ে ঘুমায়। লাফ দিতে পারে না বলে এক গাছ থেকে আরেক গাছে যেতে এটি লতা ও কাষ্ঠল লতার ওপর নির্ভর করে। ছোট ছোট পারিবারিক দলে থাকে, আর পুরুষ ও স্ত্রী উভয়ই প্রস্রাব দিয়ে নিজের এলাকা চিহ্নিত করে। একটানা ঘন চাঁদোয়া ও উঁচু গাছের চিরসবুজ ও আধা-চিরসবুজ বন এর পছন্দ। এ কারণে কোনো বনে এর উপস্থিতিকে সেই বনের সুস্থতার লক্ষণ হিসেবে ধরা হয়।
এর খাদ্যের বড় অংশ ফল। পাশাপাশি এটি ঝিঁঝিঁপোকা ও ঘাসফড়িং জাতীয় বড় পোকা, গাছের আঠা, শামুক, ছোট পাখি ও সরীসৃপও খায়। শীতকালে এটি প্রায় পুরোপুরি গাছের রস ও আঠার ওপর নির্ভর করে, যা গাছের বাকল খুঁড়ে বের করে নেয়; বহেড়া (Terminalia bellerica) গাছ এর প্রিয় উৎস। ভারতের আসামভিত্তিক বন্যপ্রাণী সংস্থা আরণ্যকের দিলীপ ছেত্রী ২০২০ সালে মোঙ্গাবে ইন্ডিয়াকে বলেন, উত্তর-পূর্ব ভারতে প্রজাতিটিকে বেশি দেখা যায় আঠা বা রস ঝরে এমন গাছে, যেমন Grewia microcos, Schima wallichii, গামারি (Gmelina arborea), কৃষ্ণচূড়া (Delonix regia) ও হরীতকী (Terminalia chebula)। লজ্জাবতী বানর বীজ ছড়িয়ে দেয় এবং রাতে ফোটা ফুলের পরাগায়ন করে; আবার অজগর ও ঈগলজাতীয় শিকারি পাখির খাদ্যও এটি।
লজ্জাবতী বানরের প্রজননের কোনো নির্দিষ্ট মৌসুম নেই। প্রায় ছয় মাস গর্ভধারণের পর স্ত্রী লরিস প্রতি ১২ থেকে ১৮ মাসে সাধারণত একটি করে বাচ্চা দেয়। মা প্রায় তিন মাস বাচ্চাকে সঙ্গে বহন করে; বাচ্চা প্রায় ২০ মাস বয়সে প্রজননক্ষম হয়, আর প্রজাতিটি ২০ বছর পর্যন্ত বাঁচতে পারে। বাংলাদেশের জাতীয় লাল তালিকা অনুযায়ী এটি সারা বছরই প্রজনন করে, একা বা জোড়ায় থাকে এবং পোকামাকড়, ছোট মেরুদণ্ডী প্রাণী, ফল ও গাছের আঠা খায়।
বাংলাদেশে বিপন্ন একটি প্রজাতি
আইইউসিএন বাংলাদেশ ২০১৫ সালে যে 'রেড লিস্ট অব বাংলাদেশ, ভলিউম ২: ম্যামালস' প্রকাশ করে, তাতে লজ্জাবতী বানরকে দেশে বিপন্ন (এনডেনজারড) হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়। মো. কামরুল হাসানের করা ওই মূল্যায়নে বলা হয়, প্রজাতিটির বিস্তৃতি সীমিত, কেবল দেশের উত্তর-পূর্ব, পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বের মিশ্র চিরসবুজ বনে। বিচরণ এলাকা সংকুচিত হওয়া, আবাসস্থলের মানে নজিরবিহীন পরিবর্তন এবং অব্যাহত শোষণের কারণে আগের প্রায় দুই দশকে এর অন্তত অর্ধেক সংখ্যা কমে গেছে বলে ধারণা করা হয়। দেশের শালবনের পুরোনো বিচরণ এলাকা থেকে প্রজাতিটি পুরোপুরি হারিয়ে গেছে। এর আগে ২০০০ সালের জাতীয় মূল্যায়নে একে মহাবিপন্ন (ক্রিটিক্যালি এনডেনজারড) তালিকায় রাখা হয়েছিল।
খাগড়াছড়ি যে অঞ্চলের অংশ, সেই পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রজাতিটির উপস্থিতি নথিভুক্ত হয়েছে। মৌলভীবাজার জেলার লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানেও লজ্জাবতী বানর আছে। আধা-চিরসবুজ এই বনকে ১৯৯৬ সালে জাতীয় উদ্যান ঘোষণা করা হয়; সেখানে উল্লুক, চশমাপরা হনুমান ও মুখপোড়া হনুমানেরও বাস। লজ্জাবতী বানরের পুরো বিচরণ এলাকা জুড়েই বন উজাড় হয়েছে ব্যাপক হারে। প্রজাতিটির বিশ্বকোষীয় ভুক্তিতে সংকলিত তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ সালে বাংলাদেশের আদি বনভূমির মাত্র ৯ শতাংশ অবশিষ্ট ছিল।
বিশ্বজুড়ে অবস্থা, পোষা প্রাণীর বাজার ও প্রথাগত ওষুধ
আইইউসিএনের বৈশ্বিক লাল তালিকায় ২০০৬ সালেও লজ্জাবতী বানরকে 'তথ্য অপ্রতুল' (ডেটা ডেফিশিয়েন্ট) শ্রেণিতে রাখা হয়েছিল। ২০২০ সালে একে বিপন্ন হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়। মোঙ্গাবে ইন্ডিয়ার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২০ সালের জুলাইয়ে এই তালিকাভুক্তির পেছনে ছিল আবাসস্থল হারানো ও শিকারের তীব্র চাপ, যার ফলে তিন প্রজন্মে, অর্থাৎ প্রায় ২৪ বছরে, প্রজাতিটির সংখ্যা ৫০ শতাংশের বেশি কমেছে। পরের তিন প্রজন্মেও পুরো বিচরণ এলাকায় সংখ্যা আরও ৫০ শতাংশের বেশি কমবে বলে গবেষকেরা আশঙ্কা করেন।
২০০৭ সালের জুন থেকে স্লো লরিসের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক কেনাবেচা নিষিদ্ধ। সে বছর নেদারল্যান্ডসের হেগে বিপন্ন বন্য প্রাণী ও উদ্ভিদের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিষয়ক কনভেনশন সাইটিসের ১৪তম পক্ষ সম্মেলনে সব প্রজাতির স্লো লরিসকে পরিশিষ্ট ১-এ তোলা হয়, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক কেনাবেচা নিষিদ্ধ করে। তার আগে ১৯৭০-এর দশক থেকে স্লো লরিস ছিল পরিশিষ্ট ২-এ, যেখানে কেবল রপ্তানি অনুমতিপত্র লাগত। ভারতে প্রজাতিটি ১৯৭২ সালের বন্যপ্রাণী সুরক্ষা আইনের তফসিল ১-এর আওতায় সুরক্ষিত।
প্রজাতিটির সবচেয়ে বড় হুমকি বন্যপ্রাণী বাণিজ্য, পোষা প্রাণী হিসেবে এবং প্রথাগত ওষুধের জন্য, আর বন উজাড়। জুম চাষ ও রাস্তা নির্মাণও এর আবাস নষ্ট করছে। ২০০৬ সালে কম্বোডিয়ার দোকানপাট ও স্টলে সবচেয়ে বেশি দেখা যাওয়া স্তন্যপায়ীদের একটি ছিল লজ্জাবতী বানর। প্রথাগত চিকিৎসায় সন্তান জন্মের পরের চিকিৎসা, পেটের সমস্যা, ক্ষত ও ভাঙা হাড় সারাতে এটি ব্যবহার করা হয়। মোঙ্গাবে ইন্ডিয়া মিয়ানমারের চীন সীমান্তবর্তী মং লা শহরকে এর বড় বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে বর্ণনা করেছে, যেখানে লরিস মেরে শুকিয়ে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আলাদা আলাদা বিক্রি করা হতো।

যেসব প্রাণী এই বাণিজ্যে বেঁচে যায়, তাদের ওপরও চলে নিষ্ঠুরতা। পোষ মানানো দেখাতে ব্যবসায়ীরা লরিসের সামনের দাঁত কেটে বা উপড়ে ফেলেন। এতে প্রচুর রক্তক্ষরণ হয় এবং প্রায়ই দাঁতের সংক্রমণ হয়, যা প্রায় ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রে প্রাণঘাতী; দাঁত হারানো লরিস আর কখনো বনে ফিরতে পারে না। স্লো লরিস মানসিক চাপে খুবই সংবেদনশীল এবং বন্দিদশায় ভালো থাকে না। জাপানগামী পাচারকারীদের কাছ থেকে জব্দ করা স্লো লরিসের ৭৬ শতাংশই মারা গেছে, অনেকগুলো চিড়িয়াখানায় পাঠানোর আগেই। অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া পোষা লরিসকে কাতুকুতু দেওয়ার ভিডিও দেখে অনেকে একে নিরীহ ভাবেন, অথচ ওই স্থিরতা আসলে চাপের মুখে আত্মরক্ষার প্রতিক্রিয়া।
উত্তর-পূর্ব ভারতের প্রাইমেট গবেষকেরা ২০২০ সালে মোঙ্গাবে ইন্ডিয়াকে জানান, সেখানে মূলত স্থানীয় প্রথাগত ওষুধের জন্যই প্রাণীটি শিকার হয়, আর পাহাড়ে জ্বালানি কাঠ সংগ্রহের সময় প্রায়ই এটি ধরা পড়ে। প্রাইমেট রিসার্চ সেন্টার নর্থ ইস্ট ইন্ডিয়ার জিহোসুও বিশ্বাস বলেন, 'বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ফাঁদে ধরার পর গ্রামের রান্নাঘর থেকে প্রাণীটিকে উদ্ধার করা হয়।' সেখানকার গবেষকেরা সংরক্ষিত এলাকার আশপাশের গ্রামে স্কুলশিক্ষার্থীদের নিয়ে সচেতনতা কার্যক্রম এবং প্রজাতিটি নিয়ে আরও বৈজ্ঞানিক গবেষণার সুপারিশ করেন।
বনের ভেতরের সড়ক ও বিদ্যুতের তার
বাংলাদেশে সড়ক ও বিদ্যুতের তারে প্রাণহানিও একটি নথিভুক্ত হুমকি। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের হাসান আল-রাজী ও মারজান মারিয়া এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবির বিন মুজাফফরের একটি গবেষণা ২০১৯ সালের অক্টোবরে 'জুলজিয়া' সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়। তাঁরা দেশের উত্তর-পূর্বের লাউয়াছড়া ও সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে ২০১৫ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত প্রাইমেটের মৃত্যুর তথ্য সংগ্রহ করেন। এতে পাঁচ প্রজাতির প্রাইমেটের ২৭টি মৃত্যু নথিভুক্ত হয়: ১৫টি সড়ক দুর্ঘটনায়, ১২টি বিদ্যুতায়িত হয়ে।
এর মধ্যে ছিল ২০১৫ সালের জানুয়ারি ও ডিসেম্বরে সাতছড়িতে এবং ২০১৬ সালের অক্টোবরে লাউয়াছড়ায় সড়কে লজ্জাবতী বানরের মৃত্যু, আর ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে লাউয়াছড়ায় বিদ্যুতায়িত হয়ে দুটি লজ্জাবতী বানরের মৃত্যু। গবেষকেরা ব্যাখ্যা করেন, লজ্জাবতী বানর ধীরে চলে; একটি তার আঁকড়ে ধরে থাকা অবস্থাতেই পাশের তার ধরে ফেলতে পারে, ফলে শর্ট সার্কিটে প্রাণ হারায়। তাঁরা উল্লেখ করেন, ২০১৬ সালে বিদ্যুৎ লাইন টানার জন্য সাতছড়িতে মহাসড়কের ওপর গাছের ডালে তৈরি ১৮টি প্রাকৃতিক সেতুর ১২টি কেটে ফেলা হয়, আর সেখানে প্রাইমেটের বিদ্যুতায়িত হয়ে মৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্ত হয় কেবল ওই লাইন বসানোর পরেই।
গবেষকেরা বনের ভেতরে সড়ক ও বিদ্যুৎ লাইন নির্মাণ এড়ানো, যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ, অন্তরিত (ইনসুলেটেড) বিদ্যুৎ লাইন ব্যবহার এবং গাছের ডালের প্রাকৃতিক সেতু রক্ষা বা কৃত্রিম সেতু তৈরির সুপারিশ করেন। তাঁরা জানান, বাংলাদেশের প্রাইমেট প্রজাতিগুলোর ৯০ শতাংশই হুমকির মুখে এবং এদের সংখ্যা ধীরে ধীরে কমছে।
মাটিরাঙ্গা ও খাগড়াছড়ির পাহাড়
খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা চট্টগ্রাম বিভাগে অবস্থিত এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের অংশ। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী জেলার আয়তন ২,৫০৫.৭৩ বর্গকিলোমিটার। এর উত্তরে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য, পূর্বে রাঙামাটি জেলা, দক্ষিণে রাঙামাটি ও চট্টগ্রাম জেলা এবং পশ্চিমে চট্টগ্রাম জেলা ও ত্রিপুরা রাজ্য। উল্লেখযোগ্য পাহাড়শ্রেণির মধ্যে আছে গোলামুন, ছোট পানছড়ি, কারমি মুড়া, লুতিবান, কুরাদিয়া, ভাঙা মুড়া ও জোপিসিল; নদীর মধ্যে চেঙ্গী, ফেনী ও মাইনী। ১৯০০ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামকে যে তিনটি মহকুমায় ভাগ করা হয়, খাগড়াছড়ি ছিল তার একটি; ১৯৮৩ সালে এটি জেলায় উন্নীত হয়।
২০২২ সালের জনশুমারিতে জেলায় ৭ লাখ ১৪ হাজার ১১৯ জন মানুষ গণনা করা হয়। তাঁদের মধ্যে ৩ লাখ ৪৯ হাজার ৩৯০ জন, অর্থাৎ ৪৮.৯৩ শতাংশ, বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষ। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় তিনটি জনগোষ্ঠী চাকমা (১ লাখ ৭৫ হাজার ১৬৫ জন), ত্রিপুরা (৯৮ হাজার ৫০০ জন) ও মারমা (৭৪ হাজার ২১০ জন)।
মাটিরাঙ্গা জেলার একটি সীমান্তবর্তী উপজেলা; এর উত্তর ও পশ্চিমে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য। উপজেলার আয়তন ৪০৪.৭৫ বর্গকিলোমিটার। ২০২২ সালের জনশুমারিতে এখানকার জনসংখ্যা ছিল ১ লাখ ২৬ হাজার ৬০৯ জন, যাঁদের মধ্যে ৩০ হাজার ২৫৭ জন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষ: ত্রিপুরা ২৩ হাজার ৬৪৭ জন, চাকমা ৩ হাজার ৯৫০ জন ও মারমা ২ হাজার ৬২১ জন। যেখানে লজ্জাবতী বানরটি পাওয়া যায়, সেই গোমতি এই উপজেলার একটি ইউনিয়ন। বাংলাপিডিয়া উপজেলার নদীর তালিকায় গোমতি, পিলাক ও ফেনীর নাম দিয়েছে এবং জানিয়েছে, মাটিরাঙ্গা থানা গঠিত হয় ১৯৮০ সালে, পরে এটি উপজেলা হয়।
এখানকার মানুষের প্রধান জীবিকা কৃষি: বাংলাপিডিয়ার হিসাবে উপজেলার ৬০.৫০ শতাংশ মানুষের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি। প্রধান ফসল ধান, রাবার, আখ, আলু, ভুট্টা, তুলা, অড়হর ও শাকসবজি; প্রধান ফল কাঁঠাল, কলা, আম, লিচু, পেঁপে, লেবু ও আনারস।

২০২৬ সালের মে মাসে যে আইন প্রাণীটিকে সুরক্ষা দিচ্ছিল
উদ্ধারের সময় প্রাণীটি বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০২৬-এর সুরক্ষায় ছিল। সরকারের 'বাংলাদেশ আইন' ওয়েবসাইটে এটি ২০২৬ সনের ৮৬ নং আইন হিসেবে ১০ এপ্রিল, ২০২৬ তারিখে লিপিবদ্ধ। এই আইন ২০১২ সালের বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইনের স্থলাভিষিক্ত হয়। নতুন কাঠামোটি প্রথমে আসে অধ্যাদেশ হিসেবে: প্রথম আলো ২০২৫ সালের ৬ ডিসেম্বর জানায়, অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ ডিসেম্বরের শুরুতে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা অধ্যাদেশ অনুমোদন করে। রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা বাসস জানায়, ২০২৬ সালের ৭ জানুয়ারি অধ্যাদেশটি গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়। পরে এটি ২০২৬ সালের আইন হিসেবে প্রণীত হয়।
আইনের তফসিল ১(খ)-এ লজ্জাবতী বানরের নাম রয়েছে, সঙ্গে আছে বিভিন্ন প্রজাতির বানর, হনুমান ও অন্যান্য স্তন্যপায়ী। আইনের ৪১(৩) ধারা অনুযায়ী তফসিল ১(খ)-এ উল্লিখিত কোনো বন্যপ্রাণী কেউ শিকার করতে পারবেন না। এর শাস্তি সর্বোচ্চ ৩ বছর কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ৩ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড; একই অপরাধের পুনরাবৃত্তিতে সর্বোচ্চ ৫ বছর কারাদণ্ড বা ৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড। ৪৬ ধারায় এই অপরাধকে আমলযোগ্য ও জামিনঅযোগ্য করা হয়েছে। প্রথম আলো জানায়, ২০১২ সালের আইনে কেবল বাঘ ও হাতি হত্যা জামিনঅযোগ্য ছিল; নতুন আইনে তা প্রায় ২৫০ প্রজাতিতে বিস্তৃত হয়েছে।
আইনের ১০ ধারা অনুযায়ী লাইসেন্স, পজেশন সার্টিফিকেট বা পারমিট ছাড়া কেউ কোনো বন্যপ্রাণী লালন-পালন, আবদ্ধ রাখা, দখলে রাখা, কেনাবেচা বা পরিবহন করতে পারবেন না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিজ্ঞাপন দিয়ে বা হাট-বাজারে বন্যপ্রাণী কেনাবেচাও নিষিদ্ধ। সব বন্যপ্রাণী সরকারের সম্পত্তি হিসেবে বিবেচিত, আর বন্যপ্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আইনে নিষ্ঠুর আচরণ বলতে প্রহার, উত্ত্যক্ত করা, চোখ বেঁধে রাখা, অপ্রয়োজনে আটক রাখা, ভয় দেখানো, পরিবহনের সময় কষ্ট দেওয়া, বৈদ্যুতিক তারের বেষ্টনী দিয়ে হত্যা এবং নিষ্ঠুর আচরণের দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করা ইত্যাদিকে বোঝানো হয়েছে। ১০ ধারা লঙ্ঘনের শাস্তি সর্বোচ্চ ১ বছর কারাদণ্ড বা ১ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড; পুনরাবৃত্তিতে সর্বোচ্চ ২ বছর বা ২ লাখ টাকা।
মাটিরাঙ্গার লজ্জাবতী বানরের মতো উদ্ধার হওয়া প্রাণীর বিষয়ে দুটি ধারা সরাসরি প্রযোজ্য। ১৪ ধারা অনুযায়ী উদ্ধার, জব্দ বা ধরা পড়া বন্যপ্রাণীকে উপযুক্ত প্রাকৃতিক পরিবেশে অবমুক্ত করার ব্যবস্থা নিতে হবে; তবে রোগ সংক্রমণের আশঙ্কা থাকলে বা শুশ্রূষার প্রয়োজন হলে আবদ্ধ রাখা যাবে। ৩৪ ধারা বন অধিদপ্তরকে বন্যপ্রাণীর চিকিৎসা, খাদ্য, আশ্রয় ও নিরাপত্তার জন্য উদ্ধার কেন্দ্র স্থাপন এবং সেখান থেকে প্রাণী প্রকৃতিতে অবমুক্ত করার নির্দেশিকা প্রণয়নের ক্ষমতা দিয়েছে। বাসস ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে জানায়, আইনে বন অধিদপ্তরের অধীনে একটি বন্যপ্রাণী উইং, উদ্ধার, শুশ্রূষা ও সংরক্ষণের জন্য বন্যপ্রাণী ট্রাস্ট ফান্ড এবং প্রয়োজনীয় সংখ্যক চিকিৎসা কেন্দ্র ও চিকিৎসকের ব্যবস্থার বিধান রাখা হয়েছে।
২০২৬ সালের এপ্রিলে বন্যপ্রাণী গবেষকেরা টেলিভিশন চ্যানেল আইটিভিকে বলেন, আইনটি কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে এবং এর বিধিবিধান নিয়ে দেশব্যাপী সচেতনতা তৈরি করতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ফিরোজ জামান বলেন, অপরাধীদের শাস্তির আওতায় এনে তা দেশবাসীকে জানাতে পারলে অন্যরা সতর্ক হবেন এবং বন্যপ্রাণীর ক্ষতি করা থেকে বিরত থাকবেন।
ছবি: Helena Snyder / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, প্রথম আলো, বাসস (বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা), বিডিনিউজ২৪, আইটিভি, বাংলাদেশ আইন (লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগ), রেড লিস্ট অব বাংলাদেশ (আইইউসিএন বাংলাদেশ, ২০১৫), মোঙ্গাবে ইন্ডিয়া, জুলজিয়া (আল-রাজী, মারিয়া ও মুজাফফর, ২০১৯), বাংলাপিডিয়া, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)