২০২৬ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন দক্ষিণ আফ্রিকার দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূল থেকে আফ্রিকান পেঙ্গুইন নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। আফ্রিকায় প্রজনন করা একমাত্র পেঙ্গুইন প্রজাতিটি এখন যে ক্ষুধার কারণে দ্রুত কমে যাচ্ছে, প্রতিবেদনের বিষয় ছিল সেটিই। দেশটির সবচেয়ে পরিচিত সামুদ্রিক পাখি উদ্ধার ও পুনর্বাসন সংস্থা সাউদার্ন আফ্রিকান ফাউন্ডেশন ফর দ্য কনজারভেশন অব কোস্টাল বার্ডস (সানকব) এর কর্মীরা পরে মারা যাওয়া কিছু সামুদ্রিক পাখির ছানার পাকস্থলীতে পাথর পেয়েছেন। এদের বেশির ভাগ ছিল করমোর্যান্ট বা পানকৌড়ি জাতীয় পাখির ছানা, তবে পেঙ্গুইন ছানার পাকস্থলীতেও পাথর পাওয়া গেছে। সানকবের রবিন ফ্রেজার-নোলস সিএনএনকে বলেন, "বাবা-মা বাচ্চাদের কিছু একটা খাওয়ানোর জন্য এতটাই মরিয়া ছিল যে তারা ওদের পাথর খাওয়াচ্ছিল।" প্রতিবেদনটির ভিত্তি ছিল ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত একটি গবেষণা, যাতে দেখা যায়, পশ্চিম দক্ষিণ আফ্রিকার উপকূলে সার্ডিন মাছের মজুত ধসে পড়ার পর প্রায় ৬২ হাজার প্রজননক্ষম আফ্রিকান পেঙ্গুইন সম্ভবত অনাহারে মারা গেছে।
বেটিস বে'র এক সকাল
সিএনএনের প্রতিবেদন শুরু হয় বেটিস বে'র সৈকত থেকে, যেখানে গ্রীষ্মের এক সকালে একদল আফ্রিকান পেঙ্গুইন সাদা পেট সূর্যের দিকে রেখে দাঁড়িয়ে ছিল। অ্যান্টার্কটিকার আত্মীয়দের মতো নয়, আফ্রিকান পেঙ্গুইন উষ্ণ আবহাওয়ায় বাঁচে; এরা দক্ষিণ আফ্রিকা ও নামিবিয়ার নাতিশীতোষ্ণ উপকূলজুড়ে বসবাস করে এবং প্রতিবছর দক্ষিণাঞ্চলীয় আফ্রিকায় কয়েক দশ হাজার পর্যটক টানে।
বেটিস বে'র এই পাখিরা স্টোনি পয়েন্ট কলোনির সদস্য। সমুদ্রের দ্বীপের বদলে মূল ভূখণ্ডে এই প্রজাতির প্রজননস্থল খুব অল্প, স্টোনি পয়েন্ট তার একটি। স্টোনি পয়েন্ট এবং সাইমনস টাউনের কাছের বোল্ডার্স বিচ, দুটি কলোনিই আশির দশকের শুরুতে পেঙ্গুইনরা নিজেরাই গড়ে তোলে, প্রতিটিতে শুরুতে ছিল এক বা দুই জোড়া। ধারণা করা হয়, স্থলের শিকারি প্রাণী কমে যাওয়ার পরই মূল ভূখণ্ডে কলোনি গড়া সম্ভব হয়েছে; তবু বেটিস বে'র কলোনিতে চিতাবাঘের আক্রমণ ঘটেছে। ২০২২ সালে নেলসন ম্যান্ডেলা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক লোরিয়েন পিশেগ্রু মোঙ্গাবেকে জানান, স্টোনি পয়েন্টে তখন প্রায় ১ হাজার ৬০০ জোড়া এবং বোল্ডার্স বিচে প্রায় ১ হাজার জোড়া পেঙ্গুইন ছিল।
সানকবের পুনর্বাসন ব্যবস্থাপক জেড সুখু সিএনএনকে বলেন, "আমরা প্রতিদিন দেখছি এই পাখিরা বেশ গুরুতর আঘাত আর শীর্ণতার সমস্যা নিয়ে (সানকবে) আসছে; বন্য পরিবেশে এরা খুব কষ্টে আছে।"
আফ্রিকার একমাত্র পেঙ্গুইন
আফ্রিকান পেঙ্গুইনের বৈজ্ঞানিক নাম স্ফেনিসকাস ডেমারসাস (Spheniscus demersus)। একে কেপ পেঙ্গুইনও বলা হয়, আর গাধার ডাকের মতো জোরালো ডাকের কারণে ইংরেজিতে এর আরেক নাম জ্যাকঅ্যাস পেঙ্গুইন। প্রাপ্তবয়স্ক পাখির পিঠ কালো, পেট সাদা; বুকজুড়ে উল্টো ঘোড়ার নালের মতো একটি কালো বন্ধনী থাকে, আর থাকে ছড়ানো কালো ফোঁটা, যার নকশা প্রতিটি পাখিতে আলাদা। চোখের ওপরের খোলা গোলাপি চামড়া শরীরের তাপ বের করে দিতে সাহায্য করে: তাপমাত্রা বাড়লে সেখানকার গ্রন্থিতে রক্তপ্রবাহ বাড়ে এবং জায়গাটি আরও গোলাপি হয়। কালো পিঠ আর সাদা পেট একধরনের ছদ্মবেশ, যাকে কাউন্টারশেডিং বলা হয়; এতে পানির ওপর বা নিচ থেকে পাখিটিকে দেখা কঠিন হয়।
প্রজাতিটি নামিবিয়া থেকে দক্ষিণ আফ্রিকার পোর্ট এলিজাবেথের কাছের অ্যালগোয়া বে পর্যন্ত বিভিন্ন দ্বীপে এবং মূল ভূখণ্ডের অল্প কয়েকটি জায়গায় কলোনি গড়ে প্রজনন করে। এরা খোলা সমুদ্রে ঝাঁকবদ্ধ ছোট মাছ শিকার করে, প্রধানত সার্ডিন ও অ্যাঙ্কোভি; সঙ্গে খায় হর্স ম্যাকেরেল, রাউন্ড হেরিং, স্কুইড ও ছোট খোলসযুক্ত প্রাণী।
এরা একগামী পাখি; জোড়া বেঁধে প্রতিবছর একই জায়গায় ফিরে আসে। সাধারণত দুটি ডিম পাড়ে, গর্তে কিংবা পাথর বা ঝোপের নিচের বাসায়। বাবা-মা দুজনেই পালা করে প্রায় ৪০ দিন ডিমে তা দেয়। ছানা ফোটার পর প্রায় এক মাস অন্তত একজন অভিভাবক ছানাদের পাহারা দেয়; এরপর ছানারা অন্য ছানাদের সঙ্গে দলবদ্ধ হয়ে থাকে আর বাবা-মা দুজনেই দিনের বেশির ভাগ সময় সমুদ্রে খাবার খোঁজে। ছানারা ৬০ থেকে ১৩০ দিন বয়সে কলোনি ছাড়ে; কখন ছাড়বে তা অনেকটাই নির্ভর করে বাবা-মা কতটা খাবার জোগাড় করতে পারে তার ওপর।
একসময় এই পাখিরা দ্বীপগুলোতে শত শত বছরে জমা পাখির বিষ্ঠা বা গুয়ানোর পুরু স্তরে গর্ত খুঁড়ে বাসা বানাত, যা ডিম ও ছানাকে ঠান্ডা রাখত এবং শিকারির নাগাল থেকে দূরে রাখত। মানুষ সেই গুয়ানো তুলে নিয়ে সার হিসেবে বিক্রি করেছে, ফলে বহু পেঙ্গুইনকে খোলা জায়গায় বাসা করতে হয়। খাবার হিসেবে পেঙ্গুইনের ডিমও সংগ্রহ করে বিক্রি করা হতো: শুধু ১৯৫৩ সালেই ডাসেন দ্বীপ থেকে ১২ হাজার ডিম তোলা হয়েছিল।
লাখো পাখি থেকে ১০ হাজার জোড়ার নিচে
একসময় দক্ষিণ আফ্রিকা ও নামিবিয়ার উপকূলে লাখ লাখ আফ্রিকান পেঙ্গুইন বাস করত। ২০২৪ সালের নভেম্বরে বার্ডলাইফ ইন্টারন্যাশনাল জানায়, বন্য পরিবেশে ৩২ হাজারেরও কম পেঙ্গুইন টিকে আছে, যা মূল সংখ্যার মাত্র ১ শতাংশের মতো; প্রজাতিটির ৯৭ শতাংশ হারিয়ে গেছে এবং জরুরি পদক্ষেপ না নিলে ৪ হাজার দিনেরও কম সময়ে এটি বন্য পরিবেশ থেকে হারিয়ে যেতে পারে।
মোঙ্গাবে ২০২৪ সালের নভেম্বরে জানায়, পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি আনুমানিক ১ লাখ ৪১ হাজার প্রজননক্ষম জোড়া, অর্থাৎ ২ লাখ ৮২ হাজার প্রাপ্তবয়স্ক পাখি ছিল। ২০২৩ সালে তা নেমে আসে প্রায় ৯ হাজার ৯০০ জোড়ায়, অর্থাৎ ১৯ হাজার ৮০০ পাখিতে; প্রায় ৭০ বছরে কমেছে ৯৩ শতাংশ। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংঘের (আইইউসিএন) ২০২৪ সালের জুলাইয়ের মূল্যায়ন অনুযায়ী নামিবিয়ায় প্রায় ১ হাজার ২০০ জোড়া এবং দক্ষিণ আফ্রিকায় ৮ হাজার ৭৫০ জোড়া পেঙ্গুইন টিকে ছিল। দক্ষিণ আফ্রিকার নিজস্ব গণনায় ২০১৮ সালে এই সংখ্যা ছিল ১৫ হাজার ১৮৭ জোড়া। সিএনএন জানায়, শুধু গত ৩০ বছরেই সংখ্যা আনুমানিক ৮০ শতাংশ কমেছে।
২০১০ সাল থেকে প্রজাতিটি 'বিপন্ন' তালিকায় ছিল। ২০২৪ সালে আইইউসিএন একে 'মহাবিপন্ন' (ক্রিটিক্যালি এনডেঞ্জারড) শ্রেণিতে তোলে, যা 'বন্য পরিবেশে বিলুপ্ত' হওয়ার আগের শেষ ধাপ। এর প্রতিক্রিয়ায় সানকবের প্রধান নির্বাহী নাটালি মাস্কেল বলেন, সানকব "এই প্রতীকী প্রজাতির ভবিষ্যতের জন্য লড়াই চালিয়ে যাবে; আমাদের আশাবাদী থাকতে হবে যে এদের পতনের গতিপথ উল্টে দেওয়া সম্ভব।" যুক্তরাজ্যের এক্সেটার বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞানী রিচার্ড শার্লি বলেন, এই তালিকাভুক্তি "আমাদের পরিবেশের স্বাস্থ্যের অনেক বড় একটি সমস্যাকে সামনে আনে।"
বার্ডলাইফ সাউথ আফ্রিকার সামুদ্রিক পাখি সংরক্ষণ কর্মসূচির ব্যবস্থাপক অ্যালিস্টার ম্যাকইনেস বার্ডলাইফকে বলেন, মূল সমস্যা সমুদ্রে, মানুষের চোখের আড়ালে: "মানুষ যখন স্টোনি পয়েন্ট বা বোল্ডার্সের কলোনিতে যায়, তারা পাখিদের বড় বড় দলে দেখে, হুমকির মাত্রা বা পেঙ্গুইনদের সংখ্যায় কী প্রভাব ফেলছে তা বুঝতে পারে না।"

২০২৫ সালের ডিসেম্বরের গবেষণায় যা উঠে আসে
সিএনএন যে গবেষণার কথা উল্লেখ করে, সেটি ২০২৫ সালের ৪ ডিসেম্বর অনলাইনে প্রকাশিত হয় আফ্রিকার পাখিবিজ্ঞান সাময়িকী অস্ট্রিচ: জার্নাল অব আফ্রিকান অর্নিথোলজির ৯৬তম খণ্ডের চতুর্থ সংখ্যায়। শিরোনাম ছিল, 'হাই অ্যাডাল্ট মর্টালিটি অব আফ্রিকান পেঙ্গুইনস স্ফেনিসকাস ডেমারসাস ইন সাউথ আফ্রিকা আফটার ২০০৪ ওয়াজ লাইকলি কজড বাই স্টারভেশন', অর্থাৎ ২০০৪ সালের পর দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রাপ্তবয়স্ক আফ্রিকান পেঙ্গুইনের ব্যাপক মৃত্যুর সম্ভাব্য কারণ অনাহার। লেখক ছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার বন, মৎস্য ও পরিবেশ দপ্তরের রবার্ট ক্রফোর্ড ও আজউইয়ানেউই মাখাদো, এক্সেটার বিশ্ববিদ্যালয়ের রিচার্ড শার্লি, কেপ টাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের লিন শ্যানন, বার্ডলাইফ সাউথ আফ্রিকার অ্যালিস্টার ম্যাকইনেস এবং নেলসন ম্যান্ডেলা বিশ্ববিদ্যালয়ের টেগান কার্পেন্টার-ক্লিং।
গবেষকেরা কেপ টাউনের কাছে পশ্চিম উপকূলের দুটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রজনন দ্বীপ, ডাসেন ও রবেন দ্বীপ, নিয়ে কাজ করেন। ২০০০ সালের দশকের শুরুতে ডাসেনে প্রায় ২৫ হাজার এবং রবেনে প্রায় ৯ হাজার প্রজননক্ষম জোড়া ছিল। গবেষণাপত্রের হিসাবে, ২০০৪ সালে এই দুই দ্বীপে যেসব পেঙ্গুইন প্রজনন করেছিল, পরের আট বছরে তাদের প্রায় ৯৫ শতাংশ মারা যায়; হারিয়ে যায় প্রায় ৬২ হাজার প্রজননক্ষম পাখি। শার্লি বলেন, "এই পতন অন্য জায়গাতেও একইভাবে দেখা যাচ্ছে।"
লেখকদের সিদ্ধান্ত, পাখিগুলো সম্ভবত বার্ষিক পালক বদলের (মোল্ট) সময়ের আশপাশে অনাহারে মারা গেছে। শরীরের তাপ ধরে রাখা ও পানি নিরোধক রাখার জন্য আফ্রিকান পেঙ্গুইন বছরে একবার সব পালক বদলায়। এতে প্রায় ২১ দিন লাগে; নতুন পালক তখনও পানি নিরোধক না হওয়ায় পাখিটি সমুদ্রে যেতে পারে না, ডাঙায় উপোস করে থাকে এবং শরীরের ওজন প্রায় অর্ধেক কমে যায়। পালক বদলের আগে প্রাপ্তবয়স্ক পাখির ওজন প্রজননরত পাখির চেয়ে গড়ে ৩১ শতাংশ বেশি থাকে। গবেষণায় আরও বলা হয়, জীর্ণ পালক পেঙ্গুইনের গতি কমিয়ে দেয়: নতুন পালকে ঘণ্টায় প্রায় ১৯ কিলোমিটার, জীর্ণ পালকে প্রায় ১৪ কিলোমিটার, আর পালক বদলের ঠিক পরে মাত্র প্রায় ১০ কিলোমিটার।
শার্লি বলেন, "পালক বদলের আগে বা ঠিক পরে যদি খাবার খুঁজে পাওয়া খুব কঠিন হয়, তাহলে উপোস টিকে থাকার মতো যথেষ্ট সঞ্চয় তাদের থাকবে না। আমরা দলে দলে ভেসে থাকা মৃতদেহ পাই না; আমাদের ধারণা, এরা সম্ভবত সমুদ্রেই মারা যায়।" গবেষণাপত্রে বলা হয়, খাদ্য-মাছ কমে গেলে পালক বদলে ব্যর্থ পেঙ্গুইনের অনুপাতও বাড়ে।

সার্ডিন, অ্যাঙ্কোভি ও মাছ ধরার শিল্প
আফ্রিকান পেঙ্গুইন ঝাঁকবদ্ধ ছোট মাছের ওপর নির্ভরশীল, সবার আগে সার্ডিন (Sardinops sagax) ও অ্যাঙ্কোভি। গবেষণায় দেখা যায়, ২০০৪ সালের পর তিনটি বছর বাদে প্রতিবছরই পশ্চিম দক্ষিণ আফ্রিকার উপকূলে সার্ডিনের জৈববস্তুর পরিমাণ সর্বোচ্চ প্রাচুর্যের ২৫ শতাংশের নিচে ছিল। সমুদ্রের তাপমাত্রা ও লবণাক্ততার পরিবর্তনে সার্ডিনের ডিম ছাড়া কম সফল হয়েছে, অথচ মাছ ধরার চাপ বেশি থেকে গেছে। শার্লি জানান, ২০০৬ সালে সার্ডিন মজুতের যে অংশ মাছ ধরার শিল্প তুলে নেয়, তা অল্প সময়ের জন্য ৮০ শতাংশে পৌঁছেছিল, যা সম্ভবত পেঙ্গুইনের মৃত্যু আরও বাড়িয়েছে।
সিএনএন জানায়, একসময় এই প্রজাতির শক্ত ঘাঁটি নামিবিয়ার উপকূলে সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধি, লবণাক্ততার পরিবর্তন ও অতিরিক্ত মাছ ধরার কারণে সার্ডিন কার্যত হারিয়ে গেছে। যেখানে সার্ডিন কম, সেখানে পেঙ্গুইন খানিকটা অ্যাঙ্কোভির দিকে ঝুঁকেছে, যাতে চর্বি ও আমিষ কম; খাবারের খোঁজে এদের সমুদ্রের অনেক দূরে যেতে হচ্ছে, যার মূল্য দিচ্ছে প্রাপ্তবয়স্ক পাখির বেঁচে থাকা এবং বাসায় অপেক্ষারত ছানারাও।
গবেষণার সহলেখক আজউইয়ানেউই মাখাদো বলেন, কেপ গ্যানেট নামের সামুদ্রিক পাখি সার্ডিন ও অ্যাঙ্কোভি কতটা পাওয়া যাচ্ছে তার ভালো "নমুনা সংগ্রাহক", কারণ এরা এসব মাছের মজুতজুড়ে বিস্তৃত এলাকায় খাবার খোঁজে। গবেষণাটি নিয়ে প্রতিবেদনে মেইল অ্যান্ড গার্ডিয়ান উল্লেখ করে, ছোট কলোনিগুলোর বিলুপ্তির ঝুঁকি বেশি, কারণ সংখ্যায় কম হলে পেঙ্গুইন কম দক্ষতায় খাবার খোঁজে।
ফ্রেজার-নোলস সিএনএনকে বলেন, "মাছ ধরা বিশাল ব্যবসা, আর আমরা চাই না মাছ ধরা পুরোপুরি বন্ধ হোক; এটি আমাদের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।" মাছের মজুত কমার পেছনে কোনো একক কারণ নেই, তবে তার সতর্কবার্তা, "আমরা যদি কম মাছ ধরা শুরু না করি, তাহলে শেষ পর্যন্ত একটি ধসে পড়া বাস্তুতন্ত্র পাব।"

সানকবে পাথর, শীর্ণ পাখি ও পরিত্যক্ত ছানা
সানকব প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৬৮ সালে। আঘাত, তেল দূষণ, রোগ ও অন্যান্য সমস্যায় ভোগা পেঙ্গুইন ও অন্য সামুদ্রিক পাখিদের এখানে চব্বিশ ঘণ্টা চিকিৎসা ও যত্ন দেওয়া হয়। ২০২৫ সালে সংস্থাটি ৯৪৮টি পেঙ্গুইন ভর্তি করে, আর ফ্রেজার-নোলসের ভাষায়, আসার সময় এরা সাধারণত ছিল "বড়জোর রোগা"। সিএনএনের প্রতিবেদনের কিছুদিন আগে ভর্তি হওয়া একটি প্রাপ্তবয়স্ক পেঙ্গুইনের ওজন ছিল মাত্র ১ দশমিক ৯ কেজি, যা আদর্শ ওজন প্রায় ৪ কেজির অর্ধেকেরও কম। তিনি বলেন, "যেসব মৃতদেহ ভেসে আসে আর যাদের আমরা চিকিৎসা করি, তাদের মধ্যে আমরা খুব খুব জোরালো একটি প্রবণতা দেখছি। বন্য পরিবেশে এখন আর আদর্শ ওজনের পেঙ্গুইন পাওয়া যায় না।"
খাদ্যসংকটের আঘাত পড়ছে অন্য সামুদ্রিক পাখির ওপরও, যার মধ্যে আছে করমোর্যান্ট; কেপ করমোর্যান্ট নিজেই একটি বিপন্ন প্রজাতি। সানকবের গবেষক আলবার্ট স্নাইম্যান পরিস্থিতি কতটা গুরুতর তা মনে রাখার জন্য তার গবেষণাগারে ছোট এক স্তূপ পাথর রেখে দিয়েছেন। পাথরগুলো পাওয়া গিয়েছিল সানকবে ভর্তি হওয়া এবং পরে মারা যাওয়া করমোর্যান্ট ছানাদের পাকস্থলীতে। এতে বোঝা যায়, ছানাগুলো কেন বেড়ে উঠতে পারেনি: কর্মীরা যে খাবার খাওয়াচ্ছিলেন, পাথরের কারণে তার পুষ্টি শোষণ করতে পারছিল না। পেঙ্গুইন ছানার পাকস্থলীতেও পাথর পাওয়া গেছে। ফ্রেজার-নোলস আরও জানান, পরিত্যক্ত ছানারাও প্রায়ই পাথর ও বালি খায়।
ছানা পরিত্যাগ এখন আলাদা এক বড় সমস্যা। সাধারণত আফ্রিকান পেঙ্গুইনের বাবা-মা পালা করে কাজ করে: একজন ছানার কাছে থাকে, অন্যজন সমুদ্রে খাবার খোঁজে। ফ্রেজার-নোলসের মতে, চরম আবহাওয়া, শিকারির সংখ্যা বৃদ্ধি আর দীর্ঘ ও দূরের খাদ্য-সফরের কারণে বাবা-মা এখন আগের চেয়ে বেশি ডিম ও ছানা ফেলে চলে যাচ্ছে। একজন অভিভাবক মারা গেলে বা খাবারের অভাবে দেরি করলে বাসায় থাকা অন্যজন নিজের খাবারের খোঁজে বাসা ছেড়ে যেতে পারে, ফলে কার্যত ছানারা পরিত্যক্ত হয়।
পালক বদলে ব্যর্থতা, শিকারি, তেল ও রোগ
সানকবের ক্লিনিক্যাল পশুচিকিৎসক ডেভিড রবার্টস জানান, ক্ষুধার প্রভাব পড়ে পালক বদলেও। জীর্ণ পালক বদলানোর সময় পেঙ্গুইন সর্বোচ্চ তিন সপ্তাহ ডাঙায় উপোস করে থাকে; এই পালকই তাদের উষ্ণ ও ভাসমান রাখে এবং ঠান্ডা পানিতে শিকারে সক্ষম করে। যথেষ্ট চর্বি না থাকলে পালক বদল দেরিতে হয় বা ব্যর্থ হয়। রবার্টস সিএনএনকে বলেন, "এরা খুব পুরোনো, নষ্ট পালক নিয়ে (সানকবে) আসে, আর আমাদের খাইয়ে খাইয়ে পালক বদলের চক্রটা চালু করে দিতে হয়, কারণ বন্য পরিবেশে এরা আর তা পারছে না।"
রবার্টসের অস্ত্রোপচারের বেশির ভাগই আঘাতজনিত, দূষণ ও প্লাস্টিকে জড়িয়ে যাওয়া থেকে শুরু করে, আর সবচেয়ে বেশি সিল ও হাঙরের মতো শিকারির কামড়। মাছ কম থাকলে শিকারির হাতে আঘাত ও মৃত্যু বাড়ে, কারণ অপুষ্ট পেঙ্গুইন দুর্বল থাকে এবং পালাতে পারে না।
অনেক কলোনি বড় জাহাজ চলাচলের পথ বা বন্দরের কাছে, যেখানে তেল দূষণ এখনো বড় হুমকি; জাহাজের শব্দ আর জাহাজের আঘাতও চাপ বাড়ায়। অতি সংক্রামক বার্ড ফ্লু বা হাইলি প্যাথোজেনিক অ্যাভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা এবং অ্যাভিয়ান ম্যালেরিয়াও বড় বিপদ। আবাসস্থল হারানো ও উৎপাতের মধ্যে থাকা পাখিদের প্রসঙ্গে ফ্রেজার-নোলস বলেন, "এরা সফলভাবে প্রজনন করতে পারে না, সফলভাবে খাবার খেতে পারে না, আর সবকিছুই এদের জন্য আরও কঠিন হয়ে যায়।"
তেল দূষণ আগেও এই প্রজাতিকে বড় আঘাত দিয়েছে। ১৯৯৪ সালে এমভি অ্যাপোলো সি জাহাজডুবির পর তেলমাখা প্রায় ১০ হাজার পেঙ্গুইন সংগ্রহ করে পরিষ্কার করা হয়, যার অর্ধেকেরও কম বেঁচে যায়। ২০০০ সালের ২৩ জুন লৌহ আকরিকবাহী জাহাজ এমভি ট্রেজার রবেন ও ডাসেন দ্বীপের মাঝে ডুবে গেলে প্রায় ১৯ হাজার প্রাপ্তবয়স্ক পেঙ্গুইন তেলে মাখামাখি হয়; আরও ১৯ হাজার ৫০০ তেলমুক্ত পাখিকে দ্বীপ থেকে সরিয়ে প্রায় ৮০০ কিলোমিটার পূর্বে ছেড়ে দেওয়া হয়, যাতে তারা সাঁতরে ফেরার আগেই উপকূল পরিষ্কার করা যায়। সানকব ও ইন্টারন্যাশনাল ফান্ড ফর অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ারের পরিচালিত এই উদ্ধার অভিযান তিন মাসের বেশি চলে। দক্ষিণ আফ্রিকার উপকূলে সামুদ্রিক পাখির জরুরি পরিস্থিতিতে সাড়া দেওয়ার জন্য সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত একমাত্র সংস্থা সানকব।
২০২৫ সালের মার্চের সমঝোতা ও মাছ ধরা নিষিদ্ধ এলাকা
সাম্প্রতিক সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপটি ছিল মাছ ধরা নিয়ে। ২০২২ সালে দেশটির পরিবেশ মন্ত্রণালয় ছয়টি প্রধান প্রজনন দ্বীপের চারপাশে পার্স-সেইন জাল দিয়ে মাছ ধরায় অন্তর্বর্তী নিষেধাজ্ঞা দেয়, যা ২০৩৩ সাল পর্যন্ত চলার কথা ছিল। ২০২৪ সালের মার্চে বায়োডাইভারসিটি ল সেন্টারের সহায়তায় বার্ডলাইফ সাউথ আফ্রিকা ও সানকব মন্ত্রীর বিরুদ্ধে মামলা করে। তাদের যুক্তি ছিল, এই নিষিদ্ধ এলাকাগুলো "জৈবিকভাবে অর্থহীন", কারণ বাণিজ্যিক সার্ডিন ও অ্যাঙ্কোভি ধরার নৌবহরের হাত থেকে পাখিদের খাবার এতে রক্ষা পায় না।
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে মামলায় যুক্ত দুই শিল্প সংগঠন, সাউথ আফ্রিকান পেলাজিক ফিশিং ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশন (এসএপিএফআইএ) এবং ইস্টার্ন অ্যান্ড সাদার্ন কেপ পেলাজিক অ্যাসোসিয়েশন (ইএসসিপিএ), সংরক্ষণ সংস্থাগুলোর সঙ্গে বৈঠকের আহ্বান জানায়। এরপর হওয়া সমঝোতা পরিবেশমন্ত্রীর অনুমোদনসহ ২০২৫ সালের ১৮ মার্চ প্রিটোরিয়া হাইকোর্টের আদেশে পরিণত হয়। এতে অন্তর্বর্তী নিষিদ্ধ এলাকার বদলে ছয়টি কলোনির চারপাশে নতুন নিষিদ্ধ এলাকা ঠিক হয়: ডাসেন দ্বীপ, রবেন দ্বীপ, স্টোনি পয়েন্ট, ডায়ার দ্বীপ, সেন্ট ক্রয় দ্বীপ ও বার্ড আইল্যান্ড। এগুলো ১০ বছর বহাল থাকবে, ছয় বছর পর বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনা হবে।
বায়োডাইভারসিটি ল সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক কেট হ্যান্ডলি বলেন, নতুন সীমানা "পেঙ্গুইনের লাভ আর শিল্পের খরচের মধ্যে সবচেয়ে উপযুক্ত ভারসাম্য" খুঁজে পেয়েছে। রবেন দ্বীপের চারপাশের নিষিদ্ধ এলাকা সংরক্ষণ সংস্থাগুলোর চাওয়ার চেয়েও বড় হয়েছে, স্টোনি পয়েন্টের নিষিদ্ধ এলাকা সেখানকার কলোনির প্রায় পুরো মূল খাদ্য-সংগ্রহের এলাকা ঢেকে দিয়েছে, আর ইস্টার্ন কেপের বার্ড আইল্যান্ডের চারপাশে ২০ কিলোমিটার এলাকা নিষিদ্ধ হয়েছে। শিল্প সংগঠন দুটি একে বলে "মাঝামাঝি একটি আপস", যেখানে নিষিদ্ধ এলাকার আকার অন্তর্বর্তী এলাকা আর সংরক্ষণ সংস্থাগুলোর দাবির প্রায় মাঝামাঝি। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে মেইল অ্যান্ড গার্ডিয়ান জানায়, এই ছয় কলোনিতে বিশ্বের আফ্রিকান পেঙ্গুইনের প্রায় ৭৬ শতাংশের বাস।
সিএনএন এসব এলাকাকে খাবারের জায়গা থেকে আহরণমূলক কর্মকাণ্ড দূরে রাখার নো-টেক জোন হিসেবে বর্ণনা করে। ফ্রেজার-নোলস বলেন, "তথ্য অনুযায়ী, রবেন দ্বীপের চারপাশের নো-টেক জোন ২০৩৩ সালের মধ্যে শুধু ওই দ্বীপের পেঙ্গুইনের সংখ্যা কমা থামাতে পারবে বলে আমরা আশা করি, তবে অবশ্যই আরও অনেক কারণ এখানে কাজ করছে।"
উদ্ধার করা ছানা ও ডি হুপে নতুন কলোনি
সিএনএন জানায়, ২০০৬ সালে শুরু হওয়া সানকবের 'চিক বলস্টারিং' প্রকল্প পরিত্যক্ত ছানা উদ্ধার করে হাতে লালন করে এ পর্যন্ত ১০ হাজারের বেশি পেঙ্গুইনকে আবার প্রকৃতিতে ছেড়েছে।
এদের কিছু পাখি গেছে দক্ষিণ কেপ উপকূলের ডি হুপ নেচার রিজার্ভে, যেখানে বার্ডলাইফ সাউথ আফ্রিকা, সানকব ও কেপনেচারের সঙ্গে মিলে একটি নতুন কলোনি গড়ার উদ্যোগ নেয়; সিএনএন একে বিশ্বের প্রথম মানুষের তৈরি সুরক্ষিত পেঙ্গুইন কলোনি বলে উল্লেখ করে এবং এর প্রতিষ্ঠাকাল বলে ২০২১ সাল। ২০০৩ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত ডি হুপে পেঙ্গুইনরা প্রজননের চেষ্টা করেছিল, জোড়ার সংখ্যা উঠেছিল ১৮-তে; পরে সম্ভবত ক্যারাকাল নামের এক বনবিড়াল জাতীয় শিকারি কয়েকটি পাখি মেরে ফেলে এবং বাকিরা জায়গাটি ছেড়ে চলে যায়। প্রকল্পে চারপাশে ২ দশমিক ৪ মিটার উঁচু বিদ্যুতায়িত বেড়া দেওয়া হয়, যা চব্বিশ ঘণ্টা নজরদারিতে থাকে; ২০১৯ সালে একটি চিতাবাঘ বেড়া ভেদ করলে দুর্বল জায়গাটি মেরামত করা হয়। পাখিদের টানতে বসানো হয় সিমেন্টের তৈরি নকল পেঙ্গুইন আর সৌরচালিত স্পিকারে বাজানো হয় পেঙ্গুইনের ডাক; ২০২১ সাল থেকে সানকবে হাতে লালিত ১৪০টির বেশি কিশোর পেঙ্গুইন সেখানে ছাড়া হয়।
২০২২ সালের অক্টোবরের শেষ দিকে সেখানে প্রথম দুটি ছানা ফোটে। প্রকল্পের নেতৃত্বে থাকা বার্ডলাইফ সাউথ আফ্রিকার ক্রিস্টিনা হেগেন বলেন, "আমি বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম।" পিশেগ্রু তখন সতর্ক করেন, কলোনি ধীরে বাড়ে এবং দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হলো পেঙ্গুইনের খাবার রক্ষা করা। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সিএনএন জানায়, ছাড়া পেঙ্গুইনরা ডি হুপে প্রজনন করছে।
ফ্রেজার-নোলসের মতে, আগামী পাঁচ থেকে ১০ বছরে সাফল্যের জন্য বন্য কলোনিগুলোকে স্থিতিশীল করা, নো-টেক জোন বর্তমান সুপারিশের চেয়েও বাড়ানো এবং সার্ডিন ও অ্যাঙ্কোভি ধরার কোটা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো দরকার। সাধারণ ভোক্তারাও সাহায্য করতে পারেন বলে তিনি জানান: মাছ মেশানো পশুখাদ্য ও পোষা প্রাণীর খাবার কম কিনে এবং ডব্লিউডব্লিউএফ দক্ষিণ আফ্রিকার সাসি (এসএএসএসআই) সামুদ্রিক খাবার নির্দেশিকায় তালিকাভুক্ত টেকসইভাবে ধরা প্রজাতি বেছে নিয়ে।
তিনি বলেন, "এরা একটি নির্দেশক প্রজাতি, আর এদের পতন সংকেত দিচ্ছে যে আমাদের বাস্তুতন্ত্র গুরুতর সমস্যায় আছে। এদের খাদ্যনিরাপত্তা না থাকলে ধাপে ধাপে প্রভাব নামতে শুরু করবে, আর তা গিয়ে শেষ হবে মানুষের কাছে।"
ছবি: Derek Keats / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 2.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, সিএনএন, অস্ট্রিচ: জার্নাল অব আফ্রিকান অর্নিথোলজি, মেইল অ্যান্ড গার্ডিয়ান, দ্য গার্ডিয়ান (দ্য নামিবিয়ানের মাধ্যমে), মোঙ্গাবে, বার্ডলাইফ ইন্টারন্যাশনাল, টাইমসলাইভ, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)