টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে ২০২৬ সালের জুলাইয়ের বন্যায় খাগড়াছড়ি জেলায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয় কৃষি খাতে। জেলা প্রশাসন ১৫ জুলাই জানায়, জেলার প্রায় আট হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। বন্যায় ৩১৩ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়ে ২৭৩ মেট্রিক টন উৎপাদন ক্ষতি হয়েছে, আর কৃষি খাতে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১২ কোটি ২০ লাখ ৯৮ হাজার টাকা।
চেঙ্গী ও মাইনী নদীর পানিতে প্লাবিত নিম্নাঞ্চল
খাগড়াছড়ি চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চলের একটি জেলা, আয়তন ২ হাজার ৭৪৯.১৬ বর্গকিলোমিটার। এর উত্তর ও পশ্চিমে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য, পূর্বে রাঙামাটি এবং দক্ষিণ-পশ্চিমে চট্টগ্রাম জেলা। দীঘিনালা, মাটিরাঙ্গা, পানছড়িসহ জেলায় উপজেলা ৯টি। চেঙ্গী, মাইনী ও ফেনী এই জেলার প্রধান নদী। ২০২২ সালের জনশুমারিতে জেলার জনসংখ্যা ছিল ৭ লাখ ১৪ হাজার ১১৯। পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মধ্যে জুম চাষ এখানকার প্রধান কৃষিপদ্ধতি।
দ্য ডেইলি স্টার বাংলা ৯ জুলাই জানায়, সোমবার থেকে টানা ভারী বৃষ্টিতে চেঙ্গী ও মাইনী নদীসহ বিভিন্ন খালের পানি বেড়ে জেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়। দীঘিনালা-লংগদু, দীঘিনালা-সাজেক ও খাগড়াছড়ি-রাঙামাটি সড়ক পানিতে তলিয়ে যায়। পাহাড়ি ঢলে দীঘিনালার বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র ডুবে গেলে দীঘিনালা ও সাজেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়। জেলা প্রশাসন ১৩৫টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলে; দীঘিনালার ২০টি কেন্দ্রেই আশ্রয় নেন প্রায় ৮০০ মানুষ। ১৪ জুলাই প্রথম আলো জানায়, মাইনী ও চেঙ্গীর পানি নেমে যাওয়ায় জেলার পরিস্থিতি অনেকটা স্বাভাবিক হয়েছে।

ফসলি জমির ক্ষতির হিসাব
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যে, সে সময় জেলায় আবাদকৃত জমি ছিল ৮ হাজার ১৩০ হেক্টর এবং ফসলি জমি ৮ হাজার ৩৫৫ হেক্টর। এর মধ্যে আগাম বপন করা ১ হাজার ৩১ হেক্টর জমি বন্যার কবলে পড়ে; প্রথম আলোর প্রতিবেদনেও জেলায় প্রায় ১ হাজার ৩১ হেক্টর ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা বলা হয়। কৃষি বিভাগের হিসাবে সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয় ২৩ হেক্টর এবং আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয় ২৯৩ হেক্টর জমি। আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত জমির প্রায় ৪১.৪৫ শতাংশ পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা আছে বলে জানায় কৃষি বিভাগ।
ক্ষতির সময়টা কৃষকের জন্য বিশেষ কঠিন ছিল। বাংলাদেশে আউশ ধান সাধারণত মার্চ-এপ্রিলে বোনা হয় এবং গ্রীষ্মে কাটা হয়, আর আমন ধান রোপণ করা হয় জুলাই থেকে আগস্টে। ফলে জুলাইয়ের বন্যায় একদিকে মাঠের আউশ, অন্যদিকে আমনের জন্য তৈরি বীজতলা দুটিই ক্ষতির মুখে পড়ে।
কৃষকের দুশ্চিন্তা
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক মো. শহিদুল জাগো নিউজকে জানান, অনেক কষ্টে তিনি দুই কানি (৮০ শতাংশ) জমিতে আউশ ধান করেছিলেন, তার সবটাই বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। এখন সংসার কীভাবে চলবে, সেই দুশ্চিন্তায় আছেন তিনি।
দীঘিনালার মেরুং ইউনিয়নের কৃষক আ. হাকিম জানান, তিন কানি জমিতে রোপণের জন্য তিনি ধানের চারা (জালা) ফেলেছিলেন; পানিতে ডুবে সব পচে গেছে, নতুন করে ধান লাগানোর টাকাও তাঁর নেই। তারাবনিয়ার কৃষানি কৃত্তি চাকমা জানান, তাঁর বাড়িঘরের ক্ষতি হয়েছে, লাউ ও সবজির খেতও নষ্ট হয়ে গেছে।

পলি-বালু সরিয়ে পুনর্বাসনের পরিকল্পনা
খাগড়াছড়ি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক ওঙ্কার বিশ্বাস জানান, বন্যার পানিতে আমন ধানের বীজতলা, বিভিন্ন সবজি, পেঁপে ও অন্যান্য মৌসুমি ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। পানি নেমে গেলেও অনেক জমিতে পলি, বালু ও কাদা জমে থাকায় চাষাবাদ স্বাভাবিক হতে সময় লাগবে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসনে বীজ, সার ও কৃষি উপকরণ সহায়তার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
ক্ষতি শুধু খেতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। জেলা মৎস্য কর্মকর্তা রাজু আহমেদ প্রথম আলোকে জানান, এবারের বন্যায় জেলায় প্রায় আড়াই কোটি টাকার মাছ ও মৎস্যসম্পদের ক্ষতি হয়েছে।
ছবি: Humayra ferdousi / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, প্রথম আলো, দ্য ডেইলি স্টার বাংলা, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)