টাঙ্গাইলের মধুপুর বনাঞ্চলের ভেতর দিয়ে যাওয়া টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ মহাসড়ক পার হতে গিয়ে বানর, হনুমানসহ বন্যপ্রাণীর মৃত্যু কমাতে মহাসড়কের পাঁচটি স্থানে দড়ির তৈরি রোপওয়ে বা উড়াল সেতু নির্মাণ করেছে বন বিভাগ। বন বিভাগের ভাষ্য অনুযায়ী, মধুপুর জাতীয় উদ্যান সদর রেঞ্জ এলাকায় পঁচিশ মাইল থেকে রসুলপুর বাজার পর্যন্ত অংশে এগুলো বসানো হয়েছে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে এবং ১৪ জুলাই জাগো নিউজে এ উদ্যোগের খবর প্রকাশিত হয়।
মহাসড়কে প্রাণ হারায় বন্যপ্রাণী
বন বিভাগ জানায়, খাবারের সন্ধানে মহাসড়কের এক পাশ থেকে অন্য পাশে যেতে গিয়ে প্রায়ই দুর্ঘটনায় বানর, হনুমান, মেছোবিড়াল, গন্ধগোকুলসহ নানা প্রাণী মারা যায়। স্থানীয়দের ভাষ্য, এই মহাসড়কে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টাই গাড়ি চলে, আর পর্যটক ও পথচারীদের দেওয়া খাবারের আশায় বানর-হনুমান প্রায়ই সড়কে নেমে আসে। টাঙ্গাইল বাস মিনিবাস মালিক সমিতির আহ্বায়ক শফিকুল ইসলামও জাগো নিউজকে একই কথা বলেন এবং আশা প্রকাশ করেন, রোপওয়ের ব্যবহার বাড়লে এ ধরনের মৃত্যু কমবে।
সমস্যাটি নতুন নয়। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে বাসস জানিয়েছিল, বন বিভাগ বনের বিভিন্ন স্থানে সাবধানে গাড়ি চালানোর সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড টানালেও অনেক চালক তা মানছেন না, আর রসুলপুর থেকে পঁচিশ মাইল পর্যন্ত বনের মাঝ দিয়ে যাওয়া সড়কে প্রায়ই গাড়ির চাকায় পিষ্ট হয়ে বন্যপ্রাণী মারা যাচ্ছে। বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ড. আবু নাসের মোহাম্মদ মহসীনও জাগো নিউজকে বলেন, ধীরগতিতে গাড়ি চালানোর সাইনবোর্ড থাকলেও অনেক চালক তা মানেন না; তাই গাছে বিচরণকারী প্রাণীদের নিরাপদ চলাচলের জন্য রোপওয়ে নির্মাণ করা হয়েছে।

গাছের সঙ্গে বাঁধা দড়ির করিডোর
টাঙ্গাইল বন বিভাগের বরাতে বাংলা টিভি জানায়, মহাসড়কের দুই পাশের সুউচ্চ গাছের সঙ্গে বিশেষ কৌশলে দড়ি যুক্ত করে করিডোরগুলো তৈরি করা হয়েছে, যাতে বানর, হনুমান, কাঠবিড়ালি, সিভেটসহ বৃক্ষবাসী প্রাণী মাটিতে না নেমেই সড়ক পার হতে পারে। মধুপুর জাতীয় উদ্যান সদর রেঞ্জের ডেপুটি রেঞ্জার মো. মোশাররফ হোসেন বলেন, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণে মধুপুর শালবন বনপ্রতিষ্ঠা প্রকল্পের আওতায় করিডোরগুলো নির্মাণ করা হয়েছে এবং প্রকল্পটি ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৮ সালের মার্চ পর্যন্ত বাস্তবায়ন করা হবে। জাগো নিউজ প্রকল্পটিকে শালবন পুনরুদ্ধার প্রকল্প হিসেবে উল্লেখ করেছে।
বন বিভাগের সূত্র জানায়, পাঁচটি করিডোর পরীক্ষামূলকভাবে তৈরি করা হয়েছে; কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণে ইতিবাচক ফল মিললে বনের আরও ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে একই ধরনের করিডোর নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হবে। সহকারী বন সংরক্ষক রানা দেব বলেন, রোপওয়ে সড়ক দুর্ঘটনা কমানোর পাশাপাশি বন্যপ্রাণীর অবাধ চলাচল, আবাসস্থলের বিভাজন রোধ এবং প্রজননে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। রোপওয়েগুলো বৈদ্যুতিক লাইন থেকে যথেষ্ট দূরে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

মধুপুর শালবন ও মুখপোড়া হনুমান
মধুপুর গড়কে দেশের তৃতীয় বৃহত্তম বনাঞ্চল বলা হয়। জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, একসময় প্রায় ৬২ হাজার একরজুড়ে বিস্তৃত এই বনের বড় একটি অংশ ইতোমধ্যে উজাড় হয়ে গেছে, আর বন উজাড়, আবাসস্থল সংকুচিত হওয়া ও খাদ্যসংকটের কারণে বহু বন্যপ্রাণী অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে। বনের একটি অংশ ১৯৮২ সালে মধুপুর জাতীয় উদ্যান ঘোষিত হয়, যার আয়তন ৮,৪৩৬ হেক্টর; এ বনের প্রায় ৪০ শতাংশ শালগাছ।
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট বিভাগের অধ্যাপক ড. এএসএম সাইফুল্লাহ জাগো নিউজকে বলেন, মধুপুর বনের দুর্লভ মুখপোড়া হনুমান উঁচু গাছে বিচরণ করে এবং খাবারের সন্ধানে এক গাছ থেকে অন্য গাছে চলাচল করে। মুখপোড়া হনুমান বা ক্যাপড লাঙ্গুর (Trachypithecus pileatus) বাংলাদেশ, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, ভুটান ও মিয়ানমারে পাওয়া যায়; আইইউসিএনের লাল তালিকায় প্রজাতিটি সংকটাপন্ন (ভালনারেবল)।

বিদ্যুৎলাইনও ঝুঁকি
অধ্যাপক সাইফুল্লাহর মতে, বনাঞ্চলের মধ্য দিয়ে যাওয়া উচ্চ ভোল্টেজের বিদ্যুৎলাইন গাছে চলাচলকারী প্রাণীদের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে; নিরাপদ বিদ্যুৎ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে প্রাণীগুলোর মৃত্যু কমবে এবং প্রজনন স্বাভাবিক থাকবে। বাংলা টিভিকে তিনি বলেন, বনাঞ্চলসংলগ্ন মহাসড়কে এ ধরনের বন্যপ্রাণীবান্ধব অবকাঠামো সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি কমাবে এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে ভূমিকা রাখবে; বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এমন করিডোর ব্যবহৃত হচ্ছে এবং ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে।
সংশ্লিষ্টদের আশা, রোপওয়ের পাশাপাশি বন সংরক্ষণ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে মধুপুরের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
ছবি: Antar Kubi / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বাংলা টিভি, দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস, বাসস, উইকিপিডিয়া (মধুপুর জাতীয় উদ্যান, মুখপোড়া হনুমান)





মন্তব্য
(০)