সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ১৬ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা২৬°পরিষ্কার আকাশআর্দ্রতা ৭৪%বাতাস ৩ কিমি/ঘ

মরুকরণ ও খরা প্রতিরোধ দিবস: আগাম সতর্কতায় বাঁচে জীবন ও সম্পদ

২০২৬ সালের মরুকরণ ও খরা প্রতিরোধ দিবসের প্রতিপাদ্য চারণভূমি, আয়োজক কেনিয়া। জাতিসংঘের হিসাবে বিশ্বের ৪০ শতাংশ পর্যন্ত ভূমি অবনত, আর ২০৫০ সাল নাগাদ খরা তিন-চতুর্থাংশের বেশি মানুষকে প্রভাবিত করতে পারে; বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা বলছে, আগাম সতর্কতা জীবন বাঁচায়।

মরুকরণ ও খরা প্রতিরোধ দিবস: আগাম সতর্কতায় বাঁচে জীবন ও সম্পদ
পরিবেশ

প্রতি বছর ১৭ জুন পালিত হয় বিশ্ব মরুকরণ ও খরা প্রতিরোধ দিবস। ২০২৬ সালে দিবসটির বৈশ্বিক আয়োজক দেশ কেনিয়া, আর এবারের প্রতিপাদ্য "চারণভূমি: স্বীকৃতি, সম্মান, পুনরুদ্ধার" (Rangelands: Recognize. Respect. Restore.)। জাতিসংঘের মরুকরণ প্রতিরোধ কনভেনশন (ইউএনসিসিডি) দিবসটির নেতৃত্ব দেয়। জাতিসংঘের ভাষায়, মরুকরণ আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় পরিবেশগত চ্যালেঞ্জগুলোর একটি। পৃথিবীর শুষ্ক অঞ্চলের বাস্তুতন্ত্রের ওপর প্রায় ২০০ কোটি মানুষ নির্ভরশীল, যাঁদের ৯০ শতাংশই উন্নয়নশীল দেশে থাকেন।

জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর হিসাব বলছে, পৃথিবীর ৪০ শতাংশ পর্যন্ত ভূমি এরই মধ্যে অবনতির শিকার, আর ২০৫০ সাল নাগাদ খরা বিশ্বের তিন-চতুর্থাংশের বেশি মানুষকে প্রভাবিত করতে পারে। খাদ্য নিরাপত্তা, পানি আর জীবিকার ওপর এই চাপের মধ্যে একটি বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা একমত: সংকট আসার আগেই প্রস্তুতি, অর্থাৎ আগাম সতর্কতা ও ঝুঁকিভিত্তিক ব্যবস্থাপনা, মানুষের জীবন ও সম্পদ বাঁচায়। ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা তার বড় উদাহরণ, আর দেশের উত্তর-পশ্চিমের খরাপ্রবণ বরেন্দ্র অঞ্চল দেখায়, ভূমি ও পানির সংকট এ দেশেও কতটা বাস্তব।

মরুকরণ আসলে কী


মরুকরণ মানে মরুভূমির এগিয়ে আসা নয়, যদিও কোথাও কোথাও বালিয়াড়ি কৃষিজমিতে ঢুকে পড়তে পারে। জাতিসংঘের ব্যাখ্যায়, মরুকরণ হলো শুষ্ক অঞ্চলের বাস্তুতন্ত্রের ধারাবাহিক অবনতি, যার পেছনে আছে জলবায়ু পরিবর্তন এবং প্রধানত মানুষের কর্মকাণ্ড। মাটির পুষ্টি নিঃশেষ করে ফেলা অটেকসই চাষাবাদ, খনন, অতিরিক্ত পশুচারণ (পশু ঘাস খেয়ে ফেলে এবং খুরের আঘাতে ওপরের মাটি আলগা করে দেয়) এবং মাটি ধরে রাখা গাছপালা কেটে ফেলা এর প্রধান কারণ। জ্বালানি কাঠ, কাঠের ব্যবসা বা চাষের জমি বের করতে গাছ ও ঝোপ উজাড় হলেও একই ঘটনা ঘটে।

এরপর বাতাস ও পানির ক্ষয় পরিস্থিতি আরও খারাপ করে। এগুলো মাটির উর্বর ওপরের স্তর বয়ে নিয়ে যায়, পড়ে থাকে ধুলা আর বালির অনুর্বর মিশ্রণ। এসব কারণ একসঙ্গে কাজ করেই অবনত জমিকে মরুভূমির মতো করে তোলে। জাতিসংঘ বলছে, আজ আবাদযোগ্য জমির অবনতির গতি ঐতিহাসিক হারের ৩০ থেকে ৩৫ গুণ। শুষ্ক অঞ্চল বলতে বোঝানো হয় শুষ্ক, আধা-শুষ্ক এবং শুষ্ক উপ-আর্দ্র এলাকা, যেখানে সবচেয়ে নাজুক কিছু বাস্তুতন্ত্র ও জনগোষ্ঠীর বাস।

বিষয়টি নতুন নয়। ১৯৯২ সালের রিও ধরিত্রী সম্মেলনে জলবায়ু পরিবর্তন ও জীববৈচিত্র্য হ্রাসের সঙ্গে মরুকরণকেও টেকসই উন্নয়নের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। দুই বছর পর, ১৯৯৪ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ মরুকরণ প্রতিরোধ কনভেনশন প্রতিষ্ঠা করে এবং A/RES/49/115 প্রস্তাবের মাধ্যমে ১৭ জুনকে বিশ্ব মরুকরণ ও খরা প্রতিরোধ দিবস ঘোষণা করে। পরিবেশ ও উন্নয়নকে টেকসই ভূমি ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত করা আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক আন্তর্জাতিক চুক্তি এটিই একমাত্র। ২০০৭ সালে সাধারণ পরিষদ ২০১০ থেকে ২০২০ সালকে মরুভূমি ও মরুকরণ প্রতিরোধ দশক ঘোষণা করে। কনভেনশনের ১৯৭টি পক্ষের মধ্যে ১৬৯টি মরুকরণে আক্রান্ত।

মরুকরণ ঠেকাতে জাতিসংঘ যেসব পদক্ষেপের কথা বলে, তার মধ্যে আছে পানি ব্যবস্থাপনা (পানি সাশ্রয়, শোধিত পানির পুনর্ব্যবহার, বৃষ্টির পানি ধরে রাখা), বালির বেড়া, গাছের সারি দিয়ে বায়ুরোধী বেষ্টনী ও ছোট বনায়ন দিয়ে মাটিকে সুরক্ষা দেওয়া, এবং কৃষক-পরিচালিত প্রাকৃতিক পুনর্জন্ম (এফএমএনআর)। শেষোক্ত পদ্ধতিতে ঝোপের ডাল বেছে বেছে ছেঁটে দেশি গাছকে আবার বড় হতে দেওয়া হয়, আর ছাঁটা ডালপালা জমিতে আচ্ছাদন হিসেবে ব্যবহার করে মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখা যায়।

বিশ্বের ৪০ শতাংশ পর্যন্ত ভূমি অবনত


ইউএনসিসিডির দ্বিতীয় গ্লোবাল ল্যান্ড আউটলুক (জিএলও২) প্রকাশিত হয় ২০২২ সালের এপ্রিলের শেষে। ২১টি সহযোগী সংস্থার সঙ্গে পাঁচ বছর ধরে তৈরি এবং এক হাজারের বেশি তথ্যসূত্রের ওপর দাঁড়ানো এই প্রতিবেদন বলছে, পৃথিবীর ৪০ শতাংশ পর্যন্ত ভূমি এরই মধ্যে অবনত। এর প্রভাব সরাসরি পড়ছে মানবজাতির অর্ধেকের ওপর, আর ঝুঁকিতে আছে বিশ্বের মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় অর্ধেক, অর্থাৎ ৪৪ লাখ কোটি মার্কিন ডলার।

প্রতিবেদনের তিনটি দৃশ্যকল্প পরিস্থিতির গুরুত্ব স্পষ্ট করে। সবকিছু যেমন চলছে তেমন চললে ২০৫০ সাল নাগাদ দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশের সমান আয়তনের আরও ভূমি অবনত হবে, এবং কৃষি, চারণ ও পশুখাদ্যের জমির ১২ থেকে ১৪ শতাংশে উৎপাদনশীলতা স্থায়ীভাবে কমতে থাকবে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে সাব-সাহারান আফ্রিকা। উল্টো দিকে, ভূমি পুনরুদ্ধারের দৃশ্যকল্পে ২০৫০ সাল নাগাদ উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ফসলের ফলন ৫ থেকে ১০ শতাংশ বাড়তে পারে, জীববৈচিত্র্যের ক্ষতির ১১ শতাংশ এড়ানো যেতে পারে এবং মাটি ও গাছপালায় ১৭ গিগাটন বাড়তি কার্বন জমা হতে পারে।

দেশগুলো ২০৩০ সালের মধ্যে ১০০ কোটি হেক্টর অবনত জমি পুনরুদ্ধারের অঙ্গীকার করেছে। জিএলও২ অনুযায়ী, এই অঙ্গীকার পূরণে চলতি দশকে প্রয়োজন ১ দশমিক ৬ লাখ কোটি মার্কিন ডলার। জাতিসংঘের হিসাবে, ভূমি পুনরুদ্ধারে বিনিয়োগ করা প্রতি ১ ডলার থেকে ৩০ ডলার পর্যন্ত ফেরত আসতে পারে, আর সংরক্ষণশীল কৃষি খরার সময় ফসলের পানির চাহিদা ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে পারে। মরুকরণ, ভূমির অবনতি ও খরায় আক্রান্ত অনেক দেশের অর্থনীতিতে কৃষির অংশ বড়, তাই জমির স্বাস্থ্য সেখানে সরাসরি আয়ের প্রশ্ন।

খরা: সংখ্যায় ও মেয়াদে দুই দিকেই বাড়ছে


২০২২ সালের ১১ মে আইভরি কোস্টের আবিদজানে ইউএনসিসিডির ১৫তম পক্ষ সম্মেলনে (কপ১৫) প্রকাশিত "ড্রট ইন নাম্বারস ২০২২" প্রতিবেদনে খরার একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরা হয়। এর প্রধান তথ্যগুলো হলো:

  • ২০০০ সালের পর থেকে খরার সংখ্যা ও স্থায়িত্ব ২৯ শতাংশ বেড়েছে।
  • ১৯৭০ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে আবহাওয়া, জলবায়ু ও পানিসংক্রান্ত বিপদ মোট দুর্যোগের ৫০ শতাংশ এবং দুর্যোগজনিত মৃত্যুর ৪৫ শতাংশের জন্য দায়ী ছিল, যার বেশির ভাগ উন্নয়নশীল দেশে।
  • প্রাকৃতিক দুর্যোগের মাত্র ১৫ শতাংশ খরা হলেও মানুষের প্রাণহানি এতেই সবচেয়ে বেশি: ১৯৭০ থেকে ২০১৯ সালে প্রায় ৬ লাখ ৫০ হাজার মৃত্যু।
  • ১৯৯৮ থেকে ২০১৭ সালে খরায় বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক ক্ষতি প্রায় ১২ হাজার ৪০০ কোটি মার্কিন ডলার।
  • ২০২২ সালে ২৩০ কোটির বেশি মানুষ পানির চাপে ছিলেন, আর প্রায় ১৬ কোটি শিশু তীব্র ও দীর্ঘ খরার মুখে।
  • ২০৩০ সালের মধ্যে আনুমানিক ৭০ কোটি মানুষ খরার কারণে বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বেন।
  • ২০৫০ সাল নাগাদ খরা বিশ্বের তিন-চতুর্থাংশের বেশি মানুষকে প্রভাবিত করতে পারে, আর ৪৮০ থেকে ৫৭০ কোটি মানুষ এমন এলাকায় থাকবেন যেখানে বছরে অন্তত এক মাস পানির সংকট থাকে।

প্রতিবেদনটি আরও বলছে, খরা ও মরুকরণে প্রতি বছর প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ হেক্টর জমি হারিয়ে যায়। গত এক শতাব্দীতে খরায় সবচেয়ে বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন এশিয়ায়। তীব্র খরা ভারতের মোট দেশজ উৎপাদন ২ থেকে ৫ শতাংশ কমিয়েছে বলে অনুমান করা হয়। ২০০০ থেকে ২০১৯ সালে ১৪০ কোটির বেশি মানুষ খরায় আক্রান্ত হন, যা বন্যার পরেই সবচেয়ে বেশি মানুষকে আক্রান্ত করা দুর্যোগ। শুষ্ক অঞ্চলে পানি সংগ্রহের বোঝা বেশির ভাগ বইতে হয় নারী (৭২ শতাংশ) ও মেয়েশিশুদের (৯ শতাংশ)।

সে সময় ইউএনসিসিডির তৎকালীন নির্বাহী সচিব ইব্রাহিম থিয়াও বলেছিলেন, "আমরা এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি। প্রান্তিক পরিবর্তনে কাঠামোগত ব্যর্থতা সারবে, এই বিশ্বাসে ধ্বংসাত্মক কাজ চালিয়ে না গিয়ে আমাদের সমাধানের দিকে এগোতে হবে।" তাঁর মতে, ভূমি পুনরুদ্ধার সবচেয়ে ভালো ও সর্বাঙ্গীণ সমাধানগুলোর একটি, কারণ এটি পানিচক্রের অবনতি ও মাটির উর্বরতা হারানোর মূল কারণগুলোর মোকাবিলা করে। তিনি খরা ব্যবস্থাপনায় "প্রতিক্রিয়াশীল" ও "সংকটভিত্তিক" পদ্ধতি থেকে সরে "আগাম" ও "ঝুঁকিভিত্তিক" পদ্ধতিতে যাওয়ার ওপর জোর দেন।

প্রতিবেদনে সুপারিশ করা পদক্ষেপগুলোর মধ্যে ছিল সীমান্ত পেরিয়ে কাজ করে এমন কার্যকর আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা, সমন্বিত খরা কর্মপরিকল্পনা এবং স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণের মতো নতুন প্রযুক্তি। উদাহরণ হিসেবে প্রতিবেদনে আইটিআইকেআই (ITIKI) নামের একটি খরা আগাম সতর্কতা ব্যবস্থার কথা আছে, যা আদিবাসী জ্ঞান ও খরার পূর্বাভাসকে একসঙ্গে ব্যবহার করে ক্ষুদ্র কৃষককে কখন কোন ফসল লাগাবেন সে সিদ্ধান্তে সাহায্য করে। মোজাম্বিক, কেনিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকায় পরীক্ষায় এর মডেল চার বছর পর্যন্ত আগাম ৭০ থেকে ৯৮ শতাংশ নির্ভুলতা দেখিয়েছে। ইউএনসিসিডি খরাপ্রবণ প্রায় ৭০টি দেশকে জাতীয় খরা পরিকল্পনা তৈরিতে সহায়তা করছে, যাতে খরা সংকটে পরিণত হওয়ার আগেই কখন ও কীভাবে সাড়া দিতে হবে তা ঠিক করা থাকে। ২০২২ সালের নভেম্বরে মিসরে জাতিসংঘ জলবায়ু সম্মেলনে (কপ২৭) স্পেন ও সেনেগালের নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক খরা সহনশীলতা জোট (আইডিআরএ) আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে।

খরায় শুকিয়ে ফেটে যাওয়া মাটি; প্রতীকী ছবি। ছবি: Atmospheric Research, CSIRO / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 3.0)
খরায় শুকিয়ে ফেটে যাওয়া মাটি; প্রতীকী ছবি। ছবি: Atmospheric Research, CSIRO / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 3.0)

এবারের প্রতিপাদ্য চারণভূমি, আয়োজক কেনিয়া


২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর নাইরোবি ও বনে কেনিয়া সরকার ও ইউএনসিসিডি যৌথভাবে ঘোষণা দেয়, ২০২৬ সালের দিবসটির বৈশ্বিক আয়োজন হবে কেনিয়ায়। প্রায় এক দশকের মধ্যে এই প্রথম আফ্রিকা মহাদেশ দিবসটির বৈশ্বিক আয়োজক। এর আগের আয়োজক ছিল কলম্বিয়া (২০২৫), জার্মানি (২০২৪), যুক্তরাষ্ট্র (২০২৩), স্পেন (২০২২), কোস্টারিকা (২০২১), দক্ষিণ কোরিয়া (২০২০), তুরস্ক (২০১৯), ইকুয়েডর (২০১৮), বুরকিনা ফাসো (২০১৭) ও চীন (২০১৬)। জাতিসংঘ ২০২৬ সালকে আন্তর্জাতিক চারণভূমি ও যাযাবর পশুপালক বর্ষ ঘোষণা করেছে, আর দিবসের প্রতিপাদ্যও সেই বর্ষের সঙ্গে মিলিয়ে ঠিক করা হয়েছে।

ইউএনসিসিডির তথ্যমতে, চারণভূমি পৃথিবীর স্থলভাগের অর্ধেকের বেশি জুড়ে আছে এবং প্রায় ২০০ কোটি মানুষের জীবন টিকিয়ে রাখে, যাঁদের মধ্যে আছেন ৫০ কোটি যাযাবর পশুপালক। বিশ্বে পশুখাদ্যের প্রায় ৭০ শতাংশ আসে চারণভূমি থেকে। অথচ বিশ্বের চারণভূমির অর্ধেক পর্যন্ত অবনত বা ঝুঁকিতে। ইউএনসিসিডির সাম্প্রতিক কারিগরি মূল্যায়ন বলছে, চারণভূমি পুনরুদ্ধারে প্রতি ১ ডলার বিনিয়োগে ৩৫ ডলার পর্যন্ত ফেরত আসতে পারে। কেনিয়ার প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকাই চারণভূমি, যা মূলত পশুপালনের মাধ্যমে লাখো মানুষের জীবিকা জোগায়।

দিবসটির তিন শব্দের আহ্বানের ব্যাখ্যাও দিয়েছে সংস্থাটি। স্বীকৃতি মানে জাতীয় ও আঞ্চলিক অর্থনীতিতে চারণভূমির অবদান, বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এর ভূমিকা এবং পানিচক্র নিয়ন্ত্রণ থেকে কার্বন ধরে রাখা পর্যন্ত এর নানা সুফলকে মূল্য দেওয়া। সম্মান মানে যাযাবর পশুপালক, আদিবাসী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর চলাচল, প্রথাগত শাসনব্যবস্থা ও পরিবেশজ্ঞানকে মর্যাদা দেওয়া, যা এসব ভূপ্রকৃতিকে সুস্থ রাখে। আর পুনরুদ্ধার মানে টেকসই ভূমি ও পানি ব্যবস্থাপনা, খরা প্রস্তুতি এবং জনগোষ্ঠী-নেতৃত্বাধীন পুনরুদ্ধারে বিনিয়োগ।

ইউএনসিসিডির নির্বাহী সচিব ইয়াসমিন ফুয়াদ ঘোষণার দিন বলেন, "এই ভূপ্রকৃতি খাদ্য, পানি, জীববৈচিত্র্য ও জলবায়ু সহনশীলতার জন্য অপরিহার্য। চারণভূমির মূল্য স্বীকার করে, এর প্রথাগত রক্ষকদের সম্মান করে এবং একে আবার সুস্থ করে তুলে আমরা ২০০ কোটি মানুষের জীবিকা শক্তিশালী করতে পারি।" তিনি আরও বলেন, বিশ্বের চারণভূমির অর্ধেক পর্যন্ত অবনত, কিছু চারণভূমি রেইনফরেস্টের চেয়েও দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে। মিসরের পরিবেশমন্ত্রী হিসেবে ২০১৮ সাল থেকে দায়িত্ব পালন করা ইয়াসমিন ফুয়াদকে ২০২৫ সালে জাতিসংঘ মহাসচিব ইউএনসিসিডির পঞ্চম নির্বাহী সচিব নিয়োগ দেন; তিনি মৌরিতানিয়ার ইব্রাহিম থিয়াওর উত্তরসূরি। ইউএনসিসিডির পরবর্তী পক্ষ সম্মেলন, কপ১৭, ২০২৬ সালের আগস্টে মঙ্গোলিয়ায় হওয়ার কথা।

কেনিয়ার নারক কাউন্টিতে মাসাই মারার কাছে চারণভূমিতে গরু, জুন ২০১৮। ছবি: Kandukuru Nagarjun / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 2.0)
কেনিয়ার নারক কাউন্টিতে মাসাই মারার কাছে চারণভূমিতে গরু, জুন ২০১৮। ছবি: Kandukuru Nagarjun / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 2.0)

মাটি ফেরানোর কৌশল: হাফ-মুন থেকে গ্রেট গ্রিন ওয়াল


আফ্রিকার সাহেল অঞ্চলের কৃষকেরা প্রায়ই দুর্বল মাটি, অনিয়মিত বৃষ্টি আর দীর্ঘ খরার মুখে পড়েন। সেখানে ঐতিহ্যবাহী একটি পদ্ধতি নতুন করে কাজে লাগানো হচ্ছে, যার নাম "হাফ-মুন" বা অর্ধচন্দ্রাকৃতির গর্ত। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) ব্যাখ্যায়, এই অর্ধচন্দ্রাকৃতির খাঁজ বৃষ্টির পানি গড়িয়ে যেতে দেয় না, পানিকে মাটিতে চুঁইয়ে ঢুকতে সাহায্য করে এবং মাটিকে বেশি দিন আর্দ্র রাখে। এতে বীজ ও চারা বেড়ে ওঠার মতো অনুকূল ক্ষুদ্র পরিবেশ তৈরি হয়। স্থানীয় জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরেই জানে, শুকনো মৌসুমের জন্য বৃষ্টির পানি ধরে রাখার সবচেয়ে ভালো উপায় এটি।

এফএওর মরুকরণবিরোধী কর্মসূচির (অ্যাকশন অ্যাগেইনস্ট ডেজার্টিফিকেশন) আওতায় বুরকিনা ফাসো, নাইজার, নাইজেরিয়া ও সেনেগালে "ডেলফিনো" নামের একটি ভারী লাঙল ব্যবহার করা হয়েছে, যা শক্ত, শুকনো মাটি আধা মিটারের বেশি গভীরে কাটতে পারে। ২০২২ সালের জানুয়ারিতে জাতিসংঘের সংবাদ বিভাগের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, হাতে খুঁড়লে ১০০ জন কৃষক দিনে প্রায় এক হেক্টর জমিতে কাজ করতে পারেন, আর ট্রাক্টরে জোড়া ডেলফিনো দিনে ১৫ থেকে ২০ হেক্টর জমি প্রস্তুত করে। এটি বড় আকারের হাফ-মুন তৈরি করে বৃষ্টির পানি সংগ্রহ দশ গুণ বাড়ায়। চাষের পর সেখানে খরা সহনশীল দেশি গাছ ও ঘাসের বীজ সরাসরি বোনা হয়। কর্মসূচির সমন্বয়ক মোক্তার সাকান্দে জানান, দুই বছরের মধ্যেই সেখানে হাঁটু-সমান উঁচু পশুখাদ্যের ঘাস জন্মেছে, যা দিয়ে মানুষ গবাদিপশু খাওয়াতে ও বাড়তি অংশ বিক্রি করতে পারছেন। হাতে হাফ-মুন খোঁড়ার মৌসুমে পুরুষেরা পশু নিয়ে অন্যত্র চলে যান বলে এই কঠিন কাজের ভার পড়ে নারীদের ওপর; যন্ত্র সেই চাপ কমায়।

সাহেলের সবচেয়ে বড় উদ্যোগ হলো আফ্রিকান নেতৃত্বাধীন "গ্রেট গ্রিন ওয়াল"। ইউএনসিসিডির তথ্য অনুযায়ী, এটি সাহারা মরুভূমির দক্ষিণ প্রান্ত বরাবর আটলান্টিক উপকূলের সেনেগাল থেকে লোহিত সাগরের তীরে জিবুতি পর্যন্ত ৮ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ একটি সবুজ বেষ্টনী, যা ১১টি দেশজুড়ে ১০ কোটি হেক্টর জমি নিয়ে গঠিত হওয়ার কথা। ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ কোটি হেক্টর অবনত জমি পুনরুদ্ধার করা গেলে আনুমানিক ১ কোটি কর্মসংস্থান তৈরি হবে এবং বায়ুমণ্ডল থেকে ২৫ কোটি টন কার্বন ডাই-অক্সাইড মাটিতে আটকে রাখা যাবে। শেষ হলে এটি হবে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় জীবন্ত কাঠামো, আকারে গ্রেট ব্যারিয়ার রিফের তিন গুণ।

উদ্যোগটির গতি বাড়াতে ২০২১ সালের জানুয়ারিতে প্যারিসে ওয়ান প্ল্যানেট সামিটে "গ্রেট গ্রিন ওয়াল অ্যাক্সিলারেটর" ঘোষণা করা হয়। শুরুতে ১ হাজার ৪৩০ কোটি ডলারের প্রতিশ্রুতি ২০২১ সালের অক্টোবরের মধ্যে বেড়ে ১ হাজার ৯০০ কোটি ডলারে দাঁড়ায়। তবে সেই প্রতিশ্রুতিকে মাঠের কাজে রূপ দেওয়ায় বাধা ছিল। ২০২১ সালের অক্টোবরে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মন্ত্রী ও অংশীদারেরা বৈঠকে বসে প্রতিশ্রুত অর্থ পাওয়া ও ফলাফল পর্যবেক্ষণ সহজ করতে পাঁচ স্তম্ভের একটি সমন্বিত ফলাফল কাঠামো, প্রতিটি দেশে বহু পক্ষের জাতীয় ফোরাম এবং স্থানীয় সক্ষমতা বাড়ানোর প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করেন। তখনকার নির্বাহী সচিব ইব্রাহিম থিয়াও বলেছিলেন, "এটা করা সম্ভব। এটা করতেই হবে।"

বাংলাদেশের খরাপ্রবণ বরেন্দ্র অঞ্চল


মরুকরণ ও খরার আলোচনা শুধু আফ্রিকার বিষয় নয়। বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমের বরেন্দ্রভূমি দেশের সবচেয়ে বড় প্লাইস্টোসিন যুগের ভূ-একক, যার আয়তন প্রায় ৭ হাজার ৭৭০ বর্গকিলোমিটার। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, এর পূর্বে করতোয়া, পশ্চিমে মহানন্দা এবং দক্ষিণে গঙ্গার উত্তর তীর। বৃহত্তর দিনাজপুর, রংপুর, পাবনা, রাজশাহী, বগুড়া, জয়পুরহাট ও নওগাঁর বড় অংশ এর মধ্যে পড়ে। এখানকার লালচে বাদামি, আঁটসাঁট মধুপুর (বরেন্দ্র) কাদামাটি এবং আশপাশের প্লাবনভূমির চেয়ে উঁচু অবস্থান এলাকাটিকে বন্যামুক্ত রাখে, তাই ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণের প্রধান উৎস বৃষ্টি।

বাংলাপিডিয়ার হিসাবে বরেন্দ্রের গড় বৃষ্টিপাত প্রায় ১ হাজার ৯৭১ মিলিমিটার, তবে বছরভেদে ব্যাপক তারতম্য হয়: ১৯৮১ সালে প্রায় ১ হাজার ৭৩৮ মিলিমিটার বৃষ্টি হলেও ১৯৯২ সালে হয় মাত্র ৭৯৮ মিলিমিটার। অঞ্চলটিকে খরাপ্রবণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং তুলনামূলক গরম ও আধা-শুষ্ক বলে বিবেচনা করা হয়; গ্রীষ্মে রাজশাহী এলাকায়, বিশেষ করে লালপুরে, তাপমাত্রা প্রায় ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি ওঠে। ২০২৪ সালের হেলিয়ন সাময়িকীর এক গবেষণায় বরেন্দ্রকে দেশের সবচেয়ে খরাক্রান্ত অঞ্চল বলা হয়েছে; এতে বরেন্দ্রের কেন্দ্রে বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত ১ হাজার ৬২৫ মিলিমিটার উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে জাতীয় গড় ২ হাজার ৫৫০ মিলিমিটার।

বনভূমির ক্ষয়ও এখানে বড় পরিবর্তন এনেছে। বাংলাপিডিয়া বলছে, ১৮৪৯ সাল থেকে ভূমি জরিপের পরিসংখ্যানে বরেন্দ্রের প্রায় ৫৫ শতাংশ জমি বনে ঢাকা ছিল, কিন্তু ১৯৭৪ সালের মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ জমি আবাদি জমিতে পরিণত হয়। ব্যাপক বন উজাড়ে অঞ্চলটি প্রায় শুষ্ক হয়ে পড়ে এবং স্যাটেলাইট ছবিতে গরম, শুষ্ক ভূমি হিসেবে ধরা পড়ে। একসময় এখানে বছরে একটি ফসল হতো এবং এলাকাটি খাদ্যঘাটতির অঞ্চল ছিল। ১৯৮০-র দশকের মাঝামাঝি বরেন্দ্র সমন্বিত এলাকা উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে গভীর নলকূপে সেচ শুরু হয়, যা পরে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) হয়।

সেচে ফলন বেড়েছে, কিন্তু চাপ পড়েছে ভূগর্ভস্থ পানিতে। ২০২০ সালের মার্চে ডায়ালগ আর্থের প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৮৫ সাল থেকে বিএমডিএ প্রায় ১৬ হাজার গভীর নলকূপে পানি তুলে সেচ দিচ্ছে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোলে পানির স্তর ১৯৮০ সালের সাড়ে ৩ মিটার থেকে ২০১৭ সালে ২৫ মিটারে নেমে যায়। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) হিসাবে এক কেজি বোরো ধান উৎপাদনে প্রায় ৩ হাজার লিটার পানি লাগে, যেখানে গম ও ভুট্টায় লাগে যথাক্রমে প্রায় ৪০০ ও ৬০০ লিটার। পানির স্তর রক্ষায় ২০১৪ সাল থেকে বিএমডিএ শুষ্ক মৌসুমে সেচ রেশনিং করছে।

২০২৬ সালের এপ্রিলে মোঙ্গাবের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পানিসম্পদ পরিকল্পনা সংস্থার (ওয়ারপো) পরামর্শে সরকার ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে চাঁপাইনবাবগঞ্জের ৫টি, রাজশাহীর ১০টি ও নওগাঁর ১০টি, মোট ২৫টি উপজেলাকে পানিসংকটপূর্ণ এলাকা ঘোষণা করে। এক পরিপত্রে কৃষকদের বেশি সেচনির্ভর বোরো চাষ কমাতে বলা হয়, তবে খাদ্য উৎপাদনের ওপর তাৎক্ষণিক প্রভাব বিবেচনায় পরে সাময়িকভাবে সেচ চালু রাখার মৌখিক নির্দেশনা দেওয়া হয় বলে বিএমডিএর একজন কর্মকর্তা জানান। বাংলাদেশ রাইস নলেজ ব্যাংকের তথ্য উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, পর্যায়ক্রমে ভেজানো ও শুকানো (এডব্লিউডি) পদ্ধতিতে ধানে প্রায় ৩০ শতাংশ কম সেচ লাগে। এলাকার কৃষকদের একাংশ এরই মধ্যে কম পানির সবজি ও ফলবাগানের দিকে ঝুঁকছেন।

জলবায়ু বাস্তুচ্যুতি ও অভিযোজন অর্থায়নে বাংলাদেশের দাবি


খরা, লবণাক্ততা, নদীভাঙন ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি মিলিয়ে জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশের মানুষকে ঘরছাড়া করতে পারে, এই উদ্বেগ বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মঞ্চে বারবার তুলেছে। ২০২২ সালের ১৪ নভেম্বর মিসরের শারম আল-শেখে কপ২৭ সম্মেলনের ফাঁকে ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরামের (সিভিএফ) প্যাভিলিয়নে বাংলাদেশ সরকার ও আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) জলবায়ু পরিবর্তন ও মানুষের স্থানান্তর নিয়ে একটি আলোচনার আয়োজন করে। সেখানে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে অভিবাসন ও বাস্তুচ্যুতি ঘটছে এবং জলবায়ুজনিত অভিবাসনসহ ক্ষয়ক্ষতির ভয়াবহতা স্বীকৃতি দেওয়ার ক্ষেত্রে বৈশ্বিকভাবে উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়েছে। আলোচনায় বন্যা, ঝড়, নদীভাঙন ও লবণাক্ততার উচ্চ ঝুঁকির কারণে বাংলাদেশকে জলবায়ু পরিবর্তনে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি হিসেবে তুলে ধরা হয়।

বিশ্বব্যাংকের হালনাগাদ "গ্রাউন্ডসোয়েল" প্রতিবেদন (সেপ্টেম্বর ২০২১) অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বের ছয়টি অঞ্চলে ২১ কোটি ৬০ লাখ মানুষ নিজ দেশের ভেতরে স্থানান্তরিত হতে বাধ্য হতে পারেন। এর মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ায় এই সংখ্যা ৪ কোটি পর্যন্ত হতে পারে। পানির সংকট, ফসলের উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়া এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এর প্রধান চালক। একই প্রতিবেদন বলছে, দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ নিলে জলবায়ুজনিত অভিবাসন ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব।

কপ২৭ সম্মেলনের উচ্চপর্যায়ের অধিবেশনে ২০২২ সালের ১৫ নভেম্বর তৎকালীন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী শাহাব উদ্দিন উন্নত দেশগুলোর প্রতি গ্লাসগোর কপ২৬-এ সম্মত হওয়া অনুযায়ী ২০২৫ সালের মধ্যে অভিযোজন অর্থায়ন অন্তত দ্বিগুণ করার আহ্বান জানান। তিনি বছরে ১০ হাজার কোটি ডলার জলবায়ু অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি রক্ষা এবং তার বড় অংশ সরকারি তহবিল থেকে অভিযোজনে দেওয়ার দাবি করেন। ২০৩০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণ ৪৫ শতাংশ কমাতে প্রয়োজনীয় প্রশমন কর্মসূচি চূড়ান্ত করার কথাও তিনি বলেন। তাঁর ভাষায়, বৈশ্বিক নিঃসরণে ০ দশমিক ৪৮ শতাংশেরও কম অবদান রাখা বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের নিরপরাধ শিকার, আর গবেষণা অনুযায়ী এই শতাব্দীতে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিতে দেশের ১২ থেকে ১৭ শতাংশ এলাকা তলিয়ে যেতে পারে।

মন্ত্রী জানান, ২০২২ সালের ৩১ অক্টোবর বাংলাদেশ জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক কাঠামো সনদে (ইউএনএফসিসিসি) জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (ন্যাপ) জমা দেয়। এতে ৮টি ঝুঁকিপূর্ণ খাতের জন্য ১১৩টি পদক্ষেপ চিহ্নিত করা হয়েছে, যা ২০২৩ থেকে ২০৫০ সাল পর্যন্ত ২৭ বছরে বাস্তবায়নে ২৩ হাজার কোটি মার্কিন ডলার লাগবে। নিজস্ব অর্থে গঠিত বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডে ৪৯ কোটি ডলার বরাদ্দ দিয়ে ৮৫০টির বেশি প্রকল্পে সহায়তা দেওয়া হয়েছে এবং আট বছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে জলবায়ু-সংশ্লিষ্ট বরাদ্দ ১৪০ কোটি থেকে বেড়ে ৩১০ কোটি ডলারের বেশি হয়েছে বলেও তিনি জানান। পরিকল্পনাটি তৈরি করে সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেস (সিইজিআইএস)। ২০২২ সালের অক্টোবরে ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের এক প্রতিবেদনে সংস্থাটির হিসাব উল্লেখ করে বলা হয়, জলবায়ু পরিবর্তনে বাংলাদেশ প্রতি বছর মোট দেশজ উৎপাদনের ১ দশমিক ৩ শতাংশ হারায়, আর কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই ক্ষতি ২০৩০ সালে ২ শতাংশ ছাড়াতে এবং ২০৫০ সালে ৯ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।

আগাম সতর্কতা যেভাবে জীবন বাঁচায়


খরা হোক বা ঘূর্ণিঝড়, আগাম সতর্কতার মূল্য সবচেয়ে স্পষ্ট দেখা যায় প্রাণহানির পরিসংখ্যানে। ২০২৩ সালের মে মাসে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) জানায়, ১৯৭০ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে আবহাওয়া, জলবায়ু ও পানিসংক্রান্ত চরম ঘটনায় বিশ্বে ১১ হাজার ৭৭৮টি দুর্যোগ ঘটেছে, যাতে ২০ লাখের কিছু বেশি মানুষ মারা গেছেন এবং অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে ৪ দশমিক ৩ লাখ কোটি ডলার। মৃত্যুর ৯০ শতাংশের বেশি ঘটেছে উন্নয়নশীল দেশে। অর্থনৈতিক ক্ষতি বেড়েছে, কিন্তু উন্নত আগাম সতর্কতা ও সমন্বিত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় গত অর্ধশতাব্দীতে প্রাণহানি অনেক কমেছে। ২০২০ ও ২০২১ সালে নথিভুক্ত মৃত্যু (মোট ২২ হাজার ৬০৮) আগের দশকের বার্ষিক গড়ের চেয়েও কম ছিল। অঞ্চলভিত্তিক হিসাব:

  • আফ্রিকা: ১ হাজার ৮৩৯টি দুর্যোগ, ৭ লাখ ৩৩ হাজার ৫৮৫ জনের মৃত্যু এবং ৪ হাজার ৩০০ কোটি ডলারের ক্ষতি। এখানে মৃত্যুর ৯৫ শতাংশের কারণ খরা। ২০১৯ সালের মার্চের ঘূর্ণিঝড় ইদাই ছিল আফ্রিকার সবচেয়ে ব্যয়বহুল দুর্যোগ (২১০ কোটি ডলার)।
  • এশিয়া: ৩ হাজার ৬১২টি দুর্যোগ, ৯ লাখ ৮৪ হাজার ২৬৩ জনের মৃত্যু এবং ১ দশমিক ৪ লাখ কোটি ডলারের ক্ষতি। বিশ্বের মোট মৃত্যুর ৪৭ শতাংশ এশিয়ায়, যার প্রধান কারণ ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড়।
  • দক্ষিণ-পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল: ১ হাজার ৪৯৩টি দুর্যোগ, ৬৬ হাজার ৯৫১ জনের মৃত্যু এবং ১৮ হাজার ৫৮০ কোটি ডলারের ক্ষতি; এখানেও মৃত্যুর প্রধান কারণ ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড়।

ডব্লিউএমওর তথ্যে এশিয়ায় সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে বাংলাদেশে: ২৮১টি দুর্যোগে ৫ লাখ ২০ হাজার ৭৫৮ জন। এই পটভূমিতে সংস্থাটির তৎকালীন মহাসচিব পেত্তেরি তালাস ২০২৩ সালের মে মাসে বলেন, সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকেই আবহাওয়া, জলবায়ু ও পানিসংক্রান্ত বিপদের ধাক্কা সবচেয়ে বেশি সইতে হয়, আর অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় মোখা তার উদাহরণ, যা মিয়ানমার ও বাংলাদেশে ব্যাপক ক্ষতি করেছে। তিনি বলেন, "অতীতে মিয়ানমার ও বাংলাদেশ দুই দেশেই দুর্যোগে হাজার হাজার, এমনকি লাখো মানুষের মৃত্যু হয়েছে। আগাম সতর্কতা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার কল্যাণে এমন বিপর্যয়কর মৃত্যুহার এখন ইতিহাস। আগাম সতর্কতা জীবন বাঁচায়।"

জাতিসংঘের বাংলাদেশ কার্যালয়ের পরিস্থিতি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঘূর্ণিঝড় মোখা ২০২৩ সালের ১৪ মে বিকেল ৩টার দিকে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের উপকূলে আঘাত হানে। সরকার দুর্যোগবিষয়ক স্থায়ী আদেশাবলি (এসওডি) অনুযায়ী প্রস্তুতি নেয় এবং কক্সবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় সাড়ে ৭ লাখের বেশি মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে নেয়। কক্সবাজারে ৫৬৫টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়, আর ভাসানচরে প্রায় ৩০ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থীকে ৫৩টি ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রে নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়। আন্তর্জাতিক রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট ফেডারেশনের (আইএফআরসি) প্রিপেয়ার সেন্টারের ২০২৪ সালের এক কেস স্টাডিতে এত বড় ঘূর্ণিঝড়ে মৃত্যুশূন্য থাকাকে বাংলাদেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার অন্যতম বড় সাফল্য বলা হয়েছে।

এই সাফল্যের পেছনে আছে ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচি (সিপিপি), যা বাংলাদেশ সরকার ও বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির যৌথ উদ্যোগ হিসেবে ১৯৭২ সালে শুরু হয়। উপকূলীয় জেলাগুলোতে এর ৭৬ হাজারের বেশি স্বেচ্ছাসেবক বাড়ি বাড়ি গিয়ে সতর্কবার্তা পৌঁছে দেন এবং ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোকে আশ্রয়কেন্দ্রে নিতে সাহায্য করেন। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ পৃথিবীর প্রত্যেক মানুষকে আগাম সতর্কতা ব্যবস্থার আওতায় আনার লক্ষ্য ঠিক করেছেন। ডব্লিউএমওর তথ্যমতে, এসব ব্যবস্থা প্রমাণিত ও কার্যকর অভিযোজন পদক্ষেপ, যা বিনিয়োগের অন্তত দশ গুণ সুফল দেয়; অথচ ২০২৩ সালে বিশ্বের মাত্র অর্ধেক দেশে আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা ছিল। ইউএনসিসিডির কথাতেও একই সুর: খরার ক্ষেত্রেও সংকট আসার পর সাড়া দেওয়ার চেয়ে আগে থেকে ঝুঁকি কমানোর ব্যবস্থা অনেক কম ব্যয়বহুল।

২০২৩ সালের ১৪ মে মিয়ানমার উপকূলের দিকে এগিয়ে যাওয়া ঘূর্ণিঝড় মোখার স্যাটেলাইট ছবি। ছবি: MODIS Land Rapid Response Team, NASA GSFC / উইকিমিডিয়া কমন্স (পাবলিক ডোমেইন)
২০২৩ সালের ১৪ মে মিয়ানমার উপকূলের দিকে এগিয়ে যাওয়া ঘূর্ণিঝড় মোখার স্যাটেলাইট ছবি। ছবি: MODIS Land Rapid Response Team, NASA GSFC / উইকিমিডিয়া কমন্স (পাবলিক ডোমেইন)

ছবি: Sakou Gado / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, জাতিসংঘ, জাতিসংঘের মরুকরণ প্রতিরোধ কনভেনশন (ইউএনসিসিডি), পিবিএল নেদারল্যান্ডস এনভায়রনমেন্টাল অ্যাসেসমেন্ট এজেন্সি, জাতিসংঘ সংবাদ (এফএও), বাংলাপিডিয়া, ডায়ালগ আর্থ, মোঙ্গাবে, বিডিনিউজ২৪, দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, বিশ্বব্যাংক, বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও), জাতিসংঘ বাংলাদেশ, আইএফআরসি প্রিপেয়ার সেন্টার

অনলাইন ডেস্কদা এগ্রো নিউজ

পরিবেশ

সম্পর্কিত খবর

পরিবেশ

শব্দদূষণ ভারতের শহরে স্বাস্থ্যঝুঁকি, কিন্তু মাপাই কঠিন

মুম্বাইয়ে বাইরের শব্দের মাত্রা গড়ে ৬৫ থেকে ৮৫ ডেসিবেল, যেখানে সড়কের শব্দে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিকা ৫৪ ডেসিবেল। গবেষকেরা বলছেন, তথ্যের ঘাটতি ও ব্যয়বহুল শব্দ-মডেলের কারণে ভারতে এর স্বাস্থ্যপ্রভাব নিয়ে গবেষণা কঠিন।

Mongabay India১৬ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
পরিবেশ

ব্যাংকক বাঁচাতে প্রতিবছর ডুবছে থাইল্যান্ডের গ্রাম

২০১১ সালের বন্যার পর থাইল্যান্ডে তৈরি বাঁধ ও জলকপাট ব্যাংকক ও শিল্পাঞ্চল থেকে পানি সরিয়ে দেয়, কিন্তু আয়ুথায়ার নদীতীরের গ্রামগুলো এখন মাসের পর মাস মাথার ওপর পানিতে ডুবে থাকে; ঘর উঁচু করতে সঞ্চয় খরচ করছেন বাসিন্দারা।

ইউরোনিউজ১৬ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
পরিবেশ

সুস্থ যমজের ছোঁয়ায় কয়েক সপ্তাহে প্রাণ ফিরে পেল বিবর্ণ প্রবাল

স্ট্যানফোর্ডের বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, একই কলোনির সুস্থ প্রবালের গায়ে বিবর্ণ প্রবালের টুকরা লাগিয়ে রাখলে দুটি জুড়ে যায় এবং বিবর্ণ প্রবাল আবার শৈবাল ফিরে পায়; পাঁচটি টুকরার সবকটি সাত সপ্তাহে সেরে উঠেছে।

ইউরোনিউজ১৬ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)