চট্টগ্রামের সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘দুর্বার তারুণ্য’ ২০২২ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর, মঙ্গলবার বিকেলে নগরীর সিআরবি এলাকায় শতাধিক গাছ লাগিয়ে তাদের ‘আমরা মালি’ শীর্ষক বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির চলমান পর্ব শেষ করে। কর্মসূচির স্লোগান ছিল ‘আমার যত্নে, আমার গাছ’। আয়োজকেরা জানান, শুধু গাছ লাগানো নয়, লাগানোর পর গাছের যত্ন নিতে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করাই এর উদ্দেশ্য।
‘আমার যত্নে, আমার গাছ’ স্লোগানে সিআরবিতে বৃক্ষরোপণ
২০২২ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম থেকে খবরটি প্রকাশ করে জাগো নিউজ ২৪। প্রতিবেদনে দুর্বার তারুণ্যকে চট্টগ্রামের জনপ্রিয় সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন হিসেবে বর্ণনা করা হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আবু আবিদ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন। প্রধান অতিথি ছিলেন হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর, প্রতিবেদনে যাঁকে করোনা প্রতিরোধক বুথের উদ্ভাবক হিসেবে পরিচয় দেওয়া হয়।
প্রতিবেদনে সেদিন বিকেলের বৃক্ষরোপণকে কর্মসূচির চলমান পর্বের সমাপ্তি বলা হয়। ‘আমরা মালি’ কর্মসূচির কয়টি পর্ব, আগের পর্বগুলো কোথায় হয়েছিল কিংবা সিআরবিতে কোন কোন প্রজাতির গাছ লাগানো হয়, প্রতিবেদনে তা বলা হয়নি, তাই এখানেও সে তথ্য দেওয়া হলো না। প্রতিবেদনে যা লেখা আছে তা হলো সেদিনের কাজের পরিমাণ, শতাধিক গাছ, আর জায়গাটি: বন্দরনগরীর মাঝখানে সেন্ট্রাল রেলওয়ে বিল্ডিং ঘিরে থাকা সবুজ, পাহাড়ি রেল এলাকা সিআরবি।
কর্মসূচির নামেই তার বার্তা। ‘মালি’ মানে বাগানের সেই মানুষ, যিনি দিনের পর দিন গাছে পানি দেন, আগাছা পরিষ্কার করেন, গাছকে রক্ষা করেন। কর্মসূচির নাম ‘আমরা মালি’ রেখে এবং তার সঙ্গে ‘আমার যত্নে, আমার গাছ’ স্লোগান জুড়ে আয়োজকেরা জোর দেন রোপণের পরের কাজের ওপর। প্রতিষ্ঠাতা তাঁর বক্তব্যে ব্যাখ্যা করেন, তাঁর মতে বাংলাদেশে এই কাজটিই অবহেলিত থেকে যাচ্ছে।
গাছ লাগানো ও পরিচর্যা নিয়ে বক্তারা যা বলেন
প্রধান অতিথির বক্তব্যে হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর বলেন, গাছকে বলা হয় অক্সিজেনের কারখানা। মানুষ, গাছ ও প্রাণিকুলের মধ্যে বাতাসের মাধ্যমে একটি সম্পর্ক রয়েছে, যার মাধ্যমে প্রত্যেকে অন্যের উপকারে নিবেদিত। তাই পরিবেশ রক্ষায় বৃক্ষরোপণের বিকল্প নেই বলে তিনি মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, প্রত্যেকেরই উচিত পরিকল্পিতভাবে বৃক্ষরোপণে অংশ নেওয়া।
তিনি আরও বলেন, বৃক্ষরোপণ ও সঠিক পরিচর্যা কেবল পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং ফলমূল ও বনজ দ্রব্যে দেশকে স্বনির্ভর করতেই সাহায্য করবে না, বরং পরিবারের আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য আনতেও ভূমিকা রাখবে এবং দেশের সার্বিক উন্নয়নে অবদান রাখবে। তাঁর মতে, দেশের অর্থনীতি ও জনজীবনে স্বাচ্ছন্দ্য আনতে প্রত্যেকের প্রতিবছর অন্তত দুটি করে গাছ লাগানো এবং সেগুলোর সঠিক পরিচর্যা করা দরকার।
দুর্বার তারুণ্যের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আবু আবিদ বলেন, বৃক্ষ আমাদের পরম বন্ধু। তাঁর ভাষায়, বৃক্ষ শুধু প্রাকৃতিক শোভাই বাড়ায় না, মাটির ক্ষয় রোধ করে, বন্যা ঠেকায়, ঝড়-তুফানে বাধা হয়ে জীবন ও সম্পদ রক্ষা করে; আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণেও বৃক্ষের ভূমিকা অপরিসীম। তিনি বলেন, বৃক্ষ না থাকলে পৃথিবী মরুভূমিতে পরিণত হতো; বৃক্ষ অক্সিজেন সরবরাহ করে আমাদের বাঁচিয়ে রাখে, তাই বৃক্ষকে বলা হয় প্রাণের অগ্রদূত।
এরপর তিনি কর্মসূচির কারণ ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশে বৃক্ষরোপণের সংখ্যা বাড়লেও লাগানোর পর পরিচর্যার দিকে তেমন মনোযোগ নেই বললেই চলে। ‘আমরা মালি’ কর্মসূচির মাধ্যমে তাঁরা মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে চান। তাঁর কথায়, গাছের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সবাই কমবেশি জানে, কিন্তু এই বহুল প্রয়োজনীয় জিনিসটি ঠিকঠাক গড়ে তুলতে পরিচর্যা দরকার।
অনুষ্ঠানে যাঁরা ছিলেন
জাগো নিউজ ২৪-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন রবিউল হাসান, হৃদয় হোসেন মল্লিক, মো. কামরুল ইসলাম, এইচ এম আলাউদ্দিন, মো. এমদাদুল হক মারুফ, এইচ এ মোবারক, হাকিমুল ইসলাম সাকিব, সাফায়েত মোর্শেদ ও মোবারক উল্লাহসহ কেন্দ্রীয় ও জেলা নেতৃবৃন্দ।
সিআরবি: চট্টগ্রামের মাঝখানে এক সবুজ পাহাড়
সিআরবি মানে সেন্ট্রাল রেলওয়ে বিল্ডিং, চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকায় অবস্থিত বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপকের দপ্তর। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগর চট্টগ্রাম কর্ণফুলী নদীর ডান তীরে অবস্থিত। জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া জানায়, চট্টগ্রাম বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের সদর দপ্তর। নগরের রেল ইতিহাসের শুরু আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে কোম্পানি থেকে, যা ১৮৯১ সালে লন্ডনে গঠিত হয়; বন্দরের সঙ্গে আসামের সংযোগকারী এর প্রথম রেললাইন চালু হয় ১৮৯৫ সালে।
উইকিপিডিয়ায় ভবনটির নিবন্ধে বলা হয়েছে, এর নির্মাণকাজ শুরু হয় ১৮৯৭ সালে; সূত্র হিসেবে সে বছরের ‘ইন্ডিয়ান ইঞ্জিনিয়ারিং’ সাময়িকীতে ‘আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ে হেড অফিস বিল্ডিংস, চিটাগং’ শিরোনামের লেখার উল্লেখ আছে। ভবনের দক্ষিণ দিকের সম্মুখভাগ দোতলা এবং ৩৬০ ফুট লম্বা; মাঝখানে বড় গাড়িবারান্দা, দুই প্রান্তে অর্ধ-অষ্টভুজাকার টাওয়ার, সামনে চওড়া বারান্দা এবং গম্বুজওয়ালা প্রবেশকক্ষ রয়েছে। ভবনটি ঘিরে আছে রেল কর্মকর্তাদের আবাসিক এলাকা।
সিআরবিকে গাছের যত্নের কর্মসূচির জায়গা করে তুলেছে ভবনের চারপাশের সবুজ পরিবেশ। ২০২১ সালের জুলাইয়ে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের এক প্রতিবেদনে সিআরবিকে কয়েক হাজার গাছে ঢাকা একটি পাহাড়চূড়ায় অবস্থিত বলে বর্ণনা করা হয়। সেখানে ৬৪টি শতবর্ষী গাছ রয়েছে, যার মধ্যে আছে গর্জন, সেগুন, শিরীষ, মেহগনি ও কড়ই। পত্রিকাটি জানায়, পাশের পাহাড়ে নানা প্রজাতির পাখি ও প্রাণীর বাস এবং নগরের বহু মানুষ প্রতিদিন নির্মল বাতাস ও দৃশ্যের টানে সেখানে যান।
এলাকার ভেতরে রয়েছে শিরীষতলা, পুরোনো শিরীষগাছে (Albizia lebbeck) ঘেরা একটি খোলা মঞ্চ, যেখানে পহেলা বৈশাখের মতো উৎসবে মানুষ জড়ো হন, ঐতিহ্যবাহী বলীখেলাও হয়। চট্টগ্রামের সংবাদমাধ্যম বহুদিন ধরে সিআরবিকে নগরের ‘ফুসফুস’ বলে আসছে; দ্য ডেইলি স্টার বাংলা ২০২২ সালের মে মাসেও এলাকাটিকে এভাবে বর্ণনা করে।
নগরের পাহাড়গুলো যে চাপের মুখে, বাংলাপিডিয়াতেও তার উল্লেখ আছে। জ্ঞানকোষটি জানায়, একসময় শহরের সবচেয়ে উঁচু জায়গা ২৮০ ফুট উঁচু বাটালি পাহাড় নির্মাণকাজের জন্য সমান করা হচ্ছে। আদালত ভবনসহ পরী পাহাড় এবং জেনারেল হাসপাতালসহ রংমহল পাহাড়ের মতো অন্য পাহাড়েও সরকারি স্থাপনা রয়েছে। সিআরবির মতো সবুজ পাহাড় নগরকেন্দ্রে টিকে থাকা হাতে গোনা বড় গাছঢাকা জায়গার একটি।

সিআরবিতে হাসপাতাল নিয়ে ২০২১-২২ সালের বিতর্ক
‘আমরা মালি’ কর্মসূচির সময় সিআরবির গাছ নিয়ে জনপরিসরে বিতর্ক এক বছরেরও বেশি সময় ধরে চলছিল। ২০২১ সালের জুলাইয়ে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড জানায়, বাংলাদেশ রেলওয়ে সিআরবি এলাকার ছয় একর জমিতে ৫০০ শয্যার একটি হাসপাতাল ও ১০০ আসনের একটি মেডিকেল কলেজ নির্মাণের কাজ শুরু করেছে এবং এ জন্য কয়েকটি শতবর্ষী গাছসহ অন্তত ৩০০টি গাছ কাটা পড়বে। চট্টগ্রামের সংস্কৃতিকর্মী ও নাগরিক সমাজের সদস্যরা এর তীব্র আপত্তি জানান এবং পরিবেশ রক্ষায় নির্মাণকাজ বন্ধের দাবি তোলেন।
প্রকল্প পরিচালক, যিনি বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী, তখন পত্রিকাটিকে বলেন, হাসপাতাল হবে গোয়ালপাড়ায়, সিআরবির শিরীষতলায় নয়; পাহাড় ও উপত্যকা অক্ষত থাকবে এবং নির্মাণস্থলে শতবর্ষী গাছ আছে মাত্র একটি। পত্রিকাটি আরও জানায়, এর মধ্যে কিছু গাছ কাটা হয়েছে, সড়ক তৈরির জন্য প্রায় ১০০ ফুট পাহাড় কাটা হয়েছে এবং আটটি পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়েছে; উচ্ছেদের তালিকায় একটি মসজিদ, একটি মন্দির, একটি ক্লাব, একটি কবরস্থান ও মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ভবনও ছিল। রেলওয়ের একজন সাবেক প্রধান কমান্ড্যান্ট পত্রিকাটিকে বলেন, সিআরবি এলাকায় রেলকর্মীদের জন্য একটি হাসপাতাল আগে থেকেই আছে এবং তার প্রায় ৮০ শতাংশ শয্যা খালি থাকে; উইকিপিডিয়া অনুযায়ী, সেই রেলওয়ে হাসপাতাল ১৯৯৪ সালে নির্মিত, মূল ভবনের পূর্ব দিকে সিআরবি সড়কের ওপারে। রেলশ্রমিক নেতারা বলেন, তাঁদের সঙ্গে আলোচনা করা হয়নি; তাঁরা সীতাকুণ্ডের কুমিরায় রেলওয়ের অব্যবহৃত জমির কথা তোলেন, যেখানে একসময় রেলওয়ের বক্ষব্যাধি হাসপাতাল ছিল।
২০২২ সালের ১২ মে দ্য ডেইলি স্টার বাংলা প্রকল্পটির ইতিহাস তুলে ধরে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে (পিপিপি) সিআরবির পাশে প্রায় ছয় একর জমিতে মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল, নির্মাতা ইউনাইটেড এন্টারপ্রাইজ অ্যান্ড কোম্পানি। প্রথম পর্যায়ে ২৫০ শয্যা ও দ্বিতীয় পর্যায়ে আরও ২৫০ শয্যার পরিকল্পনা ছিল, সম্ভাব্য ব্যয় ৩৯৮ কোটি ৩৮ লাখ টাকা; রেলকর্মীরা চিকিৎসায় ২০ শতাংশ ছাড় পাবেন বলে জানানো হয়েছিল। ২০১৩ সালে অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি প্রকল্পটির নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়, ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে আইন মন্ত্রণালয় চুক্তির খসড়া অনুমোদন করে, ২০২০ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি প্রকল্প অনুমোদিত হয় এবং ২০২০ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী চূড়ান্ত অনুমোদন দেন।
একই প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রায় এক বছর ধরে বিভিন্ন সংগঠন সিআরবিতে হাসপাতাল নির্মাণের বিরোধিতা করে আসছে। ২০২২ সালের ১০ মে রেলপথ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির ২০তম সভায় বিষয়টি ওঠে এবং বিকল্প হিসেবে কুমিরায় রেলওয়ের পরিত্যক্ত যক্ষ্মা হাসপাতালের জায়গা নিয়ে আলোচনা হয়। কমিটির সভাপতি পত্রিকাটিকে বলেন, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন প্রধানমন্ত্রী এবং কোনো প্রস্তাব বা সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়নি। নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের একজন ব্যবস্থাপক জানান, রেলওয়ে তাঁদের কিছু জানায়নি এবং সিআরবির পাশের জায়গায় কাজ এগোচ্ছে। এসব প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে দুর্বার তারুণ্য যখন সেখানে গাছ লাগায়, তখনো প্রশ্নটির নিষ্পত্তি হয়নি।

সংখ্যায় বাংলাদেশের বৃক্ষাচ্ছাদন
এই কর্মসূচির পেছনের জাতীয় চিত্রটি পাওয়া যায় বন অধিদপ্তরের ‘বাংলাদেশের বন ও বৃক্ষসম্পদ প্রতিবেদন ২০১৯’-এ। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের ২০২০ সালের জুনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই প্রতিবেদনে দেশের মোট আয়তনের ২২ দশমিক ৩৭ শতাংশ বৃক্ষাচ্ছাদিত বলে উল্লেখ করা হয়, যেখানে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) আগের এক প্রতিবেদনে এ হার ছিল ১০ দশমিক ৯ শতাংশ। পত্রিকাটি ব্যাখ্যা করে, বেশি হারের হিসাবে প্রাকৃতিক বনের বাইরের গাছ, সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির গাছের চাঁদোয়াও ধরা হয়েছে।
সংকীর্ণ অর্থে বনভূমির হার আরও কম। ইউএনবির খবর অনুযায়ী, ২০২২ সালের এপ্রিলে পরিবেশমন্ত্রী জাতীয় সংসদে জানান, দেশের ১৪ দশমিক ১০ শতাংশ ভূমি বনভূমি এবং বৃক্ষাচ্ছাদিত এলাকা ২২ দশমিক ৩৭ শতাংশ। অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৫ সালের মধ্যে বৃক্ষাচ্ছাদন ২৪ শতাংশে তোলার লক্ষ্য ছিল। ২০২১-২২ অর্থবছরে বন অধিদপ্তরের লক্ষ্য ছিল ২৯ হাজার ১২৪ হেক্টর ম্যানগ্রোভ ও ব্লক বাগান এবং ১ হাজার ৫৭৪ কিলোমিটার স্ট্রিপ বাগান সৃজন।
একই বক্তব্যে ১৯৮০-৮১ অর্থবছর থেকে সামাজিক বনায়নের হিসাবও দেওয়া হয়: ২০২০-২১ পর্যন্ত বন অধিদপ্তরের জমিতে ১ লাখ ২ হাজার ২২৯ হেক্টর উডলট ও ব্লক বাগান এবং সড়ক, মহাসড়ক, রেললাইন ও বাঁধের মতো অন্যান্য জমিতে ৭৬ হাজার ৭৫২ কিলোমিটার স্ট্রিপ বাগান করা হয়েছে।
প্রাকৃতিক বনের প্রবণতা অবশ্য আশাব্যঞ্জক ছিল না। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের ২০২০ সালের প্রতিবেদনে ন্যাশনাল রিমোট সেনসিং সেন্টারের এক গবেষণার উল্লেখ করে বলা হয়, ২০০৬ থেকে ২০১৪ সময়ে ১৯৩০ সালের পর সবচেয়ে বেশি প্রাকৃতিক বন হারিয়েছে দেশ, আর সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে চট্টগ্রাম ও মধুপুরের শালবনে। একই প্রতিবেদনে জানানো হয়, বন অধিদপ্তরের ১০ হাজার ৩১২টি পদের অন্তত ৩ হাজার ৯০টি শূন্য, যা হাতে থাকা বন রক্ষার সক্ষমতাকে সীমিত করছে।
এক দিনের বৃক্ষরোপণ থেকে সামাজিক বনায়ন
বাংলাদেশে সংগঠিত বৃক্ষরোপণের ইতিহাস দীর্ঘ, আর বাংলাপিডিয়া দেখিয়েছে কীভাবে এর ধরন বদলেছে। ১৯৬২-৬৩ সাল থেকে বন বিভাগ রাজশাহী ও ঢাকায় দুটি বন সম্প্রসারণ বিভাগ গঠন করে এবং ১ জুন বৃক্ষরোপণ দিবস চালু করে। পরে এই অভিযান এক সপ্তাহ, এক মাস এবং তারপর তিন মাসে বিস্তৃত হয়। শুরুর দিকের কার্যক্রম ছিল নার্সারি এবং জেলা সদরে আনুষ্ঠানিক বৃক্ষরোপণকেন্দ্রিক; জ্ঞানকোষটির মতে, মানুষের ওপর এর প্রভাব ছিল সামান্য এবং ভূমিহীনদের এতে যুক্ত করা হয়নি।
এই ইতিহাসে চট্টগ্রামেরও নিজস্ব জায়গা আছে। রাঙ্গুনিয়ার বেতাগী ও পোমরা পাহাড়ে কয়েকজন উদ্যোক্তা দুটি ন্যাড়া পাহাড়ে স্বনির্ভর একটি প্রকল্প শুরু করেন; বাছাই করা ১০১টি পরিবারকে জমি দেওয়া হয় এবং কৃষি ব্যাংক ঋণ দেয়। বাংলাপিডিয়া জানায়, দ্বিতীয় ও তৃতীয় বছরে প্রকল্পটি সন্তোষজনক বিবেচিত হয়, যদিও অংশগ্রহণকারী পরিবারের সংখ্যা কমে ৮৩টিতে দাঁড়ায়।
১৯৮২ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের অর্থায়নে এবং এফএওর মাধ্যমে ইউএনডিপির সহায়তায় একটি কমিউনিটি বনায়ন প্রকল্প সাতটি জেলায় কাজ করে: দিনাজপুর, রংপুর, পাবনা, রাজশাহী, বগুড়া, কুষ্টিয়া ও যশোর। এর আওতায় সড়ক, রেলপথ ও খালের বাঁধ বরাবর প্রায় ৪ হাজার ৮০০ কিলোমিটার স্ট্রিপ বাগান, ৪ হাজার ৮০০ হেক্টরে অংশীদারত্বমূলক জ্বালানি কাঠের বাগান এবং রাজশাহীতে একটি সামাজিক বনায়ন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট গড়ে তোলা হয়; এটিই প্রথম প্রকল্প, যা নারীদের কমিউনিটি বনায়নে যুক্ত করে। পরবর্তী উপজেলা বনায়ন ও নার্সারি উন্নয়ন প্রকল্পে উপজেলা নার্সারি স্থাপন ও গ্রামের নেতাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। আর ১৯৯৪-৯৫ সাল থেকে দশটি উপকূলীয় জেলায় উপকূলীয় সবুজ বেষ্টনী প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল গাছপালা বাড়িয়ে ঘূর্ণিঝড়ে জানমালের ক্ষতি কমানো।
এসব প্রকল্পের ভেতর দিয়ে যে সূত্রটি চলে এসেছে, ‘আমরা মালি’ সেটিই তুলে ধরেছে: গাছের পাশে যাঁরা বাস করেন, গাছে তাঁদের অংশীদারত্ব থাকলে তবেই রোপণ সফল হয়। বাংলাপিডিয়া সামাজিক বনায়নের সংজ্ঞায় এফএওর বর্ণনা উদ্ধৃত করেছে: এমন যেকোনো পরিস্থিতি, যেখানে বনায়ন কার্যক্রমে স্থানীয় মানুষ ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত থাকেন।
লাগানো গাছ বাঁচবে কি না, ঠিক করে পরিচর্যা
এফএওর ‘নগর ও উপনগর বনায়ন নির্দেশিকা’ (এফএও ফরেস্ট্রি পেপার ১৭৮, ২০১৬) অনুযায়ী, নগর বনায়নের মধ্যে পড়ে গাছের মূল্যায়ন, পরিকল্পনা, রোপণ, রক্ষণাবেক্ষণ, সংরক্ষণ ও পর্যবেক্ষণ, একটি গাছ থেকে শুরু করে পুরো ভূদৃশ্য পর্যন্ত। নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, এলাকাভিত্তিক পর্যায়ে নগর বনায়ন ব্যক্তিগত ও সরকারি গাছের তত্ত্বাবধানে নাগরিকদের যুক্ত করার ওপর জোর দেয়: গাছের মূল্য সম্পর্কে তাঁদের জানানো এবং চারপাশের পরিবেশের পূর্ণ মালিকানা ও দায়িত্ব নিতে তাঁদের সহায়তা করা। চট্টগ্রামবাসীর কাছে ‘আমার যত্নে, আমার গাছ’ স্লোগান প্রায় এই কথাই বলেছিল।
রোপণ অনুষ্ঠানের পর নগরের গাছ নিয়ে কী কী কাজ থাকে, নির্দেশিকায় তার তালিকা আছে: জায়গা ও মাটি প্রস্তুত, প্রজাতি বাছাই, রোপণ, নার্সারি এবং লাগানো চারার প্রাথমিক পরিচর্যা; এরপর পরিচর্যা, পাতলা করা ও ডালপালা ছাঁটাই, গাছের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা। ‘সঠিক জায়গায় সঠিক গাছ’কে নির্দেশিকা একটি সহজ কিন্তু কার্যকর নিয়ম বলেছে, যার শুরু জায়গার জলবায়ু, মাটি ও বাস্তুসংস্থান, ভবন ও অবকাঠামোর সঙ্গে সম্পর্ক এবং এলাকাবাসীর চাহিদা ও মনোভাব বোঝা থেকে। নির্দেশিকা মনে করিয়ে দেয়, গাছ দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ; চাপ বা যত্নে সাড়া দিতে গাছের বছরের পর বছর লাগতে পারে, আর জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে খরার সময় বেশি পানি দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।
নির্দেশিকা অনুযায়ী, সুব্যবস্থাপিত নগর বন বৃষ্টির পানির প্রবাহ ও ঝড়ের প্রভাব কমিয়ে এবং ‘হিট আইল্যান্ড’ বা তাপ-দ্বীপ প্রভাব প্রশমিত করে শহরকে নিরাপদ করে; বিনোদন ও সামাজিক অনুষ্ঠানের জায়গা দিয়ে শহরকে মনোরম করে; আর বাতাসের মান উন্নত করে শহরকে স্বাস্থ্যকর করে। নির্দেশিকায় যুক্তরাষ্ট্রের পাঁচটি শহরের এক মূল্যায়নের উল্লেখ আছে, যাতে দেখা যায় রোপণ, ছাঁটাই ও মেরামতসহ খরচের তুলনায় নগরের গাছের সুফল ১ দশমিক ৩৭ থেকে ৩ দশমিক ০৯ গুণ বেশি। লন্ডনের এক মূল্যায়নে শহরের ৮ মিলিয়ন গাছের বার্ষিক সুফল ধরা হয়েছে প্রায় ১৩২ মিলিয়ন পাউন্ড, যার বেশির ভাগ বায়ুদূষণ কমানো থেকে। নির্দেশিকায় উদ্ধৃত আরেক গবেষণার হিসাবে, যুক্তরাষ্ট্রের নগরের গাছ বছরে প্রায় ৭ লাখ ১১ হাজার টন বায়ুদূষক সরিয়ে দেয়, যার মূল্য ৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

চট্টগ্রামের মতো শহরে, যেখানে বাংলাপিডিয়া পাহাড় সমান করার কথা লিখেছে এবং ২০২১ ও ২০২২ সালে সংবাদমাধ্যম সিআরবির শত শত গাছ নিয়ে বিতর্কের খবর দিয়েছে, এসব কথাই ‘আমরা মালি’ বার্তাকে বাস্তব অর্থ দেয়: সেপ্টেম্বরের এক বিকেলে লাগানো চারা নগরের সবুজের অংশ হয় তখনই, যখন পরের বছরগুলোতে কেউ তাতে পানি দেন, তাকে রক্ষা করেন এবং নিয়মিত খোঁজ রাখেন।
ছবি: মোহিন রিয়াদ / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই-এসএ ৪.০)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, দ্য ডেইলি স্টার বাংলা, ইউএনবি, দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, বাংলাপিডিয়া, উইকিপিডিয়া, এফএও (নগর ও উপনগর বনায়ন নির্দেশিকা, ২০১৬)





মন্তব্য
(০)