মেহেরপুরের গাংনী উপজেলায় ঘুমের মধ্যে সাপের কামড় খাওয়া শামীম হোসেন (২৮) নামের এক যুবক ২০২৫ সালের ৫ নভেম্বর সকালে গাংনী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। কামড়ের পর পরিবার তাকে প্রথমে স্থানীয় এক ওঝার কাছে নিয়ে গিয়েছিল। হাসপাতালের চিকিৎসক জানান, রোগী অনেক দেরিতে হাসপাতালে পৌঁছেছিলেন।
রাত ২টায় কামড়, সকালে হাসপাতালে
জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শামীম হোসেন উপজেলার করমদী মাঠপাড়া গ্রামের হারান আলীর ছেলে। মঙ্গলবার (৪ নভেম্বর) দিবাগত রাত ২টার দিকে নিজ ঘরে ঘুমিয়ে থাকার সময় একটি বিষধর সাপ তার হাতের আঙুলে কামড় দেয়। জেগে উঠে তিনি পরিবারের সদস্যদের জানান। পরিবার তাকে দ্রুত স্থানীয় এক ওঝার কাছে নিয়ে যায়; সেখানে ঝাড়ফুঁক করা হয় এবং পানি পড়া খাওয়ানো হয়। অবস্থার অবনতি হলে সকালে তাকে গাংনী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়, সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
শামীমের বাবা হারান আলী বলেন, ‘ছেলের হাতের আঙুলে সাপ কামড় দিলে সে ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বলে হাত বাঁধতে। তারপর রাতে ওঝার কাছে নিয়ে যাই। গোখরা কামড়েছে কিন্তু বিষ নেই। পরে ছেলে আরও অসুস্থ হয়ে পড়লে হাসপাতালে নিয়ে যাই। সেখানে গিয়ে আর বাঁচানো গেল না।’
গাংনী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আব্দুল্লাহ আজিজ বলেন, ‘সকালে শামীম হোসেন নামের একজন সাপে কাটা রোগী হাসপাতালে আসে। তাকে আমরা চিকিৎসা দিই, কিন্তু হাসপাতালে আসতে অনেক দেরি হয়েছে। ফলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।’
গাংনী খুলনা বিভাগের মেহেরপুর জেলার একটি উপজেলা। এর পশ্চিমে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ সীমান্ত, দেশের ভেতরে পাশে কুষ্টিয়া ও চুয়াডাঙ্গা জেলা। উপজেলার ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে ভৈরব ও কাজলা নদী, আর এখানকার অর্থনীতি মূলত কৃষিনির্ভর।

বাংলাদেশে ও বিশ্বে সাপের কামড়ের চিত্র
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক অনুষ্ঠানে ২০২৩ সালের ১৮ জুন প্রকাশিত জাতীয় জরিপের (২০২১ ও ২০২২ সালে পরিচালিত) ফল অনুযায়ী, বাংলাদেশে বছরে প্রায় চার লাখ মানুষ সাপের কামড়ের শিকার হন এবং মারা যান ৭ হাজার ৫১১ জন। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদনে জরিপের বরাতে বলা হয়, এসব ঘটনার ৯৫ শতাংশ ঘটে গ্রামে, নারীর তুলনায় পুরুষেরা চার গুণ বেশি ঝুঁকিতে থাকেন এবং কামড়ের প্রায় এক-চতুর্থাংশ বিষধর সাপের। সে সময় দেশে কোনো অ্যান্টিভেনম উৎপাদিত হতো না।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) হিসাবে পৃথিবীতে বছরে আনুমানিক ৫৪ লাখ মানুষকে সাপে কাটে, এর মধ্যে ১৮ লাখ থেকে ২৭ লাখ ক্ষেত্রে শরীরে বিষ ঢোকে। প্রতিবছর ৮১ হাজার ৪১০ থেকে ১ লাখ ৩৭ হাজার ৮৮০ জন মারা যান। সংস্থাটি জানায়, কৃষিশ্রমিক ও শিশুরাই সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়। ডব্লিউএইচও ২০১৭ সালের জুনে সাপের কামড়কে অবহেলিত গ্রীষ্মমণ্ডলীয় রোগের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার তালিকায় রাখে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে এতে মৃত্যু ও প্রতিবন্ধিতা অর্ধেকে নামানোর লক্ষ্য ঠিক করে।

সাপে কাটলে কী করণীয়, ডব্লিউএইচওর পরামর্শ
ডব্লিউএইচও বলছে, সাপের কামড়ের কার্যকর চিকিৎসা আছে: সঠিক অ্যান্টিভেনম, যা যত দ্রুত সম্ভব দেওয়া গেলে সবচেয়ে ভালো কাজ করে, কারণ বিষের অনেক ক্ষতি পরে আর ফেরানো যায় না। অ্যান্টিভেনম সংস্থাটির অত্যাবশ্যক ওষুধের তালিকায় আছে। সংস্থাটি এটাও উল্লেখ করেছে যে অনেক রোগী হাসপাতালের বদলে প্রচলিত লোকজ পদ্ধতির কাছে যান। প্রাথমিক করণীয় নিয়ে ডব্লিউএইচওর পরামর্শ:
- আক্রান্ত ব্যক্তিকে একেবারে নড়াচড়া করতে না দেওয়া।
- অস্থায়ী স্ট্রেচারে করে দেরি না করে চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়া; সম্ভব হলে কাত করে শোয়ানো, যাতে শ্বাসপথ সুরক্ষিত থাকে।
- সরু দড়ি দিয়ে শক্ত বাঁধন, ক্ষত কাটা, পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেটের মতো রাসায়নিক লাগানো বা গরম পাত্র দিয়ে বিষ টানার চেষ্টা না করা; এগুলো বিপজ্জনক ও অকার্যকর।
- ‘কালো পাথর’ জাতীয় পদ্ধতিতে সময় নষ্ট না করা।
কামড় ঠেকাতে ডব্লিউএইচও ঘরে সাপ ঢোকার পথ বন্ধ করা, রাতে বাইরে আলো নিয়ে চলা এবং উঁচু খাটে ভালোভাবে গুঁজে দেওয়া মশারির নিচে ঘুমানোর পরামর্শ দেয়, যা মশাবাহিত রোগের পাশাপাশি সাপের কামড় থেকেও রক্ষা করতে পারে।

ছবি: Holger Krisp / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 3.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, উইকিপিডিয়া (গাংনী উপজেলা)





মন্তব্য
(০)