টাঙ্গাইল সিভিল সার্জন অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের শুরু পর্যন্ত আগের সাত মাসে জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে সাপের কামড়ে আক্রান্ত ৫৩৫ জন ভর্তি হয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে ৪৬১ জন চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরেন, উন্নত চিকিৎসার জন্য ৭২ জনকে অন্য হাসপাতালে পাঠানো হয় এবং টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দুজন মারা যান। জাগো নিউজ ২৪ ২০২৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর এ খবর প্রকাশ করে। মৃত দুজনের স্বজনেরা অভিযোগ করেন, হাসপাতালে অ্যান্টিভেনম না পেয়ে তাঁদের বাইরে থেকে কিনে আনতে হয়েছিল।
কোন হাসপাতালে কত রোগী
সিভিল সার্জন অফিসের হিসাবে সবচেয়ে বেশি রোগী ভর্তি হন টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে, ১২২ জন। এরপর সখীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৯৮ জন, টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৭৫ জন এবং মির্জাপুরের কুমুদিনী হাসপাতালে ৬৪ জন ভর্তি হন। অন্য উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হন মধুপুরে ৩৮ জন থেকে দেলদুয়ারে ৪ জন পর্যন্ত।
সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরা রোগীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিলেন জেনারেল হাসপাতালের ১২২ জন, সখীপুরের ৮১ জন, টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৭৩ জন এবং কুমুদিনী হাসপাতালের ৬৪ জন। বাকিরা অন্য উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে বাড়ি ফেরেন।
টাঙ্গাইল ঢাকা বিভাগের একটি জেলা। এর আয়তন ৩,৪১৪.২৮ বর্গকিলোমিটার, উপজেলা ১২টি। জেলার মধুপুর এলাকায় রয়েছে মধুপুর শালবন। মির্জাপুরের কুমুদিনী হাসপাতাল ১৯৩৮ সালে রণদাপ্রসাদ সাহা প্রতিষ্ঠা করেন এবং হাসপাতালটি ১৯৪৪ সালের ২৭ জুলাই চালু হয়।


দুই মৃত্যু ও স্বজনদের অভিযোগ
মারা যান নাগরপুর উপজেলার আসমা খাতুন ও ভূঞাপুর উপজেলার আমিনুর রহমান। দুজনই টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। আসমা খাতুনের মেয়ে হামিদা খাতুন জাগো নিউজকে জানান, ২০২৫ সালের ১১ জুন মাকে ভর্তি করার পরপরই কর্তব্যরত চিকিৎসক কাগজে লিখে দ্রুত অ্যান্টিভেনম এনে দিতে বলেন। বাইরে থেকে কিনে আনার পর চিকিৎসক ইনজেকশন দেন এবং স্যালাইন চালু করেন। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি মারা যান।
একই মাসে আমিনুর রহমানকে ওই হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তাঁর বোনের স্বামী পারভেজ বলেন, 'ভর্তির ২ ঘণ্টা পর চিকিৎসকরা জানান সেখানে অ্যান্টিভেনম নেই।' পরিবারটি বাইরে থেকে অ্যান্টিভেনম কিনে আনে, কিন্তু তা দেওয়ার সময়ই আমিনুর রহমানকে মৃত ঘোষণা করা হয়।
পারভেজের অভিযোগ, হাসপাতালের দুজন চিকিৎসক অ্যান্টিভেনম নিয়ে একটি চক্রে জড়িত এবং হাসপাতালে ওষুধ থাকলেও রোগীদের বাইরে থেকে কিনে আনতে বলা হয়। তিনি জানান, একজন চিকিৎসকের লিখে দেওয়া ঠিকানায় গিয়ে তাঁরা একই হাসপাতালের চিকিৎসক আতিকুর রহমানকে পান এবং ১৪ হাজার টাকা দামে অ্যান্টিভেনম নেন। অভিযোগের বিষয়ে আতিকুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, 'আমার নিজের প্রয়োজনে ইনসেপ্টা কোম্পানির দুটি ইনজেকশন ফার্মেসিতে রেখে দিয়েছিলাম।' তাঁর ভাষায়, কখন কার বিপদ আসে, তা মোকাবিলার জন্যই তিনি সেগুলো রেখেছিলেন।

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও অ্যান্টিভেনমের সরবরাহ
টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. আব্দুস কদ্দুছ বলেন, 'হাসপাতালে বর্তমানে পর্যাপ্ত পরিমাণে অ্যান্টিভেনম রয়েছে।' তিনি আরও বলেন, অ্যান্টিভেনম নিয়ে কোনো চিকিৎসকের রোগীকে বিভ্রান্ত করার কথা নয়। টাঙ্গাইলের সিভিল সার্জন ডা. ফরাজী মুহাম্মদ মাহবুবুল আলম মঞ্জু জানান, জেলার ১৩টি হাসপাতালে সাপের দংশনের প্রতিষেধক ৩৪৫টি রয়েছে এবং সংকট হবে না বলে তিনি আশা করেন।
ঢাকা ট্রিবিউনের ২০২৫ সালের ১৮ আগস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে অ্যান্টিভেনম তৈরি হয় না; ভারত থেকে আমদানি করে তা সরকারি হাসপাতালে বিতরণ করা হয়। ওই প্রতিবেদনে জানানো হয়, এক জনস্বার্থ রিটের প্রাথমিক শুনানিতে হাইকোর্ট দেশের সব সরকারি উপজেলা হাসপাতালে অ্যান্টিভেনম সরবরাহের নির্দেশ দিয়েছেন। একই প্রতিবেদনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বরাতে বলা হয়, ২০২২ সালের এক জরিপে দেশে চার লাখের বেশি সাপের কামড়ের ঘটনা এবং প্রায় সাড়ে সাত হাজার মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়। এর আগে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ঢাকা ট্রিবিউন জানিয়েছিল, ঢাকার হাসপাতালের আশপাশের বেসরকারি ফার্মেসিতে ১০ ডোজের এক প্যাকেট অ্যান্টিভেনমের দাম প্রায় ১৪ হাজার টাকা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য ও প্রাথমিক করণীয়
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) হিসাবে বিশ্বে প্রতিবছর আনুমানিক ৫৪ লাখ মানুষ সাপের কামড়ের শিকার হন; তাঁদের মধ্যে ১৮ লাখ থেকে ২৭ লাখ জনের শরীরে বিষক্রিয়া হয় এবং প্রায় ৮১,৪১০ থেকে ১,৩৭,৮৮০ জন মারা যান। সংস্থাটি বলছে, কৃষিশ্রমিক ও শিশুরাই সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়, আর মানসম্মত অ্যান্টিভেনমই সাপের বিষের বেশির ভাগ ক্ষতি ঠেকানো বা ফিরিয়ে আনার সবচেয়ে কার্যকর চিকিৎসা। ২০১৭ সালের জুনে ডব্লিউএইচও সাপের দংশনজনিত বিষক্রিয়াকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের অবহেলিত গ্রীষ্মমণ্ডলীয় রোগ হিসেবে তালিকাভুক্ত করে।
সাপে কাটার পর করণীয় নিয়ে ডব্লিউএইচওর পরামর্শ:
- আক্রান্ত ব্যক্তিকে স্থির রাখুন, একেবারেই নড়াচড়া করতে দেবেন না।
- অস্থায়ী স্ট্রেচারে করে দেরি না করে চিকিৎসাকেন্দ্রে নিয়ে যান; সম্ভব হলে কাত করে শুইয়ে দিন, এতে শ্বাসনালি ও শ্বাস-প্রশ্বাস সুরক্ষিত থাকে।
- সরু বাঁধন (টর্নিকেট) দেওয়া, ক্ষতস্থান বা অঙ্গ কাটা, পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেটের মতো রাসায়নিক লাগানো কিংবা গরম কাচের পাত্র দিয়ে বিষ টেনে বের করার চেষ্টা বিপজ্জনক ও অকার্যকর; এগুলো করবেন না।
ছবি: AChawla / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, ঢাকা ট্রিবিউন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)