২০২৬ সালের জুলাইয়ের শুরুতে, বর্ষার ভরা মৌসুমে, এল নিনো নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় মহাসাগর ও বায়ুমণ্ডল প্রশাসনের (নোয়া) জলবায়ু পূর্বাভাস কেন্দ্র ১১ জুন সতর্কতা বাড়িয়ে ‘এল নিনো অ্যাডভাইজরি’ জারি করে, অর্থাৎ এল নিনো পরিস্থিতি তখন বিরাজমান। জাগো নিউজ ২৪ ৮ জুলাই এক ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদনে তুলে ধরে, এল নিনো কী, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রস্তুতি কেমন হওয়া উচিত।
এল নিনো কী এবং ২০২৬ সালের পূর্বাভাস
স্প্যানিশ ভাষায় এল নিনো মানে ‘ছোট ছেলে’। নোয়ার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, দক্ষিণ আমেরিকার জেলেরা বড়দিনের সময় উপকূলের পানি উষ্ণ হওয়া ও মাছ কমে যাওয়া লক্ষ করে যিশুর জন্মদিনের সঙ্গে মিলিয়ে নামটি দেন। এটি মধ্য ও পূর্ব বিষুবীয় প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে যাওয়া, যা এল নিনো-সাউদার্ন অসিলেশন (এনসো) চক্রের উষ্ণ পর্যায়; পূর্ব থেকে পশ্চিমে বয়ে চলা বাণিজ্য বায়ু দুর্বল হলে উষ্ণ পানি পূর্ব দিকে জমে এর সূচনা হয়। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) জানায়, চক্রটি সাধারণত ২ থেকে ৭ বছর অন্তর ঘুরে আসে; নোয়ার হিসাবে একেকটি পর্ব সাধারণত ৯ থেকে ১২ মাস থাকে।
২০২৬ সালের পূর্বাভাস ছিল জোরালো। ডব্লিউএমও ২ জুন জানায়, জুন থেকে আগস্টে এল নিনো পরিস্থিতি তৈরির সম্ভাবনা ৮০ শতাংশ এবং সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বরে প্রায় ৯০ শতাংশ। সংস্থাটির মহাসচিব সেলেস্তে সাউলো বলেন, ‘উষ্ণ সমুদ্র জলবায়ু ব্যবস্থায় তাপ ও আর্দ্রতা যোগ করে, যা তাপপ্রবাহ ও ভারী বৃষ্টির মতো কিছু চরম আবহাওয়াকে আরও খারাপ করতে পারে।’ নোয়ার ১১ জুনের বিশ্লেষণে সাপ্তাহিক নিনো-৩.৪ সূচক ছিল +০.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস, আর নভেম্বর থেকে জানুয়ারিতে ‘খুব শক্তিশালী’ এল নিনোর সম্ভাবনা ছিল ৬৩ শতাংশ।

বাংলাদেশের বর্ষায় সম্ভাব্য প্রভাব
জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর দক্ষিণ এশিয়ার বর্ষার মূল সময়, আর বাংলাদেশের বছরের বৃষ্টির বড় অংশ এ সময়েই হয়। ডব্লিউএমওর তথ্য অনুযায়ী, এল নিনোর সময় মৌসুমি বায়ু দুর্বল হয়ে দক্ষিণ এশিয়ার কিছু অংশ, অস্ট্রেলিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় খরা দেখা দিতে পারে, আর এল নিনো সাধারণত বৈশ্বিক তাপমাত্রা বাড়ায়। তবে নোয়া বলছে, উষ্ণ পৃথিবী এনসো চক্রকে ঠিক কীভাবে বদলাবে, সে বিষয়ে বিজ্ঞানীদের আস্থা এখনো কম।
দেশের বিশেষজ্ঞরাও ঝুঁকি নিয়ে মত দেন। দ্য ডেইলি স্টারের ৪ জুনের প্রতিবেদনে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ বজলুর রশিদ বলেন, এ বর্ষায় বৃষ্টি কম হবে এবং তাপমাত্রা বেশি থাকবে। অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটির জলবায়ুবিজ্ঞানী ড. রাশেদ চৌধুরীর মতে, ২০২৬ সালের বর্ষায় এল নিনোর প্রভাব হতে পারে মাঝারি।

ফসল, বাজার ও স্বাস্থ্যের ঝুঁকি
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) ২২ জুন জানায়, এল নিনো ভারতের বড় অংশে গ্রীষ্মকালীন বর্ষাকে দুর্বল করে ধান ও ভুট্টার মতো বৃষ্টিনির্ভর ফসলকে গুরুত্বপূর্ণ বৃদ্ধির সময়ে চাপে ফেলতে পারে; ২০১৫ সালের এল নিনোতে প্রধান উৎপাদক দেশগুলোতে ভুট্টা ও ধানের উৎপাদন কমে দাম বেড়েছিল। জাগো নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়, কম বৃষ্টিতে ধান, গম, ডাল ও সবজির ফলন কমতে, সেচের খরচ বাড়তে এবং খাদ্যপণ্যের বাজারে অস্থিরতা দেখা দিতে পারে; অতিরিক্ত গরমে হিটস্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ে, বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের।

প্রস্তুতি: সরকার, কৃষক ও সাধারণ মানুষের করণীয়
এল নিনো ঠেকানো যায় না, তবে ক্ষতি কমানো যায়। এফএও ও বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি ১৮ জুন ২২টি ঝুঁকিপূর্ণ দেশের ৮৮ লাখ মানুষকে সুরক্ষা দিতে ২০ কোটি ২০ লাখ ডলারের যৌথ আগাম পদক্ষেপ আবেদন করে। এফএওর উপমহাপরিচালক বেথ বেকডল বলেন, ‘সংকট বাড়ার পর সাড়া দেওয়ার চেয়ে আগাম পদক্ষেপ বেশি কার্যকর ও কম ব্যয়বহুল।’ জাগো নিউজ ও এফএওর পরামর্শে করণীয়:
- আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও আগাম সতর্কবার্তা জোরদার করা এবং আবহাওয়া অধিদপ্তরের সতর্কবার্তা মেনে চলা।
- পূর্বাভাস দেখে বপন ও রোপণের সময় ঠিক করা, প্রয়োজনে দেরিতে বোনা।
- খরাসহিষ্ণু জাতের ফসল বেছে নেওয়া।
- পানি সাশ্রয়ী সেচ ব্যবহার এবং বৃষ্টির পানি ধরে রেখে বাড়তি মজুত গড়া।
- গবাদিপশুর জন্য আগেভাগে খাদ্য মজুত করা।
- তীব্র গরমে পর্যাপ্ত পানি পান করা এবং দুপুরের রোদে অপ্রয়োজনে বাইরে না যাওয়া।
ছবি: NOAA / উইকিমিডিয়া কমন্স (পাবলিক ডোমেইন)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় মহাসাগর ও বায়ুমণ্ডল প্রশাসন (নোয়া) জলবায়ু পূর্বাভাস কেন্দ্র, বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও), জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও), দ্য ডেইলি স্টার





মন্তব্য
(০)