২০২৬ সালের ২৯ এপ্রিল জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জানান, রাজধানী ঢাকাকে ‘ক্লিন ও গ্রিন সিটি’ বা পরিচ্ছন্ন ও সবুজ নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে সরকার ১২ দফা কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। সেদিন সকালের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর পর্বে কুমিল্লা-৯ আসনের সংসদ সদস্য মো. আবুল কালামের তারকাচিহ্নিত প্রশ্নের জবাবে তিনি এই পরিকল্পনার বিবরণ তুলে ধরেন। এর মধ্যে ছিল দুই সিটি করপোরেশনের সাপ্তাহিক সচেতনতা কার্যক্রম, মশক নিধন ও নতুন বৃক্ষরোপণ থেকে শুরু করে মাতুয়াইল ল্যান্ডফিল নিয়ে পরিকল্পনা, ইলেকট্রিক বাস, দূষণকারী ইটভাটার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং রাজধানীর চারপাশের নদীতীরের কারখানার তরল বর্জ্য পর্যবেক্ষণ।
বেলা ১১টায় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদের বৈঠক শুরু হয়। শুরুতেই প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তরের জন্য ৪০ মিনিট নির্ধারিত ছিল। সেই বুধবার প্রধানমন্ত্রীর জন্য ৮টি প্রশ্ন তালিকাভুক্ত ছিল; নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তিনি ২টি প্রশ্ন ও সম্পূরক প্রশ্নের জবাব দেন। পরিবেশ অধিদপ্তরের কাজের বেশির ভাগ বিবরণ এসেছে তাঁর লিখিত জবাব থেকে, যা সংসদের টেবিলে উপস্থাপন করা হয়।
সংসদে প্রধানমন্ত্রী যা জানালেন
প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাজধানী ঢাকাকে ক্লিন ও গ্রিন সিটি রূপে গড়ে তুলতে স্থানীয় সরকার বিভাগের আওতায় ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মাধ্যমে নানাবিধ পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। তাঁর জবাব অনুযায়ী, নাগরিক সচেতনতা ও সম্পৃক্ততা বাড়াতে সিটি করপোরেশন দুটি সাপ্তাহিক ভিত্তিতে জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম চালাচ্ছিল, পাশাপাশি বিশেষ পরিচ্ছন্নতা ও মশক নিধন কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছিল।
তিনি জানান, সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশনগুলো (বর্জ্য ফেলার স্থান) আধুনিকায়নের লক্ষ্যে ল্যান্ডস্কেপিং, সবুজায়ন ও সচেতনতামূলক গ্রাফিতি যুক্ত করে পরিবেশসম্মতভাবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করা হচ্ছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) কোরিয়াভিত্তিক একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগে মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলকে সার্কুলার ইকোনমিভিত্তিক সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও জ্বালানি উৎপাদন কেন্দ্রে রূপান্তরের পরিকল্পনা নিয়েছে, যার লক্ষ্য সব বর্জ্যকে ‘জিরো বর্জ্যে’ পরিণত করা। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আশা করি, এসব কার্যক্রম ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ধীরে ধীরে পরিচ্ছন্ন ও সবুজ ঢাকা শহর গড়ে তোলা সম্ভব হবে।’
সবুজায়ন প্রসঙ্গে তিনি জানান, ডিএসসিসি এলাকার রোড মিডিয়ান, সড়কদ্বীপ ও উন্মুক্ত স্থানে বৃক্ষরোপণ কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) বিভিন্ন এলাকায় মিয়াওয়াকি পদ্ধতিতে নগর বনায়ন করা হচ্ছে এবং উন্মুক্ত মিডিয়ানগুলো ‘জিরো সয়েল’ পদ্ধতিতে, অর্থাৎ কোনো খালি মাটি না রেখে, সবুজে ঢেকে দেওয়া হচ্ছে। ডিএনসিসি তার এলাকায় আগামী পাঁচ বছরে ৫ লাখ গাছ লাগানোর লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছে। এ ছাড়া মেট্রোরেলের নিচে মিরপুর-১২ থেকে মিরপুর ডিওএইচএস পর্যন্ত এবং এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নিচে আব্দুল্লাহপুর থেকে ফার্মগেট পর্যন্ত খালি জায়গায় গাছ লাগানো হবে।
লিখিত জবাবে প্রধানমন্ত্রী জানান, ঢাকাকে ক্লিন ও গ্রিন সিটি হিসেবে গড়তে পরিবেশ অধিদপ্তর ঢাকা শহরের দূষণ নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। এ লক্ষ্যে অধিদপ্তরের যেসব পদক্ষেপের কথা তিনি তুলে ধরেন:
- বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে পরিবেশ অধিদপ্তর ও ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) সমন্বিতভাবে আধুনিক বাস সার্ভিস ও ২৫০টি ইলেকট্রিক বাস চালুর উদ্যোগ নিচ্ছে।
- বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় ঢাকার বায়ুদূষণের প্রধান উৎসগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে এবং সে অনুযায়ী অধিদপ্তর কাজ করছে।
- কালো ধোঁয়া নির্গমনকারী যানবাহন, নির্মাণকাজ ও নির্মাণসামগ্রী থেকে বায়ুদূষণের বিরুদ্ধে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে।
- ঢাকার চারপাশের অবৈধ দূষণকারী ইটভাটা বন্ধে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে; এ লক্ষ্যে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত ও এনফোর্সমেন্ট কার্যক্রম চলছে।
- সাভার উপজেলাকে ডিগ্রেডেড এয়ারশেড ঘোষণা করা হয়েছে এবং সেখানে ইটভাটা পরিচালনা ও খোলা জায়গায় বর্জ্য পোড়ানো নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
- তরল বর্জ্য নির্গমনকারী প্রতিষ্ঠানে বর্জ্য পরিশোধনাগার (ইটিপি) স্থাপন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে; এ পর্যন্ত ২৪৮টি প্রতিষ্ঠানে ইটিপি বসানো হয়েছে এবং রিয়েল-টাইম পর্যবেক্ষণের জন্য ক্যামেরা স্থাপনের কাজ চলছে।
- বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, বালু ও তুরাগ নদী এবং ঢাকা মহানগরে প্রবাহিত ১৯টি প্রধান খালের দূষণের উৎস ও প্রকৃতি নির্ধারণ করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর।
তিনি আরও জানান, বন অধিদপ্তর ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই করে রাস্তার মিডিয়ান, ইউলুপ, পন্ডিং এরিয়া ও খালের পাড়ে যৌথভাবে বৃক্ষরোপণ ও জিরো সয়েল কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছে। এর আওতায় বিভিন্ন প্রজাতির ৪১ হাজার ৫৬৫টি ফলদ, বনজ, ঔষধি ও শোভাবর্ধনকারী গাছের চারা রোপণ করা হয়েছে, আর দূষণ কমাতে লতা, গুল্ম ও ঘাস দিয়ে মাটি ঢেকে দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে ঢাকার বনায়নযোগ্য খালি জায়গায় গাছ লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
প্রথম আলো জানায়, আবুল কালাম সম্পূরক প্রশ্নে রাজধানীমুখী মানুষের স্রোত কমানোর উপায় জানতে চান। জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি বিষয়। চাকরি, চিকিৎসা, পড়ালেখাসহ প্রায় সব সুযোগ-সুবিধা বহু বছর ধরে ঢাকাকেন্দ্রিক হয়ে গড়ে উঠেছে, তাই সারা দেশ থেকে মানুষ ঢাকায় আসে। তাঁর ভাষ্যে, সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হলো দেশের বিভিন্ন জায়গায় পর্যায়ক্রমে মৌলিক সুবিধা, শিল্পাঞ্চল, চিকিৎসাসেবা ও ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা; এসব গড়ে উঠলে মানুষ ঢাকায় আসতে কম উৎসাহিত হবে এবং ধীরে ধীরে শহরের ওপর চাপ কমবে।
দুই সিটি করপোরেশন ও ঢাকার বর্জ্যের চাপ
এসব পদক্ষেপের বেশির ভাগ বাস্তবায়নের দায়িত্ব রাজধানীর নাগরিক সেবা দেওয়া দুই সংস্থার। ২০১১ সালের ২৯ নভেম্বর সংসদে পাস হওয়া স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) সংশোধন আইনে সাবেক ঢাকা সিটি করপোরেশন ভেঙে ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ গঠিত হয়। ২০১৬ সালে সীমানা বাড়ানোর পর ডিএনসিসির আয়তন প্রায় ১৯৭ বর্গকিলোমিটার, ওয়ার্ড ৫৪টি; ডিএসসিসির আয়তন প্রায় ১০৯ বর্গকিলোমিটার, ওয়ার্ড ৭৫টি। ২০২২ সালের জনশুমারি ও গৃহগণনায় ডিএনসিসিতে ৫৯ লাখ ৯০ হাজার ৭২৩ জন এবং ডিএসসিসিতে ৪৩ লাখ ৫ হাজার ৬৩ জন মানুষ গণনা করা হয়। ২০২৫ ও ২০২৬ সালে দুই সংস্থাই নির্বাচিত মেয়রের বদলে প্রশাসকের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছিল।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি ডিএসসিসির নবনিযুক্ত প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সঙ্গে পৃথক সভায় চারটি অগ্রাধিকার কর্মসূচি ঠিক করেন: বৃক্ষরোপণ ও ব্যাপক সবুজায়ন, খনন করে খালের প্রবাহ পুনরুদ্ধার, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং কার্যকর মশক নিধন। সভায় এক সপ্তাহের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কর্মপরিকল্পনা তৈরি করে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে পাঠানো এবং মশক নিধন তদারকিতে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি মনিটরিং টিম গঠনের সিদ্ধান্ত হয়।
সংসদে প্রশ্নোত্তরের চার দিন আগে, ২০২৬ সালের ২৫ এপ্রিল, ধানমন্ডি লেকে পরিচ্ছন্নতা ও মশক নিধন অভিযানের পাশাপাশি কলাবাগানে একটি আধুনিক সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন উদ্বোধন করে ডিএসসিসি। সেখানে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, ঢাকা যত মানুষের জন্য পরিকল্পিত, এখন তার তিন থেকে চার গুণ মানুষ এখানে থাকে, তাই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে; তাঁর মতে, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার চেয়েও বড় চ্যালেঞ্জ জনসচেতনতা। প্রশাসক জানান, দুর্গন্ধের কারণে আগে মানুষের ভোগান্তির কারণ হওয়া কলাবাগানের স্টেশনটিকে এখন পরিচ্ছন্ন ও কার্যকর স্থাপনা হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে।
কাজের পরিমাণ কতটা বড়, তা উঠে আসে ২০২৫ সালের নভেম্বরে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের এক প্রতিবেদনে: দুই সিটি করপোরেশন মিলে প্রতিদিন সাড়ে সাত হাজার টনের বেশি বর্জ্য সংগ্রহ করে ফেলে, যার বেশির ভাগ যায় আমিনবাজার, মাতুয়াইল, বেড়িবাঁধ ও উত্তরার চারটি ভাগাড়ে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রতিবেদন ২০১৯-২০২০ উদ্ধৃত করে পত্রিকাটি জানায়, মাথাপিছু দৈনিক বর্জ্য উৎপাদন ২০১৭-২০১৮ সালের ০.৫৭৫ কেজি থেকে বেড়ে ২০১৯-২০২০ সালে ০.৭২ কেজিতে দাঁড়ায়। জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) ক্লিন ঢাকা মাস্টারপ্ল্যান তৈরিতে সহায়তা, বর্জ্য সংগ্রহের যানবাহন এবং আঞ্চলিক পরিচ্ছন্নতা কার্যালয় গড়তে সহায়তা দেওয়ায় সংগ্রহব্যবস্থার উন্নতি হয়; প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্জ্য সংগ্রহের হার ২০০৫ সালের ৪০ শতাংশ থেকে ২০২১ সালে ৮৫ শতাংশে ওঠে।

মাতুয়াইল ল্যান্ডফিল নিয়ে পরিকল্পনা
মাতুয়াইল ডিএসসিসির বর্জ্য ফেলার ভাগাড় বা ল্যান্ডফিল। ঢাকা ট্রিবিউনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২ এপ্রিল এক সংবাদ সম্মেলনে প্রশাসক জায়গাটিকে ১৮১ একরের বলে উল্লেখ করেন। তিনি জানান, পচনশীল বর্জ্য থেকে জৈব সার তৈরির জন্য সেখানে দৈনিক ২০ টন ক্ষমতার একটি কম্পোস্ট প্ল্যান্ট চালু হয়েছে, ঘন ঘন অগ্নিকাণ্ড ঠেকাতে পাইপলাইন ও জলাধারসহ ৪০টি স্থানে পানির হাইড্র্যান্ট বসানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, আর মিথেন নিঃসরণ ও আগুনের ঝুঁকি কমাতে ফেলা বর্জ্যের প্রায় ৪০ শতাংশ মাটি দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী যে কোরীয় বিনিয়োগের কথা বলেন, তা নিয়ে কয়েক সপ্তাহ আগেই প্রকাশ্যে আলোচনা হয়েছিল। ইউএনবি ২০২৬ সালের ১২ মার্চ জানায়, নগর ভবনে ডিএসসিসির কর্মকর্তাদের সঙ্গে কোরিয়াভিত্তিক প্রতিষ্ঠান বি অ্যান্ড এফ কোম্পানির একটি কারিগরি দলের বৈঠক হয়, যেখানে প্রতিষ্ঠানটি মাতুয়াইলে ‘ঢাকা রিসোর্স সার্কুলেশন পার্ক’ গড়ার একটি মহাপরিকল্পনা উপস্থাপন করে। প্রস্তাব অনুযায়ী, পুরোনো ভাগাড়ের ১০০ একর থেকে ল্যান্ডফিল গ্যাস তোলা হবে; লক্ষ্য বছরে প্রায় ১৫ হাজার টন মিথেন সংগ্রহ, যা থেকে ৮১ হাজার মেগাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব, আর সৌরশক্তি থেকে আরও ২৮ হাজার মেগাওয়াট-ঘণ্টা। একটি পাইলট ম্যাটেরিয়াল রিকভারি ফ্যাসিলিটিতে প্রতিদিন ৩০০ টন গৃহস্থালি বর্জ্য প্রক্রিয়া করে বায়োগ্যাস, কম্পোস্ট, জৈব জ্বালানি, ইকো-ইট, ব্ল্যাক সোলজার ফ্লাই এবং সলিড রিফিউজ ফুয়েল তৈরির কথা বলা হয়। বাস্তবায়িত হলে প্রকল্পটি বছরে প্রায় ৫ লাখ ১৫ হাজার টন কার্বন ডাই-অক্সাইড সমতুল্য নিঃসরণ কমাবে বলে আশা করা হয়।
ডিএসসিসির কর্মকর্তারা ইউএনবিকে জানান, করপোরেশনের ১০৯.২৪ বর্গকিলোমিটার এলাকায় প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার ২০০ থেকে ৩ হাজার ৫০০ টন বর্জ্য তৈরি হয়; পাইলট প্রকল্প সফল হলে পুরো দৈনিক বর্জ্যকেই সম্পদে রূপান্তর করা সম্ভব হবে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ক্ষমতাসীন দলের নির্বাচনী ইশতেহারে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় চারটি উদ্যোগের কথা ছিল: সার্কুলার মডেল, আঞ্চলিক ম্যাটেরিয়াল রিকভারি ফ্যাসিলিটি, কমানো-পুনর্ব্যবহার-পুনর্চক্রায়ণের থ্রিআর নীতি এবং বর্জ্য থেকে জ্বালানি। ২ এপ্রিলের সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, কোরীয় প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে ডিএসসিসি চুক্তি সই করেছে।
ঢাকার ভাগাড় নিয়ে দীর্ঘ বিতর্কের প্রেক্ষাপটে এই প্রস্তাব আসে। ২০২৫ সালের নভেম্বরের প্রতিবেদনে ডিএসসিসির প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা বলেছিলেন, করপোরেশন যত প্রস্তাব পায় তার বেশির ভাগ বর্জ্য পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের; কিন্তু ঢাকার বর্জ্যের ক্যালরিফিক মান মাত্র ৬০০ থেকে ৭০০, অথচ বিদ্যুৎ উৎপাদনে অন্তত ১ হাজার ৫০০ দরকার, তাই পরিবেশের দিক থেকে যৌক্তিক প্রকল্পই কেবল তাঁরা গ্রহণ করবেন। একই প্রতিবেদনে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২১ সালের একটি গবেষণার কথা বলা হয়, যাতে ভাগাড়ের আশপাশের মাটি, অগভীর ভূগর্ভস্থ পানি এবং ধান ও সবজিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সীমার চেয়ে বেশি সিসা, ক্যাডমিয়াম, নিকেল ও ম্যাঙ্গানিজ পাওয়া যায়। গবেষকদের একজন অধ্যাপক বলেন, সেখানে প্রকৌশলভিত্তিক ল্যান্ডফিলের প্রয়োজনীয় সুরক্ষা স্তর বা সিনথেটিক মেমব্রেন নেই; এগুলো আসলে ভাগাড়।
মিডিয়ান, মিয়াওয়াকি বন, মেট্রোরেল ও এক্সপ্রেসওয়ের নিচে সবুজায়ন
ডিএনসিসি যে মিয়াওয়াকি পদ্ধতি ব্যবহার করছে, তার নামকরণ জাপানি উদ্ভিদবিজ্ঞানী আকিরা মিয়াওয়াকির (১৯২৮-২০২১) নামে। তিনি ছিলেন ইয়োকোহামা ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ইমেরিটাস অধ্যাপক। কোনো এলাকায় মানুষের হস্তক্ষেপ না থাকলে প্রাকৃতিকভাবে যে গাছপালা জন্মাত, সেই ধারণা থেকে তিনি দেশীয় বন ফিরিয়ে আনার একটি পদ্ধতি তৈরি করেন: ছোট জায়গায় খুব ঘন করে নানা জাতের স্থানীয় অগ্রগামী ও দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রজাতির চারা লাগানো। এই পদ্ধতিতে জাপান ও বিভিন্ন গ্রীষ্মমণ্ডলীয় দেশে তিনি ১ হাজার ৩০০টির বেশি স্থানে সুরক্ষামূলক বন গড়ে তোলেন।
জাগো নিউজ২৪-এর সে সময়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৬ নভেম্বর উত্তরার দিয়াবাড়িতে ১১ নম্বর লেকের পূর্ব পাশে ৪ নম্বর ব্রিজের পাশে প্রায় ৫৪.৬৩ কাঠা জমিতে ডিএনসিসি একটি মিয়াওয়াকি বন গড়ার কাজ শুরু করে, যা দেশের সবচেয়ে বড় মিয়াওয়াকি বন হতে যাচ্ছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়। পরিকল্পনা ছিল প্রায় ২২৫ প্রজাতির প্রায় ১৪ হাজার চারা লাগানো, যার মধ্যে দেশি ফল, বেরি, ফুল, ঔষধি, কাঠ, শোভাবর্ধনকারী ও কনিফার গাছ, গুল্ম এবং নিচের স্তরের উদ্ভিদ রয়েছে। প্রাকৃতিক পানিনিষ্কাশনের জন্য কৃত্রিম টিলা তৈরি করা হয়, আর মাটিতে মেশানো হয় দোআঁশ মাটি, ভার্মিকম্পোস্ট, জৈব সার, হাড়ের গুঁড়া, নারকেলের ছোবড়ার গুঁড়া ও ধানের তুষ। ডিএনসিসি জানায়, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) চিহ্নিত সবুজ বেষ্টনী এলাকার মধ্যেই কাজটি করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী যে দুটি নতুন জায়গায় গাছ লাগানোর কথা বলেন, সেগুলো শহরের নতুন উড়ালপথের নিচে। একটি মেট্রোরেলের মিরপুর-১২ থেকে মিরপুর ডিওএইচএস অংশ। অন্যটি ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, দেশের প্রথম উড়াল মহাসড়ক হিসেবে বিবেচিত ১৯.৭৩ কিলোমিটারের টোল সড়ক, যা ২০২৩ সালে আংশিক চালু হয় এবং হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সঙ্গে ফার্মগেটকে যুক্ত করেছে; জবাবে আব্দুল্লাহপুর থেকে ফার্মগেট অংশের কথা বলা হয়।

ঢাকার বাতাস ও পরিবেশ অধিদপ্তরের পদক্ষেপ
পরিবেশ অধিদপ্তর পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অধীন সরকারের পরিবেশ নিয়ন্ত্রক সংস্থা। ১৯৮৯ সালে গঠিত এই অধিদপ্তর দূষণকারী শিল্পকে জরিমানা করতে পারে, আর কারখানা চালাতে তার ছাড়পত্র লাগে। ঢাকার বাতাসের ওপর তার মনোযোগের কারণ, বছরের পর বছর এই বাতাসের মান খুব খারাপ। সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বায়ুমান পর্যবেক্ষণ প্রতিষ্ঠান আইকিউএয়ার ২০২৬ সালের মার্চে প্রকাশিত বিশ্ব বায়ুমান প্রতিবেদনে ২০২৫ সালে বাংলাদেশকে বিশ্বের দ্বিতীয় দূষিত দেশ হিসেবে চিহ্নিত করে; বার্ষিক গড় পিএম২.৫ ঘনত্ব ছিল প্রতি ঘনমিটারে ৬৬.১ মাইক্রোগ্রাম, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিত মাত্রা ৫ মাইক্রোগ্রামের ১৩ গুণের বেশি। প্রতিবেদনে বলা হয়, দুশানবে ও দিল্লির সঙ্গে ঢাকা এমন তিন রাজধানীর একটি, যেখানে অন্তত দুই মাস পিএম২.৫ প্রতি ঘনমিটারে ১০০ মাইক্রোগ্রাম ছাড়িয়েছে; কারণ হিসেবে শিল্প ও যানবাহনের নিঃসরণ, ইটভাটা, নির্মাণকাজের ধুলা ও ফসলের অবশিষ্টাংশ পোড়ানোর কথা বলা হয়। ২০২৪ সালের প্রতিবেদনে ঢাকা ছিল বিশ্বের তৃতীয় দূষিত রাজধানী, গড় ঘনত্ব ৭৮ মাইক্রোগ্রাম।
প্রধানমন্ত্রী যে বিশ্বব্যাংকের সহায়তার কথা বলেন, সেই বিশ্বব্যাংক ২০২২ সালের ডিসেম্বরে ‘ব্রিদিং হেভি: নিউ এভিডেন্স অন এয়ার পলিউশন অ্যান্ড হেলথ ইন বাংলাদেশ’ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে দেখা যায়, ঢাকায় বড় নির্মাণকাজ ও স্থায়ী যানজটের এলাকায় সূক্ষ্ম বস্তুকণার মাত্রা সবচেয়ে বেশি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিত মাত্রার চেয়ে গড়ে ১৫০ শতাংশ বেশি; এর পরেই বৃহত্তর ঢাকার ইটভাটার আশপাশ, যেখানে মাত্রা ১৩৬ শতাংশ বেশি। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৯ সালে বাংলাদেশে বায়ুদূষণে ৭৮ হাজার ১৪৫ থেকে ৮৮ হাজার ২২৯ জনের মৃত্যু হয়, আর ঢাকা বিভাগে পিএম২.৫-এর এক-পঞ্চমাংশ পর্যন্ত আসে সীমান্তের ওপার থেকে। ২০২৫ সালের নভেম্বরে দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস বিশ্বব্যাংকের বরাতে আরও বড় একটি হিসাব দেয়: ২০১৯ সালে বায়ুদূষণে ১ লাখ ৫৯ হাজারের বেশি অকালমৃত্যু ও ২৫০ কোটি দিনের অসুস্থতা, যার স্বাস্থ্য ব্যয় জিডিপির ৮.৩ শতাংশের সমান।
ইলেকট্রিক বাস ও ক্লিন এয়ার প্রকল্প
প্রধানমন্ত্রী পরিবেশ অধিদপ্তরের সঙ্গে যে ডিটিসিএর নাম বলেন, সেটি ২০১২ সালের ২ সেপ্টেম্বর ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ আইন ২০১২-এর অধীনে গঠিত হয়। ঢাকা এবং পাশের গাজীপুর, মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদী জেলায় পরিবহন প্রকল্পের সমন্বয় এবং ২০১৬ সালে অনুমোদিত সংশোধিত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা (আরএসটিপি) তদারকি করে এই সংস্থা।
বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ‘বাংলাদেশ ক্লিন এয়ার প্রজেক্ট’-এর আওতায় ঢাকায় ইলেকট্রিক বাস নামানোর পরিকল্পনা আগে থেকেই ছিল। ২০২৫ সালের মে মাসে দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস জানায়, সরকার ২৯ কোটি ডলারের ঋণ নিয়ে আলোচনা শেষ করেছে; এর আওতায় ডিটিসিএ প্রথমে পরীক্ষামূলকভাবে চালানোর জন্য ১০০টি ইলেকট্রিক বাস কিনবে, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) যানবাহন পরিদর্শন কেন্দ্র স্থাপন করবে এবং ২০টি নিঃসরণ শনাক্তকরণ যন্ত্র বসানো হবে। ২০২৫ সালের ২ জুন জাতীয় বাজেট বক্তৃতায় ঢাকার গণপরিবহনে ৪০০টি ইলেকট্রিক বাস যুক্ত করার ঘোষণা দেওয়া হয়। ২০২৫ সালের নভেম্বরে পত্রিকাটি জানায়, বিশ্বব্যাংক জুনে ২৯ কোটি ডলার অনুমোদন করলেও বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তখনো অনুমোদনের অপেক্ষায় ছিল; ডিটিসিএর কর্মকর্তারা বলেন, বাস কেনা ২০২৭ সালে শুরু হয়ে ২০৩০ সালের মধ্যে শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড প্রকল্প নথির বরাতে জানায়, ফ্র্যাঞ্চাইজির মাধ্যমে নির্দিষ্ট ফিতে চালানো ৪০০টি ইলেকট্রিক বাসের জন্য ডিটিসিএ ৪২৭ কোটি টাকা এবং আরও ২৪৪ কোটি টাকার সিড ক্যাপিটাল নিয়ে একটি পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ফান্ড গঠন করবে; পুরোনো ডিজেলচালিত বাস তুলে নিতে ও মালিকদের ক্ষতিপূরণ দিতে ৮৫ কোটি ৪০ লাখ টাকার একটি স্কিম থাকবে; আর সরকারি জমিতে তিনটি ইলেকট্রিক বাস ডিপো হবে, যার স্থান বাছাই করা হবে কাঁচপুর, গাবতলী, কল্যাণপুর, পূর্বাচল ও জোয়ারসাহারা থেকে। ২০২৬ সালের এপ্রিলে প্রধানমন্ত্রীর জবাবে আধুনিক বাস সার্ভিস ও ২৫০টি ইলেকট্রিক বাসের কথা বলা হয়; আগের প্রকল্প নথির ৪০০টি বাসের সঙ্গে এই সংখ্যার সম্পর্ক জবাবে স্পষ্ট করা হয়নি।
ইটভাটা ও সাভারের ‘ডিগ্রেডেড এয়ারশেড’
ঢাকার বায়ুদূষণের অন্যতম প্রধান উৎস হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে ইটভাটার নাম আসছে। ইট তৈরি নিয়ন্ত্রিত হয় ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন ২০১৩ দিয়ে, যা আরও কড়া বিধান নিয়ে ১৯৮৯ সালের ইট পোড়ানো (নিয়ন্ত্রণ) আইনের জায়গা নেয়। আইন অনুযায়ী আবাসিক, সংরক্ষিত বা বাণিজ্যিক এলাকা, পৌর শহর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা কৃষিজমির কাছে ইটভাটা স্থাপন করা যায় না। ২০১৯ সালে দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের এক কলামে পরিবেশ অধিদপ্তরের হিসাবে দেশে প্রায় সাড়ে ছয় হাজার ইটভাটার কথা বলা হয়; পরিবেশবাদীদের দাবি, সংখ্যাটি প্রায় ১০ হাজার এবং এর অর্ধেকই রাজধানীর চারপাশে। ২০২৫ সালের আগস্টে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকা ও আশপাশের ইটভাটা শহরের বায়ুদূষণের ৫৮ শতাংশের জন্য দায়ী।
প্রধানমন্ত্রী সাভারের যে পদক্ষেপের কথা বলেন, সেটি ২০২৫ সালের আগস্টের। বায়ুদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা ২০২২-এর বিধি ৫ অনুযায়ী পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের সই করা ১৭ আগস্ট ২০২৫ তারিখের এক পরিপত্রে ঢাকা জেলার পুরো সাভার উপজেলাকে ‘ডিগ্রেডেড এয়ারশেড’ ঘোষণা করা হয়। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে টানেল কিলন ও হাইব্রিড হফম্যান কিলন ছাড়া সাভারের সব ধরনের ইটভাটা চালানো নিষিদ্ধ হয়; খোলা জায়গায় কঠিন বর্জ্য পোড়ানো এবং বায়ুদূষণ ঘটাতে পারে এমন নতুন শিল্পের অবস্থানগত ও পরিবেশগত ছাড়পত্র দেওয়াও বন্ধ করা হয়। অধিদপ্তরের অবিরাম বায়ুমান পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের তথ্যে দেখা যায়, সাভারের বাতাসে দূষণকারী উপাদানের বার্ষিক গড় ঘনত্ব জাতীয় মানমাত্রার প্রায় তিন গুণ; আর শুষ্ক মৌসুমের প্রায় পাঁচ মাস উত্তর-পশ্চিম ও উত্তর-পূর্ব দিকের বাতাস সেই দূষণ ঢাকায় বয়ে আনে বলে মন্ত্রণালয় জানায়।
এই আদেশ আগের কয়েকটি পদক্ষেপের ধারাবাহিকতা। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড জানায়, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে অন্তর্বর্তী সরকারের পরিবেশ উপদেষ্টা ঘোষণা দেন, নতুন ইটভাটার অনুমতি দেওয়া হবে না এবং পরিবেশ ছাড়পত্র ছাড়া চলা ৩ হাজার ৪৯১টি ইটভাটা বন্ধ করা হবে; আর ২০২৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট সারা দেশের অবৈধ ইটভাটা উচ্ছেদের নির্দেশ দেন।

নদী, খাল ও বর্জ্য পরিশোধনাগার
প্রধানমন্ত্রী যে চার নদীর নাম বলেন, সেগুলো রাজধানীকে ঘিরে রেখেছে। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, বুড়িগঙ্গা প্রায় ২৭ কিলোমিটার দীর্ঘ জোয়ারভাটার নদী, যা পুরান ঢাকার পশ্চিম ও দক্ষিণ দিয়ে বয়ে গেছে এবং এর মূল প্রবাহ আসে তুরাগ থেকে। বাংলাপিডিয়ার ভাষ্যে, এই নদীর দূষণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে, যার সবচেয়ে বড় উৎস দীর্ঘদিন ধরে হাজারীবাগের ট্যানারি, আর শুষ্ক মৌসুমে পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন প্রায় শূন্যে নেমে আসে। তুরাগ মিরপুরের কাছে বুড়িগঙ্গায় মিলেছে এবং এর নিম্নাংশ জোয়ারভাটার। বালু নদী ঢাকার পূর্বের জলাভূমির পানি নিষ্কাশন করে ডেমরার কাছে শীতলক্ষ্যায় মিশেছে।
প্রধানমন্ত্রীর জবাবের এক বছর আগেই গবেষকেরা সমস্যার মাত্রা তুলে ধরেছিলেন। রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টার (আরডিআরসি) ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে স্যাটেলাইট ছবি ও মাঠ জরিপের মাধ্যমে একটি গবেষণা করে, যা দ্য ডেইলি স্টার ২০২৫ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি প্রকাশ করে। তাতে দেখা যায়, পাঁচ বছরে ঢাকার চারপাশের নদীর দূষণ উৎস ৬০৮টি থেকে প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ১ হাজার ২৪টিতে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে ছিল ১০২টি শিল্পবর্জ্যের নির্গমনমুখ, ৭৫টি পৌর পয়োনিষ্কাশন লাইন ও ২১৬টি ছোট ব্যক্তিগত পয়োনালা। বুড়িগঙ্গায় ৫০৬টি, শীতলক্ষ্যায় ১৭৩টি, তুরাগে ৯৭টি এবং বালুতে ৩৩টি দূষণ উৎস পাওয়া যায়। পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক তখন বলেছিলেন, পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন পেলে অধিদপ্তর ব্যবস্থা নেবে। ২০১৯ সালে হাইকোর্ট নদীকে আইনি সত্তা ঘোষণা করে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে তাদের আইনি অভিভাবক করেন।
এই প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রীর জবাবে বলা হয়, ২৪৮টি প্রতিষ্ঠানে বর্জ্য পরিশোধনাগার বা ইটিপি স্থাপন করা হয়েছে, যা তরল বর্জ্য নদীতে ফেলার আগে পরিশোধন করে, আর এসব প্ল্যান্ট রিয়েল-টাইমে পর্যবেক্ষণের জন্য ক্যামেরা বসানো হচ্ছে। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ও প্রথম আলো এগুলোকে ইন্টারনেট প্রটোকল (আইপি) ক্যামেরা বলে উল্লেখ করে। প্রধানমন্ত্রী জানান, পরিবেশ অধিদপ্তর চার নদী এবং ঢাকা মহানগরে প্রবাহিত ১৯টি প্রধান খালের দূষণের উৎস ও প্রকৃতিও নির্ধারণ করেছে; তবে জবাবে খালগুলোর নাম বলা হয়নি।

বন অধিদপ্তরের বৃক্ষরোপণ ও ২৫ কোটি গাছের কর্মসূচি
সিটি করপোরেশন, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের সঙ্গে মিলে বন অধিদপ্তর যে ৪১ হাজার ৫৬৫টি চারা লাগিয়েছে, তা একটি অনেক বড় জাতীয় লক্ষ্যের অংশ। দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৪ মার্চ প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সম্মেলনকক্ষে সরকারের দুটি প্রধান কর্মসূচি, ‘৫ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ’ এবং ‘সুস্বাস্থ্যের বাংলাদেশ গঠন’ সংক্রান্ত বিশেষ সেলের অগ্রগতি নিয়ে পর্যালোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন। বাসস জানায়, ২০২৬ সালের ১১ মার্চ আগারগাঁওয়ের বন ভবনে বিশ্ব বন্যপ্রাণী দিবসের আলোচনা সভায় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, বন, বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় প্রধানমন্ত্রী ‘ন্যাশনাল গ্রিন মিশন’ নামে পাঁচ দফা পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন, যার আওতায় আগামী পাঁচ বছরে সারা দেশে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ২৫ কোটি গাছ লাগানো হবে। তিনি আরও বলেন, সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খনন ও পুনঃখনন করা হবে।
ঢাকায় এ ধরনের বৃক্ষরোপণের জায়গা সীমিত। সে কারণেই জবাবে সরু সরকারি জায়গার তালিকা দেওয়া হয়: সড়কের মিডিয়ান, ইউলুপ, পন্ডিং এরিয়া ও খালের পাড়। জবাবে ১২টি পদক্ষেপ কবে শেষ হবে তার কোনো সময়সীমা বা ব্যয়ের হিসাব দেওয়া হয়নি।
ছবি: Shafiul Islam Shaikot / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ২৪, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), প্রথম আলো, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, ইউনাইটেড নিউজ অব বাংলাদেশ (ইউএনবি), ঢাকা ট্রিবিউন, দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, দ্য ডেইলি স্টার (এশিয়া নিউজ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে), দেশ রূপান্তর, বিশ্বব্যাংক, আইকিউএয়ার, বাংলাপিডিয়া, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)