খুলনার সাত নম্বর ঘাট এলাকায় ১৮ জন বেদে নারী গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়ানোর জীবন ছেড়ে পরিবার নিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন এবং নিজেরাই ছোট ব্যবসা চালাচ্ছেন। ২০২৫ সালের ৮ মার্চ, আন্তর্জাতিক নারী দিবসে, জাগো নিউজ ২৪-এর খুলনা জেলা প্রতিনিধি আরিফুর রহমানের প্রতিবেদনে তাঁদের এই বদলের কথা উঠে আসে। কাপড়ের ব্যবসা, ব্যাগ বানানো, মুদি দোকান, সবজি বিক্রি ও ছাগল পালন করে তাঁরা আয় করছিলেন, আর সন্তানদের ভর্তি করিয়েছিলেন স্কুল ও মাদরাসায়।
সাপের খেলা থেকে কাপড়ের দোকান
নারীরা জাগো নিউজকে জানান, আগে তাঁরা সিঙ্গা লাগাতেন, সাপের খেলা দেখাতেন এবং এ জন্য গ্রামে গ্রামে ঘুরতে হতো। করোনা মহামারির সময় মানুষ তাঁদের ঘরে উঠতে দিত না, তাচ্ছিল্য করত; তখন ভিক্ষা পর্যন্ত করতে হয়েছে। করোনার পর ২০২২ সালে তাঁরা বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা রূপান্তরে ১০ দিনের প্রশিক্ষণ নেন। এরপর সংস্থাটির সহযোগিতায় নিজেরা ব্যবসা শুরু করেন এবং শাড়ি-কাপড় বিক্রি করতে থাকেন। তাঁদের ভাষায়, আয় বেড়েছে, আর আগে যে মানুষ জায়গা দিত না, তারাই এখন ভালোবাসে।
খোদেজা বেগম জানান, প্রায় তিন বছর আগে তিনি আগের পেশা ছেড়ে ছাগল পালন শুরু করেন। একটি ছাগল মারা গেলে অন্যটি বিক্রি করে কাপড়ের ব্যবসা শুরু করেন। কেয়া খাতুন সিমেন্টের বস্তা কিনে তা দিয়ে ব্যাগ বানিয়ে বিক্রি করেন। তিনি বলেন, আগে সাপখেলা দেখিয়ে টাকা আয় করতে হতো, মানুষের কাছে টাকা চাইতেও হয়েছে; এখন তিনি শান্তিতে আছেন।

সন্তানদের জন্য নতুন পথ, সরকারের সহায়তার আবেদন
কপালি বেগম জানান, তাঁরা যে কঠিন জীবন পার করে এসেছেন, সন্তানদের আর সেখানে ফিরতে দিতে চান না; সে জন্যই তাঁরা এখনো লড়াই করে যাচ্ছেন। মিনারা খাতুন বলেন, আগে নিজেদের সম্প্রদায়ের বাইরে ছেলেমেয়েদের বিয়ে দিতে পারতেন না, একটি গণ্ডির মধ্যে আটকে ছিলেন; এখন ব্যবসা করছেন এবং সবাই তাঁদের সম্মান করে। তিনি আরও জানান, সম্প্রদায়ের অনেকেই এমন জীবন চান, কিন্তু সুযোগের অভাবে পারেন না। তাই তাঁরা সরকারের সহযোগিতা চান; সরকার সহায়তা করলে অনেকেই নতুন জীবনে ফিরতে পারবেন বলে তাঁর বিশ্বাস।
রূপান্তরের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক স্বপন কুমার গুহ জাগো নিউজকে বলেন, বেদে সম্প্রদায়ের মানুষ অনেক পরিশ্রমী ও কর্মঠ। প্রশিক্ষণের দশ দিন তাঁরা এক মিনিটও দেরি করে আসেননি, আর নিজেদের ইচ্ছাশক্তির জোরেই তাঁরা ভাগ্য বদলাতে পেরেছেন। খুলনার শিরিশনগরে কার্যালয় থাকা রূপান্তর ১৯৯৫ সাল থেকে উন্নয়ন খাতে কাজ করছে। সংস্থাটি কমিউনিটি মিডিয়া ও লোকনাট্যের মাধ্যমে উন্নয়ন বার্তা পৌঁছে দেয় এবং শিশু, তরুণ, নারী ও প্রান্তিক মানুষের অধিকার নিয়ে কাজ করে।

বেদে কারা, সরকারি কর্মসূচিতে কী আছে
বেদেরা বাংলাদেশের একটি যাযাবর জনগোষ্ঠী, যাঁদের অনেকে একসময় নৌকায় বসবাস করতেন। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের ২০২২ সালের জুনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সাপ ধরা ও বিক্রি, সাপের খেলা, বানরের খেলা ও জাদু দেখানো ছিল তাঁদের প্রচলিত জীবিকা, আর অনেক বেদে পরিবার নৌকা ছেড়ে স্থায়ী ঘরে উঠছে। বণিক বার্তা ২০২৪ সালের নভেম্বরে জরিপের বরাতে জানায়, দেশে প্রায় ৭৫ হাজার ৭০২ জন বেদে রয়েছেন।
একই প্রতিবেদন অনুযায়ী, সমাজসেবা অধিদপ্তরের "বেদে ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন কার্যক্রম" ২০১২-১৩ অর্থবছরে সাতটি জেলায় পাইলট কর্মসূচি হিসেবে শুরু হয়ে পরে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। এর আওতায় রয়েছে:
- ৫০ বছর বা তার বেশি বয়সী অক্ষম ও অসচ্ছল ব্যক্তির জন্য মাসে ৫০০ টাকা ভাতা
- শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি: প্রাথমিকে ৭০০, মাধ্যমিকে ৮০০, উচ্চ মাধ্যমিকে ১০০০ ও উচ্চতর স্তরে ১২০০ টাকা
- বিকল্প পেশার জন্য প্রশিক্ষণ, এরপর পুনর্বাসন সহায়তা হিসেবে ১০ হাজার টাকা ও যাতায়াত ভাতা
বণিক বার্তা আরও জানায়, সমন্বয়ের অভাবে এসব প্রকল্পের সুফল ঠিকমতো আলোর মুখ দেখেনি। খুলনার এই ১৮ নারীর ঘুরে দাঁড়ানো এসেছিল একটি বেসরকারি সংস্থার প্রশিক্ষণ ও নিজেদের পরিশ্রম থেকে, আর তাঁদের চাওয়া ছিল, সম্প্রদায়ের অন্যরাও যেন সেই সুযোগ পান।

ছবি: Mithun Ahmed / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বণিক বার্তা, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, রূপান্তর





মন্তব্য
(০)