২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে অ্যান্টার্কটিকা থেকে এক অস্বাভাবিক উষ্ণতার খবর আসে। ব্রাজিলের গবেষকেরা জানান, ৯ ফেব্রুয়ারি অ্যান্টার্কটিক উপদ্বীপের উত্তর প্রান্তের কাছে সেমোর দ্বীপের একটি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে তাপমাত্রা উঠেছিল ২০ দশমিক ৭৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। খবরটি সত্য হলে এটিই হতো অ্যান্টার্কটিক অঞ্চলে প্রথমবার ২০ ডিগ্রির বেশি তাপমাত্রা। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) তখন জানায়, রেকর্ড হিসেবে মেনে নেওয়ার আগে এই পাঠ আনুষ্ঠানিকভাবে যাচাই করতে হবে।
সেমোর দ্বীপে কী মাপা হয়েছিল
পাঠটি নেওয়া হয় ব্রাজিল সরকারের অর্থায়নে চলা টেরান্টার (Terrantar) প্রকল্পের একটি কেন্দ্রে। এই প্রকল্প অ্যান্টার্কটিকার বিভিন্ন স্থানে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পর্যবেক্ষণ করে। প্রকল্পের বিজ্ঞানী কার্লোস শেফার ২০২০ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, "অ্যান্টার্কটিকায় এত বেশি তাপমাত্রা আমরা আগে কখনো দেখিনি।"
তবে শেফার নিজেই সতর্ক করে দেন, এটি একটিমাত্র দিনের পাঠ, দীর্ঘমেয়াদি তথ্যের অংশ নয়; তাই জলবায়ু পরিবর্তনের প্রবণতা বোঝাতে এর আলাদা কোনো অর্থ নেই। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের অনেক পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে উষ্ণায়নের প্রবণতা দেখা যাচ্ছিল, কিন্তু এমন পাঠ আগে দেখা যায়নি।
সেমোর দ্বীপ অ্যান্টার্কটিক উপদ্বীপের উত্তর প্রান্তের কাছে, জেমস রস দ্বীপের পূর্বে অবস্থিত। দ্বীপটিতে আর্জেন্টিনার প্রধান অ্যান্টার্কটিক গবেষণাকেন্দ্র মারাম্বিও ঘাঁটি রয়েছে, তাই একে মারাম্বিও দ্বীপও বলা হয়।

কয়েক দিন আগে এস্পেরানসায় ১৮.৩ ডিগ্রি
এর মাত্র তিন দিন আগে, ৬ ফেব্রুয়ারি, অ্যান্টার্কটিক উপদ্বীপের উত্তর প্রান্তে আর্জেন্টিনার এস্পেরানসা গবেষণাকেন্দ্রে তাপমাত্রা ওঠে ১৮ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ডব্লিউএমও ১৪ ফেব্রুয়ারি জানায়, এটি অ্যান্টার্কটিক মহাদেশের নতুন রেকর্ড বলে জানানো হয়েছে; আগের রেকর্ড ছিল ২০১৫ সালের ২৪ মার্চ একই কেন্দ্রে মাপা ১৭ দশমিক ৫ ডিগ্রি।
ডব্লিউএমওর চরম আবহাওয়া ও জলবায়ুর রেকর্ড যাচাইয়ের দায়িত্বে থাকা র্যান্ডাল সার্ভেনি বলেন, এ পর্যন্ত যা দেখা গেছে তাতে এস্পেরানসার রেকর্ড সম্ভবত সঠিক, তবে আনুষ্ঠানিক মূল্যায়ন শুরু হবে। তাঁর ব্যাখ্যায়, এলাকায় তখন ফন (foehn) পরিস্থিতি চলছিল, অর্থাৎ পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে আসা বাতাস দ্রুত গরম হয়ে উঠছিল। সেমোর দ্বীপের পাঠ নিয়ে তিনি বলেন, কেন্দ্রের যন্ত্রপাতি, মাপার পদ্ধতি ও যন্ত্রের মান যাচাইয়ের তথ্য বিশ্লেষণ না করে মূল্যায়ন সম্ভব নয়। ডব্লিউএমওর হিসাবে, ৬০ ডিগ্রি দক্ষিণ অক্ষাংশের দক্ষিণে পুরো অ্যান্টার্কটিক অঞ্চলের তখনকার রেকর্ড ছিল ১৯৮২ সালের জানুয়ারিতে সিগনি দ্বীপে মাপা ১৯ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

উষ্ণ হতে থাকা পৃথিবী ও গলতে থাকা বরফ
ডব্লিউএমও জানায়, গত ৫০ বছরে অ্যান্টার্কটিক উপদ্বীপের তাপমাত্রা প্রায় ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে; অঞ্চলটি পৃথিবীর দ্রুততম উষ্ণ হয়ে ওঠা অঞ্চলগুলোর একটি। ১৯৭৯ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে অ্যান্টার্কটিকার বার্ষিক বরফ হারানোর পরিমাণ অন্তত ছয় গুণ বেড়েছে। মহাদেশটির বরফের স্তরে পৃথিবীর প্রায় ৯০ শতাংশ মিঠা পানি জমা আছে; পুরোটা গলে গেলে সমুদ্রপৃষ্ঠ প্রায় ৬০ মিটার বাড়তে পারে।
খবরটি এসেছিল বৈশ্বিক উষ্ণতার আরও কয়েকটি রেকর্ডের মধ্যেই। ২০২০ সালের ১৫ জানুয়ারি ডব্লিউএমও নিশ্চিত করে, ২০১৯ ছিল রেকর্ডে দ্বিতীয় উষ্ণতম বছর, ২০১৬ সালের পরেই; আর ২০১০ থেকে ২০১৯ সালের দশক ছিল রেকর্ডের উষ্ণতম দশক। ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোপারনিকাস জলবায়ু পরিবর্তন সেবা ৪ ফেব্রুয়ারি জানায়, ২০২০ সালের জানুয়ারি বৈশ্বিকভাবে আগের যেকোনো জানুয়ারির চেয়ে উষ্ণ ছিল, যদিও ২০১৬ সালের জানুয়ারির চেয়ে মাত্র ০.০৩ ডিগ্রি বেশি।

ছবি: The MODIS Rapid Response Team, NASA GSFC / উইকিমিডিয়া কমন্স (পাবলিক ডোমেইন)
সূত্র: দ্য এগ্রো নিউজ, এএফপি (আল জাজিরা ও গ্লোবাল নিউজের মাধ্যমে), বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও), জাতিসংঘ সংবাদ, কোপারনিকাস জলবায়ু পরিবর্তন সেবা





মন্তব্য
(০)