২০২৬ সালের ১৮ জুলাই শনিবার বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানায়, দেশের দুটি জেলায় নদীর পানি তখন বিপদসীমার ওপর দিয়ে বইছিল এবং উত্তরাঞ্চলের তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমারের পানি পরের দুই দিনে কিছু জায়গায় বিপদসীমা ছাড়াতে পারে। কেন্দ্রের হিসাবে কুশিয়ারা নদী সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ ও সুনামগঞ্জের মারকুলি পয়েন্টে বিপদসীমার ওপরে ছিল।
উত্তরের পাঁচ জেলায় স্বল্পমেয়াদি বন্যার পূর্বাভাস
পূর্বাভাসে বলা হয়, পরের পাঁচ দিন এসব নদীর পানি বাড়তে পারে এবং ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর, গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রাম জেলার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে কোথাও কোথাও স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তিস্তা তখন ডালিয়া, কাউনিয়া, হরিপুর ও তারাপুর স্টেশনে সতর্কসীমায় বইছিল। ব্রহ্মপুত্র-যমুনার পানি আগের ২৪ ঘণ্টায় বাড়লেও বিপদসীমার নিচে ছিল।
তিস্তা পূর্ব হিমালয়ের পাউহুনরি পর্বত থেকে নেমে সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গ হয়ে রংপুর বিভাগ দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকেছে। ৪১৪ কিলোমিটার দীর্ঘ নদীটির ১০৯ কিলোমিটার বাংলাদেশে, এবং এটি গাইবান্ধার ফুলছড়িতে যমুনায় মিশেছে। একই বছরের ২২ জুন উজানের ঢলে লালমনিরহাটের হাতীবান্ধায় তিস্তা ব্যারাজ পয়েন্টে পানি বিপদসীমার এক সেন্টিমিটার ওপরে উঠেছিল; দ্য ডেইলি স্টার তখন জানায়, ব্যারাজের ৪৪টি গেট খুলে দেওয়া হয় এবং চর ও নিম্নাঞ্চলে আমনের বীজতলা ও বোরো ধানের জমির ক্ষতির খবর আসে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা যা বলেছিলেন
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ রাকিবুল হাসান বিবিসি বাংলাকে বলেন, জেলার কোনো নদী তখনো বিপদসীমা পেরোয়নি, তবে উজানে বৃষ্টি থাকায় তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার তা পেরোতে পারে। তার ভাষায়, "ভারতের আসাম অর্থাৎ উজানে প্রবল বৃষ্টির কারণে পানি বাড়ছে। তবে ব্রহ্মপুত্র নদের পানি এবার বিপদসীমা অতিক্রম করবে না। সে কারণে নদী সংলগ্ন এলাকায় পানি উঠলেও বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের কিছু নেই।"
গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম বলেন, তিস্তায় বিপদসীমা অতিক্রমের সম্ভাবনা আছে, যমুনা বাড়লেও তা পেরোবে না, তবে দুই-তিন দিন সব নদীর পানি বেড়ে নিম্নাঞ্চলে উঠবে। "তবে এ নিয়ে উদ্বেগের কিছু নেই। কয়েকদিন পর পানি আবার নেমে যাবে," বলেন তিনি। জুলাইয়ের শুরুতে ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা বিপদসীমা ছাড়ালে গাইবান্ধা সদর, সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি ও সাঘাটার চরাঞ্চলে পানি উঠে বেশ কিছু চরে বাড়িঘর তলিয়ে গিয়েছিল। ফুলছড়ির মানিককর চরের বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বিবিসি বাংলাকে জানান, আবার একই পরিস্থিতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ রবিউল ইসলাম বলেন, ভারতের দিকে বৃষ্টির কারণে রংপুর ও কুড়িগ্রামে তিস্তার পানি বাড়বে। "এসব এলাকায় স্বল্পমেয়াদী বন্যার আশঙ্কা আছে। তবে এখনো পানি প্রবাহ বিপদসীমা থেকে নীচেই আছে," বলেন তিনি। ধরলা নদী সিকিমে জলঢাকা নামে উৎপন্ন হয়ে লালমনিরহাট দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকে কুড়িগ্রামের কাছে যমুনায় মিশেছে; জুন থেকে সেপ্টেম্বরের বর্ষায় তিস্তার সঙ্গে এটিও বড় বন্যার কারণ হয়ে থাকে।

সিলেট অঞ্চল, ঢাকার নদী ও আবহাওয়ার পূর্বাভাস
সুরমা-কুশিয়ারা অববাহিকায় সুরমা ছাতকে এবং কুশিয়ারা মৌলভীবাজারের শেরপুরে সতর্কসীমায় ছিল। নেত্রকোনার কলমাকান্দায় সোমেশ্বরী বিপদসীমার ওপরে ছিল। বরাক নদী ভাগ হয়ে তৈরি কুশিয়ারা প্রায় ১৬০ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে সুরমার সঙ্গে মিলে মেঘনা হয়েছে। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে প্রতিষ্ঠিত এই কেন্দ্রটি পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের আওতায় দেশের বন্যার পূর্বাভাস দেয়।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানায়, ১৮ জুলাই থেকে পাঁচ দিন সারাদেশে বিভিন্ন মাত্রার বৃষ্টি চলবে। রংপুর বিভাগের কোথাও কোথাও অতি ভারী বর্ষণের আভাস দেওয়া হয়। এর আগে জুলাইয়ের শুরুতে এক সপ্তাহের টানা বর্ষণে চট্টগ্রাম ও বান্দরবানসহ অন্তত সাতটি জেলায় বন্যার পানি ওঠে; ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের হিসাবে অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ধসে অন্তত ৫৮ জন মারা যান, যার সবচেয়ে বেশি ৩২ জন কক্সবাজারে (১৯ জন স্থানীয় বাসিন্দা ও ১৩ জন রোহিঙ্গা)।

ছবি: Tanvir Rahat / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: বিবিসি বাংলা, দ্য ডেইলি স্টার, উইকিপিডিয়া (তিস্তা নদী; ধরলা নদী; বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র; কুশিয়ারা নদী)





মন্তব্য
(০)