২০২৬ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি, বাংলা পঞ্জিকায় ফাল্গুনের প্রথম দিন ও বসন্তের সূচনার দিনে, জাগো নিউজ ২৪ ঢাকার হাতিরঝিলে ফুটে থাকা শিমুল ও পলাশ গাছ নিয়ে খায়রুল বাশার আশিকের একটি আলোকচিত্র-প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, এফডিসি সংলগ্ন দাবার কোর্ট পার্ক এলাকায় প্রতি বছরের মতো সেবারও বসন্তের আগমনে গাছের ডালপালা লালচে ফুলে ভরে উঠেছিল। রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ত এলাকায় এই ফুল একদিকে রঙের ছোঁয়া এনেছিল, অন্যদিকে মধুর খোঁজে ছোট ছোট পাখিদের টেনে এনেছিল ফুলের কাছে।
হাতিরঝিলের দাবার কোর্ট পার্কে বসন্তের রং
প্রতিবেদনে হাতিরঝিলকে রাজধানীর ব্যস্ততার মাঝে প্রকৃতির এক নীরব আশ্রয় বলে বর্ণনা করা হয়। দাবার কোর্টের পাশের সবুজ প্রান্তরে ফুটে থাকা রক্তিম ফুল নগরবাসীর চোখে আরাম দেয়, আবার পাখিদেরও কাছে টানে। কোথাও ছোট পাখিরা ডালে বসে মধু খুঁজছিল, কোথাও ঝুলন্ত গুচ্ছফুলে খেলা করছিল আলো আর ছায়া।
শুকনো, পাতাহীন ডালের ফাঁকে ফাঁকে ছড়িয়ে থাকা লাল শিমুল ফুল খোলা আকাশের পটভূমিতে লেখকের চোখে আগুনরঙা নকশার মতো দেখাচ্ছিল। ডালজুড়ে ঘন গুচ্ছবদ্ধ কমলা-লাল ফুল প্রকৃতির উচ্ছ্বাসকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছিল। লেখক বর্ণনা করেন, একটি ছোট পাখি ডালে বসে ফুলের ভেতরে মধু খুঁজছে; তাঁর ভাষায় এটি নগর প্রকৃতির এক জীবন্ত মুহূর্ত, যা মানুষ ও প্রকৃতির সহাবস্থানের কথা মনে করিয়ে দেয়।
কাছ থেকে তোলা ছবিতে ফুলের পাপড়ি, পরাগ ও সবুজ কুঁড়ির সূক্ষ্ম বিন্যাস ধরা পড়েছিল। দর্শনার্থী ও পথচারীরা থেমে, বসে সেই দৃশ্য উপভোগ করছিলেন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই জায়গার গাছগুলোতে প্রতি বসন্তে টকটকে লাল, হলুদ ও লালচে-কমলা রঙের ফুল ফোটে, আর দাবার কোর্ট এলাকায় আগুনরাঙা ‘লাল পলাশ’ ও শিমুল মিলে পুরো পরিবেশে বসন্তের আবহ তৈরি করে।
লেখক পলাশকে আলাদা করে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তাঁর ভাষায় পলাশ যেন আগুনের রঙে লেখা বসন্তের এক নীরব কবিতা। শুকনো ডালপালা ফুঁড়ে যখন টকটকে লাল-কমলা পাপড়ি একসঙ্গে ফুটে ওঠে, তখন চারপাশের নির্জন প্রকৃতিও যেন হঠাৎ প্রাণ ফিরে পায়। দূর থেকে মনে হয় গাছজুড়ে অগ্নিশিখা জ্বলছে, আর কাছে গেলে কোমল পাপড়ির ভাঁজে মেলে মৃদু সৌরভ। নীল আকাশ, ধুলোমাখা পথ আর সবুজের ফাঁকে পলাশের দীপ্ত রং বসন্তকে আরও উচ্ছল করে তোলে; লেখক এই ফুলকে ঋতুর আনন্দ, প্রেম ও নতুন আশার রক্তিম প্রতীক বলে বর্ণনা করেন।
পহেলা ফাল্গুন: বসন্তের প্রথম দিন
প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়েছিল পহেলা ফাল্গুনে, অর্থাৎ বাংলা ফাল্গুন মাসের প্রথম দিনে, যে দিনটিকে বাংলাদেশ বসন্তের প্রথম দিন হিসেবে উদযাপন করে। ২০২৬ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় প্রকাশিত ঢাকা ট্রিবিউনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সে বছর পহেলা ফাল্গুন পড়েছিল শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারি, এবং দিনটি আবারও মিলে গিয়েছিল ভালোবাসা দিবসের সঙ্গে, যা বিশ্বজুড়ে এই তারিখে পালিত হয়।
দুটি উপলক্ষ একই দিনে পড়ার কারণ সংশোধিত বাংলা পঞ্জিকা। একই প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগের পঞ্জিকায় পহেলা ফাল্গুন পড়ত ১৩ ফেব্রুয়ারি। বাংলা একাডেমির এই সংশোধনে ১৯৭১ সালের ঐতিহাসিক তারিখগুলোর সঙ্গে পঞ্জিকাকে মিলিয়ে নেওয়া হয়, যাতে জাতীয় দিবসগুলো প্রতি বছর একই বাংলা তারিখে পড়ে। সংশোধিত পঞ্জিকায় বৈশাখ থেকে আশ্বিন পর্যন্ত প্রতিটি মাস ৩১ দিনের, কার্তিক থেকে মাঘ পর্যন্ত প্রতিটি মাস ৩০ দিনের, আর ফাল্গুন ২৯ দিনের; ইংরেজি অধিবর্ষে ফাল্গুন হয় ৩০ দিনের।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ২০২৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের কোনো আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি ছিল না; শিক্ষার্থীরা নিজেদের মতো করে দিনটি উদযাপনের পরিকল্পনা করেছিলেন। বসন্তের প্রথম দিনে শিক্ষার্থীদের জড়ো হয়ে ক্যাম্পাসে ঘুরে বেড়ানোর যে রীতি, তা শুরু হয়েছিল চারুকলা থেকে, পরে ছড়িয়ে পড়ে পুরো ক্যাম্পাসে। শহরের বহু মানুষের কাছে হাতিরঝিলের মতো খোলা জায়গায় ফুটে থাকা গাছগুলোও ঋতুবদলের সেই উৎসবেরই অংশ।
হাতিরঝিল: পানিনিষ্কাশনের খাল থেকে নগরের লেক
হাতিরঝিল ঢাকার কেন্দ্রস্থলের একটি লেক ও সড়ক-ব্যবস্থা, যা গড়ে তোলা হয়েছে হাতিরঝিল ও বেগুনবাড়ি এলাকা নিয়ে। ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে প্রকল্পটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের সময় দ্য ডেইলি স্টার জানায়, এটি এয়ারপোর্ট রোড ও রামপুরার মাঝখানে ৩০২ একর জায়গাজুড়ে, তেজগাঁও, গুলশান, মধুবাগ, মগবাজার, বাড্ডা ও উলনের পাশ দিয়ে বিস্তৃত। পত্রিকাটির হিসাবে এর মধ্যে ৪৬ একর ছিল রাজউকের, ৩৪ একর অন্যান্য সরকারি সংস্থার, ৮১ একর কোর্ট অব ওয়ার্ডসের এবং ১৪১ একর ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি।
২০১৩ সালের ২ জানুয়ারি দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস জানায়, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ২০০৭ সালে প্রকল্পটি শুরু করে জলাধারটিকে দখল থেকে রক্ষা করে বৃষ্টির পানি ধরে রাখার জলাশয়ে রূপ দিতে; পরে নকশা বদলে এতে সড়ক, সেতু ও বিনোদনের সুবিধা যোগ করা হয়। পত্রিকাটি প্রকল্পের সংশোধিত ব্যয় উল্লেখ করে ১৯.৭১ বিলিয়ন টাকা। দ্য ডেইলি স্টারের তথ্যমতে, ২০০৮ সাল থেকে রাজউক, ঢাকা ওয়াসা, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ও সেনাবাহিনীর একটি প্রকৌশল ইউনিট কাজের বিভিন্ন অংশ বাস্তবায়ন করে, আর পরামর্শক ছিল বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)। ২০১৩ সালের ২ জানুয়ারি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অবকাঠামোটির উদ্বোধন করেন।
দ্য ডেইলি স্টারের তালিকায় প্রধান অবকাঠামোর মধ্যে ছিল পূর্ব-পশ্চিমে ৯ কিলোমিটারের এক্সপ্রেস সড়ক, ৮ কিলোমিটার সার্ভিস রোড, লেকের ওপর তিনটি সেতু, পরিধি সড়কে তিনটি ভায়াডাক্ট ও চারটি ওভারপাস, সেই সঙ্গে ৯ কিলোমিটার ফুটপাত ও লেকের পাড়ে ১০ কিলোমিটার হাঁটার পথ। পরিকল্পনায় একটি থিয়েটার, দর্শনীয় ডেক, নিসর্গ-সজ্জা ও পার্কের আসবাবও ছিল।
প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ছিল পানিনিষ্কাশন। নকশা করা হয়েছিল বেগুনবাড়ি খালকে গুলশান-বনানী লেকের সঙ্গে যুক্ত করতে এবং ঢাকা ওয়াসার চারটি জোনের বৃষ্টির পানি সরিয়ে পরীবাগ, কারওয়ান বাজার ও ইস্কাটনের মতো এলাকাকে জলাবদ্ধতা থেকে রক্ষা করতে; একই সঙ্গে বৃষ্টির পানি মাটির নিচে প্রবেশেও এটি সহায়ক হওয়ার কথা। ঢাকা মেট্রোপলিটন ডেভেলপমেন্ট প্ল্যান (ডিএমডিপি) বেগুনবাড়ি খালকে প্রাকৃতিক জলাশয় ও বন্যাপ্রবাহ অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত করেছে, আর প্রকল্পের কারিগরি বিশেষজ্ঞ দলের প্রধান দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, নগরের বন্যা ঠেকাতে খালটি একটি গুরুত্বপূর্ণ নিষ্কাশন পথ। লেকের পাড়ের সবুজ অংশ, হাঁটার পথ আর পার্কেই দাঁড়িয়ে আছে জাগো নিউজের ছবির শিমুল ও পলাশ গাছের মতো গাছগুলো।

শিমুল: লাল তুলার গাছ
শিমুলের বৈজ্ঞানিক নাম Bombax ceiba; ইংরেজিতে একে রেড সিল্ক-কটন ট্রি বা কটন ট্রি বলা হয়। বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া একে Bombacaceae গোত্রের ৩০ থেকে ৪০ মিটার উঁচু পত্রমোচী বৃক্ষ হিসেবে বর্ণনা করেছে (উদ্ভিদবিজ্ঞানীরা এখন এই গণকে বৃহত্তর Malvaceae গোত্রের অন্তর্ভুক্ত করেন)। এর প্রধান কাণ্ড সোজা ও অবিভক্ত, বাকল ধূসর ও খুব রুক্ষ। বাংলাপিডিয়ার বাংলা সংস্করণে বলা হয়েছে, অল্পবয়সী গাছের কাণ্ডে অনেক কাঁটা থাকে, তবে বয়স্ক গাছ সাধারণত কাঁটামুক্ত।
শিমুলের পাতা করতলাকার: লম্বা বোঁটার মাথা থেকে প্রায় ছয়টি পত্রক চারদিকে ছড়িয়ে থাকে। শুকনো মৌসুমে গাছ পাতা ঝরিয়ে ফেলে এবং নতুন পাতা আসার আগেই খালি ডালের মাথায় বা কাছাকাছি ফোটে লাল বা কমলা রঙের বড় বড় পেয়ালা-আকৃতির ফুল, প্রতিটিতে পাঁচটি পাপড়ি। এ কারণেই পূর্ণ প্রস্ফুটনের সময় শিমুল গাছকে আকাশের পটে লালের স্তূপের মতো দেখায়। এর ফল লম্বাটে, ভেতরে সাদা রেশমি তুলা, আর সেই তুলার মধ্যে থাকে অসংখ্য কালচে বীজ।
বাংলাপিডিয়া জানায়, শিমুল চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সিলেটের বনাঞ্চলে জন্মে, এর বাইরে দেশের সর্বত্রই এ গাছ দেখা যায়। এর স্বাভাবিক বিস্তার গ্রীষ্মমণ্ডলীয় এশিয়াজুড়ে: পাকিস্তান, ভারত, নেপাল, বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কা থেকে মিয়ানমার, দক্ষিণ চীন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া হয়ে অস্ট্রেলিয়া পর্যন্ত। ভারতে ফুলের সৌন্দর্যের জন্য পার্কে ও সড়কের পাশে শিমুল ব্যাপকভাবে লাগানো হয়।
২০০৫ সালে অর্নিথোলজিক্যাল সায়েন্স সাময়িকীতে প্রকাশিত এ. জে. সলোমন রাজু ও সহকর্মীদের এক গবেষণায়, যা ভারতের পূর্বঘাট অঞ্চলে করা হয়েছিল, গাছটির বার্ষিক চক্র বর্ণনা করা হয়: পাতা ঝরা, ফুল ফোটা ও ফল ধরা সবই হয় শুকনো মৌসুমে, আর নতুন পাতা গজায় বর্ষায়। একটি গাছে ফল ধরে অল্প, তবে প্রতিটি ফলে থাকে অসংখ্য বীজ। ফল পাকলে ফেটে যায়, আর তুলায় ভর করে বীজ বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে, তখনো শুকনো মৌসুম চলে।

কাঠ ও তুলা: শিমুল গাছের ব্যবহার
কাণ্ড বিশাল হলেও শিমুলের কাঠ নরম, হালকা ও টেকসই নয়। বাংলাপিডিয়ার তথ্যমতে, এই কাঠের প্রধান ব্যবহার দেশলাই শিল্পে, দেশলাইয়ের বাক্স ও কাঠি তৈরিতে। এ ছাড়া প্যাকিং বাক্স, খেলনা, সাধারণ মানের পেনসিল, তক্তা ও কফিন তৈরিতে এর যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে। ফলের ভেতরের তুলা, যা শিমুল তুলা নামে পরিচিত, দিয়ে ভালো মানের বালিশ, তোশক ও গদি বানানো হয়।
বাংলাপিডিয়া আরও জানায়, এই গাছের আঠা ও শিকড়ের কিছু ভেষজগুণ আছে বলে ধারণা করা হয়। শিমুল ফুল নিয়েও গবেষকদের আগ্রহ রয়েছে: ২০২৫ সালের আগস্টে কেমিস্ট্রি অ্যান্ড বায়োডাইভারসিটি সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি পর্যালোচনায় শিমুল ফুলকে আঁশ ও শর্করার উৎস হিসেবে বর্ণনা করা হয়, যাতে ভিটামিন সি, লৌহ, সোডিয়াম, ফসফরাস ও ক্যালসিয়াম রয়েছে। পর্যালোচনাটি গবেষণাগারের বিভিন্ন গবেষণায় ফুলে পাওয়া ফেনলিক ও ফ্ল্যাভোনয়েড যৌগগুলোর বিবরণ দিয়ে খাদ্য ও ওষুধপণ্যে এগুলোর সম্ভাব্য ব্যবহার যাচাই করার লক্ষ্যে লেখা। এ ধরনের পর্যালোচনা গবেষণার বিবরণ, প্রমাণিত চিকিৎসা নয়; গাছের কোনো অংশ ওষুধ হিসেবে ব্যবহারের কথা ভাবলে আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
বসন্তে শিমুলের এই রঙিন রূপ নিজেই মানুষকে টানে। ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা ট্রিবিউন সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার মানিগাঁওয়ের শিমুল বাগান নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। বাগানটি জেলা শহর থেকে প্রায় ২৮ কিলোমিটার দূরে, যাদুকাটা নদীর তীরে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্থানীয় এক বৃক্ষপ্রেমী প্রায় ২৫ বছর আগে ১০০ একর জমিতে ৩ হাজার শিমুলের চারা রোপণ করেছিলেন; সে বছর ৩ হাজার গাছের মধ্যে ২ হাজার গাছে ফুল ফুটেছিল, আর পহেলা ফাল্গুন ও ভালোবাসা দিবসে সারা দেশ থেকে দর্শনার্থীরা বাগানে ভিড় করেছিলেন। বাগানের মালিক পত্রিকাটিকে জানান, সে বছর ৩০০টিরও বেশি নতুন চারা লাগানো হয়েছে।
পলাশ: বনের অগ্নিশিখা
পলাশের বৈজ্ঞানিক নাম Butea monosperma। এটি শিম গোত্রের, অর্থাৎ Fabaceae গোত্রের গাছ; ইংরেজিতে একে ফ্লেম অব দ্য ফরেস্ট বা বনের অগ্নিশিখা বলা হয়, ঢাক ও বেঙ্গল কিনো নামেও পরিচিত। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ও উপ-গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে এর আদি নিবাস, অন্যত্র শোভাবর্ধক গাছ হিসেবে লাগানো হয়। পলাশ শিমুলের চেয়ে ছোট: মাঝারি আকারের এই গাছ শুকনো মৌসুমে পাতা ঝরায় এবং প্রায় ১৫ মিটার পর্যন্ত উঁচু হয়।
পলাশের প্রতিটি পাতায় তিনটি চওড়া পত্রক থাকে। ফুল প্রায় আড়াই সেন্টিমিটার লম্বা, উজ্জ্বল কমলা-লাল, আর প্রায় ১৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা মঞ্জরিতে ঘন গুচ্ছে ফোটে। শিম ফুলের মতো প্রতিটি ফুলে থাকে একটি বড় ওপরের পাপড়ি, দুটি পাখার মতো পাপড়ি ও একটি নৌকাকৃতি পাপড়ি, যা পলাশে টিয়াপাখির বাঁকানো ঠোঁটের মতো দেখায়। ফল ১৫ থেকে ২০ সেন্টিমিটার লম্বা চ্যাপ্টা শুঁটি; প্রজাতির নাম monosperma বোঝায় এর একটিমাত্র বীজকে।
পলাশের ফুল ফোটা নিয়ে সবচেয়ে বিস্তারিত গবেষণাগুলোর একটি ২০০৩ সালে অ্যানালস অব বোটানি সাময়িকীতে প্রকাশিত রাজেশ ট্যান্ডন, কে. আর. শিবান্না ও এইচ. ওয়াই. মোহন রামের প্রবন্ধ, যা করা হয়েছিল নয়াদিল্লির সেন্ট্রাল রিজ ফরেস্টের প্রায় ২০০টি বুনো গাছ নিয়ে। যেসব গাছে ফুল এসেছিল, সেগুলো ডিসেম্বরে পাতা ঝরাতে শুরু করে এবং জানুয়ারির মধ্যে পুরোপুরি পাতাশূন্য হয়ে যায়। ফুল ফোটার মৌসুম ছিল ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল: মার্চের প্রথম বা দ্বিতীয় সপ্তাহে কুঁড়ি ফুটতে শুরু করে, এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে তা চূড়ায় পৌঁছায়। একটি গাছ ছয় থেকে আট সপ্তাহ ফুলে ভরা থাকে, যদিও প্রতিটি ফুল টেকে মাত্র এক থেকে দুই দিন। একটি মঞ্জরি গড়ে প্রায় ২১ সেন্টিমিটার লম্বা, তাতে গড়ে প্রায় ১৬৬টি ফুল থাকে।
গবেষণাটি অনেকের চোখে পড়া একটি বিষয়ও নিশ্চিত করে: প্রতিটি পলাশ গাছে প্রতি বছর ফুল আসে না। গবেষকেরা যে ৩০টি গাছ পর্যবেক্ষণ করেন, তার মধ্যে প্রথম বছরে ২৭টিতে ফুল এসেছিল, আর দ্বিতীয় বছরে মাত্র ১৮টিতে।
বাংলায় পলাশ বসন্তের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর গান ও কবিতায় পলাশ ফুলকে আগুনের সঙ্গে তুলনা করেছেন, আর শান্তিনিকেতনে বসন্ত উদযাপনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে এই ফুল। পলাশীর যুদ্ধের জন্য পরিচিত পলাশী জায়গাটির নামও এসেছে এই গাছ থেকে।

লাক্ষা, রং ও পাতার থালা: পলাশের নানা ব্যবহার
পলাশ বহুকাল ধরে কাজের গাছ। ট্যান্ডন ও তাঁর সহলেখকেরা এর কাঠ ছাড়া অন্যান্য উৎপাদনের তালিকা দিয়েছেন: পানিতে দ্রবণীয় রং, লাক্ষা বা গালা, পশুখাদ্য এবং থালা হিসেবে ব্যবহৃত পাতা। ভারতে পলাশ লাক্ষা পোকার অন্যতম প্রধান আশ্রয় গাছ; এই পোকার রজনজাতীয় নিঃসরণ প্রক্রিয়াজাত করে তৈরি হয় শেলাক।
পলাশ ফুল থেকে হলুদ থেকে গাঢ় কমলা রং পাওয়া যায়, যা রেশম এবং কখনো কখনো সুতি কাপড় রাঙাতে ব্যবহৃত হয়, আর ভারতে উৎসবের রং হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। গাছের বাকল থেকে বের হয় লাল আঠা, যা শুকিয়ে ‘বেঙ্গল কিনো’ নামে বিক্রি হয়; এতে থাকা ট্যানিনের জন্য চামড়া শিল্পে এর কদর আছে। কাঠ নরম হলেও পানির নিচে ভালো টেকে। একসময় এর পাতা খাবার পরিবেশনের থালা হিসেবে ব্যবহৃত হতো, যেখানে আজ একবার ব্যবহারযোগ্য থালা ব্যবহৃত হয়। মাটির ক্ষয় কমাতে কৃষকেরা জমির আলেও এ গাছ লাগান।
শিমুলের মতো পলাশও দক্ষিণ এশিয়ার প্রচলিত চিকিৎসায় দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে, এবং গবেষকেরা গবেষণাগারে এর ফুল, বাকল ও বীজের নির্যাস নিয়ে পরীক্ষা করেছেন। তবে এসব গবেষণা একে প্রমাণিত ওষুধ বানায় না। পলাশের বীজের তেল এবং ফুলের রসের একটি যৌগকে বিষাক্ত বলে গণ্য করা হয়; তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এর ফুল বা বীজ ওষুধ হিসেবে খাওয়া উচিত নয়।
ফুলে কেন পাখির ভিড়
জাগো নিউজের ছবিতে যে ছোট পাখিদের ফুলে মধু খুঁজতে দেখা গিয়েছিল, তারা আসলে এই দুই গাছের বংশবিস্তারের অংশ। শিমুল ও পলাশ দুটোই ফোটে ডাল যখন পাতাশূন্য থাকে; ফলে বড়, উজ্জ্বল, মধুভরা ফুলগুলো সেই প্রাণীদের চোখের সামনে খোলা থাকে, যারা এগুলো থেকে খাবার নেয়।
নয়াদিল্লির পলাশ গবেষণায় দেখা যায়, ফুলের পাঁচটি মধুগ্রন্থি থেকে মধু নিঃসৃত হয়ে বৃতির পেয়ালায় জমে। একটি ফুল সকাল পাঁচটা থেকে সন্ধ্যা ছয়টার মধ্যে প্রায় ৭৩ মাইক্রোলিটার মধু তৈরি করে, যার বেশির ভাগ সকাল ৯টা থেকে ১১টার মধ্যে; আর ফুল ফোটে সকাল ৯টা থেকে সাড়ে ১০টার মধ্যে। ছয়টি গোত্রের সাত প্রজাতির পাখি গাছগুলোতে আসত: পাতি কাক, হাঁড়িচাচা, বেগুনি মৌটুসি, টিয়া, বুলবুলি, ছাতারে ও শ্বেতাক্ষী (হোয়াইট-আই)। পাখিদের মধ্যে কেবল বেগুনি মৌটুসি, যে ফুলের সামনের দিক থেকে মধু খায়, কার্যকর পরাগায়নকারী হিসেবে প্রমাণিত হয়; তিন-ডোরা কাঠবিড়ালিও ফুলের পরাগায়ন ঘটায়। প্রাকৃতিক অবস্থায় ফল ধরার হার ছিল কম, প্রায় ৫ শতাংশ; অথচ গবেষকেরা হাতে পর-পরাগায়ন করালে তা দাঁড়ায় প্রায় সাড়ে ২২ শতাংশে।
শিমুল তার অতিথিদের ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল। রাজু ও সহকর্মীরা দেখেছেন, এর খোলা, লাল, পেয়ালা-আকৃতির, মধুভরা ফুলের পরাগায়ন ঘটায় মৌমাছি, পাখি ও বাদুড়, এবং গাছটি বাধ্যতামূলকভাবে পর-পরাগী: কেবল ভিন্ন ভিন্ন শিমুল গাছের মধ্যে পরাগ বাহিত হলেই ফল ধরে। তাঁরা আরও দেখেছেন, কিছু পাখি, কাঠবিড়ালি ও বানর প্রতিদিন ফুলের অংশ বা গোটা ফুল খেয়ে ফেলে, যা গাছের ফল ধরার সাফল্য কমিয়ে দেয়।
২০২২ সালে ফ্রন্টিয়ার্স ইন প্ল্যান্ট সায়েন্স সাময়িকীতে প্রকাশিত দক্ষিণ চীনের হাইনান দ্বীপের এক জিনগত গবেষণায় বলা হয়, সেখানে শিমুল ফোটার চূড়ান্ত সময় ফেব্রুয়ারির শেষ ও মার্চের শুরু, যখন খুব কম গাছেই ফুল থাকে; এর ফুলের উজ্জ্বল, ঊর্ধ্বমুখী পাপড়িমণ্ডল ও প্রচুর পাতলা মধু থাকে। গবেষকেরা গাছ থেকে গাছে পরাগ কত দূর যায় তা মেপে দেখেন: গড় দূরত্ব প্রায় ২০৩ মিটার, সবচেয়ে বেশি এক কিলোমিটারের বেশি, যা শ্বেতাক্ষী ও বুলবুলির মতো সাধারণ খাদ্যাভ্যাসের পাখির আচরণের সঙ্গে মেলে। ফল ধরার হার ছিল মাত্র প্রায় ৩.৩ শতাংশ; লেখকেরা এর মূল কারণ হিসেবে পাখিদের স্বল্প দূরত্বের উড়াল ও মানুষের হস্তক্ষেপকে চিহ্নিত করেন, আর গাছগুলোর কম জিনগত বৈচিত্র্যের জন্য মূলত গাছ কাটা ও ফল সংগ্রহকে দায়ী করেন।
এই গবেষণার আলোয় দেখলে হাতিরঝিলের দৃশ্যটি কেবল সুন্দর একটি ছবি নয়: শুকনো মৌসুমের শেষে ফুলে ভরা একটি শিমুল বা পলাশ গাছ পাখিদের জন্য মধুর উৎস, আর বীজ উৎপাদনের জন্য গাছগুলোও নির্ভর করে সেই পাখিদের ওপর।
ছবি: Saad Faruque / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 2.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বাংলাপিডিয়া, দ্য ডেইলি স্টার, দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, ঢাকা ট্রিবিউন, অ্যানালস অব বোটানি, অর্নিথোলজিক্যাল সায়েন্স, ফ্রন্টিয়ার্স ইন প্ল্যান্ট সায়েন্স, কেমিস্ট্রি অ্যান্ড বায়োডাইভারসিটি, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)