২০২৬ সালের ১৬ জুন বাংলাদেশ বিমানবাহিনী জানায়, তাদের 'বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি-২০২৬'-এর আওতায় দেশের উপকূলীয় অঞ্চল এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম বিভিন্ন স্থানে হেলিকপ্টার থেকে সিডবল (বীজ ভরা মাটির বল) ফেলে আকাশ থেকে বীজ ছিটানোর পরিকল্পনা রয়েছে। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) সেদিন এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানায়; জাগো নিউজ ২৪ এবং রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম বিজ্ঞপ্তিটি প্রকাশ করে।
আইএসপিআরের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ১৩ জুন দেশব্যাপী '৫ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ' কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। দেশের বৃক্ষসম্পদ বাড়ানো এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার এই উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় বিমানবাহিনী নিজস্ব বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি পালন করছে বলে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়। বাসসের প্রতিবেদনে কর্মসূচির লক্ষ্য হিসেবে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলার কথাও উল্লেখ করা হয়।
বিমানবাহিনী সদর দপ্তরে কর্মসূচির উদ্বোধন
বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন ১৬ জুন মঙ্গলবার ঢাকা সেনানিবাসের বিমানবাহিনী সদর দপ্তর প্রাঙ্গণে গাছের চারা রোপণ করে কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। এ কর্মসূচিতে বিমানবাহিনী নানা ধরনের ফলদ, বনজ ও ঔষধি গুণসম্পন্ন গাছের চারা রোপণ করবে বলে জানানো হয়।
উদ্বোধনী আয়োজনে বিমান সদরের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসাররা বিভিন্ন গাছের চারা রোপণ করে অংশ নেন। বিমান সদরের পরিচালক ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আরও জানানো হয়, বিমানবাহিনীর বিভিন্ন ঘাঁটি ও ইউনিট এবং বিমানবাহিনী পরিচালিত সব স্কুল ও কলেজ প্রাঙ্গণেও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।
আইএসপিআর জানায়, বিমানবাহিনী প্রধানের সার্বিক দিকনির্দেশনায় বনায়নের লক্ষ্যে উপকূলীয় অঞ্চল এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম এলাকার বিভিন্ন স্থানে বিমানবাহিনীর হেলিকপ্টার থেকে সিডবল ফেলে বীজ ছিটানো হবে। এর আগেও দেশের বিভিন্ন প্রত্যন্ত উপকূলীয় অঞ্চলে বিমানবাহিনীর হেলিকপ্টার থেকে সিডবল ফেলা হয়েছে বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়। কবে, ঠিক কোন কোন এলাকায় এবং কী পরিমাণ সিডবল ফেলা হবে, কোন প্রজাতির বীজ থাকবে, সে বিষয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে বিস্তারিত কিছু ছিল না।
জাতীয় '৫ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ' কর্মসূচি
বিমানবাহিনীর উদ্যোগটি যে জাতীয় কর্মসূচির অংশ, তার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয় তিন দিন আগে, ১৩ জুন শনিবার। বাসস ও ঢাকা টাইমসের সেদিনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী কক্সবাজারের ডুলাহাজারায় মালুমঘাট সংরক্ষিত বন এলাকায় একটি গর্জন গাছের চারা রোপণ করে কর্মসূচি উদ্বোধন করেন। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদসহ মন্ত্রিসভার সদস্যরা সেখানে বিভিন্ন প্রজাতির মোট ১১টি গাছের চারা রোপণ করেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন পরিবেশমন্ত্রী।
প্রতিবেদন দুটিতে বলা হয়, পাঁচ বছরে দেশব্যাপী ২৫ কোটি গাছ লাগানো বিএনপির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল। পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় পাঁচ বছর ধরে পর্যায়ক্রমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করবে; প্রথম পর্যায়ে দেশের ৪৯টি জেলার ১৪৯টি উপজেলায় প্রায় দেড় কোটি গাছের চারা রোপণ করা হবে বলে জানানো হয়।
উদ্বোধনের প্রস্তুতি হিসেবে ৬ জুন প্রধানমন্ত্রী তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে কর্মসূচির উদ্বোধন ও বিশ্ব পরিবেশ দিবসের কার্যক্রম নিয়ে একটি সভায় সভাপতিত্ব করেন বলে দ্য ডেইলি অবজারভার জানায়। সভায় কর্মসূচির বিভিন্ন বাস্তবায়ন পর্যায়ের জলবায়ু-বার্তা নিয়েও আলোচনা হয়।
অবজারভারের ৮ জুনের সম্পাদকীয়তে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী স্থানীয় মাটি ও পরিবেশের সঙ্গে মানানসই প্রজাতির গাছ লাগানোর ওপর জোর দিয়েছেন, কারণ কক্সবাজারের উপকূল থেকে মধ্যাঞ্চলের প্লাবনভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড় পর্যন্ত প্রতিটি অঞ্চলের প্রয়োজন আলাদা। সম্পাদকীয়টির যুক্তি ছিল, বাংলাদেশে বৃক্ষরোপণ অভিযান দীর্ঘদিন ধরে কতগুলো চারা বিতরণ হলো তা দিয়ে মাপা হয়েছে, কতগুলো টিকে বড় হলো তা দিয়ে নয়; তাই দীর্ঘমেয়াদি তদারকি, স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ এবং লাগানো গাছের যত্ন না থাকলে এত বড় উদ্যোগও প্রতীকী আয়োজনে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
সিডবল কী এবং কীভাবে তৈরি হয়
সিডবল হলো কাদামাটি ও অন্যান্য উপকরণের ছোট গোলকের ভেতরে ভরে রাখা বীজ, যাতে বীজের অঙ্কুরিত হওয়ার সুযোগ বাড়ে। উইকিপিডিয়ার 'সিড বল' নিবন্ধ অনুযায়ী, সাধারণত আয়তনের হিসাবে প্রায় পাঁচ ভাগ লাল কাদামাটির সঙ্গে এক ভাগ বীজ মিশিয়ে ১০ থেকে ৮০ মিলিমিটার ব্যাসের বল বানানো হয়। বীজের সুরক্ষা ও উপকারী অণুজীবের সহায়তার জন্য এতে হিউমাস, কম্পোস্ট, তুলার আঁশ বা গলানো কাগজও মেশানো হয়। বানানোর পর ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা শুকিয়ে বলগুলো ছড়ানোর উপযোগী করা হয়।
নিবন্ধটিতে বলা হয়েছে, আধুনিক কালে আকাশ থেকে বীজ বপনে সিডবল ব্যবহারের একটি উদ্দেশ্য হলো বীজকে প্রাণীর খাদ্যে পরিণত হওয়া থেকে রক্ষা করা। সিডবল ছুড়ে বা ওপর থেকে ফেলে গাছপালা জন্মানোর এই চর্চাকে ইংরেজিতে 'সিড বোম্বিং' বলা হয়।
জাপানের প্রাকৃতিক কৃষির পথিকৃৎ মাসানোবু ফুকুওকা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় শিকোকু দ্বীপে উদ্ভিদবিজ্ঞানী হিসেবে কাজ করার সময় এ পদ্ধতিকে নতুন করে আবিষ্কার ও সুসংগঠিত করেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল প্রচলিত ধানচাষের জন্য বরাদ্দ জমিতে হাত না দিয়েই খাদ্য উৎপাদন বাড়ানো। জাপানি ভাষায় একে বলা হয় 'নেন্দো দাঙ্গো', যার আক্ষরিক অর্থ মাটির বল। ১৯৭৩ সালে নিউইয়র্কে গ্রিন গেরিলাস নামের একটি দলের লিজ ক্রিস্টি শহরের ফাঁকা জমিতে বীজ ও সার ভরা মোড়ক ছুড়ে এলাকা সবুজ করার যে চর্চা শুরু করেন, তা থেকেই সমকালীন 'গেরিলা গার্ডেনিং' আন্দোলনের সূচনা ধরা হয়।

আকাশ থেকে বীজ বপন: সুবিধা ও সীমাবদ্ধতা
ড্রোন, উড়োজাহাজ বা হেলিকপ্টার থেকে যান্ত্রিকভাবে বীজ ছিটানোকে আকাশ থেকে বীজ বপন বা এরিয়াল সিডিং বলা হয়; বনায়নে ব্যবহার করলে একে বলা হয় এরিয়াল রিফরেস্টেশন। দাবানলের পর গাছপালা ফেরানো, আচ্ছাদন ফসল বোনা এবং প্রচলিত পদ্ধতিতে পৌঁছানো যায় না এমন ভূমিতে বীজ পৌঁছাতে পদ্ধতিটি ব্যবহার হয়। উইকিপিডিয়ার নিবন্ধ অনুযায়ী, ১৯৩০-এর দশকে হনলুলুতে দাবানলের পর আকাশ থেকে বনায়নের প্রথম দিকের পরীক্ষা হয়, তবে বীজ ঠিকমতো ছড়াতে না পারায় সেগুলো মূলত ব্যর্থ হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর উদ্বৃত্ত সামরিক বিমান কাজে লাগিয়ে পদ্ধতিটি দ্রুত ছড়ায়; ১৯৪৬ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ওরেগনে ৫০০ একরের বেশি জমিতে ডগলাস ফার ও সিডার গাছের বীজ আকাশ থেকে বোনা হয়।
নিবন্ধে উদ্ধৃত মার্কিন কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) গবেষণা অনুযায়ী, এ পদ্ধতির বড় সুবিধা হলো কম সময়ে বিশাল এলাকা ঢেকে ফেলা এবং খাড়া ঢাল, দূরবর্তী জলাধার এলাকা বা ভেজা মাটির মতো জায়গায় বীজ পৌঁছানো, যেখানে অন্যভাবে যাওয়া কঠিন। অবকাঠামো কম এমন পাহাড়ি বা বিচ্ছিন্ন এলাকায় পদ্ধতিটি বিশেষভাবে কাজে লাগে। খাড়া ঢালের সুরক্ষা বন ও দূরবর্তী জলাধার এলাকাকে এ পদ্ধতির উপযুক্ত ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
সীমাবদ্ধতাও কম নয়। একই ফল পেতে যন্ত্রে সারিতে বোনার তুলনায় আকাশ থেকে বোনায় ২৫ থেকে ৫০ শতাংশ বেশি বীজ লাগে, কারণ মাটির ওপরে খোলা পড়ে থাকা বীজ পাখি, পোকা ও ইঁদুর খেয়ে ফেলে। বীজ ছিটানোর ১০ দিনের মধ্যে মাটির ওপরের আধা থেকে এক ইঞ্চি স্তর ভেজা থাকা দরকার, আর বীজকে ঘাস বা না-পচা পাতার স্তরের বদলে সরাসরি মাটিতে পড়তে হয়। খাড়া ও মসৃণ খালি ঢালে বৃষ্টিতে বীজ ধুয়ে যেতে পারে, হালকা বীজ বাতাসে লক্ষ্য থেকে সরে যায়। প্রাণীর প্রিয় বীজ আবরণে মুড়ে না দিলে সেগুলো টেকার সম্ভাবনা কম বলেও নিবন্ধে উল্লেখ আছে। অন্যান্য বনায়ন পদ্ধতির তুলনায় এর কার্যকারিতা ঠিক কতটা, তা জানতে আরও গবেষণা দরকার বলে সেখানে বলা হয়েছে।
এ অঞ্চলের অন্য দেশেও সামরিক হেলিকপ্টার এ কাজে ব্যবহার হয়েছে। শ্রীলঙ্কা বিমানবাহিনীর ২০১৯ সালের ৩০ অক্টোবরের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, তাদের এমআই-১৭ হেলিকপ্টার আম্পারার লাহুগালা বনে দুই দফায় মোট ৬৭ হাজার 'সিড বোম্ব' ফেলে। এতে আরালু, কোন ও তেঁতুলসহ পাঁচটি দেশি গাছের বীজ ছিল, আর কাজটি হয় দেশটির বন বিভাগ, পেরাদেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ও একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মিলে। শ্রীলঙ্কার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ২০২১ সালের ২৪ নভেম্বরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ষষ্ঠ দফায় একটি এমআই-১৭ হেলিকপ্টার প্রায় ৬৫ হাজার সিড বোম্ব ৭০ একর সরকারি সংরক্ষিত বনে ফেলে; অঙ্কুরোদগমের সুবিধার জন্য সময়টি মৌসুমি বৃষ্টির সঙ্গে মিলিয়ে ঠিক করা হয়।
২০২০ সালে প্রথমবার হেলিকপ্টার থেকে সিডবল
বাংলাদেশে হেলিকপ্টার থেকে সিডবল ফেলার কাজ প্রথম হয় ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে। আইএসপিআরের তখনকার বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, বন বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে বিমানবাহিনী দেশের প্রত্যন্ত উপকূলীয় এলাকা ও পার্বত্য চট্টগ্রামে বনায়ন কর্মসূচি হাতে নেয়, এবং ২০ ও ২১ সেপ্টেম্বর হেলিকপ্টার থেকে উপকূলীয় এলাকায় সিডবল ফেলা হয়। বিজ্ঞপ্তিতে একে দেশের প্রত্যন্ত উপকূলে হেলিকপ্টার দিয়ে আকাশ থেকে প্রথম বীজ ছিটানো বলে উল্লেখ করা হয়।
সে বছর ৩ সেপ্টেম্বর পটুয়াখালী থেকে প্রয়োজনীয় বীজ সংগ্রহ করে বিমানবাহিনী সদর দপ্তরে সিডবল তৈরি করা হয়। পরে দুটি এমআই সিরিজের হেলিকপ্টার নোয়াখালীর ডোমার চরের উপকূলীয় এলাকায় সেগুলো ফেলে। আইএসপিআর জানায়, বনায়নের জন্য বাছাই করা জায়গাগুলো দুর্গম এবং সড়কপথে যাতায়াতের অনুপযোগী, তাই হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হয়। বিজ্ঞপ্তিতে আশা প্রকাশ করা হয়, এ কর্মসূচি থেকে তৈরি বন ভবিষ্যতে উপকূলের মানুষের জীবনরেখা হয়ে উঠবে এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষতি কমাতে ভূমিকা রাখবে।
দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস ২০২০ সালের ২৭ সেপ্টেম্বরের সম্পাদকীয়তে উদ্যোগটিকে বাংলাদেশের জন্য বনায়নের নতুন ধরন বলে উল্লেখ করে। পত্রিকাটি লেখে, ঘূর্ণিঝড় ও বারবার জলোচ্ছ্বাসে উপকূলের বিস্তীর্ণ এলাকার গাছ উপড়ে গেছে; একসময় নারকেল ও ঝাউবনে ঘেরা কুয়াকাটা সৈকত, যা এ প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত ছিল না, গাছ হারিয়ে বিবর্ণ হয়ে পড়েছে। সম্পাদকীয়টি জানায়, প্রথম দফায় নোয়াখালীর দুর্গম ছোট দ্বীপগুলোর ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে, আর অবৈধ কাঠ কাটা ও ইটভাটার কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের বনও পাতলা হয়ে আসছে। পত্রিকাটির মতে, বিশেষজ্ঞরা প্রতি বছরের আনুষ্ঠানিক বৃক্ষরোপণের পর তদারকি ও স্থানীয় মানুষের সচেতনতার ওপর জোর দেন, এবং আকাশ থেকে ফেলা বীজ থেকে জন্মানো গাছেরও একই রকম পরিদর্শন ও পরিচর্যা দরকার।

উপকূলীয় বনায়নের দীর্ঘ ইতিহাস
উপকূলে গাছ লাগানোর সরকারি উদ্যোগ নতুন নয়। বাংলাপিডিয়ার 'কোস্টাল প্লান্টেশন' নিবন্ধ অনুযায়ী, বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় ১৯৬৬ সালে দেশের ন্যাড়া তটরেখা ও উপকূলের দ্বীপগুলোতে ম্যানগ্রোভ বনায়ন শুরু হয়, এবং এ পর্যন্ত প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার হেক্টর জমিতে বাগান করা হয়েছে। নিবন্ধে বলা হয়েছে, এ বন ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে প্রাণ ও সম্পদের ক্ষতি কমানোর পাশাপাশি কর্মসংস্থান ও কাঠের জোগান দেয়। দেশের তটরেখা প্রায় ৭০০ কিলোমিটার দীর্ঘ।
নতুন জেগে ওঠা চরে কেওড়া, বাইন, গেওয়া, কাঁকড়া, সুন্দরী, গোলপাতাসহ নানা ম্যানগ্রোভ প্রজাতি লাগানো হলেও সবচেয়ে সফল হয়েছে কেওড়া (Sonneratia apetala)। সফল ম্যানগ্রোভ বাগানের প্রায় ৯৪.৪ শতাংশই কেওড়া, আর বাইন (Avicennia officinalis) প্রায় ৪.৮ শতাংশ; বাইন ভালো করেছে মূলত পূর্ব উপকূলে। কেওড়া লাগানো হয় চারা দিয়ে, আর বাইনের বীজ সরাসরি কাদায় পুঁতে দেওয়া হয়। চর জেগে ওঠার পর ঘাস ঘন হওয়ার আগেই বর্ষায় প্রায় শূন্য দশমিক ছয় মিটার উঁচু চারা নৌকায় করে নিয়ে লাগানো হয়, আর জোয়ারের পানি দীর্ঘ সময় আটকে না থাকার জন্য মরা কাটালের সময় বেছে নেওয়া হয়।
নিবন্ধটি উপকূলীয় বাগানের কিছু সমস্যার কথাও তুলে ধরে। কেওড়া বাগানে পোকার আক্রমণ উপকূলজুড়ে প্রায় ৫২ শতাংশ, যার প্রধান কারণ বি-হোল বোরার নামের একটি মথের লার্ভা। এ ছাড়া একক প্রজাতির বাগান, প্রাকৃতিকভাবে নতুন চারা না জন্মানো এবং পরবর্তী প্রজন্মের গাছ তৈরির সমস্যাও রয়েছে। সমাধান হিসেবে একাধিক প্রজাতি মিশিয়ে বাগান এবং বড় গাছের নিচে নতুন চারা লাগানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
২০২০ সালে যে ডোমার চরে সিডবল ফেলা হয়েছিল, সেটি নোয়াখালী জেলায়। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, ৩৬৮৫.৮৭ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই জেলার দক্ষিণে মেঘনা মোহনা ও বঙ্গোপসাগর, আর সন্দ্বীপ ও হাতিয়া চ্যানেল এখানকার উল্লেখযোগ্য জলপথ। ২০১১ সালের আদমশুমারিতে জেলার জনসংখ্যা ছিল ৩১ লাখ ৮ হাজার ৮৩ জন, এবং জেলার মানুষের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি।
পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম পাহাড় ও বন
বিমানবাহিনীর পরিকল্পনার দ্বিতীয় এলাকা পার্বত্য চট্টগ্রাম। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, এটি দেশের একমাত্র বিস্তৃত পাহাড়ি অঞ্চল; আয়তন প্রায় ১৩ হাজার ১৮৪ বর্গকিলোমিটার, যা দেশের মোট আয়তনের প্রায় দশ ভাগের এক ভাগ। আশির দশকের শুরুতে অঞ্চলটিকে রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান এই তিনটি জেলায় ভাগ করা হয়। কর্ণফুলী, সাঙ্গু, মাতামুহুরী ও ফেনী এখানকার প্রধান নদী।
এখানকার পাহাড়ের শিরাগুলো খাড়াভাবে উঠে গেছে, বেশির ভাগ পর্বতশ্রেণির পশ্চিম দিকে খাড়া ঢাল, পাথুরে দেয়াল ও জলপ্রপাত। দক্ষিণ ও পশ্চিমে বছরে ২৫৪০ থেকে ৩৮১০ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টি হয়, আর জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত বর্ষাকাল। পাহাড়ের মাটি হলদে বাদামি থেকে লালচে বাদামি দোআঁশ এবং খুবই অম্লীয়। পাহাড়, নদী ও খাড়া পাড় ঘন বাঁশঝাড়, উঁচু গাছ ও লতাগুল্মে ঢাকা; উদ্ভিদ আধা-চিরসবুজ থেকে ক্রান্তীয় চিরসবুজ ধরনের, যেখানে গর্জন পরিবারের (ডিপটেরোকার্পেসি) উঁচু গাছের প্রাধান্য।
বাংলাদেশ জাতীয় বন জরিপের (বাংলাদেশ ফরেস্ট ইনভেন্টরি) ফলাফল নিয়ে ২০২১ সালে ফরেস্ট ইকোসিস্টেমস সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণাপত্র অনুযায়ী, দেশের বনভূমির ধরনগুলোর মধ্যে আয়তনে সবচেয়ে বড় পাহাড়ি বন, যা দেশের মোট আয়তনের ৪.৬ শতাংশ। জরিপে পাহাড়ি অঞ্চলেই সবচেয়ে বেশি গাছের প্রজাতি পাওয়া যায়, এবং আইইউসিএন লাল তালিকায় বিপন্ন বা মহাবিপন্ন অন্তত দুটি প্রজাতি সেখানে রয়েছে। পাহাড়ি অঞ্চলে বাড়ির কাছের বন থেকেই আসে প্রায় ৭০ শতাংশ কাঠ, বাঁশ, জ্বালানি কাঠ ও পাতা।
একই জরিপে মাঠকর্মীরা যে নমুনা প্লটগুলোতে একেবারেই পৌঁছাতে পারেননি, তার অর্ধেকের বেশি ক্ষেত্রে কারণ ছিল খাড়া ঢালের মতো বিপজ্জনক পরিস্থিতি। গবেষকেরা লিখেছেন, দক্ষিণ-পূর্বের পাহাড়ি অঞ্চলে দুর্গমতার কারণে মাঠ পর্যায়ের তথ্যের ঘাটতি ছিল। স্থলপথে পৌঁছানো কঠিন এমন পাহাড়েই আকাশপথে বীজ পৌঁছানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে।

দেশের বন ও গাছের আচ্ছাদনের চিত্র
জাতীয় বন জরিপটি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অধীন বন অধিদপ্তর পরিচালনা করে; এতে ১৭৮১টি মাঠ প্লট পরিদর্শন, ৬৪০০টি খানায় জরিপ এবং ২০১৫ সালের জাতীয় ভূমি আচ্ছাদন মানচিত্র তৈরি করা হয়। ফরেস্ট ইকোসিস্টেমসের গবেষণাপত্র অনুযায়ী, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) সংজ্ঞায় ২০১৫ সালে দেশের বনভূমি ছিল ১৮ লাখ ৮৪ হাজার ১৯ হেক্টর, যা দেশের মোট আয়তনের ১২.৮ শতাংশ; নদী বাদ দিয়ে শুধু স্থলভাগ ধরলে এ হার ১৪.১ শতাংশ। পাহাড়ি বনের পর আয়তনে বড় ছিল বিক্ষিপ্ত গাছসহ ঝোপঝাড় (৪.২ শতাংশ) ও ম্যানগ্রোভ বন (২.৭ শতাংশ)।
গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, ২০০০ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে দেশে গাছের আচ্ছাদন নিট ৩.৪ শতাংশ কমেছে। দেশের মোট জৈববস্তুর ৬৬ শতাংশই রয়েছে বনের বাইরের গাছে, যেমন গ্রামের বসতবাড়ির গাছে। মোট আয়তনের প্রায় ৯.৪ শতাংশ জমির মালিক বন অধিদপ্তর। বনের প্রায় ৩২ শতাংশ এলাকা ভূমিধস, ভাঙন ও ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের শিকার হয়।
জরিপের আর্থসামাজিক অংশে দেখা যায়, গাছ ও বনের টেকসই ব্যবস্থাপনার জন্য কোনো সংস্থার সহায়তা পেয়েছেন মাত্র ১.৩ শতাংশ উত্তরদাতা; যাঁরা পেয়েছেন, তা মূলত বিনা মূল্যের চারা ও গাছ লাগানোর প্রশিক্ষণ। ২০১৭-১৮ সালে দেশের ৪৩ শতাংশ খানা নিজেরাই চারা কিনেছিল। দেশের মোট জনসংখ্যার আনুমানিক ৬৪ শতাংশ গাছ ও বন থেকে কোনো না কোনো প্রাথমিক পণ্য সংগ্রহের সঙ্গে যুক্ত।
বিমানবাহিনী ও প্রতি বছরের বৃক্ষরোপণ
বাংলাদেশ বিমানবাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৭১ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর, মুক্তিযুদ্ধের সময়। একটি ডাকোটা, একটি টুইন অটার উড়োজাহাজ ও একটি অ্যালুয়েট-৩ হেলিকপ্টার নিয়ে গঠিত 'কিলো ফ্লাইট' ১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের তেল ডিপোতে হামলার মধ্য দিয়ে প্রথম অভিযানে নামে। বাহিনীর সদর দপ্তর ঢাকা সেনানিবাসে। বন্যার মতো দুর্যোগে ত্রাণ পৌঁছানোসহ নানা মানবিক কাজে বাহিনীর হেলিকপ্টার ব্যবহৃত হয়।
জাতীয় বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির সঙ্গে মিল রেখে বিমানবাহিনী প্রতি বছর নিজস্ব বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি পালন করে আসছে। আইএসপিআরের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ২০ জুন বিমান সদর প্রাঙ্গণে চারা রোপণ করে সে বছরের কর্মসূচি উদ্বোধন করা হয় এবং সব ঘাঁটি ও ইউনিটে ঔষধি, ফলদ, ছায়াদানকারী ও কাঠের গাছ লাগানো হয়। ২০২১ সালের কর্মসূচি উদ্বোধন হয় ১৫ জুন, আর ২০২৩ সালের কর্মসূচি ২০ জুন তেজগাঁও পুরোনো বিমানবন্দরের রানওয়ের পাশের লেকের ধারে চারা রোপণের মধ্য দিয়ে।
ঢাকা ট্রিবিউনের ২০২৫ সালের ৩০ জুনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সে বছর বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন 'পরিকল্পিত বনায়ন করি, সবুজ বাংলাদেশ গড়ি' প্রতিপাদ্যে জাতীয় বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি-২০২৫-এর সঙ্গে মিল রেখে বাহিনীর কর্মসূচি উদ্বোধন করেন; সব ঘাঁটি ও ইউনিটে ফলদ, শোভাবর্ধনকারী বা বনজ এবং ঔষধি চারা লাগানো হয়। এসব বছরের উদ্বোধনী বিজ্ঞপ্তিতে হেলিকপ্টার থেকে বীজ ছিটানোর উল্লেখ ছিল না; ২০২৬ সালের কর্মসূচিতে চারা রোপণের সঙ্গে আকাশ থেকে সিডবল ফেলার পরিকল্পনাও যুক্ত হয়।
ছবি: Faisal Akram / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 2.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪ (১৬ জুন ২০২৬), বাসস (১৩ ও ১৬ জুন ২০২৬), ঢাকা টাইমস (১৩ জুন ২০২৬), দ্য ডেইলি অবজারভার (৬ ও ৮ জুন ২০২৬), আইএসপিআর (২০১৯, ২০২০, ২০২১ ও ২০২৩ সালের বিজ্ঞপ্তি), দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস (২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০), ঢাকা ট্রিবিউন (৩০ জুন ২০২৫), বাংলাপিডিয়া (কোস্টাল প্লান্টেশন, পার্বত্য চট্টগ্রাম, নোয়াখালী জেলা), ফরেস্ট ইকোসিস্টেমস (২০২১), শ্রীলঙ্কা বিমানবাহিনী (৩০ অক্টোবর ২০১৯), শ্রীলঙ্কার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় (২৪ নভেম্বর ২০২১), উইকিপিডিয়া (সিড বল, এরিয়াল সিডিং, বাংলাদেশ বিমানবাহিনী)





মন্তব্য
(০)