সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ১৬ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা২৮°পরিষ্কার আকাশআর্দ্রতা ৬২%বাতাস ৫ কিমি/ঘ

কলাপাড়ায় উদ্ধার হওয়া আহত দাঁড়াশ ও কালনাগিনীর চিকিৎসা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ে

২০২৬ সালের ৫ মে পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় দুটি বাড়ি থেকে ছয় ফুটের একটি দাঁড়াশ ও দেড় ফুটের একটি কালনাগিনী উদ্ধার করেন অ্যানিমেল লাভারস অব পটুয়াখালীর সদস্যরা। আহত সাপ দুটির চিকিৎসা চলে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ে, সুস্থ হলে বনে অবমুক্ত করার কথা জানানো হয়।

কলাপাড়ায় উদ্ধার হওয়া আহত দাঁড়াশ ও কালনাগিনীর চিকিৎসা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ে
পরিবেশ

পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলায় ২০২৬ সালের ৫ মে, মঙ্গলবার সকালে দুটি বসতবাড়ি থেকে ছয় ফুট দৈর্ঘ্যের একটি দাঁড়াশ ও দেড় ফুট দৈর্ঘ্যের একটি কালনাগিনী সাপ উদ্ধার করেন অ্যানিমেল লাভারস অব পটুয়াখালীর কলাপাড়া শাখার সদস্যরা। সাপ দুটি আহত ছিল, তাই চিকিৎসার জন্য সেগুলোকে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ে নেওয়া হয়। সেদিন বিকেলে জাগো নিউজ ২৪ এ খবর প্রকাশ করে।

দাঁড়াশ সাপটি পাওয়া যায় নীলগঞ্জ ইউনিয়নের পাখিমারা গ্রামের কৃষক নীলকান্তের বাড়িতে, জালে প্যাঁচানো অবস্থায়। একই দিনে পশ্চিম সেনাতলা গ্রামের মাসুদ মোল্লার বসতঘর থেকে কালনাগিনী সাপটি উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারকারীরা জানান, কালচে-বাদামি রঙের দাঁড়াশ সাপটি সম্পূর্ণ নির্বিষ, আর সবুজ-হলুদ আভাযুক্ত লাল-কালো ডোরাকাটা কালনাগিনী সাপটি মৃদু বিষধর।

উদ্ধারকারী ও প্রাণিসম্পদ কার্যালয় যা বলেছে


সংগঠনটির কলাপাড়া শাখার টিম লিডার বায়জিদ আহসান জাগো নিউজকে বলেন, হটলাইনে খবর পেয়ে তাঁরা দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে সাপ দুটি উদ্ধার করেন। আঘাতপ্রাপ্ত হওয়ায় সাপ দুটিকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে, আর সুস্থ হলে সেগুলোকে সংরক্ষিত বনে অবমুক্ত করা হবে বলে জানান তিনি।

উপ-সহকারী প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. আলী আহসান পত্রিকাটিকে বলেন, সাপ দুটি তখন পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছিল এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিল; সুস্থ হওয়ার পর সেগুলোকে প্রাকৃতিক পরিবেশে অবমুক্ত করা হবে। প্রতিবেদনে সাপ দুটির আঘাতের ধরন বা কীভাবে তারা আহত হয়েছিল তা বলা হয়নি, অবমুক্ত করার কোনো তারিখও জানানো হয়নি।

উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয় প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের (ডিএলএস) অংশ। এই সরকারি দপ্তর গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগির চিকিৎসাসেবা, উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ সেবার দায়িত্বে রয়েছে। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, ব্রিটিশ সরকারের অধীনে ১৮৯৩ সালে সিভিল ভেটেরিনারি ডিপার্টমেন্ট দিয়ে এর কাজ শুরু হয়; কয়েক দফা পুনর্গঠনের পর ১৯৬০ সালে এর নাম হয় ডিরেক্টরেট অব লাইভস্টক সার্ভিসেস। এর প্রধান কার্যালয় ঢাকার ফার্মগেটে পশুসম্পদ ভবনে।

দাঁড়াশ: গ্রাম ও মাঠের চেনা সাপ


বাংলাপিডিয়া বলছে, দাঁড়াশ (Ptyas mucosa) কলুব্রিডি পরিবারের একটি সাধারণ নির্বিষ সাপ। এর দুই ধরনের রং দেখা যায়: হালকা বা হলদেটে বাদামি এবং জলপাই-বাদামি। সাধারণত এটি দুই মিটারের কম লম্বা হয়, তবে বড়গুলো তিন মিটার পর্যন্ত হতে পারে। দাঁড়াশ ভালো গাছে চড়তে পারে, ডুব দিতে ও সাঁতার কাটতে পারে, চলাফেরায়ও খুব দ্রুত। যে প্রাণী সামলাতে পারে তা-ই খায়, তবে তার পছন্দ ইঁদুর, নেংটি ইঁদুর, ব্যাঙ ও কুনো ব্যাঙ; শিকার ধরেই সে গিলতে শুরু করে। স্ত্রী দাঁড়াশ প্রায় এক ডজন আঠালো ডিম পাড়ে, যা প্রায় দুই মাসে ফোটে।

প্রজাতিটি দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াজুড়ে ছড়িয়ে আছে: আফগানিস্তান ও ইরান থেকে পাকিস্তান, ভারত, নেপাল, বাংলাদেশ ও মিয়ানমার হয়ে দক্ষিণ চীন, তাইওয়ান ও ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত। প্রাপ্তবয়স্ক দাঁড়াশ সাধারণত ১.৫ থেকে ১.৯৫ মিটার লম্বা হয়, কিছু দুই মিটারও ছাড়িয়ে যায়; রেকর্ড দৈর্ঘ্য ৩.৭ মিটার। শুকনো অঞ্চলে এর রং হালকা বাদামি, আর্দ্র বনে প্রায় কালো। এটি দিনে সক্রিয়, আংশিক গাছবাসী; বনের মেঝে, জলাভূমি, ধানখেত, কৃষিজমি ও শহরতলিতে থাকে এবং ছোট সরীসৃপ, উভচর, পাখি ও স্তন্যপায়ী প্রাণী শিকার করে। প্রকৃতি সংরক্ষণের আন্তর্জাতিক সংস্থা আইইউসিএন একে ‘ন্যূনতম উদ্বেগ’ (লিস্ট কনসার্ন) শ্রেণিতে রেখেছে।

দুটি স্বভাব মানুষের কাছাকাছি দাঁড়াশকে প্রায়ই বিপদে ফেলে। বিপদ টের পেলে প্রাপ্তবয়স্ক দাঁড়াশ গরগর শব্দ করে এবং গলা ফুলিয়ে তোলে, যা গোখরার অনুকরণ হতে পারে; ফলে নিরীহ সাপটিকে বিষধর ভেবে মেরে ফেলা হয়। বাংলাপিডিয়াও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে একই কথা বলে: দাঁড়াশকে প্রায়ই গোখরা ভেবে মারা হয়, যদিও এর মাথা গোখরার চেয়ে অনেক সরু এবং এর কোনো ফণা নেই। দ্বিতীয় স্বভাবটি প্রতিদ্বন্দ্বী পুরুষ সাপের ‘লড়াইয়ের নাচ’, যেখানে দুটি সাপ শরীর আংশিক উঁচু করে একে অপরকে পেঁচিয়ে ধরে। বাংলাপিডিয়া জানায়, অনেক গ্রামবাসী ভুলভাবে একে গোখরা ও দাঁড়াশের মিলন বলে বিশ্বাস করেন।

দাঁড়াশের চামড়ার বাণিজ্যিক মূল্য অনেক দিনের। বাংলাপিডিয়া বলছে, বাণিজ্যে দাঁড়াশের চামড়ার দাম বেশি, আর কোরিয়া ও চীনে এর মাংস খাওয়া হয়। প্রজাতিটির বিস্তারের অন্য প্রান্তে, বন্যপ্রাণী বাণিজ্য পর্যবেক্ষণ সংস্থা ট্রাফিক ২০১১ সালের এপ্রিলে জানায়, ইন্দোনেশিয়া থেকে সরকারি নিয়মের বাইরে বিপুল সংখ্যায় দাঁড়াশ ধরা ও রপ্তানি হচ্ছিল এবং কোটা ব্যাপকভাবে মানা হচ্ছিল না।

থাইল্যান্ডের নাম নাও জাতীয় উদ্যানে একটি কালনাগিনী (Chrysopelea ornata ornatissima, বাংলাদেশে পাওয়া উপপ্রজাতি)। ছবি: Bernard DUPONT from FRANCE / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 2.0)
থাইল্যান্ডের নাম নাও জাতীয় উদ্যানে একটি কালনাগিনী (Chrysopelea ornata ornatissima, বাংলাদেশে পাওয়া উপপ্রজাতি)। ছবি: Bernard DUPONT from FRANCE / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 2.0)

কালনাগিনী: যে সাপ এক গাছ থেকে আরেক গাছে ভেসে যায়


কালনাগিনী হলো অর্নেট ফ্লাইং স্নেক বা গোল্ডেন ট্রি স্নেক, বৈজ্ঞানিক নাম Chrysopelea ornata। সরু দেহের এই গাছবাসী সাপ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পাওয়া যায়: ভারত, শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, লাওস, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম ও দক্ষিণ চীন পর্যন্ত। এর উপপ্রজাতি C. o. ornatissima উত্তর ও পূর্ব ভারত, নেপাল, বাংলাদেশ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় থাকে। বাংলায় একে কালনাগিনী ছাড়াও উড়ন্ত সাপ, সুন্দরী সাপ ও কালসাপ নামে ডাকা হয়। সাধারণত এর রং সবুজ, তার ওপর কালো জালির মতো দাগ এবং হলুদ বা সোনালি ছোপ; মাথা চ্যাপ্টা, নাক ভোঁতা, চোখ বড়। দৈর্ঘ্যে এটি ১১.৫ থেকে ১৩০ সেন্টিমিটার হয় এবং প্রায় এক মিটার দৈর্ঘ্যে প্রাপ্তবয়স্ক হয়।

সাপটি আসলে ওড়ে না। এটি উঁচুতে উঠে নিজেকে শূন্যে ছুড়ে দেয়, পেটের দিক ভেতরে টেনে পুরো দেহ বরাবর অবতল একটি তল তৈরি করে এবং বাতাসে ঢেউ খেলিয়ে এক গাছ থেকে আরেক গাছে বা মাটিতে ভেসে নামে; ১০০ মিটার পর্যন্ত এমন ভেসে যাওয়ার কথা নথিভুক্ত আছে। বাংলাপিডিয়াও লিখেছে, কালনাগিনী উঁচু ডাল থেকে নিচু ডালে ভেসে নামতে পারে। এটি দিনে সক্রিয়; টিকটিকি-গিরগিটি, বাদুড় ও ছোট ইঁদুর শিকার করে, পাখির ডিম ও পোকামাকড়ও খেতে পারে। এরা ছয় থেকে বারোটি লম্বাটে ডিম পাড়ে।

কালনাগিনীকে বিষধর বলা হবে কি না, তা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন বর্ণনা পাওয়া যায়। কলাপাড়ার উদ্ধারকারীরা একে মৃদু বিষধর বলেছেন। বাংলাপিডিয়া একে বাংলাদেশের পেছনের দিকে বিষদাঁতওয়ালা সেই কলুব্রিড সাপগুলোর মধ্যে রেখেছে, যেগুলোকে সাধারণত মৃদু বিষধর ধরা হয়, এবং বলেছে এ ধরনের সাপের কামড় সাধারণত মানুষের জন্য প্রাণঘাতী নয়। প্রজাতিটি নিয়ে প্রামাণ্য তথ্যসূত্র বলছে, এর বিষ গাছে দ্রুত চলা শিকারকে কাবু করার জন্য, মানুষের জন্য বিপজ্জনক বলে ধরা হয় না; তবে ধরতে গেলে সাপটি কামড়াতে দ্বিধা করে না। ২০২৫ সালের জুনে বন অধিদপ্তরের বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মকর্তা জোহরা মিলা আরটিভিকে বলেন, কালনাগিনী নির্বিষ ও শান্ত স্বভাবের সাপ, খুব বেশি বিরক্ত না হলে কামড়ায় না। তিনি জানান, সাধারণত মার্চ থেকে জুলাই এর প্রজনন মৌসুম, একবারে ছয় থেকে বারোটি ডিম পাড়ে এবং প্রায় দুই মাস পর বাচ্চা ফোটে; নাটক-সিনেমায় একে ভয়ংকর বিষধর হিসেবে দেখানোয় মানুষ সাপটি দেখামাত্রই মেরে ফেলে।

সাপ, ইঁদুর আর কৃষকের ফসল


কৃষক পরিবারের কাছে দাঁড়াশের খাদ্যাভ্যাসের গুরুত্ব আছে। বাংলাপিডিয়ার সাপবিষয়ক ভুক্তি বলছে, মানুষের কাছাকাছি থাকা কয়েকটি নির্বিষ প্রজাতি, যেমন দাঁড়াশ, দুধরাজ, গোলবাহার (অজগর), বালুবোড়া ও ঘরগিন্নি, ইঁদুর ও নেংটি ইঁদুরের জৈবিক দমনে উপকারী; আর সামগ্রিকভাবে সাপ প্রতিবছর বিপুল সংখ্যক জীবন্ত প্রাণী খায়, যেগুলোকে সাধারণত ফসলের শত্রু ধরা হয়।

বাংলাদেশে ফসলের শত্রুদের মধ্যে ইঁদুর অন্যতম ব্যয়বহুল। ২০১৭ সালের অক্টোবরে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) কর্মকর্তারা দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসকে জানান, দেশের বার্ষিক খাদ্যশস্য ও সবজির প্রায় ৪ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ১৫ লাখ টন, ইঁদুর একাই খেয়ে ফেলে; সে সময় দেশে বছরে দানাদার শস্য উৎপাদন ছিল ৩ কোটি ৭২ লাখ ৬৬ হাজার টন এবং সবজি ৩০ লাখ ৬০ হাজার টন। ডিএইর উপপরিচালক দেব দুলাল ঢালী ইঁদুরকে দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য হুমকি বলে উল্লেখ করেন।

কলাপাড়ার এই উদ্ধারের আগের মৌসুমগুলোতেও ইঁদুরের ক্ষতির খবর আসছিল। ২০২৪ সালের মার্চে বিডিনিউজ২৪ডটকম জানায়, বোরো ধান রক্ষায় গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া উপজেলায় ইঁদুর নিধন অভিযান শুরু করেছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর; উপজেলা কৃষি অফিসে ইঁদুরের লেজ জমা দিলে প্রতিটির জন্য ১০ টাকা দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়। সেখানকার কৃষকেরা বলেন, ইঁদুর ধানগাছের গোড়া কেটে দিচ্ছে, আর বিষটোপ, ফাঁদ ও পলিথিনের বেড়া দিয়েও তা ঠেকানো যাচ্ছে না।

পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলায় কুয়াকাটা জাতীয় উদ্যানের ভেতরের একটি বনপথ। ছবি: Md Riaz / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলায় কুয়াকাটা জাতীয় উদ্যানের ভেতরের একটি বনপথ। ছবি: Md Riaz / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

কলাপাড়া: খেত, নদী আর বনের উপকূলীয় উপজেলা


কলাপাড়া বরিশাল বিভাগের পটুয়াখালী জেলার সবচেয়ে দক্ষিণের উপজেলা। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী এর আয়তন ৪৯১.৮৯ বর্গকিলোমিটার; উত্তরে আমতলী উপজেলা, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর, পূর্বে রাবনাবাদ চ্যানেল ও গলাচিপা উপজেলা। প্রধান নদী আন্ধারমানিক, নীলগঞ্জ ও ধানখালী। কলাপাড়া থানা গঠিত হয় ১৯২১ সালে, উপজেলা হয় ১৯৮৩ সালে। উপজেলা সদর খেপুপাড়া নামে পরিচিত।

২০২২ সালের জনশুমারিতে কলাপাড়ার জনসংখ্যা ছিল ২ লাখ ৮৬ হাজার ৯৯৩। উপজেলায় কলাপাড়া ও কুয়াকাটা নামে দুটি পৌরসভা এবং ১২টি ইউনিয়ন রয়েছে, যার একটি নীলগঞ্জ, যেখানে দাঁড়াশটি পাওয়া যায়। বাংলাপিডিয়ার উদ্ধৃত শুমারির তথ্য অনুযায়ী ৫৭.২৩ শতাংশ পরিবারের প্রধান আয়ের উৎস কৃষি; প্রধান ফসল ধান, ডাল, আলু ও সবজি। প্রধান রপ্তানিপণ্য ধান, ইলিশ ও সামুদ্রিক শুঁটকি। উপজেলায় চিংড়ি ঘের, দুগ্ধ খামার, পোলট্রি খামার ও হ্যাচারিও রয়েছে; ১৮২২, ১৯৬০ ও ১৯৭৯ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় এর ইতিহাসের অংশ।

উপজেলার দক্ষিণ প্রান্তে কুয়াকাটা, যার ১৮ কিলোমিটার দীর্ঘ সৈকত থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দুটিই দেখা যায়। কাছেই কুয়াকাটা জাতীয় উদ্যান, উদ্ভিদ, প্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ এবং পর্যটন সুবিধা উন্নয়নের লক্ষ্যে সরকার ২০১০ সালের ২৪ অক্টোবর এটি ঘোষণা করে। এর আয়তন ১ হাজার ৬১৩ হেক্টর, এবং এটি শকুনের নিরাপদ এলাকা হিসেবে ঘোষিত এলাকাগুলোর একটি। বাংলাপিডিয়া কলাপাড়ার দর্শনীয় স্থানের মধ্যে ফাতরার চরের ম্যানগ্রোভ, ঝাউবন ও নারকেল বীথির কথাও উল্লেখ করেছে।

একই সংগঠনের আগের উদ্ধার


অ্যানিমেল লাভারস অব পটুয়াখালী জেলায় বন্যপ্রাণী উদ্ধার করে প্রকৃতিতে ফিরিয়ে দেয় এমন একটি সংগঠন; প্রকাশিত কয়েকটি ঘটনায় তারা বন বিভাগের সঙ্গে মিলে কাজ করেছে। ২০২৬ সালের মের আগের এক বছরে প্রকাশিত খবরে দেখা যায়, এর কলাপাড়া শাখা বসতঘরে পাওয়া সাপ নিয়ে কাজ করেছে:

  • ২০২৫ সালের ১৭ জুন সংগঠনের সদস্যরা কলাপাড়ার চাকামাইয়া ইউনিয়নের দিত্তা গ্রামের কৃষক জব্বার মুন্সীর বসতবাড়ি থেকে প্রায় দুই ফুট লম্বা দুটি কালনাগিনী সাপ উদ্ধার করেন। সাপ দুটি আহত না হওয়ায় উপজেলা সহকারী কমিশনারের (ভূমি) উপস্থিতিতে দিত্তা গ্রামের সংরক্ষিত বনে সেগুলো অবমুক্ত করা হয় বলে আরটিভি জানায়। শাখার টিম লিডার আরটিভিকে বলেন, কালনাগিনী মানুষের জন্য ক্ষতিকর নয় এবং না বুঝে অনেক নির্বিষ সাপ মেরে ফেলা হয়।
  • ২০২৫ সালের ২১ আগস্ট কুয়াকাটা পৌরসভার হোসেনপাড়ায় একটি বাড়ির আঙিনায় জালে আটকে থাকা প্রায় চার ফুট লম্বা একটি পদ্মগোখরা (Naja kaouthia) পাওয়া যায়। সংগঠনের উদ্ধারকারী দল, স্থানীয় পরিবেশকর্মী, পৌরসভার কর্মী ও বন বিভাগ মিলে সাপটি উদ্ধার করে প্রকৃতিতে ফিরিয়ে দেয় বলে যুগান্তর জানায়। বন বিভাগের মহিপুর রেঞ্জ কর্মকর্তা কে এম মনিরুজ্জামান বলেন, পদ্মগোখরা দেশের অন্যতম ভয়ংকর বিষধর সাপ হলেও সাধারণত মানুষকে এড়িয়ে চলে, আর অজ্ঞতার কারণে সাপ মেরে ফেলা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর।
  • ২০২৫ সালের ২৩ আগস্ট সংগঠনের বন্যপ্রাণী উদ্ধারকর্মীরা কুয়াকাটা সৈকতের পূর্ব পাশ থেকে প্রায় দুই ফুট লম্বা বিরল কাঁকড়াভুক পাইন্না সাপ উদ্ধার করেন এবং উপকূল পরিবেশ রক্ষা আন্দোলন (উপরা), পৌরসভার কর্মী ও বন বিভাগের সঙ্গে মিলে সেটি অবমুক্ত করেন বলে বাসস জানায়। সংগঠনের রেসকিউ অ্যান্ড রিলিজ উইংয়ের প্রধান আসাদুল্লাহ হাসান মুছা বলেন, প্রজাতিটি মৃদু বিষধর হলেও মানুষের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ নয়।
  • ২০২৫ সালের অক্টোবরে কলাপাড়া শাখা রাতে পৌর শহরের মাছবাজারসংলগ্ন একটি বাসা থেকে দেড় ফুটের বেশি লম্বা একটি ঘরগিন্নি সাপ উদ্ধার করে পরদিন সকালে সংরক্ষিত বনে অবমুক্ত করে বলে মানবকণ্ঠ জানায়। শাখার টিম লিডার বলেন, সাপটি নির্বিষ; সাপ দেখে আতঙ্কিত না হয়ে বা হত্যা না করে সংগঠনকে খবর দেওয়ার অনুরোধ জানান তিনি।

পাখিমারার দাঁড়াশের মতো কুয়াকাটার পদ্মগোখরাটিও একটি বাড়িতে জালে আটকা পড়েছিল; উপকূলের গ্রামে উদ্ধারকারীরা একাধিকবার এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন।

ঘটনার দিনে বন্যপ্রাণী আইন যা বলত


২০২৬ সালের ৫ মে বাংলাদেশে বন্যপ্রাণী সুরক্ষিত ছিল বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০২৬ দিয়ে। এটি ২০২৬ সনের ৮৬ নং আইন, তারিখ ১০ এপ্রিল ২০২৬, এবং ২০২৬ সালের ৭ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হয়েছে বলে গণ্য। আইনের ৫৪ ধারা বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২ রহিত করেছে, তবে পুরোনো আইনে দায়ের হওয়া মামলা এমনভাবে নিষ্পত্তি হবে যেন সেটি রহিত হয়নি। আইনের প্রস্তাবনায় সংবিধানের ১৮ক অনুচ্ছেদের উল্লেখ আছে, যেখানে জীববৈচিত্র্য, বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণকে রাষ্ট্রের দায়িত্ব করা হয়েছে।

উদ্ধার হওয়া দুটি প্রজাতিই আইনের তফসিল ২-এ রয়েছে, যা ২০২৬ সালের ১০ এপ্রিলের বাংলাদেশ গেজেটে প্রকাশিত হয়: কলুব্রিড সাপের তালিকায় দাঁড়াশ (Indian Rat Snake, Ptyas mucosa) ও কালনাগিনী (Ornate Flying Snake, Chrysopelea ornata) দুটিরই নাম আছে। সরকারের ‘বাংলাদেশের আইন’ ওয়েবসাইটে প্রকাশিত পাঠ অনুযায়ী কলাপাড়ার মতো উদ্ধারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিধানগুলো হলো:

  • ধারা ২-এ শিকারের সংজ্ঞা বিস্তৃত: কোনো বন্যপ্রাণীকে হত্যা করা, ধরা, বিষ প্রয়োগ করা বা অনুরূপ উদ্যোগ; এসব উদ্দেশ্যে বন্যপ্রাণীকে তাড়িয়ে নেওয়া; কোনো বন্যপ্রাণীকে আহত বা ক্ষতিগ্রস্ত করা; কিংবা বন্য পাখি বা সরীসৃপের বাসা বা ডিম সংগ্রহ বা ধ্বংস করা।
  • ধারা ৪২(১) অনুযায়ী লাইসেন্স বা পারমিট ছাড়া তফসিল ২-এর কোনো বন্যপ্রাণী শিকার করা যাবে না। ধারা ৪৪ অনুযায়ী এর দণ্ড সর্বোচ্চ এক বছর কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড; একই অপরাধের পুনরাবৃত্তিতে সর্বোচ্চ দুই বছর কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড।
  • ধারা ১০ অনুযায়ী লাইসেন্স, পজেশন সার্টিফিকেট বা পারমিট ছাড়া কেউ কোনো বন্যপ্রাণী লালন-পালন বা আবদ্ধ রাখতে, দখলে রাখতে, কেনাবেচা বা পরিবহন করতে পারবেন না, আর বন্যপ্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ শাস্তিযোগ্য অপরাধ। প্রহার, উত্ত্যক্ত করা, অপ্রয়োজনে আটক রাখা, ভীতি প্রদর্শন এবং নিষ্ঠুর আচরণ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করাও নিষ্ঠুর আচরণের মধ্যে পড়ে।
  • ধারা ১৪ অনুযায়ী উদ্ধার করা, জব্দ করা বা ধরা বন্যপ্রাণীকে উপযুক্ত প্রাকৃতিক পরিবেশে অবমুক্ত করার ব্যবস্থা নিতে হবে; তবে রোগ সংক্রমণের আশঙ্কা থাকলে বা শুশ্রূষার প্রয়োজন হলে আবদ্ধ রাখা যাবে।
  • ধারা ৩৪ বন অধিদপ্তরকে বন্যপ্রাণীর চিকিৎসা, খাদ্য, আশ্রয় ও নিরাপত্তার জন্য উদ্ধার কেন্দ্র স্থাপনের ক্ষমতা দিয়েছে, আর ধারা ৪(২) অনুযায়ী বন্যপ্রাণীর কল্যাণে প্রয়োজনীয় সংখ্যক চিকিৎসা কেন্দ্র ও চিকিৎসকের ব্যবস্থা করতে সরকার উদ্যোগ নেবে।

কলাপাড়ায় উদ্ধারকারী ও প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা যে পরিকল্পনার কথা বলেছিলেন, অর্থাৎ আহত অবস্থায় প্রাথমিক চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণ এবং সুস্থ হলে বনে অবমুক্ত করা, তা ধারা ১৪-এর নির্দেশিত পথের সঙ্গেই মেলে।

পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার কুয়াকাটা ইকোপার্ক। ছবি: Raisrulez / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার কুয়াকাটা ইকোপার্ক। ছবি: Raisrulez / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

বাংলাদেশে সাপ ও সাপের কামড়


বাংলাপিডিয়ার হিসাবে বাংলাদেশে প্রায় ৯০ প্রজাতির সাপ আছে, যার তিন-চতুর্থাংশের বেশি নির্বিষ; স্থলভাগের অতি বিষধর সাপ আধা ডজনেরও কম। ২০২৩ সালের জুলাইয়ে ঢাকা ট্রিবিউনের এক প্রতিবেদনে প্রজাতির সংখ্যা প্রায় ৯৮ বলা হয়, যার ৩১টি বিষধর। বাংলাপিডিয়ার তালিকায় দেশের সাধারণ সাপের মধ্যে আছে ঢোঁড়া, ডোরা, ঘরগিন্নি, কুকরি, দুধরাজ, দাঁড়াশ, অজগর, গোখরা ও সামুদ্রিক সাপ। গোখরা ও কেউটে জাতীয় (ইলাপিডি পরিবার) সাপ এবং ভাইপার প্রকৃত বিপজ্জনক দল; এদের মধ্যে গোখরা ও কেউটে মানুষের বসতির কাছাকাছি থাকে।

দেশে সাপের কামড় একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য সমস্যা। ঢাকা ট্রিবিউন ২০২৩ সালের জুলাইয়ে জানায়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (ডিজিএইচএস) ‘ন্যাশনাল সার্ভে অন অ্যানুয়াল ইনসিডেন্স অ্যান্ড এপিডেমিওলজি অব স্নেকবাইট ইন বাংলাদেশ’ অনুযায়ী প্রতিবছর চার লাখের বেশি মানুষ সাপের কামড়ের শিকার হন এবং অন্তত ৭ হাজার ৫১১ জন মারা যান, অর্থাৎ দিনে চার থেকে পাঁচজন। প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রতি এক লাখ মানুষের মধ্যে প্রায় ২৪৪ জন প্রতিবছর বিষধর সাপের কামড় খান, আর আক্রান্তদের ৯৫ শতাংশ গ্রামের বাসিন্দা।

ছবি: Suniltalasila / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বাংলাপিডিয়া, উইকিপিডিয়া, বাংলাদেশের আইন (বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০২৬ ও এর তফসিল), আরটিভি, যুগান্তর, বাসস, মানবকণ্ঠ, দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, বিডিনিউজ২৪ডটকম, ঢাকা ট্রিবিউন, ট্রাফিক

অনলাইন ডেস্কদা এগ্রো নিউজ

পরিবেশ

সম্পর্কিত খবর

পরিবেশ

শব্দদূষণ ভারতের শহরে স্বাস্থ্যঝুঁকি, কিন্তু মাপাই কঠিন

মুম্বাইয়ে বাইরের শব্দের মাত্রা গড়ে ৬৫ থেকে ৮৫ ডেসিবেল, যেখানে সড়কের শব্দে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিকা ৫৪ ডেসিবেল। গবেষকেরা বলছেন, তথ্যের ঘাটতি ও ব্যয়বহুল শব্দ-মডেলের কারণে ভারতে এর স্বাস্থ্যপ্রভাব নিয়ে গবেষণা কঠিন।

Mongabay India১৬ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
পরিবেশ

ব্যাংকক বাঁচাতে প্রতিবছর ডুবছে থাইল্যান্ডের গ্রাম

২০১১ সালের বন্যার পর থাইল্যান্ডে তৈরি বাঁধ ও জলকপাট ব্যাংকক ও শিল্পাঞ্চল থেকে পানি সরিয়ে দেয়, কিন্তু আয়ুথায়ার নদীতীরের গ্রামগুলো এখন মাসের পর মাস মাথার ওপর পানিতে ডুবে থাকে; ঘর উঁচু করতে সঞ্চয় খরচ করছেন বাসিন্দারা।

ইউরোনিউজ১৬ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
পরিবেশ

সুস্থ যমজের ছোঁয়ায় কয়েক সপ্তাহে প্রাণ ফিরে পেল বিবর্ণ প্রবাল

স্ট্যানফোর্ডের বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, একই কলোনির সুস্থ প্রবালের গায়ে বিবর্ণ প্রবালের টুকরা লাগিয়ে রাখলে দুটি জুড়ে যায় এবং বিবর্ণ প্রবাল আবার শৈবাল ফিরে পায়; পাঁচটি টুকরার সবকটি সাত সপ্তাহে সেরে উঠেছে।

ইউরোনিউজ১৬ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)