২০২৬ সালের জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহ থেকে কয়েক দিনের টানা ভারী বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড়ধসে বাংলাদেশের সাত জেলায় ২০ জুলাই পর্যন্ত ৫৪ জনের মৃত্যু হয়, সেদিন বিবিসি বাংলা এ খবর দেয়। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় চট্টগ্রাম বিভাগের জেলাগুলো, বিশেষ করে পার্বত্য অঞ্চল, আর চট্টগ্রামের নিচু এলাকায় আকস্মিক বন্যাও দেখা দেয়। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর জানায়, সে মাসে চট্টগ্রামে একদিনে ৩২৯ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড হয়, যা বহু বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।
সাত জেলায় প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি
প্রাণহানি শুরু হয় মাসের প্রথম সপ্তাহেই। প্রথম আলো ৯ জুলাই জানায়, আগের তিন দিনে পাহাড়ধসে ২২ জনের মৃত্যু হয়েছে; এর মধ্যে এক রাতেই কক্সবাজারে ১০ জন মারা যান, যাদের আটজন রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে। পত্রিকাটির প্রতিবেদনে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি জেলাকে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের ১১ জুলাইয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ক্ষতিগ্রস্ত সাত জেলা ছিল খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবান, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ। সেদিন পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা ছিল ৪৪, আহত ৩৯ এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ ১০ লাখ ২২ হাজার ৯৬৩ জন। ২০ জুলাই বিবিসি বাংলার হিসাবে মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় ৫৪ জনে।

কেন চট্টগ্রামেই এত বৃষ্টি
বাংলাদেশে সারা বছরের বৃষ্টির ৭১ শতাংশই হয় বর্ষাকালে। জুন, জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর, এই চার মাসকে বর্ষা মৌসুম ধরা হয়; এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি হয় জুলাইয়ে, আর তখনই পাহাড়ধসের ঝুঁকিও সবচেয়ে বেশি থাকে।
আবহাওয়াবিদ বজলুর রশীদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, সেবারের মৌসুমি নিম্নচাপটি বাংলাদেশের উপকূলের খুব কাছ দিয়ে সরাসরি পশ্চিম দিকে এগিয়েছে, তাই সারা দেশে সমানভাবে বৃষ্টি না হয়ে মূলত চট্টগ্রাম বিভাগে অতিভারী বৃষ্টি হয়েছে, বাকিটা বরিশাল বিভাগে। তাঁর ভাষায়, "চট্টগ্রামের পূর্বদিকে পাহাড় থাকায় আর্দ্র বাতাস সহজে তা অতিক্রম করতে পারেনি। তাই একই এলাকায় কয়েকদিন ধরে সেই বাতাস জমে থাকায় টানা ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে।"
আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, স্বাধীনতার পর জুলাই মাসে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি হয়েছিল ১৯৮৩ সালে, ৪০৭ মিলিমিটার। বজলুর রশীদ জানান, বর্ষার ধরনও বদলাচ্ছে: ২০২৬ সালের জুনে স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ৩০ শতাংশ কম বৃষ্টি হয়েছিল, আর শুরুতে ঘাটতি থাকলে পরে অল্প সময়ে অতিভারী বৃষ্টি হয়। শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাবও বিবেচনায় রাখতে হবে বলে তিনি মনে করেন। এল নিনো হলো প্রশান্ত মহাসাগরের পানির তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে যাওয়ার একটি প্রাকৃতিক জলবায়ুগত ঘটনা, যা বিশ্বের নানা অঞ্চলের বৃষ্টি ও তাপমাত্রার ধরন বদলে দেয়।
পাহাড় কাটা ও বসতি বাড়াচ্ছে ঝুঁকি
একদিনের ভারী বৃষ্টিতে সাধারণত বড় ধস হয় না; কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে মাটি পানিতে ভিজে গেলে পাহাড়ের ঢাল দুর্বল হয়ে পড়ে। বজলুর রশীদের মতে, রোহিঙ্গা সংকটের পর কক্সবাজার ও আশপাশে ব্যাপক হারে পাহাড় কাটা হয়েছে, ফলে এখন তুলনামূলক কম বৃষ্টিতেই ভূমিধস হচ্ছে। পাহাড়ে যেখানে যে গাছপালা থাকার কথা, তা না থাকায় মাটির বাঁধনও দুর্বল হয়ে গেছে।
ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন অব বাংলাদেশ (আইইবি) চট্টগ্রাম কেন্দ্রের সাবেক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী দেলোয়ার হোসেন মজুমদার জানান, চট্টগ্রামের পাহাড়গুলোর বয়স ২৫ লাখ বছরের মতো, এগুলো বালুময় এবং জন্মগতভাবেই ক্ষয়িষ্ণু; চট্টগ্রাম শহরে একসময়ের পাহাড়ের এক তৃতীয়াংশ এখন টিকে আছে। তাঁর মতে, পাহাড়ের পাদদেশে অনিয়ন্ত্রিত বসতি, পাহাড় কাটা ও প্রাকৃতিক উদ্ভিদ ধ্বংস, মূলত এই তিন কারণে ধস হচ্ছে। তিনি উদাহরণ দেন, পাঁচ কাঠা জমির দাম পাঁচ কোটি টাকা হলেও পাহাড় কেটে ধরা পড়লে জরিমানা এক লাখ টাকা, তাই জরিমানা বাড়ানো উচিত।

অতীতের বড় ধস ও সামনের ঝুঁকি
২০০৭ সালের ১১ জুন চট্টগ্রামের লালখান বাজারের মতিঝর্ণাসহ ছয়টি স্থানে পাহাড়ধসে ১২৭ জন প্রাণ হারান; সেদিন ২৪ ঘণ্টায় ৪২৫ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছিল। ২০১৭ সালের ১২ জুন বঙ্গোপসাগরের একটি নিম্নচাপের প্রভাবে ভারী বৃষ্টিতে রাঙামাটি, চট্টগ্রাম ও বান্দরবানে পাহাড়ধস হয়; বিবিসি বাংলার হিসাবে সে বছর ১৬০ জনেরও বেশি মানুষ মারা যান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. আশরাফুল ইসলামের গবেষণা অনুযায়ী, ২০০৮ সালে চট্টগ্রামে ১৩ জন, ২০১০ সালে কক্সবাজারে ৬৬ জন, ২০১১ সালে চট্টগ্রামে ১৭ জন, ২০১৫ সালে চট্টগ্রামে সাতজন ও ২০১৯ সালে কক্সবাজারে দুজন পাহাড়ধসে নিহত হন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির পাহাড়ি এলাকা দেশে পাহাড়ধসের সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে, আর সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি চট্টগ্রাম শহরের পাহাড়ঘেঁষা বসতিতে। বজলুর রশীদ বলেন, ঝুঁকি কমাতে কোন পাহাড় বিপজ্জনক তা আগে থেকে প্রশাসনকে জানাতে হবে এবং পাহাড় যেমন আছে তেমন রাখতে হবে। তাঁর মতে, অল্প সময়ের মধ্যে আবার ভারী বৃষ্টি না হলে তখনই বড় ধসের সম্ভাবনা কম ছিল। অধ্যাপক আশরাফুল ইসলাম বলেন, চট্টগ্রামের পাহাড় দিন দিন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে, তবে পরের ধস কত বড় পরিসরে হবে তা আগে থেকে নিশ্চিত করে বলা যায় না।
ছবি: Ferdous / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: বিবিসি বাংলা, প্রথম আলো, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)