শিল্প বা উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য বনভূমি কাটার ক্ষতিপূরণ কীভাবে হবে, সেই নিয়মে বড় পরিবর্তনের পথ খুলেছিল ভারত। কেন্দ্রীয় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের বন উপদেষ্টা কমিটি (ফরেস্ট অ্যাডভাইজরি কমিটি বা এফএসি) ‘গ্রিন ক্রেডিট’ নামের একটি প্রকল্পে সম্মতি দেয়। ২০১৯ সালের ১৯ ডিসেম্বরের বৈঠকের কার্যবিবরণী থেকে খবরটি ২০২০ সালের জানুয়ারির শুরুতে প্রকাশ্যে আসে। ১৮ জানুয়ারি কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকা ‘ঋণাত্মক’ শিরোনামে এক সম্পাদকীয়তে প্রকল্পটি নিয়ে নানা প্রশ্ন তোলে।
এত দিন ক্ষতিপূরণের নিয়ম কী ছিল
দ্য ওয়্যারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রচলিত নিয়মে বনভূমি কেটে কাজে লাগাতে চাইলে শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে সমপরিমাণ উপযুক্ত অ-বনভূমি খুঁজে দিতে হতো এবং কাটা বনের বর্তমান অর্থনৈতিক মূল্য রাজ্যের বন বিভাগকে দিতে হতো। সেই জমিতে নতুন করে বন তৈরির দায়িত্ব ছিল বন বিভাগের। শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর অভিযোগ ছিল, বিদ্যমান বনের লাগোয়া এমন উপযুক্ত জমি জোগাড় করা কঠিন।
এই ক্ষতিপূরণের টাকা ব্যবস্থাপনার জন্য ভারত ২০১৬ সালে ক্ষতিপূরণমূলক বনায়ন তহবিল আইন (কম্পেনসেটরি অ্যাফরেস্টেশন ফান্ড অ্যাক্ট) পাস করে, যা ২০১৮ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর কার্যকর হয়। এই আইনে জাতীয় ও রাজ্য পর্যায়ে ‘ক্যাম্পা’ নামে কর্তৃপক্ষ গঠিত হয়। দ্য ওয়্যার জানায়, কয়েক দশকে কেন্দ্র প্রায় ৫০ হাজার কোটি রুপি সংগ্রহ করেছিল, কিন্তু রাজ্যগুলো তা বন পুনরুদ্ধারে খরচ করছিল না। সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপ ও নতুন বিধির পর আগস্ট পর্যন্ত রাজ্যগুলোকে ৪৭ হাজার কোটি রুপি দেওয়া হলেও তাতে বন পুনরুদ্ধার হয়নি বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।

গ্রিন ক্রেডিট প্রকল্পে কী বদলায়
নতুন প্রকল্পে বেসরকারি কোম্পানি ও গ্রামের বন সম্প্রদায়ের মতো সংস্থা নিজেরাই জমি বেছে নিয়ে গাছ লাগাতে পারবে। তিন বছর পর বন বিভাগের শর্ত পূরণ করলে সেই বাগান ক্ষতিপূরণমূলক বনভূমি হিসেবে গণ্য হওয়ার যোগ্য হবে। তখন বনভূমি প্রয়োজন এমন কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান টাকা দিয়ে সেই জমি কিনে নিতে পারবে। আনন্দবাজারের ভাষায়, যা এত দিন একান্তই সরকারের কাজ ছিল, তা এখন বেসরকারি সংস্থাও করতে পারবে।
বৈঠকের কার্যবিবরণীতে কমিটির যুক্তি ছিল, এই প্রকল্প প্রচলিত বনাঞ্চলের বাইরে ব্যক্তি পর্যায়ে বৃক্ষরোপণে উৎসাহ দেবে এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যের মতো আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার পূরণে সহায়ক হবে। দ্য ওয়্যার জানায়, ২০১৫ সালেও ক্ষয়িষ্ণু বনভূমির জন্য সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে একটি গ্রিন ক্রেডিট প্রকল্পের সুপারিশ হয়েছিল, কিন্তু কেন্দ্রীয় পরিবেশ মন্ত্রণালয় অনুমোদন না দেওয়ায় তা স্থগিত হয়ে যায়।

বৃক্ষরোপণ কি বনের বিকল্প
আনন্দবাজারের সম্পাদকীয়র মূল আপত্তি ছিল, যে বন কাটা পড়ে আর ক্ষতিপূরণ হিসেবে যে বাগান তৈরি হয়, দুইয়ের চরিত্র এক নয়। পত্রিকাটির মতে, প্রাকৃতিক বন বহুমাত্রিক, তাতে অসংখ্য প্রজাতির গাছ ও লতা থাকে এবং নানা প্রাণী আশ্রয় পায়। বেসরকারি সংস্থার গাছ বড় করার সময় নির্দিষ্ট থাকায় তারা অল্প পরিশ্রমে দ্রুত বাড়ে এমন এক-দুটি প্রজাতি, যেমন ইউক্যালিপটাস, সারি সারি লাগাতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করে পত্রিকাটি। এমন একক প্রজাতির বাগান জীববৈচিত্র্য ধরে রাখতে পারবে না বলে মত দেয় সম্পাদকীয়টি।
দ্য ওয়্যারকে দেওয়া মন্তব্যে সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চের গবেষক কাঞ্চি কোহলিও বলেন, প্রকল্পটি ক্ষতিপূরণমূলক বনায়নের মূল সমস্যার সমাধান করে না; বরং বহুমুখী ব্যবহারের বনাঞ্চলকে একক প্রজাতির বাগানের প্লটে পরিণত করে বেসরকারিকরণের সমস্যা তৈরি করে, যেখানে বনকে সামাজিক ও পরিবেশগত চরিত্রহীন নিছক পণ্য হিসেবে দেখা হয়।

বন জরিপের পরিসংখ্যান ও অন্য প্রশ্ন
সম্পাদকীয়টি ভারতের বন জরিপ প্রতিবেদনের (ইন্ডিয়া স্টেট অব ফরেস্ট রিপোর্ট) প্রসঙ্গও টানে। ২০১৯ সালের ৩০ ডিসেম্বর প্রকাশিত এই প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশটির বনাচ্ছাদন ৭ লাখ ১২ হাজার ২৪৯ বর্গকিলোমিটার, যা মোট ভৌগোলিক আয়তনের ২১.৬৭ শতাংশ। মোঙ্গাবে ইন্ডিয়ার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৭ সালের তুলনায় বন ও বনের বাইরের গাছ মিলিয়ে আচ্ছাদন বেড়েছিল ৫ হাজার ১৮৮ বর্গকিলোমিটার, তবে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোতে বনাচ্ছাদন কমেছিল ৭৬৫ বর্গকিলোমিটার। আনন্দবাজারের মতে, সবুজের এই বৃদ্ধির বড় অংশই বাণিজ্যিক বৃক্ষরোপণ, আর প্রকৃত গভীর বনের পরিধি ক্রমে কমছে।
সম্পাদকীয়তে আরও প্রশ্ন তোলা হয়: প্রকল্পে যুক্ত সংস্থাগুলোর সামগ্রিক দায়বদ্ধতা থাকবে কি না, বনবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষা পাবে কি না, এবং এত কিছু নজরদারি করতে গিয়ে বন বিভাগ নিজের কাজে পিছিয়ে পড়বে কি না। বিভিন্ন খাতে বেসরকারিকরণ নিয়ে চলমান বিতর্কের কথা উল্লেখ করে পত্রিকাটি বলে, সব দিক সামলে সবুজ বাড়ানোর এই উদ্যোগ সফল হবে কি না, সে প্রশ্ন থেকেই যায়।
ছবি: Biswarup Ganguly / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 3.0)
সূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা, দ্য ওয়্যার, মোঙ্গাবে ইন্ডিয়া, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)