যে পাখিদের এখন আকাশে উড়তে খুব একটা দেখা যায় না, যাদের ডাক অনেকের কানেই আর পৌঁছায় না, ২০২৬ সালের ৩১ জানুয়ারি শনিবার তাদের দেখা মিলেছিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি), তবে জীবন্ত অবস্থায় নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের বুদ্ধিজীবী চত্বরে দিনব্যাপী পাখি মেলায় রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় সংরক্ষিত পাখি প্রদর্শন করা হয়, যাদের জাগো নিউজের প্রতিবেদনে ‘মমি’ পাখি বলা হয়েছে। সঙ্গে ছিল পাখির ছবির স্টল, সচেতনতামূলক র্যালি এবং ছোট স্কুলশিক্ষার্থীদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা।
মেলার আয়োজন করে বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ড কনজারভেশন ক্লাব। সার্বিক সহযোগিতায় ছিল প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, বার্ডশাহী ও ভ্যালেন্টটেক লিমিটেড। প্রতিপাদ্য ছিল ‘পাখি দেখি, পাখি ভালোবাসি, পাখি রক্ষা করি’। জাগো নিউজ সেদিন বিকেলে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে। একই দিনে প্রকাশিত এনটিভি অনলাইনের ছবির গ্যালারিতেও একই আয়োজক ও প্রতিপাদ্যের কথা বলা হয় এবং জানানো হয়, মেলা শুরু হয় সকাল ৯টায়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংরক্ষিত এসব পাখির মাধ্যমে বিলুপ্তি আর সংরক্ষণের মাঝের বাস্তব চিত্র দর্শনার্থীদের সামনে তুলে ধরাই ছিল উদ্দেশ্য। প্রাণহীন দেহে প্রাণের এই উপস্থিতিই মেলাটিকে আলাদা ও চিন্তাজাগানিয়া করে তোলে। কাছ থেকে, নির্ভয়ে পাখি দেখার বিরল সুযোগ পান দর্শনার্থীরা।
স্টল, র্যালি আর ছবি আঁকায় সারা দিন
উদ্বোধনের পর পাখি সংরক্ষণে জনসচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে একটি র্যালি বের করা হয়। মেলাপ্রাঙ্গণে সাদা-নীল কাপড়ে ঘেরা পরিপাটি একটি জায়গায় সাজানো হয় কয়েকটি ছোট স্টল। একটি স্টলে ছিল পাখির ছবি, পাশের আরেকটি স্টলে সংরক্ষিত পাখির প্রদর্শনী।
প্রতিবেদন বলছে, মেলার সবচেয়ে প্রাণবন্ত অংশ ছিল স্কুলশিক্ষার্থীদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা। ক্যাম্পাসসংলগ্ন বিভিন্ন স্কুলের নার্সারি থেকে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা এতে অংশ নেয়। বাবার সঙ্গে মেলা ঘুরতে ও প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে আসা চতুর্থ শ্রেণির এক শিক্ষার্থী জানায়, এখানে এসে তার খুব ভালো লেগেছে। আগে কখনো দেখেনি এমন অনেক নতুন পাখি সে দেখেছে, আর এমন আয়োজন আরও বেশি হলে ভালো হয় বলে মনে করে সে।
প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষার্থীরা স্টলে দাঁড়িয়ে দর্শনার্থীদের পাখি সম্পর্কে নানা তথ্য দিচ্ছিলেন। বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ফারহানা আশা বলেন, মেলায় এমন অনেক দুর্লভ পাখি রয়েছে, যেগুলো সচরাচর দেখা যায় না। সাদা বক, কঙ্কাল, দুর্লভ হাঁস, পায়রাসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি এখানে প্রদর্শন করা হয়েছে। তিনি জানান, সকাল থেকেই স্টলে দর্শনার্থীদের ভিড় ছিল, আর কীভাবে এসব পাখি সংরক্ষণ করা হয়েছে এবং এর পেছনের বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া কী, সে বিষয়ে দর্শনার্থীদের ধারণা দেওয়া হচ্ছিল।
বার্ড কনজারভেশন ক্লাবের আহ্বায়ক ও প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. এ এম সালেহ রেজা বলেন, বাংলাদেশে এমন অনেক পাখি আছে, যেগুলো সম্পর্কে আমরা অনেকেই জানি না। এসব পাখির সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পরিচয় করিয়ে দিতে, পাখির প্রতি তাদের মমত্ববোধ তৈরি করতে এবং পাখি সংরক্ষণে সবাইকে সচেতন করতেই এই মেলার আয়োজন বলে জানান তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয় ও তার ক্যাম্পাস
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৫৩ সালে, আর সে বছরের ৬ জুলাই থেকে এর কার্যক্রম শুরু হয়। রাজশাহী শহর থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত বিশ্ববিদ্যালয়টিকে সেখানে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিশ্ববিদ্যালয় বলা হয়েছে। ক্যাম্পাসের জন্য মতিহার এলাকায় ২৯৮.২০ হেক্টর জমি অধিগ্রহণ করা হয়, যা মতিহার সবুজ চত্বর নামে পরিচিত। বাংলাপিডিয়ার হিসাবে ২০১৮-২০১৯ সেশনে অনুষদের সংখ্যা ছিল ৯ এবং বিভাগের সংখ্যা ৫৯। মেলার স্টলগুলো যাঁরা সামলেছেন, সেই শিক্ষার্থী ও সাবেক শিক্ষার্থীদের প্রাণিবিদ্যা বিভাগ এগুলোরই একটি।
ক্যাম্পাসে রয়েছে অনেক পুকুর ও জলাশয়, আর নারকেলবাড়িয়ায় রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ক্যাম্পাস। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে প্রথম আলো জানায়, রহমতুন্নেসা হলের পাশের পুকুর, তুঁতবাগানসংলগ্ন পুকুর, পশ্চিমপাড়ার শিক্ষক কোয়ার্টারের ভেতরের দুটি পুকুর, শামসুজ্জোহা হলের পাশের পুকুর এবং কৃষি অনুষদ ভবনসংলগ্ন জলাশয়গুলোতে সাধারণত পরিযায়ী পাখির দেখা মেলে। বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা পত্রিকাটিকে বলেন, নারকেলবাড়িয়া ক্যাম্পাসে প্রতিবছর উল্লেখযোগ্যসংখ্যক পরিযায়ী পাখি আসে এবং সেখানে পাখিদের বসবাসের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে দেওয়া হয়েছে।
‘মমি’ পাখি আসলে কী
এই ‘মমি’ মিসরের মমির মতো কিছু নয়; এগুলো ট্যাক্সিডার্মি নমুনা, অর্থাৎ এমন পাখি, যাদের চামড়া সংরক্ষণ করে কাঠামোর ওপর বসানো হয়েছে, যাতে আকার ও পালক অবিকৃত থাকে। মেলায় ট্যাক্সিডার্মি বিষয়ে জানাতে উপস্থিত ছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী ও আর্মড ফোর্সেস মেডিকেল কলেজের গেজেটেড ট্যাক্সিডার্মিস্ট মো. দেলোয়ার হোসেন। তিনি জানান, দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রাণী মারা গিয়ে নষ্ট হয়ে যেতে দেখে তাঁর মধ্যে সংরক্ষণ পদ্ধতি নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়। সেই আগ্রহ থেকেই তিনি ট্যাক্সিডার্মি নিয়ে কাজ শুরু করেন।
ট্যাক্সিডার্মি হলো প্রদর্শন বা গবেষণার জন্য কোনো প্রাণীর দেহ কাঠামোর ওপর বসিয়ে কিংবা ভেতরে উপকরণ ভরে সংরক্ষণের কৌশল। শব্দটি এসেছে গ্রিক দুটি শব্দমূল থেকে, যার অর্থ দাঁড়ায় ‘চামড়ার বিন্যাস’। প্রচলিত পদ্ধতিতে প্রথমে প্রাণীর চামড়া ছাড়ানো হয়। চামড়ার ধরন অনুযায়ী এরপর তাতে সংরক্ষণকারী রাসায়নিক লাগানো হয় অথবা চামড়া ট্যান করা হয়, তারপর সেটি একটি ম্যানিকুইন বা পলিইউরেথেনের তৈরি কাঠামোর ওপর বসানো হয় এবং কাদামাটি দিয়ে কাচের চোখ লাগানো হয়। তুলনামূলক নতুন পদ্ধতি ফ্রিজ-ড্রাইংয়ে অভ্যন্তরীণ অঙ্গ সরিয়ে প্রাণীটিকে নির্দিষ্ট ভঙ্গিতে রেখে জমিয়ে ফেলা হয় এবং ভ্যাকুয়াম চেম্বারে শুকানো হয়; এ ধরনের নমুনা পোকামাকড়ের আক্রমণে বিশেষভাবে নষ্ট হতে পারে।
জাদুঘরে দুই ধরনের নমুনা রাখা হয়। ‘মাউন্ট’ তৈরি হয় জীবন্ত প্রাণীর মতো দেখানোর জন্য, প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে, যেমন রাজশাহীতে সারি বেঁধে সাজানো পাখিগুলো। ‘স্টাডি স্কিন’ হলো ন্যূনতম প্রস্তুতির নমুনা; এতে কৃত্রিম চোখ থাকে না, ড্রয়ারে সমতলভাবে রাখা হয়, আর এর একমাত্র উদ্দেশ্য তথ্য সংরক্ষণ। স্টাডি স্কিনের বড় সংগ্রহ থেকে গবেষকেরা অনেকগুলো প্রাণীর শারীরিক বৈশিষ্ট্য তুলনা করতে পারেন, পরে এসব নমুনা থেকে ডিএনএও বের করা যায়। বিলুপ্ত ও বিপন্ন প্রজাতিসহ বিভিন্ন প্রজাতির নথি রাখতে জাদুঘরগুলো দুই ধরনের নমুনাই ব্যবহার করে।
বিজ্ঞানচর্চায় এই কৌশলের ইতিহাস দীর্ঘ। প্রাকৃতিক ইতিহাসের সংগ্রহশালার জন্য পাখি সংরক্ষণের প্রাচীনতম পদ্ধতিগুলো প্রকাশ করেন রেনে-আঁতোয়ান ফেরশো দ্য রেওমুর, ১৭৪৮ সালে। আঠারো শতকে জঁ-বাতিস্ত বেকারের কাজ ট্যাক্সিডার্মিকে আরও নিয়মতান্ত্রিক করে তোলে, আর আর্সেনিকযুক্ত সাবান ব্যবহারের সেই পদ্ধতি লুই দ্যুফ্রেন প্রকাশ করেন ১৮০৩ ও ১৮০৪ সালে। ১৮৫১ সালে লন্ডনের গ্রেট এক্সিবিশনে জন হ্যানককের প্রদর্শিত জীবন্ত দেখতে স্টাফ করা পাখিগুলো ভিক্টোরীয় যুগে ব্রিটেনে ট্যাক্সিডার্মির কথিত স্বর্ণযুগের সূচনায় ভূমিকা রাখে।

ছবিতে যেসব পাখি
প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্টলে প্রদর্শিত ছবির মধ্যে ছিল চোখাচোখি, পিজিওন, প্যারোট, নিশি বক, গুবরে শালিক ও বামুন শালিক; আরও ছিল কালোপিঠ গাংচিল, পালাসির গাংচিল, সাইবেরিয়ান শিলাফিদ্দা, নীল চটক, উইলসন্স স্টর্ম পেট্রেল, লালঘাড় কাস্তেচরা, ইউরেশিয়ান চামচঠুঁটি, বুটপা ঈগল, জল ময়ূর ও ডাহুক। নামগুলো শুনেই অনেক দর্শনার্থী অবাক হচ্ছিলেন, কেউ কেউ স্মৃতি হিসেবে মোবাইলে ছবি তুলে রাখছিলেন।
পালাসির গাংচিল (Ichthyaetus ichthyaetus), যাকে বড় কালোমাথা গাংচিলও বলা হয়, সবচেয়ে বড় গাংচিলগুলোর একটি; দৈর্ঘ্যে প্রায় ৫৫ থেকে ৭২ সেন্টিমিটার, ডানার বিস্তার ১৪২ থেকে ১৭০ সেন্টিমিটার। দক্ষিণ রাশিয়া থেকে মঙ্গোলিয়া পর্যন্ত জলাভূমি ও দ্বীপে এরা দল বেঁধে বাসা বাঁধে, আর শীত কাটায় পূর্ব ভূমধ্যসাগর, আরব অঞ্চল ও ভারতে। গ্রীষ্মে প্রাপ্তবয়স্ক পাখির কালো মাথা দেখে একে সহজেই চেনা যায়, কারণ এই আকারের আর কোনো গাংচিলের মাথা কালো হয় না।
উইলসন্স স্টর্ম পেট্রেল (Oceanites oceanicus) ১৬ থেকে ১৮.৫ সেন্টিমিটার লম্বা ছোট সামুদ্রিক পাখি। দক্ষিণ গোলার্ধের গ্রীষ্মে এরা অ্যান্টার্কটিকার উপকূল ও আশপাশের দ্বীপে প্রজনন করে, বছরের বাকি সময় কাটায় সাগরে, আর দক্ষিণ গোলার্ধের শীতে চলে আসে উত্তরের মহাসাগরগুলোতে। পানির ওপর পা ঠুকে ঠুকে চলতে চলতে প্ল্যাংকটন খুঁটে খাওয়ার জন্য পাখিটি পরিচিত, আর একে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় টিকে থাকা পাখিগুলোর একটি ধরা হয়।
লালঘাড় কাস্তেচরা (Pseudibis papillosa), যার আরেক নাম ভারতীয় কালো আইবিস, ভারতীয় উপমহাদেশের সমভূমিতে ব্যাপকভাবে দেখা যায়। দেহ মূলত কালো, ঠোঁট লম্বা ও নিচের দিকে বাঁকানো, কাঁধে সাদা ছোপ, আর মাথার চাঁদিতে উজ্জ্বল লাল আঁচিলের মতো চামড়া। শুকনো মাঠে কেঁচো, পোকামাকড়, ব্যাঙ ও শস্যদানা খুঁজে খায়। ইউরেশিয়ান চামচঠুঁটি (Platalea leucorodia) নাম পেয়েছে চওড়া, চ্যাপ্টা ঠোঁটের জন্য; ঠোঁট পানিতে এপাশ-ওপাশ নেড়ে এরা ছোট মাছ ও চিংড়ি ছেঁকে খায়। উত্তরাঞ্চলে প্রজনন করা পাখিরা শীত কাটায় এশিয়া, আফ্রিকা ও দক্ষিণ-পশ্চিম ইউরোপের উষ্ণ অঞ্চলে।
বুটপা ঈগল (Hieraaetus pennatus) প্রায় ৪০ সেন্টিমিটার লম্বা ছোট আকারের ঈগল। দক্ষিণ ইউরোপ, উত্তর আফ্রিকা ও এশিয়াজুড়ে এরা প্রজনন করে। উত্তরের পাখিরা মোটামুটি নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি সময়ে দক্ষিণে পাড়ি জমায় এবং সাহারার দক্ষিণের আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ায় শীত কাটায়। এর হালকা ও গাঢ় রঙের দুই ধরনের রূপ দেখা যায়; ছোট স্তন্যপায়ী, সরীসৃপ ও পাখি শিকার করে খায়।
জল ময়ূর (Hydrophasianus chirurgus), ইংরেজিতে ফেজেন্ট-টেইলড জাকানা, খুব লম্বা আঙুল ও নখের সাহায্যে ভাসমান জলজ উদ্ভিদের ওপর দিয়ে হেঁটে বেড়ায়; প্রজনন মৌসুমে পুরুষ পাখির লম্বা মাঝের লেজের পালক থেকেই এর ইংরেজি নাম। স্ত্রী পাখি ভাসমান লতাপাতার ওপর বাসা বানায় এবং এক মৌসুমে একাধিকবার ডিম পাড়তে পারে, প্রতিবারের ছানা লালন করে আলাদা পুরুষ পাখি। সাইবেরিয়ান শিলাফিদ্দা (Saxicola maurus) সাইবেরিয়া থেকে দক্ষিণে হিমালয় পর্যন্ত এশিয়ার নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে প্রজনন করে এবং দক্ষিণে থাইল্যান্ড ও ভারত পর্যন্ত এসে শীত কাটায়। ডাহুক (Amaurornis phoenicurus) রেলিডি গোত্রের মাঝারি আকৃতির পাখি, যা বাংলাদেশ, ভারত এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে দেখা যায়।
সংরক্ষিত নমুনায় চেনা পাখিরা
সংরক্ষিত পাখির স্টলে ছিল এমন সব পাখি, যাদের বাংলাদেশের বেশির ভাগ মানুষ দেখলেই চেনেন। সারিবদ্ধভাবে সাজানো ছিল পানকৌড়ি, জলকাক, টিয়া, লক্ষ্মী পেঁচা, হুতোম পেঁচা, গরিয়াল মাছরাঙা, নিশি বক, পাতি কাক, কোয়েল ও বালি হাঁস, সঙ্গে একটি কাঠবিড়ালি। প্রতিবেদন বলছে, কাছ থেকে দেখে অনেকেই বুঝতে পারছিলেন, প্রকৃতি থেকে এদের হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা কতটা বাস্তব।
গরিয়াল বা মেঘহও মাছরাঙা (Pelargopsis capensis) বেশ বড় আকারের মাছরাঙা, দৈর্ঘ্যে প্রায় ৩৫ সেন্টিমিটার। পিঠ সবুজ, ডানা ও লেজ নীল, মাথা জলপাই-বাদামি, দেহের নিচের অংশ হালকা বাদামি, আর বড় ঠোঁট ও পা উজ্জ্বল লাল। হ্রদ, নদী বা উপকূলের কাছে গাছপালায় ঘেরা এলাকায়, বিশেষ করে গাছের ছায়াঘেরা নিচু এলাকার খাল ও পুকুরপাড়ে এদের বাস। এরা মাছ, ব্যাঙ, কাঁকড়া, ইঁদুরজাতীয় প্রাণী ও পাখির ছানা খায়।
লক্ষ্মী পেঁচার মুখ বড় ও হৃদয় আকৃতির; এটি হুতুম শব্দে ডাকে না, তীক্ষ্ণ চিৎকার করে। মূলত রাতে সক্রিয় এই পাখি ঘুটঘুটে অন্ধকারেও অত্যন্ত প্রখর শ্রবণশক্তির ওপর ভর করে শিকার করে। এর খাদ্যের প্রায় সবটাই ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণী, তাই লক্ষ্মী পেঁচাকে ইঁদুরের প্রাকৃতিক নিয়ন্ত্রক হিসেবে দেখা হয়; ইসরায়েল ও জর্ডানের একটি যৌথ প্রকল্পে ইঁদুর দমনে কীটনাশকের ওপর নির্ভরতা কমাতে লক্ষ্মী পেঁচা কাজে লাগানো হয়েছে।
বালি হাঁস বা ধলা বালিহাঁস (Nettapus coromandelianus) পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট জলচর হাঁসজাতীয় পাখিগুলোর একটি; দৈর্ঘ্যে প্রায় ২৬ সেন্টিমিটার, ওজন ১৬০ গ্রামের মতো কমও হতে পারে। শাপলার মতো ভাসমান উদ্ভিদে ভরা হ্রদ ও পুকুর এদের পছন্দ। পানির ওপরের স্তর থেকে ছোট মাছ, শামুক-ঝিনুক, কাঁকড়া-চিংড়িজাতীয় প্রাণী, পোকার শূককীট ও জলজ উদ্ভিদ খায়, আর বাসা বাঁধে মূলত গাছের প্রাকৃতিক কোটরে। পানকৌড়ি, ইংরেজিতে কর্মোরেন্ট, সারা পৃথিবীতে প্রায় ৪০ প্রজাতির একটি দল; সবার দেহেই কালো রঙের প্রাধান্য, আর সবাই খুব ভালো সাঁতারু।

ক্যাম্পাসের পরিযায়ী পাখি
মেলায় অধ্যাপক সালেহ রেজা বিশ্ববিদ্যালয়ে শীত কাটাতে আসা পরিযায়ী পাখি রক্ষার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, প্রতিবছর শীতের শুরুতে বিশ্ববিদ্যালয়ের পুকুর ও নারকেলবাড়িয়া ক্যাম্পাসে প্রচুর পরিযায়ী পাখির সমাগম ঘটে, তাদের সংরক্ষণে সবাইকে সচেতন হতে হবে। তাদের থাকার উপযুক্ত পরিবেশ না দিয়ে যদি ঢিল ছুড়ে বিরক্ত করা হয়, তাহলে তারা আতঙ্কিত হয়ে অন্যত্র চলে যাবে; পাখিসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণীর সঙ্গে বিরূপ আচরণ করা যাবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
২০২৫ সালের নভেম্বরে বণিক বার্তা জানায়, ক্যাম্পাসে শীতের অতিথিদের বেশির ভাগই হাঁসজাতীয় পাখি। সংখ্যায় সবচেয়ে বেশি ছোট সরালি; এ ছাড়া ছিল বড় সরালি, ল্যাঞ্জা হাঁস, খুন্তে হাঁস ও ঝুঁটি হাঁস। পেরিগ্রিন ফ্যালকন কয়েক বছর ধরে এসে প্রায় পাঁচ মাস থাকছে। পাখিরা ভিড় করছিল খালেদা জিয়া, তাপসী রাবেয়া, রহমতুন্নেসা ও রোকেয়া হলের পেছনের পুকুরে এবং শামসুজ্জোহা হলের পাশের জলাশয়ে। অধ্যাপক সালেহ রেজা পত্রিকাটিকে বলেন, আগের বছরের চেয়ে সে বছর পাখির সংখ্যা বেশি; তবে মানুষের ঢিল ছোড়া আর উড়ন্ত পাখির ছবি তোলা পাখিদের বিরক্ত করে, অভয়াশ্রম না থাকলে পাখিরা আর আসবে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর পত্রিকাটিকে জানান, ক্যাম্পাসে পাখি মারা নিষেধ।
এর আগেও এসব জলাশয়ের ওপর চাপ নিয়ে সতর্ক করা হয়েছিল। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে প্রথম আলো জানায়, সাধারণত নভেম্বরে আসা পরিযায়ী পাখি সে শীতে ক্যাম্পাসে তেমন দেখা যায়নি। পত্রিকাটির সঙ্গে কথা বলা পাখি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা এর কারণ হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভৌত অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ভবন নির্মাণ, পুকুর ভরাট, উচ্চ শব্দ আর জলাশয়ে মাছ ধরার কথা বলেন; জলাশয়গুলোর অধিকাংশই লিজ দিয়ে মাছ চাষ করা হচ্ছিল, আর তিনটি হলের পেছনের একটি পুকুর ভরাট করে নতুন হল নির্মাণ চলছিল। পত্রিকাটি জানায়, অধ্যাপক সালেহ রেজা ২০০৫ সাল থেকে পাখি নিয়ে গবেষণা করছেন। তিনি বলেন, সে বছরও পরিযায়ী পাখি এসেছে, তবে নিয়মিত নজরদারি বা সমীক্ষা না থাকায় সংখ্যা কম না বেশি তা বলা মুশকিল; তবু আগের তুলনায় পাখি কম দেখা যায়।
একই প্রতিবেদনে পাখিদের আসার কারণও ব্যাখ্যা করা হয়। প্রতিবছর সেপ্টেম্বর থেকে অক্টোবরের শেষ দিকে হিমালয়ের উত্তরে প্রচণ্ড শীত নামে। শীতের তীব্রতা সইতে না পেরে পাখিরা উষ্ণতার খোঁজে নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে পাড়ি জমায়, আর এ সময় হাজার হাজার পরিযায়ী পাখি বাংলাদেশেও আসে। রাবি ক্যাম্পাসে সাধারণত হাঁসজাতীয় পাখিই বেশি দেখা যায়, যার মধ্যে ছোট সরালির সংখ্যা সবচেয়ে বেশি; অন্যদের মধ্যে আছে ল্যাঞ্জা হাঁস, খুন্তে হাঁস, ভূতি হাঁস ও বড় সরালি।

ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে পাখি মেলা
মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশে মূলত দুটি জায়গায় নিয়মিতভাবে এ ধরনের পাখি মেলার আয়োজন হয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। তাঁর মতে, এই মেলার মূল উদ্দেশ্য শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে পাখি সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা, তাদের পাখি সম্পর্কে জানার সুযোগ করে দেওয়া এবং বৈজ্ঞানিকভাবে কীভাবে পাখি সংরক্ষণ করা হয় তা তুলে ধরা। তিনি জানান, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের উদ্যোগে এই আয়োজন প্রতিবছর নিয়মিত হয়ে আসছে।
দুটির মধ্যে জাহাঙ্গীরনগরের মেলা পুরোনো। ২০২২ সালের অক্টোবরে বাংলা ট্রিবিউন জানায়, ২০০১ সালে একটি বার্ড ক্লাবের উদ্যোগে সেখানে প্রথম পাখি মেলা হয়; প্রথম দুই বার আয়োজন করে বাংলাদেশ বার্ড ক্লাব, এরপর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগ প্রতিবছর ‘পাখ-পাখালি দেশের রত্ন, আসুন করি সবাই যত্ন’ শিরোনামে মেলাটি আয়োজন করে আসছে। মেলার আহ্বায়ক পত্রিকাটিকে জানান, সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদনের মাধ্যমে পাখি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় অবদানের জন্য ‘কনজারভেশন মিডিয়া অ্যাওয়ার্ড’, নতুন প্রজাতির পাখির ছবি তোলা ও শনাক্ত করার জন্য ‘বিগ বার্ড অ্যাওয়ার্ড’ এবং পাখি নিয়ে প্রকাশিত গবেষণার জন্য ‘সায়েন্টিফিক পাবলিকেশন অ্যাওয়ার্ড’ দেওয়া হয়।
একই প্রতিবেদনে উদ্ধৃত জাহাঙ্গীরনগরের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের তথ্যমতে, ১৯৮৬ সাল থেকে সেখানকার জলাশয়ে পরিযায়ী পাখি আসছে, আর ক্যাম্পাসে তখন পর্যন্ত দেশি-বিদেশি ২০৪ প্রজাতির পাখির দেখা মিলেছে; এর মধ্যে দেশি ১২৬টি ও বিদেশি ৭৮টি। দ্য ডেইলি স্টার বাংলা জানায়, প্রতিবছরের মতো পাখি সংরক্ষণে গণসচেতনতা বাড়াতে জাহাঙ্গীরনগরে ‘পাখি মেলা-২০২৩’ অনুষ্ঠিত হয় ২০২৩ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি।
সংখ্যায় বাংলাদেশের পাখি
বাংলাপিডিয়ার পাখি বিষয়ক ভুক্তিতে বাংলাদেশে ১৬টি বর্গ ও ৬৭টি গোত্রের ৬২৮ প্রজাতির পাখির কথা বলা হয়েছে, যার ৩৮৮টি আবাসিক এবং ২৪০টি পরিযায়ী। পরিযায়ী পাখিদের বেশির ভাগ আসে শীতে, আর বড় ঝাঁকগুলো থাকে মূলত উপকূল, মোহনা, চর, বিল, বাঁওড় ও হাওরে। ভুক্তিটি জানায়, আবাসিক প্রজাতিগুলোর মধ্যে ৪১টি দেশে বিপদাপন্ন, যার ১৯টি মহাবিপন্ন, ১৮টি বিপন্ন ও ৪টি সংকটাপন্ন; আর গোলাপিশির হাঁস, নাকতা হাঁস, দেশি ময়ূর ও বর্মি ময়ূর বাংলাদেশ থেকে কার্যত হারিয়ে গেছে।
আইইউসিএন বাংলাদেশ ২০১৫ সালে যে জাতীয় লাল তালিকা তৈরি করে, তার তৃতীয় খণ্ড শুধু পাখি নিয়ে। ২০১৬ সালের জুনে তালিকাটি নিয়ে প্রতিবেদনে ঢাকা ট্রিবিউন জানায়, সব প্রাণিগোষ্ঠী মিলিয়ে ১ হাজার ৬১৯টি প্রজাতির মূল্যায়ন করা হয়েছে এবং ৩১টি প্রজাতিকে দেশ থেকে বিলুপ্ত বলে গণ্য করা হয়েছে, যার মধ্যে ১৯টি পাখি, ১১টি স্তন্যপায়ী ও ১টি সরীসৃপ। মূল্যায়িত সব প্রজাতির ৩ শতাংশ মহাবিপন্ন, ১১ শতাংশ বিপন্ন, ৯ শতাংশ সংকটাপন্ন ও ৬ শতাংশ প্রায়-বিপদাপন্ন।
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে আইন যা বলত
মেলার দিন বাংলাদেশে বন্যপ্রাণী সুরক্ষিত ছিল বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) অধ্যাদেশ, ২০২৬-এর অধীনে, যা ২০২৬ সালের ৭ জানুয়ারি থেকে কার্যকর এবং যা বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২-এর স্থলাভিষিক্ত হয়। এর সংজ্ঞায় ‘শিকার’ বলতে কোনো বন্যপ্রাণীকে হত্যা করা, ধরা, বিষ প্রয়োগ করা, আহত বা ক্ষতিগ্রস্ত করা, বন্যপ্রাণীর কোনো অংশ নেওয়া এবং বন্য পাখির বাসা বা ডিম সংগ্রহ বা ধ্বংস করাকেও বোঝানো হয়েছে।
এর ১০ ধারা অনুযায়ী লাইসেন্স বা ক্ষেত্রমতো পজেশন সার্টিফিকেট বা পারমিট ছাড়া কেউ কোনো বন্যপ্রাণী লালন-পালন বা আবদ্ধ রাখতে পারবেন না, কিংবা বন্যপ্রাণী, ট্রফি বা অসম্পূর্ণ ট্রফি দখলে রাখা, কেনা, বেচা বা পরিবহন করতে পারবেন না। একই ধারায় সব বন্যপ্রাণী, বন্যপ্রাণীর দেহের অংশ, মাংস, ট্রফি ও অসম্পূর্ণ ট্রফিকে সরকারের সম্পত্তি হিসেবে গণ্য করা হয়েছে এবং বন্যপ্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুর আচরণকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ করা হয়েছে; নিষ্ঠুর আচরণের ব্যাখ্যায় বন্যপ্রাণীকে প্রহার, উত্ত্যক্ত করা, ভীতি প্রদর্শন ও অপ্রয়োজনে আটক রাখার কথা আছে।
৪১ ও ৪২ ধারায় আইনের তফসিল ১ ও তফসিল ২-এ উল্লিখিত বন্যপ্রাণী শিকার নিষিদ্ধ করা হয়েছে, আর ২৬ ধারার অধীন পারমিট ছাড়া এসব প্রাণীর ট্রফি, অসম্পূর্ণ ট্রফি, মাংস বা দেহের অংশ সংগ্রহ, দখলে রাখা, কেনা, বেচা বা পরিবহনও নিষিদ্ধ। ২৯ ধারা অনুযায়ী লাইসেন্স ও পজেশন সার্টিফিকেট দেন প্রধান বন্যপ্রাণী ওয়ার্ডেন বা তাঁর ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, আর এর মেয়াদ এক বছর।
ছবি: Grambangla / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, এনটিভি অনলাইন, বণিক বার্তা, প্রথম আলো, বাংলা ট্রিবিউন, দ্য ডেইলি স্টার বাংলা, ঢাকা ট্রিবিউন, বাংলাপিডিয়া, বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) অধ্যাদেশ, ২০২৬ (সরকারি পাঠ, বিডিলজ), উইকিপিডিয়া (ট্যাক্সিডার্মি ও সংশ্লিষ্ট পাখির ভুক্তি)





মন্তব্য
(০)