মাদারীপুর শহরে থাকেন ২৮ বছর বয়সী মনির হোসেন। জাগো নিউজ ২৪-এ ২০২৬ সালের ৬ এপ্রিল প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগের দুই বছরে তিনি লোকালয় থেকে ৮৬টি সাপ উদ্ধার করে মাদারীপুর বন বিভাগের পরামর্শে অবমুক্ত করেছেন এবং মানুষের পিটুনিতে আহত পাঁচটি সাপের চিকিৎসা দিয়েছেন। প্রতিবেদনের সময় দুটি আহত দাঁড়াশ সাপ তাঁর তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাধীন ছিল।
প্রশিক্ষণ নিয়ে বন বিভাগের সঙ্গে কাজ
মনির হোসেনের বাড়ি কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার যাদুরচর ইউনিয়নের ধনারচর পূর্বপাড়ায়। পড়াশোনার জন্য ২০১৭ সাল থেকে তিনি মাদারীপুরে আছেন; মাদারীপুর সরকারি কলেজ থেকে স্নাতক (সম্মান) এবং পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর শেষ করেছেন। শহরের ২ নম্বর শকুনি এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি প্রথমে পঞ্চগড়ে এবং পরে বরিশাল বন বিভাগ থেকে সাপ বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ নেন। ‘ওয়াইল্ড লাইফ অ্যান্ড স্নেক রেসকিউ টিম ইন বাংলাদেশ’ নামের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের মাধ্যমেও প্রশিক্ষণ নিয়ে তিনি সংগঠনটির সদস্য হিসেবে কাজ শুরু করেন। সাপ দেখার খবরে ফোন পেলে তিনি সেখানে যান, সাপটি উদ্ধার করে বন বিভাগের পরামর্শ অনুযায়ী অবমুক্ত করেন।
মাদারীপুর বন বিভাগের বন কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর আলম জাগো নিউজকে বলেন, কেউ বন বিভাগে ফোন করে সাপের খবর দিলে তাঁরা মনির হোসেনকে ডাকেন, তিনি গিয়ে সাপ উদ্ধার করেন এবং পরে তা সঠিক জায়গায় অবমুক্ত করা হয়। আহত সাপের ওষুধের ব্যবস্থা করে বন বিভাগ। তিনি বলেন, ‘মনির এই ব্যাপারে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। তাই তিনি দক্ষতার সঙ্গে কাজগুলো করে থাকেন।’

১২ জেলা থেকে ৮৬টি সাপ
দুই বছরে মাদারীপুর, শরীয়তপুর, চাঁদপুর, গোপালগঞ্জ, খুলনা, ফরিদপুর, মুন্সিগঞ্জ, বাগেরহাট, পিরোজপুর, বরিশাল, পটুয়াখালী ও কুড়িগ্রাম থেকে উদ্ধার করা সাপের মধ্যে ছিল খৈয়া গোখরা, বেত আঁচড়া, দাঁড়াশ ও কালনাগিনী। খৈয়া গোখরা বা স্পেক্টাকল্ড কোবরা (Naja naja) উপমহাদেশের অন্যতম বিষধর সাপ; কালনাগিনী লাফিয়ে অনেক দূর পর্যন্ত ভেসে (গ্লাইড করে) যেতে পারে।
একবার তিনি খবর পান, কুড়িগ্রামের রৌমারীতে এক সাপুড়ের কাছে একটি অজগর অসুস্থ অবস্থায় আছে; চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করে সেটিকেও অবমুক্ত করেন। প্রতিবেদনের আগের এক সপ্তাহে তিনি মাদারীপুর সদরের পাঁচখোলা ইউনিয়নের জাজিরা এলাকা থেকে একটি বড় দাঁড়াশ, শকুনি লেকের দক্ষিণ পাড় থেকে আরেকটি দাঁড়াশ এবং শরীয়তপুরের জাজিরা থেকে একটি কালনাগিনী উদ্ধার করেন। কালনাগিনীটি অবমুক্ত করা হয়। স্থানীয়দের পিটুনিতে জখম দাঁড়াশ দুটিকে আলাদা দুটি প্লাস্টিকের বাক্সে রেখে তিনি ক্ষত পরিষ্কার করে নিয়মিত মলম দিচ্ছিলেন। সুস্থ হলে বন বিভাগের পরামর্শে লোকালয়হীন জায়গায় সেগুলো ছাড়ার কথা ছিল।

দাঁড়াশ বিষহীন, তবু মারা পড়ে ভয়ে
বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, দাঁড়াশ (Ptyas mucosa) বাংলাদেশের একটি সাধারণ বিষহীন সাপ। একে প্রায়ই গোখরা ভেবে মেরে ফেলা হয়, যদিও এর মাথা গোখরার চেয়ে অনেক সরু এবং এর ফণা নেই। এটি সাধারণত দুই মিটারের কম লম্বা হয় এবং খাবার হিসেবে ইঁদুর, ব্যাঙ ও কুনোব্যাঙ পছন্দ করে।
মনির হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, বাংলাদেশের বেশির ভাগ সাপের বিষ নেই, অথচ সাপকে ঘিরে নানা কুসংস্কার আছে। তাঁর হিসাবে, একটি দাঁড়াশ সাপ বছরে কৃষকের এক লাখ টাকার ফসল ইঁদুরের হাত থেকে রক্ষা করে। তিনি বলেন, ‘সবাই জানুক ও বুঝুক সাপ মারলে নয়, বরং সাপ বাঁচালেই প্রকৃতির উপকার হয়।’ শকুনি এলাকার বাসিন্দা তাহমিনা বেগম জানান, দাঁড়াশকে ব্যথা দিলে সাত সমুদ্র পার হয়ে এসেও কামড় দেবে, এমন কথা তাঁরা দাদা-দাদির কাছে শুনে এসেছেন।

বিষধর সাপের কামড় কতটা বিপজ্জনক
সব সাপ বিষহীন নয়, আর বিষধর সাপের কামড় প্রাণঘাতী হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ২০২৩ সালের ১২ সেপ্টেম্বরের তথ্যপত্র অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতিবছর আনুমানিক ৫৪ লাখ মানুষকে সাপে কামড়ায় এবং ৮১ হাজার ৪১০ থেকে ১ লাখ ৩৭ হাজার ৮৮০ জন মারা যান; কৃষিশ্রমিক ও শিশুরাই বেশি আক্রান্ত হন। সংস্থাটি বলছে, মানসম্পন্ন অ্যান্টিভেনমই বেশির ভাগ বিষক্রিয়া ঠেকানোর সবচেয়ে কার্যকর চিকিৎসা, এবং নিরাপদ ও কার্যকর অ্যান্টিভেনম সহজলভ্য করা গেলে বেশির ভাগ মৃত্যু পুরোপুরি এড়ানো যায়।
২০১০ সালে পিএলওএস নেগলেক্টেড ট্রপিক্যাল ডিজিজেস সাময়িকীতে প্রকাশিত গ্রামীণ বাংলাদেশের এক জরিপভিত্তিক গবেষণায় বছরে প্রায় ৫ লাখ ৮৯ হাজার ৯১৯ জনকে সাপে কাটা এবং প্রায় ৬ হাজার ৪১ জনের মৃত্যুর হিসাব দেওয়া হয়। সেখানে দেখা যায়, ৮৬ শতাংশ ক্ষেত্রে আক্রান্তরা প্রথমে সাপুড়ে বা ওঝার কাছে গেছেন, তাৎক্ষণিক চিকিৎসাসেবা নিয়েছেন মাত্র ৩ শতাংশ।
ছবি: Thomas Brown / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 2.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বাংলাপিডিয়া, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), পিএলওএস নেগলেক্টেড ট্রপিক্যাল ডিজিজেস, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)