সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ১৬ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা২৬°পরিষ্কার আকাশআর্দ্রতা ৭৪%বাতাস ৩ কিমি/ঘ

লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে দখল, গাছ চুরি ও পর্যটকের চাপ নিয়ে উদ্বেগ

জাগো নিউজের ২০২৬ সালের ৮ এপ্রিলের প্রতিবেদনে বলা হয়, ঘোষণার ৩০ বছর পরও মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের সীমানা মাঠে নির্ধারিত হয়নি, আর চুরি, দখল, যানবাহন ও পর্যটকের ভিড়ে বন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বন কর্মকর্তারা বলেন, সীমানার জন্য সেটেলমেন্ট অফিসে চিঠি দেওয়া হয়েছে এবং পর্যটক ও চালকেরা নিয়ম মানেন না।

লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে দখল, গাছ চুরি ও পর্যটকের চাপ নিয়ে উদ্বেগ
পরিবেশ

মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সবচেয়ে পরিচিত বনগুলোর একটি। জাতীয় উদ্যান ঘোষণার ৩০ বছর পর এই বন গাছ, জমি ও বন্যপ্রাণী হারাচ্ছে বলে ২০২৬ সালের ৮ এপ্রিল এক প্রতিবেদনে জানায় জাগো নিউজ। পত্রিকাটির মৌলভীবাজার জেলা প্রতিনিধি মাহিদুল ইসলামের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ১ হাজার ২৫০ হেক্টরের উদ্যানটির সীমানা মাঠে কখনো নির্ধারণ করা হয়নি, মূল্যবান গাছ, বাঁশ ও বেত চুরি নিত্য ঘটনা হয়ে উঠেছে, বনের অনেক জমি দখল হয়ে গেছে, আর বনের ভেতর দিয়ে যাওয়া সড়ক ও রেলপথে চলাচলকারী যানবাহনে প্রাণী মারা যাচ্ছে। প্রতিবেদনে উদ্ধৃত স্থানীয় বাসিন্দা, একজন পর্যটক ও একজন পরিবেশকর্মীর মতে, বন বিভাগ বনটি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি; অন্যদিকে বন বিভাগের বন্যপ্রাণী কর্মকর্তারা বলেন, সীমানার বিষয়ে তাঁরা সেটেলমেন্ট অফিসে চিঠি দিয়েছেন এবং পর্যটক ও চালকেরা নিয়ম মানেন না।

প্রতিবেদনে যা উঠে আসে


লাউয়াছড়াকে জাতীয় উদ্যান ঘোষণা করা হয় ১৯৯৬ সালে। প্রতিবেদনে বলা হয়, বনটি স্বকীয়তা হারাচ্ছে: আগের চেয়ে বনের ঘনত্ব কমেছে, প্রাণীর সংখ্যা কমে এসেছে, দেখা দিয়েছে খাদ্য ও পানির সংকট। প্রতিবেদনের ভাষায়, বনের সীমানা কতটুকু, তা বন বিভাগের জানা নেই, আর বনের ভেতর দিয়ে যাওয়া সড়ক ও রেলপথের ওপরও তাদের নিয়ন্ত্রণ নেই।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঘোষণার পর ৩০ বছরেও সীমানা নির্ধারণ করা যায়নি, যদিও জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসের মাধ্যমে সীমানা নির্ধারণের উদ্যোগ বন বিভাগ কয়েকবার নিয়েছে। বনের পাশে যাঁদের জমি আছে, তাঁদের অনেকে বনের জমি দখল করে রেখেছেন, কেউ কেউ সেখানে বাগান গড়েছেন, আবার অনেকে নিজের ব্যক্তিমালিকানাধীন জমির সঙ্গে বনের জায়গাও দখল করেছেন। বন বিভাগ মাঝেমধ্যে এসব জমি উদ্ধারে অভিযান চালালেও সীমানার চিহ্ন না থাকায় উদ্ধারকাজ বাধাগ্রস্ত হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বনের চারপাশ খোলা এবং ভেতর দিয়ে সড়ক থাকায় গাছ, বাঁশ, বেতসহ মূল্যবান জিনিস সহজেই চুরি হয়ে যাচ্ছে; গত দুই দশকে চুরি আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে, এতে বনের ঘনত্ব ও প্রাণীদের আবাসস্থল নষ্ট হচ্ছে। বনের ভেতরের সড়ক ও রেলপথে সর্বোচ্চ গতিসীমা ঘণ্টায় ২০ কিলোমিটার নির্ধারণ করা থাকলেও বাস্তবে তার প্রয়োগ নেই। দিনরাত ২৪ ঘণ্টা গাড়ি ও ট্রেন চলাচল করায় প্রাণীরা প্রায়ই চাকায় পিষ্ট হয়ে মারা যাচ্ছে, আর বিদ্যুৎ লাইনে স্পৃষ্ট হয়েও মারা যাচ্ছে অনেক প্রাণী।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুষ্ক মৌসুমে বনের ছড়াগুলো শুকিয়ে যায়, ফলে খাবারের পাশাপাশি পানির সংকটেও পড়ে প্রাণীরা। তখন খাবারের খোঁজে অনেক প্রাণী লোকালয়ে চলে আসে, আর কোনো কোনোটি মানুষের আঘাতে মারা পড়ে। পর্যটক ও সংশ্লিষ্টরা পত্রিকাটিকে জানান, একসময় এই বন ছিল বিপন্ন উল্লুকের সবচেয়ে বড় আশ্রয়স্থল, বনে ঢুকলেই সহজে এর দেখা মিলত; কিন্তু এখন সাধারণত দেখা মেলে বানর, অজগর আর বন্যশূকরের।

চট্টগ্রাম থেকে ঘুরতে আসা পর্যটক শাহান আলী জাগো নিউজকে বলেন, 'আমরা কয়েকজন বন্ধু লাউয়াছড়া বনে ঘুরতে এসেছিলাম। তবে বনের অবস্থা খুবই ভয়াবহ। বানর ছাড়া আর কোনো প্রাণী দেখা যায় না। পর্যটকরা যত্রতত্র ময়লা ফেলে রাখছেন। বনকে নিয়মতন্ত্র করতে হলে বন বিভাগকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।' স্থানীয় বাসিন্দা আবিদ হাসান ও মুসা আহমেদ বলেন, 'সময় যত যাচ্ছে বনের অবস্থা তত করুণ হচ্ছে। বনের ভেতর রেললাইন ও সড়কপথে প্রতিনিয়ত প্রাণীরা মারা যাচ্ছে। বন থেকে নিয়মিত গাছ-বাঁশ উজাড় হচ্ছে। বনের সেই আগের পরিবেশ আর নেই।'

প্রতিবেদনে বলা হয়, গত কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন ছুটিতে, বিশেষ করে ঈদের সময় অতিরিক্ত পর্যটক আসছেন। কিছু পর্যটক টিকিট কেটে ঢুকলেও প্রতিবেদন অনুযায়ী বেশির ভাগই ঢোকেন বিনা টিকিটে, কারণ বনের চারপাশ খোলা। অনেকে বন বিভাগের নির্দেশনা না মেনে যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলেন, বনের ভেতর হইচই করেন, এতে প্রাণীদের স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হয়।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) কার্য পরিষদের সদস্য আ স ম সালেহ সোহেল জাগো নিউজকে বলেন, 'দ্রুততম সময়ে লাউয়াছড়া বনের প্রাকৃতিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা উচিত। বনের দখলকৃত জায়গা উদ্ধার করে বনের সীমানা চিহ্ন দেওয়া খুবই প্রয়োজন। প্রাণীদের প্রয়োজনে যা যা করণীয় তাই করতে হবে। তবে বনের প্রাণীদের কষ্ট দিয়ে কোনো কিছু করা যাবে না।' তিনি আরও বলেন, বন থেকে গাছ ও বাঁশ উজাড় হচ্ছে, বনের ঘনত্ব কমে এসেছে, এগুলো রক্ষা করা বন বিভাগের দায়িত্ব; বছরে ছয় মাস বনে পর্যটক প্রবেশ বন্ধ রাখতে হবে।

কর্মকর্তারা যা বলেন


বন বিভাগের বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ পত্রিকাটিকে জানায়, বনে খাবারের সংকট নেই; পাকা ধানের মৌসুমে শূকরের দল মাঝেমধ্যে ধানখেতে চলে যায়। বিভাগটি জানায়, সীমানা নির্ধারণের জন্য সিলেট জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসে চিঠি পাঠানো হয়েছে, আর সড়ক ও রেলপথে গাড়ি ও ট্রেনের সর্বোচ্চ গতিসীমা ২০ কিলোমিটার নির্ধারণ করা হয়েছে, কিন্তু কেউই এ নিয়ম মানতে চান না। পর্যটকদের জন্য বেশ কিছু নির্দেশনা বোর্ড লাগানো আছে; বেশির ভাগ পর্যটক তা পড়লেও মেনে চলেন না।

বিভাগটির রেঞ্জ কর্মকর্তা মোহাম্মদ কাজী নাজমুল হক জানান, প্রাণীদের সুরক্ষায় যা যা প্রয়োজন, তা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, 'বনে অতিরিক্ত মানুষ প্রবেশ করছে যা নিয়ন্ত্রণ করা খুবই কঠিন। বনের ভেতর দিয়ে চলা সড়ক ও রেলপথ নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য কয়েকবার বন বিভাগ থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে কেউ তা মেনে চলেন না।'

বিভাগটির সিলেট বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. আবুল কালাম বলেন, 'জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে সড়কপথে গাড়ির সংখ্যা বেড়েছে। পর্যটকের সংখ্যাও বেড়েছে, যা নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না।' তিনি জানান, সীমানা নির্ধারণে জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসে চিঠি পাঠানো হয়েছে; বনের ভেতরে পর্যটক নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না, তাঁরা যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলে পরিবেশ নষ্ট করছেন। খাদ্যসংকটের কথা নাকচ করে তিনি বলেন, প্রাণীরা সাধারণত লতাপাতা খেয়ে বেঁচে থাকে।

তবে সিলেট জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসের ভারপ্রাপ্ত চার্জ অফিসার সোনিয়া সুলতানা জানান, বন জরিপের বিষয়ে তিনি কোনো চিঠি পাননি। তিনি বলেন, 'লাউয়াছড়া বনের জরিপ নিয়ে বন বিভাগের পক্ষ থেকে আমি কোনো চিঠি পাইনি। চিঠি এলে অফিসে গিয়ে খোঁজ নিয়ে দেখতে হবে। আমাদের কাছে আবেদন করলে বন জরিপের উদ্যোগ নেওয়া হবে।'

রোপিত বন থেকে ১৯৯৬ সালের জাতীয় উদ্যান


লাউয়াছড়া পশ্চিম ভানুগাছ সংরক্ষিত বনের অংশ। পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের ইউএসএআইডি-সহায়তাপুষ্ট বন সহ-ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের জন্য নেচার কনজারভেশন ম্যানেজমেন্ট (নাকম) ২০০৩ সালের নভেম্বরে যে মাধ্যমিক তথ্য প্রতিবেদন তৈরি করে, তাতে বলা হয়েছে, ১৯৭৩ সালের বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ) আদেশ, যা ১৯৭৪ সালের একটি আইনে সংশোধিত হয়, তার অধীনে ১৯৯৬ সালের ৭ জুলাই তারিখের গেজেট প্রজ্ঞাপনে উদ্যানটি গঠিত হয়। প্রজ্ঞাপিত আয়তন ১ হাজার ২৫০ হেক্টর, যা সংরক্ষিত বনের ৩ ও ৪ নম্বর ব্লক নিয়ে গঠিত; ব্লক দুটি স্থাপিত হয় ১৯২১ ও ১৯২৭ সালে। সংরক্ষিত বনের আরও ২৮১ হেক্টর উদ্যানে যুক্ত করার প্রস্তাবও ছিল। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ওই আইনে উদ্যানে বন্যপ্রাণী শিকার, হত্যা, ধরা বা বিরক্ত করা, গাছ কাটা এবং চাষাবাদ বা খনিজ আহরণের জন্য জমি পরিষ্কার করা নিষিদ্ধ ছিল।

বাংলাপিডিয়ার কমলগঞ্জ উপজেলা ভুক্তি অনুযায়ী, উপজেলাটির আয়তন ৪৮৫.২৬ বর্গকিলোমিটার, এর দক্ষিণে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য এবং পূর্বে আসাম রাজ্য। উপজেলার দর্শনীয় স্থানের তালিকায় লাউয়াছড়ার কথা একই তথ্যসহ এসেছে: ১ হাজার ২৫০ হেক্টর এলাকা নিয়ে গঠিত উদ্যানটিকে ১৯৯৬ সালে জাতীয় উদ্যান ঘোষণা করা হয়। ইউএসএআইডির নিসর্গ সাপোর্ট প্রজেক্টের জন্য ইন্টারন্যাশনাল রিসোর্সেস গ্রুপ ২০০৬ সালের অক্টোবরে যে ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা তৈরি করে, তাতে বলা হয়েছে, উদ্যানের ভেতর দিয়ে একটি পাকা সড়ক ও একটি রেলপথ শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জকে যুক্ত করেছে; শ্রীমঙ্গল উদ্যানের দক্ষিণ-পশ্চিম সীমানা থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার পশ্চিমে, কমলগঞ্জ পূর্ব সীমানা থেকে প্রায় ২ কিলোমিটার পূর্বে।

বনটি মূলত মানুষের হাতে গড়া। ২০০৩ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই সংরক্ষিত বনে বনায়ন শুরু হয় ১৯২৩ সালেই এবং চলে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত। প্রথমে লাগানো হয় সেগুন, মেহগনি, গামারি, চাঁপা ও আগরের মতো দীর্ঘমেয়াদি গাছ এবং চাপালিশ, চিকরাশি ও গর্জনের মতো দেশি প্রজাতি; পরে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে লাগানো হয় আকাশমণি, ম্যাঞ্জিয়াম ও ইউক্যালিপটাসের মতো দ্রুতবর্ধনশীল বিদেশি গাছ। মূল মিশ্র ক্রান্তীয় চিরসবুজ বনের প্রায় পুরোটাই কেটে ফেলা বা বদলে ফেলা হয়েছিল। বিশের দশকের পুরোনো বাগানগুলো পরে বহুস্তরের আধা-চিরসবুজ বনে পরিণত হয়েছে, যেখানে উঁচু পত্রঝরা গাছের নিচে চিরসবুজ গাছের স্তর। সমৃদ্ধ প্রাকৃতিক বনের সামান্য অংশই টিকে আছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) ৮.৬ হেক্টরের একটি গবেষণা প্লট, যেখানে কখনো গাছ কাটা হয়নি।

বনের ভেতরে ও আশপাশে মানুষের বসবাস দীর্ঘদিনের। ২০০৩ সালের প্রতিবেদনে উদ্যানের ভেতরে খাসিয়া জনগোষ্ঠীর দুটি গ্রামের কথা আছে: আনুমানিক ১৯৫০ সালে গড়ে ওঠা মাগুরছড়া পুঞ্জি এবং চল্লিশের দশকের লাউয়াছড়া পুঞ্জি। বনায়ন ও টহলের কাজে সহায়তার বিনিময়ে বন বিভাগের বরাদ্দ দেওয়া বনভূমিতে তাঁরা পান চাষ করেন। দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে আছে ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর গ্রাম ডলুবাড়ি, আর উত্তর-পূর্ব দিকের কয়েকটি গ্রামে বসতি গড়েছেন অভিবাসীরা। ২০০৬ সালের পরিকল্পনায় উদ্যানের প্রভাব এলাকার মধ্যে ১৮টি গ্রাম ও ৬টি চা-বাগান গণনা করা হয়।

লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে বাঁশঝাড়, ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি। ছবি: Kritzolina / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে বাঁশঝাড়, ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি। ছবি: Kritzolina / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

কাগজে আঁকা সীমানা


২০২৬ সালের এপ্রিলের প্রতিবেদনে যে অনির্ধারিত সীমানার কথা বলা হয়েছে, তা দুই দশক ধরে সরকারি পরিকল্পনায় লিপিবদ্ধ। ২০০৩ সালের নাকম প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৯৬ সালের গেজেট প্রজ্ঞাপনে সীমানার বিস্তারিত বিবরণ আছে: সংরক্ষিত বনের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে শ্রীমঙ্গল-ভানুগাছ সড়কের ১১ কিলোমিটার চিহ্নের পাশে বন বিভাগের একটি খুঁটি থেকে শুরু হয়ে নম্বরযুক্ত কয়েকটি জরিপ স্টেশন ঘুরে সীমানারেখা আবার সেই খুঁটিতে ফিরে এসেছে।

২০০৩ সালের প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে, উদ্যান ঘোষণার সময় ১৯৯৬ সালে যে ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা তৈরি হয়, তার মূল উপাদানের মধ্যেই ছিল 'সীমানা নির্ধারণ, চিহ্নিতকরণ ও বিধিবিধান'। দশ বছর পর ২০০৬ সালের অক্টোবরের ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনায় বলা হয়, মাঠে সীমানা বাস্তবে চিহ্নিত করার কোনো উদ্যোগ তখন পর্যন্ত নেওয়া হয়নি; প্রবল চাপ ও ব্যাপক দখলের কারণে বন খণ্ডিত হয়ে পড়েছে, বন্যপ্রাণীর চলাচলের করিডর ও প্রজননের জায়গা সীমিত হয়ে গেছে।

২০০৬ সালের পরিকল্পনায় এটাও দেখা যায় যে উদ্যানের নিজস্ব মানচিত্রগুলোর মধ্যে মিল নেই। প্রজ্ঞাপিত আয়তন ১ হাজার ২৫০ হেক্টর হলেও বন বিভাগের জিআইএস তথ্যভান্ডার থেকে হিসাব করা আয়তন ১ হাজার ২২১.২ হেক্টর। কারণ, প্রচলিত ট্রাভার্স পদ্ধতিতে আকাশচিত্রের সঙ্গে মিলিয়ে না দেখেই সীমানা আঁকা হয়েছিল, আর ছড়া, সড়ক বা শৈলশিরার মতো স্থায়ী প্রাকৃতিক চিহ্ন ধরে সীমানা টানা হয়নি। পরিকল্পনায় ডিফারেনশিয়াল জিপিএস দিয়ে জরিপ, গুরুত্বপূর্ণ ও বাঁকের স্থানে কংক্রিটের খুঁটি, সড়ক ও রেলপথ যেখানে উদ্যানের সীমানা পার হয়েছে সেখানে সাইনবোর্ড এবং পরিকল্পনার প্রথম বছরেই পুরো সীমানা জরিপ ও চিহ্নিত করার সুপারিশ করা হয়।

২০০৩ সালের প্রতিবেদনে দখলের তথ্যও আছে। বন গ্রামবাসীদের প্রতি পরিবারকে পান চাষের জন্য ১.২ হেক্টর জমি বরাদ্দ দেওয়া হলেও তাঁরা ব্যবহার করছিলেন তার চেয়ে অনেক বেশি; বাইরের গ্রামবাসীরা উদ্যানের প্রায় ১০ হেক্টর জমিকে কৃষিজমিতে পরিণত করেছিলেন; আর উদ্যানের বাইরের প্রায় ৫৫৬ একর বনভূমি পাশের তিনটি গ্রামের লোকজন দখল করেছেন বলে জানা গিয়েছিল।

প্রতিবেদন প্রকাশের কয়েক মাস আগে বিষয়টি আবার সরকারের আলোচনায় আসে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শুরুতে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ নতুন বন্যপ্রাণী অধ্যাদেশ অনুমোদন করলে পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান প্রথম আলোকে বলেন, বন অধিদপ্তর বনের সীমানা চিহ্নিতকরণের কাজ করবে, যাতে বনভূমি নতুন করে বেদখল না হয়।

একটি সড়ক, একটি রেলপথ ও বিদ্যুৎ লাইন


যাতায়াতপথগুলো কেন উদ্যানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, ২০০৬ সালের পরিকল্পনায় তার ব্যাখ্যা আছে: যানবাহনের শব্দ বন্যপ্রাণীকে বিরক্ত করে, পরিষ্কার করা পথের ফালি প্রাণীদের চলাচলে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, অবৈধ গাছ কাটার লোকদের সহজে ঢোকার সুযোগ দেয়, আর মহাসড়ক দর্শনার্থীদের সরাসরি উদ্যানের ভেতরে নিয়ে আসে। সড়কের প্রায় সমান্তরালে চলে গেছে একটি বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন। ২০০৩ সালের প্রতিবেদনে, ২০০০ সালের কাছাকাছি সময়ের তথ্য অনুযায়ী, সড়কে ঘণ্টায় গড়ে প্রায় ২৫টি যানবাহন এবং ঢাকা-সিলেট রেলপথে দিনে ২৪ বার ট্রেন চলাচলের হিসাব দেওয়া হয়।

এসব পথে প্রাণীর মৃত্যুর খবর ২০২৬ সালের অনেক আগে থেকেই আসছে। ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বরে প্রথম আলো জানায়, বন বিভাগ এবং ওরিয়ন সোসাইটি ও কারিনাম বাংলাদেশ নামের দুটি সংগঠনের সহায়তায় ২০১১ সালের মে মাস থেকে উদ্যানে কাজ করা বাংলাদেশ অজগর গবেষণা প্রকল্পের গবেষকেরা দুই বছরে উদ্যান এলাকায় প্রায় এক হাজার মৃত সাপ পেয়েছেন, বৈশাখ থেকে কার্তিক মাসের মধ্যে, যখন সাপের চলাফেরা বেশি থাকে। শ্রীমঙ্গল-ভানুগাছ সড়কে গাড়িচাপায়, ঢাকা-সিলেট রেললাইনে ট্রেনে কাটা পড়ে এবং আশপাশের চা-বাগান ও গ্রামে মানুষের হাতে সাপগুলো মারা পড়ে। প্রকল্পটি উদ্যানে অজগর ও কিং কোবরাসহ ৩৯ প্রজাতির সাপের সন্ধান পায়।

এপ্রিলের প্রতিবেদনে যে গতিসীমার কথা এসেছে, সেটিও আগে থেকে ছিল। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক জামিল মোহাম্মদ খান প্রথম আলোকে বলেন, বনের ভেতর দিয়ে যাওয়া সড়কে যানবাহনের ২০ কিলোমিটার গতি নির্ধারণ করা আছে, কিন্তু কেউ তা মানতে চায় না; পর্যটকদের গাড়ি পার্কিংয়েরও কোনো জায়গা নেই।

লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের ভেতর দিয়ে যাওয়া রেলপথ, ২০১৪ সালের নভেম্বর। ছবি: Shafquat Ameen / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের ভেতর দিয়ে যাওয়া রেলপথ, ২০১৪ সালের নভেম্বর। ছবি: Shafquat Ameen / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

কাঠ, জ্বালানি আর ১৯৯৭ সালের গ্যাসকূপ বিস্ফোরণ


লাউয়াছড়া থেকে কাঠ সরিয়ে নেওয়ার সমস্যা পুরোনো। ২০০৩ সালের নাকম প্রতিবেদনে বলা হয়, জীবিকার প্রয়োজনে ও ছোট পরিসরে কাঠ সংগ্রহকারীরা দীর্ঘদিন ধরে উদ্যানটি ব্যাপকভাবে ব্যবহার করে আসছেন। স্থানীয় বনকর্মীদের তখনকার হিসাবে শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জের দিক থেকে প্রতিদিন ১০০ থেকে ১৪০ জন জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ করতে বনে ঢুকতেন। এক জরিপে দেখা যায়, হাটবারের বাইরের দিনে গড়ে ২৩৩ জন এবং হাটবারে ৩৩৭ জন রেললাইন ধরে জ্বালানি কাঠ বয়ে নিচ্ছিলেন, যাতে দিনে আনুমানিক যথাক্রমে ৫.১৩ ও ৭.৪২ টন কাঠ বন থেকে যাচ্ছিল।

একই প্রতিবেদনে বলা হয়, সুনির্দিষ্ট তথ্য না থাকলেও উদ্যানের ভেতরে অবৈধভাবে গাছ কাটার জোরালো প্রমাণ আছে; রাতে বড়, প্রায়ই সশস্ত্র দল এ কাজ করে, আর কাটা গাছের বেশির ভাগই সেগুন ও চাপালিশ। প্রতিবেদনে সমস্যাটির পেছনে অপর্যাপ্ত জনবল, টহলের দুর্বল সরঞ্জাম ও ব্যবস্থাপনা এবং কর্মীদের মনোবলের ঘাটতির কথা বলা হয়। অন্যান্য হুমকির মধ্যে মশার কয়েল কারখানার জন্য গাছের বাকল তোলা, গবাদিপশু চরানো, ঝোপঝাড় পরিষ্কার করে পান চাষ, শিকার এবং অপরিকল্পিত পর্যটনের কথা আছে; আর বনায়নের ইতিহাসকেই লাউয়াছড়ার 'প্রধান ট্র্যাজেডি' বলা হয়েছে, কারণ গাছ সাফ করে কাটা এবং বিদেশি গাছের একক বাগান বনের গঠন বদলে দিয়েছে।

বনটি এখনো বহন করছে ১৯৯৭ সালের জুনে মাগুরছড়া গ্যাসক্ষেত্রে বিস্ফোরণের চিহ্ন। বনের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে প্রায় ১০ হেক্টর জায়গা পরিষ্কার করে গ্যাসক্ষেত্রটি স্থাপন করা হয়েছিল। ২০০৩ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিস্ফোরণে প্রায় ২০০ মিটারের একটি গর্ত তৈরি হয়, প্রায় ৭৫ মিটার উঁচু আগুনের শিখা প্রায় ১৫ দিন ধরে জ্বলে, উত্তর দিকের প্রায় ৫ হেক্টর বন পুরোপুরি পুড়ে যায় এবং একটি বনগ্রাম সরিয়ে নিতে হয়। বানরজাতীয় প্রাণীরা তখন বনের নিরাপদ অংশে সরে যায়।

উল্লুক ও অন্যান্য প্রাইমেট


পর্যটকেরা যে উল্লুকের কথা বলেছেন, সেটি পশ্চিমা উল্লুক (Hoolock hoolock)। ২০০৩ সালের প্রতিবেদনে সংক্ষেপে তুলে ধরা ১৯৯০-৯১ সালের এক গবেষণায় দেখা যায়, এই সংরক্ষিত বনে উল্লুক দুই থেকে পাঁচ সদস্যের দলে থাকে, ৩০ থেকে ৩৫ হেক্টরের বিচরণ এলাকা আগলে রাখে, প্রধানত ফল ও ডুমুর খায় এবং দিনের প্রায় ৩৯ শতাংশ সময় খাবার খেয়ে কাটায়।

২০০৬ সালে অক্সফোর্ড ব্রুকস বিশ্ববিদ্যালয়ের পেত্রা ওস্টারবার্গের করা এক শুমারিতে, যা ২০০৭ সালে গিবন জার্নালে প্রকাশিত হয়, লাউয়াছড়া ও পাশের পশ্চিম ভানুগাছ বনে ১৭টি দলে ৬২টি উল্লুক পাওয়া যায়; এর একটি দল গ্রাম ও ধানখেতে ঘেরা ছোট একটি বনখণ্ডে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় ছিল। গবেষণাপত্রে বলা হয়, বাংলাদেশে তখন আনুমানিক ২০০ থেকে ৩০০টি পশ্চিমা উল্লুক ২২টি ছোট ও বিচ্ছিন্ন জনগোষ্ঠীতে ছড়িয়ে ছিল, প্রজাতিটি আইইউসিএন/এসএসসি প্রাইমেট স্পেশালিস্ট গ্রুপের ২০০৬-২০০৮ সালের বিশ্বের সবচেয়ে বিপন্ন ২৫টি প্রাইমেটের তালিকায় যুক্ত হয়েছিল, আর দেশে যে একমাত্র উল্লুক জনগোষ্ঠী আগামী শতাব্দী পর্যন্ত টিকে থাকার সম্ভাবনা রাখে, সেটি সম্ভবত লাউয়াছড়ার।

২০২৫ সালের মে মাসে প্রথম আলো জানায়, আইইউসিএন এসএসসি প্রাইমেট স্পেশালিস্ট গ্রুপ, রি-ওয়াইল্ড ও ইন্টারন্যাশনাল প্রাইমেটোলজিক্যাল সোসাইটির প্রকাশিত বিশ্বের সবচেয়ে বিপন্ন প্রাইমেটের প্রতিবেদন 'প্রাইমেটস ইন পেরিল'-এর ২০২৩-২০২৫ সংস্করণে পশ্চিমা উল্লুক ও চশমাপরা হনুমান অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। পত্রিকাটি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের হাবিবুন নাহারের নেতৃত্বে ২০২০ সালের এক গবেষণার কথা উল্লেখ করে, যাতে দেখা যায়, দেশে উল্লুকের সংখ্যা ১৯৮০ সালের ৩ হাজার থেকে কমে ৪৬৮টিতে দাঁড়িয়েছে, তাদের বসবাস উপযোগী জায়গা মাত্র ২৯৪ বর্গকিলোমিটার, আর একসময় যে ২২টি বনে উল্লুক পাওয়া যেত, তার ১০টি থেকে প্রাণীটি হারিয়ে গেছে। পত্রিকাটি আরও জানায়, জার্মান প্রাইমেট সেন্টারের ২০২৫ সালের এক গবেষণায় লাউয়াছড়াসহ সিলেট অঞ্চলের বনগুলোতে মাত্র ৪৮৪টি চশমাপরা হনুমান পাওয়া গেছে।

প্রধান বন সংরক্ষক মো. আমীর হোসাইন চৌধুরী তখন পত্রিকাটিকে বলেন, উল্লুক সংরক্ষণে একটি কর্মপরিকল্পনা খসড়া পর্যায়ে আছে, দুই প্রজাতির জন্যই সবচেয়ে বড় হুমকি আবাসস্থল ধ্বংস হয়ে যাওয়া, আর লাউয়াছড়া বনে রশি দিয়ে বানানো পথ করে দেওয়া হয়েছে, যাতে প্রাণীগুলো বনের এক অংশ থেকে অন্য অংশে যেতে পারে।

উদ্যানের প্রজাতির হিসাব নিয়েও সতর্ক থাকা দরকার। এপ্রিলের প্রতিবেদনে উদ্ধৃত ৪৬০ প্রজাতির হিসাব (১৬৭ প্রজাতির উদ্ভিদ, ৪ প্রজাতির উভচর, ৬ প্রজাতির সরীসৃপ, ২৪৬ প্রজাতির পাখি ও ২০ প্রজাতির স্তন্যপায়ী) ২০০৩ সালের নাকম প্রতিবেদনে সংকলিত তালিকার সঙ্গে মেলে; ওই তালিকায় ১৭ প্রজাতির ফড়িংও ছিল, আর প্রতিবেদনটি নিজেই সতর্ক করেছিল যে তালিকাগুলো অসম্পূর্ণ, অপর্যাপ্ত এবং সে কারণে বিভ্রান্তিকর। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে উদ্ধৃত বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, উদ্যানে সরীসৃপ আছে ৫৯ প্রজাতির (৩৯ প্রজাতির সাপ, ১৮ প্রজাতির লিজার্ড ও ২ প্রজাতির কচ্ছপ) এবং উভচর ২২ প্রজাতির।

লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে একটি পশ্চিমা উল্লুক, ২০০৮ সালের মার্চ। ছবি: AKM Emdadul Islam Bitu / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে একটি পশ্চিমা উল্লুক, ২০০৮ সালের মার্চ। ছবি: AKM Emdadul Islam Bitu / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

দর্শনার্থীর সংখ্যা ও প্রবেশ ফি


এপ্রিলের প্রতিবেদনে যে ভিড়ের কথা বলা হয়েছে, তা বছরের পর বছর ধরে বেড়েছে। ২০০৩ সালের প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে, ২০০০ সালের কাছাকাছি সময়ে ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মাসে প্রায় ৩০০টি বাস ও মিনিবাস উদ্যানে আসত, যার বেশির ভাগই বনভোজনের দল; দর্শনার্থীরা উচ্চ শব্দে গান বাজাতেন, প্রাণীদের তাড়া করতেন এবং আবর্জনা ফেলে যেতেন। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে প্রথম আলোর উদ্ধৃত লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের সহব্যবস্থাপনা কমিটির কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ১ লাখ ৫১ হাজার ৫৭১ জন পর্যটক লাউয়াছড়ায় প্রবেশ করেন এবং রাজস্ব আদায় হয় ৯৮ লাখ ৭০ হাজার ৭৮২ টাকা। টিকিট কাউন্টারের হিসাবে ২০২৪ সালের ১২ ডিসেম্বর পর্যটক এসেছিলেন ৫৭৯ জন, ১৩ ডিসেম্বর ১ হাজার ৩৬৯ জন এবং ১৪ ডিসেম্বর ১ হাজার ৭২৭ জন।

একই প্রতিবেদনে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন স্ট্যান্ড ফর আওয়ার এনডেঞ্জার্ড ওয়াইল্ডলাইফের (সিউ) অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সোহেল শ্যাম বলেন, প্রতিদিন কতজন পর্যটক ঢুকবেন, তা নির্ধারণ করে দেওয়া উচিত এবং পর্যটকদের ট্যুর গাইড নিয়ে ঢোকা উচিত। সহকারী বন সংরক্ষক জামিল মোহাম্মদ খান বলেন, পর্যটক ধারণক্ষমতা ঠিক করার চিন্তা তাঁদের আছে, তবে ওপর থেকে এ বিষয়ে কোনো নির্দেশনা নেই; মৌখিকভাবে লাউয়াছড়ায় বনভোজন না করতে বলা হয়েছে।

প্রবেশ ফি বাড়ানো হয় ২০২৪ সালের জুনে। প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বন বিভাগের ২০২৪ সালের ১৩ জুনের চিঠিতে প্রাপ্তবয়স্কদের প্রবেশ ফি ৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১৫ টাকা, অপ্রাপ্তবয়স্কদের ২০ টাকা থেকে ৫৭ টাকা ৫০ পয়সা এবং বিদেশি পর্যটকদের ৫০০ টাকা থেকে ১ হাজার ১৫০ টাকা করা হয়; ছোট গাড়ির পার্কিং ফি ২৭ টাকা থেকে বেড়ে হয় ১১৫ টাকা। মৌলভীবাজার বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. শহিদুল ইসলাম তখন জানান, সে বছর লাউয়াছড়া, সাতছড়িসহ বিভিন্ন বনে প্রবেশ ফি বাড়িয়েছে মন্ত্রণালয়।

প্রতিবেদনের সময়ে বলবৎ আইন


২০২৬ সালের ৮ এপ্রিল বাংলাদেশে বন্যপ্রাণী ও রক্ষিত এলাকা পরিচালিত হচ্ছিল বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) অধ্যাদেশ, ২০২৬ অনুযায়ী, যা ২০২৬ সালের ৭ জানুয়ারি থেকে কার্যকর এবং যা বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২-এর স্থলাভিষিক্ত হয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে উপদেষ্টা পরিষদে অধ্যাদেশটি অনুমোদনের পর প্রথম আলো জানায়, এতে প্রাণী ও উদ্ভিদ মিলিয়ে ১ হাজার ৫৯৯টি প্রজাতি সুরক্ষার আওতায় এসেছে, বাঘ ও হাতির মতোই তফসিল ১(খ)-এর ২৫০ প্রজাতির বন্যপ্রাণী হত্যা জামিন অযোগ্য অপরাধ করা হয়েছে, আর সন্দেহভাজন অপরাধীকে পরোয়ানা ছাড়া গ্রেপ্তারের ক্ষমতা পেয়েছেন বন কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

সরকারের লজ অব বাংলাদেশ ওয়েবসাইটে থাকা ২০২৬ সালের আইনের পাঠে রক্ষিত এলাকা অধ্যায়ে বলা হয়েছে, অভয়ারণ্য ও জাতীয় উদ্যান ঘোষণা করতে হবে সুনির্দিষ্টভাবে সীমানা নির্ধারণ করে, আর প্রতিটি অভয়ারণ্য ও জাতীয় উদ্যানের জন্য বন অধিদপ্তর ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা প্রণয়ন করবে এবং সরকারের অনুমোদন সাপেক্ষে তা বাস্তবায়ন করবে। অভয়ারণ্য ও জাতীয় উদ্যানে অন্যান্য কাজের সঙ্গে অননুমোদিত প্রবেশ, চাষাবাদ, সিলভিকালচারাল কাজ ছাড়া উদ্ভিদ কাটা, ময়লা-আবর্জনা ও বর্জ্য ফেলা, বন্যপ্রাণীকে উত্ত্যক্ত করা বা ভয় দেখানো, গৃহপালিত পশু ঢোকানো এবং বনভোজন নিষিদ্ধ। উদ্যানের সীমানা থেকে ২ কিলোমিটারের মধ্যে নতুন শিল্পকারখানা, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বা ইটভাটা স্থাপনও নিষিদ্ধ। প্রধান বন্যপ্রাণী ওয়ার্ডেন বা তাঁর ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তার অনুমতি নিয়ে ও প্রবেশ ফি দিয়ে ইকোট্যুরিজমের জন্য জাতীয় উদ্যানে প্রবেশ করা যায়, আর বনে বসবাসকারী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণে সরকার সহ-ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি চালু করতে পারে।

ছবি: Abdulmominbd / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

সূত্র: জাগো নিউজ ২৪ (৮ এপ্রিল ২০২৬), নেচার কনজারভেশন ম্যানেজমেন্ট (নাকম) প্রণীত লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের মাধ্যমিক তথ্য প্রতিবেদন (নভেম্বর ২০০৩), লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা (ইউএসএআইডির জন্য ইন্টারন্যাশনাল রিসোর্সেস গ্রুপ, অক্টোবর ২০০৬), গিবন জার্নাল নং ৩ (২০০৭), প্রথম আলো (১১ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ১৬ জুন ২০২৪, ১৮ জানুয়ারি ২০২৫, ৫ মে ২০২৫, ৬ ডিসেম্বর ২০২৫), বাংলাপিডিয়া, লজ অব বাংলাদেশ (লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগ)

অনলাইন ডেস্কদা এগ্রো নিউজ

পরিবেশ

সম্পর্কিত খবর

পরিবেশ

শব্দদূষণ ভারতের শহরে স্বাস্থ্যঝুঁকি, কিন্তু মাপাই কঠিন

মুম্বাইয়ে বাইরের শব্দের মাত্রা গড়ে ৬৫ থেকে ৮৫ ডেসিবেল, যেখানে সড়কের শব্দে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিকা ৫৪ ডেসিবেল। গবেষকেরা বলছেন, তথ্যের ঘাটতি ও ব্যয়বহুল শব্দ-মডেলের কারণে ভারতে এর স্বাস্থ্যপ্রভাব নিয়ে গবেষণা কঠিন।

Mongabay India১৬ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
পরিবেশ

ব্যাংকক বাঁচাতে প্রতিবছর ডুবছে থাইল্যান্ডের গ্রাম

২০১১ সালের বন্যার পর থাইল্যান্ডে তৈরি বাঁধ ও জলকপাট ব্যাংকক ও শিল্পাঞ্চল থেকে পানি সরিয়ে দেয়, কিন্তু আয়ুথায়ার নদীতীরের গ্রামগুলো এখন মাসের পর মাস মাথার ওপর পানিতে ডুবে থাকে; ঘর উঁচু করতে সঞ্চয় খরচ করছেন বাসিন্দারা।

ইউরোনিউজ১৬ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
পরিবেশ

সুস্থ যমজের ছোঁয়ায় কয়েক সপ্তাহে প্রাণ ফিরে পেল বিবর্ণ প্রবাল

স্ট্যানফোর্ডের বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, একই কলোনির সুস্থ প্রবালের গায়ে বিবর্ণ প্রবালের টুকরা লাগিয়ে রাখলে দুটি জুড়ে যায় এবং বিবর্ণ প্রবাল আবার শৈবাল ফিরে পায়; পাঁচটি টুকরার সবকটি সাত সপ্তাহে সেরে উঠেছে।

ইউরোনিউজ১৬ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)