দক্ষিণ কাজাখস্তানের কিজিলোরদা শহরের উপকণ্ঠে একসময়ের অব্যবহৃত জমিতে এখন বাগান আর মাছের পুকুর। বিশ্বব্যাংক ২০২৬ সালের ১৮ মার্চ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানায়, ‘কারাকাত’ কৃষি উদ্যোগটি সাত হেক্টরের বাগান করেছে, ২৫ টন ধারণক্ষমতার ফল সংরক্ষণাগার বানিয়েছে এবং চার হেক্টরে মাছ চাষের পুকুর কেটেছে। খামারের পরিচালক সাবিত কারামিরজায়েভ বলেন, ‘২০২৪-২০২৫ সালে আমরা আগে ব্যবহার না হওয়া জমিতে পাঁচ হেক্টরের আপেলবাগান করেছি। আপেলের পাশাপাশি এখন প্রায় দশ ধরনের ফল ও বেরি, তরমুজ, ফুটি, মিষ্টিকুমড়া ও অন্যান্য ফসল ফলাই।’
রেসিল্যান্ড প্রকল্প কী
কাজটি হচ্ছে গ্লোবাল এনভায়রনমেন্ট ফ্যাসিলিটির (জিইএফ) অর্থায়নে ও বিশ্বব্যাংকের মাধ্যমে বাস্তবায়িত ‘রেসিল্যান্ড’ প্রকল্পের আওতায়, যা কিজিলোরদা, ঝাম্বিল, তুর্কিস্তান ও আকমোলা অঞ্চলে অবক্ষয়িত জমি পুনরুদ্ধারে কাজাখস্তানকে সাহায্য করছে। ২০২১ সালের মার্চে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের প্রকল্প তথ্যপত্র অনুযায়ী, পুরো প্রকল্পের ব্যয় ৪৩ লাখ ৪০ হাজার মার্কিন ডলার, যার সবটাই জিইএফের অনুদান; বাস্তবায়ন করছে দেশটির বন ও বন্যপ্রাণী কমিটি। লক্ষ্য হলো জনগোষ্ঠীকে কেন্দ্রে রেখে কৃষিবনায়ন পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা এবং ভূদৃশ্য ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধারে সরকারের সক্ষমতা বাড়ানো।

কিজিলোরদাকে ঘিরে সাক্সাউলের সবুজ বলয়
সবচেয়ে দৃশ্যমান কাজ কিজিলোরদাকে ঘিরে সাক্সাউল গুল্মের বলয়। ২০২৩ সালে ৩৬ লাখের বেশি চারা লাগানো হয়, আর ২০২৪-২০২৫ সালের রক্ষণাবেক্ষণে যোগ হয় আরও ২১ লাখ। বিশ্বব্যাংক জানায়, এই বলয় ধুলো কমাচ্ছে, কাছের জনপদের অণুজলবায়ু উন্নত করছে এবং প্রবল বাতাস ঠেকাতে ভবিষ্যতের এক বনাঞ্চলের ভিত গড়ছে।
কালো সাক্সাউল (Haloxylon ammodendron) মধ্য এশিয়ার নিম্নভূমির উদ্ভিদ, দক্ষিণ কাজাখস্তান থেকে তুর্কমেনিস্তান, উজবেকিস্তান, ইরান, মঙ্গোলিয়া ও চীন পর্যন্ত জন্মায়। এটি বড় গুল্ম থেকে ছোট গাছ পর্যন্ত হয়, উচ্চতা সাধারণত ২ থেকে ৮ মিটার। খরা সহ্য করার ক্ষমতা প্রবল বলে মরুকরণ ঠেকাতে আশ্রয়বলয় তৈরি ও বালিয়াড়ি স্থির করতে এটি দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত হচ্ছে।
আরাল সাগরের শুকনো তলদেশ
আরাল সাগর একসময় ছিল ৬৮ হাজার বর্গকিলোমিটারের, বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম হ্রদ। ১৯৬০-এর দশক থেকে সোভিয়েত পরিকল্পনায় এর দুই প্রধান উৎস আমু দরিয়া ও সির দরিয়ার পানি তুলাখেতের সেচে সরিয়ে নেওয়া হয়। বিশ্বব্যাংকের ২০২১ সালের প্রকল্প তথ্যপত্র অনুযায়ী, সাবেক তলদেশের ৩৪ লাখ হেক্টর শুকিয়ে বালু ও লবণের মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে, যার ১৮ লাখ হেক্টর কাজাখস্তানে; বাতাসে ওড়া লবণ ও ধুলো বাতাসের মান খারাপ করছে, ফসলের ফলনও কমাচ্ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, কিজিলোরদা অঞ্চলের আনুমানিক ৬৬ শতাংশ জমি অবক্ষয়ে আক্রান্ত, প্রায় ৪ শতাংশ ইতিমধ্যে মরুভূমি হয়ে গেছে এবং প্রায় ৭৬ শতাংশ আরও মরুকরণের প্রবল ঝুঁকিতে। তলদেশে লাগানোর চারা জোগাতে ২০২৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে কাজালিনস্ক জেলায় ৩৩ দশমিক ৫ হেক্টরের একটি নতুন বন নার্সারি গড়া হয়েছে। কিজিলোরদা আঞ্চলিক কাজালিনস্ক বন ও বন্যপ্রাণী সুরক্ষা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের উপপরিচালক সেরিক আইমিশ জানান, নার্সারিটির বছরে ৩০ লাখ কালো সাক্সাউল চারা এবং ৫৫ হাজার শক্তকাঠ ও ফলদ গাছের চারা উৎপাদনের ক্ষমতা আছে। শুধু ২০২৩-২০২৪ সালেই তলদেশের ৭৪ হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে সাক্সাউল ও অন্যান্য লবণসহিষ্ণু গুল্ম লাগানো বা বীজ বোনা হয়েছে, যা বালুমাটি স্থির করছে ও বিষাক্ত ধুলোর বিস্তার কমাচ্ছে।


বীজব্যাংক ও কৃষকের কৃষিবন
দীর্ঘমেয়াদি পুনরুদ্ধার নির্ভর করে বনের জিনসম্পদ রক্ষার ওপরও, কারণ রোগ ও পোকামাকড় সাক্সাউল বলয় এবং তার ওপর নির্ভরশীল জীবিকা নষ্ট করে দিতে পারে। শুচিনস্কে রেসিল্যান্ড জাতীয় বনবীজ জিনব্যাংককে সহায়তা দিচ্ছে; নিম্ন তাপমাত্রার সংরক্ষণাগার ও বীজ গণনাযন্ত্রসহ ৬৫ ধরনের বিশেষায়িত পরীক্ষাগার যন্ত্রে সজ্জিত ব্যাংকটিতে ১৫৬ প্রজাতির গাছ ও গুল্মের নমুনা আছে। ফরেস্ট ব্রিডিং অ্যান্ড সিড সেন্টারের উপপরিচালক নাতালিয়া জাখারোভা বলেন, ‘বীজ ২০ বছর বা তারও বেশি সময় সংরক্ষণ করা যায়।’
প্রকল্পের হিসাবে কিজিলোরদার চারপাশে ১৫ হেক্টরে কৃষিবনায়নের প্রদর্শনী প্লট করা হয়েছে, আর ঝাম্বিল অঞ্চলের কৃষকেরা ১২০ হেক্টরে পরীক্ষামূলক কৃষিবন গড়েছেন, যেখানে বাগান ফসলে বৈচিত্র্য আনছে ও আয়ের নতুন উৎস দিচ্ছে। আগে হিসাবের বাইরে থাকা ১ লাখ ১ হাজার ৮৮২ হেক্টর বন শনাক্ত করে রাষ্ট্রীয় বন তহবিলে দেওয়া হয়েছে এবং চারা রোপণে প্রায় এক হাজার মানুষ মৌসুমি কাজ পেয়েছেন। কারাকাত খামারের সাবিত কারামিরজায়েভ পরিবর্তনটা বললেন সহজ ভাষায়: ‘আমরা আগে অব্যবহৃত জমিতে চাষ করছি। এখন তা আমাদের পরিবারের খাবার জোগায়।’
ছবি: Antonov14 / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: বিশ্বব্যাংক, বিশ্বব্যাংক প্রকল্প তথ্যপত্র (কাজাখস্তান রেসিল্যান্ড ল্যান্ডস্কেপ রেস্টোরেশন প্রজেক্ট, ২০২১), উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)