বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর ২০২৬ সালের ২৮ এপ্রিল, মঙ্গলবার, সকাল ১১টা থেকে পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টার জন্য দেশের আট বিভাগে কালবৈশাখী ঝড়ের সতর্কবার্তা দেয়। বিবিসি বাংলার সেদিনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের ওপর দিয়ে বিদ্যুৎ চমকানোসহ পশ্চিম বা উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে ঘণ্টায় ৬০ থেকে ৮০ কিলোমিটার বেগে ঝড় বয়ে যেতে পারে বলে জানানো হয়। তার আগের এক সপ্তাহ ধরে ঢাকাসহ প্রায় সব বিভাগে বৃষ্টি ও বজ্রপাত হচ্ছিল, আর আগাম সতর্কবার্তা সত্ত্বেও বজ্রপাতে তখন পর্যন্ত সারা দেশে প্রায় ৫৬ জনের মৃত্যু হয়েছিল।
স্বস্তির এপ্রিল, কারণ বেশি বজ্রঝড়
আবহাওয়াবিদ মুহাম্মাদ আবুল কালাম মল্লিক বিবিসি বাংলাকে জানান, এপ্রিলে সাধারণত গড় তাপমাত্রা থাকে ৩৩ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস, কখনও তা ৩৬ থেকে ৪২ ডিগ্রির মধ্যে ওঠানামা করে। ২০২৬ সালের এপ্রিলে কেবল একবার, ২২ এপ্রিল রাজশাহীতে, তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রিতে ওঠে। তার ভাষায়, "উচ্চ তাপমাত্রার ক্রুয়েলেস্ট এপ্রিল মাস এবার অনেকটাই সহনশীল।" তিনি মনে করিয়ে দেন, ৭৬ বছরের মধ্যে ২০২৪ সালেই টানা ৩৫ দিন উচ্চ তাপমাত্রা ছিল; এবার তেমনটি হয়নি, কারণ বজ্রঝড় বেশি হয়েছে।
তবে মাসটি পুরোপুরি গরমমুক্ত ছিল না। দ্য ডেইলি স্টার ২৭ এপ্রিল জানায়, তার আগের সপ্তাহে তাপপ্রবাহ ২৪ জেলায় ছড়িয়েছিল এবং তাপমাত্রা ৩৫ থেকে ৪০ ডিগ্রির মধ্যে ছিল; ২৬ এপ্রিলের ঝড়বৃষ্টিতে প্রায় এক সপ্তাহের সেই তাপপ্রবাহ কাটে।
মি. মল্লিক জানান, মার্চ, এপ্রিল ও মে মাসকে প্রাক-বর্ষা মৌসুম বলা হয়। এই মৌসুমে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে যে ৩৮ শতাংশ বজ্রঝড় হয়, স্থানীয়ভাবে সেগুলোকেই কালবৈশাখী বলা হয়; জুন থেকে সেপ্টেম্বরের বজ্রঝড়, যা প্রায় ৫১ শতাংশ, কালবৈশাখী নয়। গড়ে মার্চে পাঁচ থেকে ছয়টি, এপ্রিলে নয়টি এবং মে মাসে ১৩টি কালবৈশাখী হয়। ২০২৬ সালের এপ্রিলে তখনই দশটির বেশি বজ্রঝড় হয়ে গিয়েছিল, বিশেষ করে সিলেটে। স্থানীয় ও বৈশ্বিক বায়ুমণ্ডলীয় অবস্থার মিথস্ক্রিয়ায় ব্যত্যয়কে তিনি এর কারণ বলেন এবং বুধবার থেকে রাজশাহী ও খুলনা বিভাগে বজ্রমেঘ বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেন।
কালবৈশাখী বা নরওয়েস্টার হলো বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ ও পূর্ব ভারতের গ্রীষ্মকালীন স্থানীয় বজ্রঝড়। সাধারণত বিকেলে বা সূর্যাস্তের ঠিক আগে ঘন কালো মেঘ জমে, তারপর অল্প সময়ের জন্য ঝোড়ো হাওয়া ও প্রবল বৃষ্টি হয়, প্রায়ই শিলাসহ। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তৈরি হয় বলে কোথায়, কতক্ষণ কালবৈশাখী হবে তা আগে জানানোর বৈজ্ঞানিক উপায় এখনও নেই বলে বিবিসি বাংলা জানায়।

ভারী বৃষ্টি, ভূমিধসের ঝুঁকি ও বন্দরে সংকেত
একই দিন সকালে অধিদপ্তর ৯৬ ঘণ্টার ভারী বৃষ্টিপাতের সতর্কবার্তাও দেয়। আট বিভাগের কোথাও কোথাও ২৪ ঘণ্টায় ৪৪ থেকে ৮৮ মিলিমিটার ভারী এবং ৮৮ মিলিমিটার বা তার বেশি অতি ভারী বর্ষণ হতে পারে বলে জানানো হয়, সঙ্গে অস্থায়ী জলাবদ্ধতা ও চট্টগ্রাম বিভাগের পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের ঝুঁকি। উত্তর বঙ্গোপসাগরে বায়ুচাপের তারতম্যের কারণে মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত উপকূলের কাছাকাছি সাবধানে চলাচল করতে বলা হয়, আর চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে তিন নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখাতে বলা হয়।
দোসরা মে পর্যন্ত পাঁচ দিনের পূর্বাভাসে ঢাকা, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম, সিলেট ও বরিশাল বিভাগের কোথাও কোথাও মাঝারি থেকে অতি ভারী বৃষ্টি এবং সব বিভাগেই দমকা বা ঝোড়ো হাওয়াসহ বৃষ্টি বা বজ্রবৃষ্টির কথা বলা হয়। এরপর বৃষ্টি কমে তাপমাত্রা বাড়তে পারে।

মে মাসে গরম ও লঘুচাপের সম্ভাবনা
মি. মল্লিকের পূর্বাভাস ছিল, মে মাসের প্রথম সপ্তাহের পর এবং জুনেও তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকতে পারে। বাতাসে জলীয় বাষ্প বেশি আর বাতাসের গতি কম থাকলে গরমের অনুভূতি মাঝে মাঝেই তীব্র হবে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ বজলুর রশিদও ডেইলি স্টারকে বলেছিলেন, মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে তাপপ্রবাহ ফিরতে পারে।
মে মাস ঘূর্ণিঝড়প্রবণ। মি. মল্লিকের হিসাবে সে মাসে এক থেকে দুটি লঘুচাপ তৈরি হতে পারে, যার একটি নিম্নচাপ, গভীর নিম্নচাপ বা ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে পারে; তবে পরের দশ দিনে বঙ্গোপসাগরে লঘুচাপ বা ঘূর্ণিঝড়ের সম্ভাবনা ছিল না।
বোরো কাটার মৌসুমে কৃষকের ঝুঁকি
পূর্বাভাসটি আসে বোরো ধান কাটার ভরা মৌসুমে। দ্য ডেইলি স্টারের খবরে, ১৮ এপ্রিল সাত জেলায় বজ্রপাতে অন্তত ১৩ জন মারা যান, যাদের পাঁচজন সুনামগঞ্জে হাওরে ধান কাটার বা বাড়ির পাশে ধান শুকানোর সময়। ২৬ এপ্রিলের ঝড়ে সাত জেলায় আরও অন্তত ১২ জনের মৃত্যু হয় এবং কোথাও কোথাও শিলাবৃষ্টিতে পাকা ধানের ক্ষতি হয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কৃষকদের দ্রুত বোরো ধান কেটে ফেলার পরামর্শ দেয়, আর বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র সিলেটের হাওর এলাকায় আকস্মিক বন্যার সতর্কতা জারি করে।

ছবি: ZahidTushar / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: বিবিসি বাংলা, দ্য ডেইলি স্টার, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)