চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলায় বিষধর সাপের কামড়ে গোপা ঘোষ (৪৭) নামের এক গৃহবধূ মারা যান। ২০২৫ সালের ৩ সেপ্টেম্বর, বুধবার রাতে উপজেলার সৈয়দপুর ইউনিয়নের পূর্ব সৈয়দপুর গ্রামে দিলীপ ঘোষের বাড়িতে ঘটনাটি ঘটে। তিনি ওই বাড়ির পিন্টু কুমার ঘোষের স্ত্রী এবং স্থানীয় একটি মন্দিরভিত্তিক বিদ্যালয়ে পাঠদান করতেন। জাগো নিউজ ২৪ পরদিন ৪ সেপ্টেম্বর খবরটি প্রকাশ করে।
রাতে বাড়ির পেছনের শৌচাগারে যাওয়ার পথে ছোবল
জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বুধবার রাতে গোপা ঘোষ বাড়ির পেছনের শৌচাগারে যান। তখন একটি সাপ তাঁর পায়ে ছোবল দেয়। স্থানীয়রা তাঁকে উদ্ধার করে সীতাকুণ্ড উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাঁকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে নেওয়ার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। স্থানীয় ইউপি সদস্য সজল কুমার শীল তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন। কোন প্রজাতির সাপ কামড়েছিল, প্রতিবেদনে তা জানানো হয়নি।
সীতাকুণ্ড চট্টগ্রাম বিভাগের চট্টগ্রাম জেলার একটি উপজেলা। এর আয়তন ৪৮৩ দশমিক ৯৭ বর্গকিলোমিটার এবং ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী এখানে ৪ লাখ ৫৭ হাজার ৩৯৬ জনের বাস। উপজেলার মাঝ বরাবর প্রায় ৩২ কিলোমিটার লম্বা একটি পাহাড়শ্রেণি রয়েছে, আর পশ্চিমে সন্দ্বীপ চ্যানেল ও বঙ্গোপসাগরের উপকূল। সৈয়দপুর উপজেলার ইউনিয়নগুলোর একটি। এখানে জাহাজভাঙা শিল্পের পাশাপাশি কৃষিও গুরুত্বপূর্ণ; শিম, তরমুজ, রাবার ও পান এখানকার উল্লেখযোগ্য পণ্য।
দেরিতে হাসপাতালে পৌঁছানোর কথা জানান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা
সীতাকুণ্ড উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. আলতাফ হোসেন জাগো নিউজকে জানান, রাতে স্বজনরা সাপে কাটা এক রোগীকে নিয়ে এসেছিলেন। রোগীর অবস্থা দেখে প্রাথমিকভাবে বোঝা যায়, সাপে কাটার অনেকক্ষণ পর তাঁকে হাসপাতালে আনা হয়েছে। এ কারণে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে তাঁকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
ডা. আলতাফ হোসেন আরও বলেন, সাপে কাটা রোগীকে যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসা দেওয়া ভালো; দেরি করলেই যেকোনো বিপদ হতে পারে।


দেশে ও বিশ্বে সাপের কামড়ের চিত্র
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক অনুষ্ঠানে ২০২৩ সালের ১৮ জুন উপস্থাপিত জাতীয় জরিপের (২০২১ ও ২০২২ সালে পরিচালিত) ফল অনুযায়ী, বাংলাদেশে বছরে প্রায় চার লাখ মানুষ সাপের কামড়ের শিকার হন এবং মারা যান ৭ হাজার ৫১১ জন। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদনে জরিপের বরাতে বলা হয়, এসব ঘটনার ৯৫ শতাংশ ঘটে গ্রামে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ফ্যাক্টশিট অনুযায়ী, পৃথিবীতে বছরে আনুমানিক ৫৪ লাখ মানুষকে সাপে কাটে, এর মধ্যে ১৮ লাখ থেকে ২৭ লাখ ক্ষেত্রে শরীরে বিষক্রিয়া হয়। প্রতিবছর ৮১ হাজার ৪১০ থেকে ১ লাখ ৩৭ হাজার ৮৮০ জন মারা যান। সংস্থাটি জানায়, এশিয়ায় বছরে ২০ লাখ পর্যন্ত মানুষ সাপের বিষক্রিয়ার শিকার হন, আর সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হন কৃষিশ্রমিক ও শিশুরা। ডব্লিউএইচও বলছে, সাপের কামড়ের কার্যকর চিকিৎসা আছে: মানসম্মত অ্যান্টিভেনম, যা বেশির ভাগ বিষক্রিয়া ঠেকাতে বা ফেরাতে সবচেয়ে কার্যকর। অনেক রোগী হাসপাতালের বদলে প্রচলিত লোকজ পদ্ধতির কাছে যান বলেও সংস্থাটি উল্লেখ করেছে।
সাপে কাটলে কী করণীয়, ডব্লিউএইচওর পরামর্শ
ডব্লিউএইচওর ২০১৯ সালের প্রশ্নোত্তরে প্রাথমিক করণীয় নিয়ে যা বলা হয়েছে:
- সাপে কাটা মানুষটিকে স্থির রাখুন, একেবারেই নড়াচড়া করতে দেবেন না।
- অস্থায়ী স্ট্রেচারে শুইয়ে দেরি না করে চিকিৎসাকেন্দ্রে নিয়ে যান।
- সরু বাঁধন (টুর্নিকেট), ক্ষতস্থান কাটা, পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেটের মতো রাসায়নিক লাগানো বা গরম কাচের পাত্র দিয়ে বিষ টানার চেষ্টা বিপজ্জনক ও অকার্যকর; এগুলো করবেন না।
- কালো পাথরের মতো পদ্ধতি অকার্যকর এবং মূল্যবান সময় নষ্ট করে।
কামড় ঠেকানো নিয়েও সংস্থাটির পরামর্শ আছে। ডব্লিউএইচও জানায়, রাতে বাইরে চলার সময় আলো সঙ্গে রাখা জরুরি; অন্ধকারে সাপের ওপর পা পড়লে ঘর থেকে বাইরের শৌচাগার পর্যন্ত অল্প পথটুকুও প্রাণঘাতী হতে পারে। প্রায় ৮০ শতাংশ কামড় লাগে পায়ে বা হাঁটুর নিচে, তাই জুতা পরা সুরক্ষা দেয়। বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখা ও ঘাস ছোট করে কাটা, ঘরে সাপ ঢোকার পথ বন্ধ করা এবং উঁচু খাটে ভালোভাবে গুঁজে দেওয়া মশারির নিচে ঘুমানোও কামড়ের ঝুঁকি কমায়।

ছবি: Syed Sajidul Islam / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, উইকিপিডিয়া (সীতাকুণ্ড উপজেলা)





মন্তব্য
(০)