২০২৬ সালের জানুয়ারির শেষ দিকে রাজবাড়ী জেলার গোয়ালন্দ উপজেলায় একটি সরিষা মাঠের পাশে ১১০টি মৌবাক্স বসিয়ে মধু সংগ্রহ করছিলেন নারায়ণগঞ্জের বারদী এলাকা থেকে আসা মৌচাষি পল্লব রায়সহ কয়েকজন তরুণ। ২০২৬ সালের ২৬ জানুয়ারি প্রকাশিত জাগো নিউজের রাজবাড়ী জেলা প্রতিনিধির প্রতিবেদন অনুযায়ী, তারা জানান, এ কাজ থেকে মাসে তাদের আয় প্রায় ৩ থেকে সাড়ে ৩ লাখ টাকা। বছরের প্রায় ৬ থেকে ৮ মাস তারা ভ্রাম্যমাণ অবস্থায় দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘোরেন; যেখানে যে ফসলে ফুল আসে, সেখানে মৌবাক্স বসিয়ে একের পর এক বিভিন্ন ফুলের মধু আহরণ করেন।
প্রতিবেদনে একই মাঠ থেকে দুই রকম লাভের কথা বলা হয়। মৌচাষিরা মধু বিক্রি করে লাভবান হন, আর মৌমাছি ফুলে ফুলে পরাগায়ন ঘটানোয় যে কৃষকের জমির সরিষায় মৌমাছি বসে, তার ফলন বাড়ে। মৌচাষিরা পত্রিকাটিকে জানান, নিজেদের থাকা-খাওয়ার খরচ আর মৌমাছির পরিচর্যা ছাড়া বাক্সে মৌচাষে তেমন বাড়তি খরচ নেই; এ কারণে বাক্সে মৌচাষ একটি লাভজনক পেশা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
নগর রায়ের পাড়ার সরিষা মাঠে ১১০টি মৌবাক্স
মৌবাক্সগুলো বসানো হয়েছিল গোয়ালন্দ পৌরসভার নগর রায়ের পাড়ার একটি সরিষা মাঠের পাশে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাক্স বসানোর ১২ থেকে ১৫ দিনের মধ্যেই মৌচাষিরা নিজস্ব উপায়ে প্রথম দফার মধু সংগ্রহ বা হারভেস্ট করেন। রৌদ্রোজ্জ্বল আবহাওয়া থাকলে মাসে ৪ থেকে ৫ বারে তারা ২০ থেকে ২৫ মণ মধু সংগ্রহ করেন এবং প্রতি মণ ১৪ হাজার টাকায় পাইকারি বিক্রি করেন। মণ হলো ৪০ সেরের প্রচলিত একক, যাতে বাংলাদেশের কৃষকেরা এখনো অনেক ফসল মাপেন।
সরিষা ফুলের মধু সংগ্রহ চলে প্রায় দুই মাস। এরপর মৌচাষিরা ধনিয়া, কালোজিরাসহ অন্যান্য ফসলের ফুলের মধু আহরণে চলে যান বলে জানান এবং এভাবেই বছরের ৬ থেকে ৮ মাস পথে পথে কাটান।
কুয়াশা এই মৌসুমে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। প্রতিবেদনে বলা হয়, কুয়াশার কারণে কিছুদিন মৌচাষিরা মধু সংগ্রহ করতে পারেননি, আর জেলা কৃষি বিভাগও জানায় যে মাসের শুরুর দিকে মধু সংগ্রহ কিছুটা ব্যাহত হয়েছিল। সরিষা মৌসুমে ঠান্ডা আবহাওয়া একটি পরিচিত ঝুঁকি: এক বছর আগে, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে দ্য ডেইলি স্টার জানিয়েছিল, সিরাজগঞ্জের এক মৌচাষি এক সপ্তাহে ৬৫ কেজি মধু পেলেও পরের সপ্তাহে ঠান্ডার কারণে পেয়েছিলেন মাত্র ৩৭ কেজি।

জাগো নিউজকে যা বললেন মৌচাষিরা
গোয়ালন্দের মৌখামারে মৌমাছির পরিচর্যাকারী আবু হাসনাত জাগো নিউজকে বলেন, 'আবহাওয়া ভালো থাকলে এক মাসে ৪ বার মধু সংগ্রহ করতে পারি। ৪ বারে প্রায় ২০ মণের বেশি মধু পাই। এই মধু ঢাকায় পাঠাই। ১৩-১৪ হাজার টাকা মণ বিক্রি করি। প্রায় দুই মাস সরিষা ফুলের মাঠে থাকি। এরপর কালোজিরা ও ধনিয়ার মাঠে যাবো। সেখানে প্রায় দুই মাস থাকার পর যাবো লিচুর মাঠে। তারপর আর কোনো মাঠ না থাকায় এক স্থানে বসে প্রায় ৬-৭ মাস নিজস্ব উপায়ে মৌমাছিগুলো দেখাশোনা করি।'
পল্লব রায় পত্রিকাটিকে নিজের হিসাব দেন: 'আমাদের এখানে প্রায় ১১০টি মৌবাক্স আছে। ৭-৮ দিন পর পর মধু সংগ্রহ করি। এতে প্রায় ৬-৮ মণ মধু হয়। আমাদের সব মধু ঢাকায় পাঠাই। খুচরা পর্যায়ে ৬০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করি।'
মাসে ৩ থেকে সাড়ে ৩ লাখ টাকা আয়ের কথাটি প্রতিবেদনে মৌচাষিদের নিজেদের হিসাব হিসেবেই এসেছে। মধুর পরিমাণের হিসাবেও প্রতিবেদনের বিভিন্ন অংশে কিছুটা ভিন্নতা আছে: শুরুতে মাসে ৪ থেকে ৫ বারে ২০ থেকে ২৫ মণের কথা বলা হয়েছে, পরিচর্যাকারী বলেছেন ৪ বারে ২০ মণের বেশি, আর পল্লব রায় বলেছেন প্রতি ৭ থেকে ৮ দিনে ৬ থেকে ৮ মণ। পাইকারি দাম প্রতিবেদনে মণপ্রতি ১৪ হাজার টাকা এবং পরিচর্যাকারীর কথায় ১৩ থেকে ১৪ হাজার টাকা; খুচরা দাম কেজিপ্রতি ৬০০ টাকা।
বছরজুড়ে তাদের এই যাত্রাপথ দেশের নিজস্ব জ্ঞানকোষে মধুর উৎস নিয়ে যা বলা আছে, তার সঙ্গে মেলে। জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া সরিষা, ধনিয়া, পেঁয়াজ, তিল, মুলাসহ মাঠের নানা ফসলকে বাংলাদেশের সাধারণ মধু-উদ্ভিদ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে এবং বলেছে, এদের বেশির ভাগে ফুল আসে ডিসেম্বর থেকে মার্চে; আর লিচু, আম, নারকেল, লেবুজাতীয় ফল ও পেয়ারায় ফুল আসে মার্চ থেকে মে মাসে, যা বসন্তের প্রধান মধুপ্রবাহ তৈরি করে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে পাবনার এক মৌচাষি পরিবারও একই চিত্র দেয়: ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল মধু সংগ্রহের মূল সময়; ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি সরিষা আর মার্চ-এপ্রিলে লিচুবাগান; বর্ষায় মধু সংগ্রহ হয় না, তখন কাজ হলো মৌমাছির যত্ন নেওয়া আর বাক্স মেরামত করা।
জেলা কৃষি বিভাগের হিসাবে রাজবাড়ীর সরিষা মৌসুম
সেই মৌসুমে গোয়ালন্দসহ রাজবাড়ী জেলার বিভিন্ন এলাকায় সরিষার আবাদ হয়েছিল; প্রতিবেদনে মাঠে মাঠে হলুদ ফুলের সমারোহ আর তার ওপর মৌমাছির ওড়াউড়ির বর্ণনা ছিল। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) জেলা কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সে বছর জেলায় ৫ হাজার ৮৩২ হেক্টর জমিতে সরিষা আবাদ হয়: গোয়ালন্দে ২ হাজার ১৬৫, রাজবাড়ী সদরে ১ হাজার ৮৩৫, বালিয়াকান্দিতে ৯৫৭, কালুখালীতে ৪৭৫ এবং পাংশায় ৪০০ হেক্টর। কার্যালয়টি ৭ হাজার ৮৭৩ মেট্রিক টন ফলনের আশা করছিল। প্রতিবেদনে বলা হয়, অল্প খরচের এই তেলফসল খরচের তুলনায় কয়েক গুণ লাভ দেয়, তাই দিন দিন সরিষার আবাদ বাড়ছে।
রাজবাড়ী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রশিক্ষণ অফিসার গোলাম রাসূল জাগো নিউজকে বলেন, 'জেলায় ৭ হাজার ৮০০ মেট্রিক টন সরিষা উৎপাদন হবে। ৫ উপজেলায় কমবেশি চাষ হলেও গোয়ালন্দে চাষ বেশি হয়। অনেক স্থানে সরিষা ক্ষেতের পাশে মৌমাছি চাষ করা হচ্ছে। মৌমাছির কারণে সরিষা ফুলে পরাগায়নের মাধ্যমে ফসলের উৎপাদন বাড়ে। মৌচাষিরা মধু সংগ্রহ করে লাভবান হচ্ছেন। চলতি মাসের শুরুর দিকে কুয়াশার কারণে মধু সংগ্রহ কিছুটা ব্যাহত হয়েছে।'
ডিএইর তথ্যমতে জেলায় চাষ হয়েছিল টরি-৭, বারি সরিষা-১৪, ১৫, ১৭ ও ১৮ এবং বিনা সরিষা-৪, ৯ ও ১১ জাত। বারি জাতগুলো বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের এবং বিনা জাতগুলো বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের উদ্ভাবিত। আগের কয়েকটি সংবাদ প্রতিবেদনে এর কয়েকটির বর্ণনা আছে। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রথম আলো ডিএইর যশোর কার্যালয়ের বরাতে জানায়, বারি সরিষা-১৪ বপনের ৭৫ থেকে ৮০ দিনের মধ্যে ঘরে তোলা যায়, হেক্টরপ্রতি ফলন প্রায় দেড় হাজার কেজি, আর সরিষা তোলার পর একই জমিতে বোরো ধান চাষ করা যায়। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে সিরাজগঞ্জের ডিএইর উপপরিচালক দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, সেখানকার কৃষকদের কাছে বারি ১৪ সবচেয়ে প্রচলিত জাত। ২০২২ সালের জানুয়ারিতে বাংলা ট্রিবিউন পাশের জেলা ফরিদপুর থেকে জানায়, সেখানে কৃষকেরা বারি সরিষা-১৮, বারি সরিষা-১৭, বারি সরিষা-১৪ ও টরি-৭ চাষ করছেন, এবং বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) ডাল ও তৈলবীজ খামারের একজন কর্মকর্তা বলেন, বারি সরিষা-১৮-এর তেলে ইরুসিক অ্যাসিড খুবই কম।
বাংলাপিডিয়া সরিষাকে বীজ থেকে তেল পাওয়া ক্রুসিফেরি গোত্রের বীরুৎ হিসেবে বর্ণনা করেছে, যার মধ্যে আছে ব্রাসিকা নেপাস (রেপ) ও ব্রাসিকা নাইগ্রা (কালো সরিষা)। মাত্র কয়েক দশক আগেও সরিষার তেলই ছিল বাংলাদেশে রান্নার একমাত্র তেল, যা গরু দিয়ে টানা ঘানিতে পেষা হতো; এখন তেল বের করা হয় বিদ্যুৎচালিত মিলে। জ্ঞানকোষটি বলছে, দেশে উৎপাদিত সরিষা রান্নার তেলের চাহিদার সামান্য অংশই মেটায়, তাই বিপুল পরিমাণ সয়াবিন ও সূর্যমুখী তেল আমদানি করতে হয়।
পদ্মাপারের গোয়ালন্দ ও রাজবাড়ী
ঢাকা বিভাগের রাজবাড়ী জেলার আয়তন ১ হাজার ৯২ দশমিক ২৮ বর্গকিলোমিটার; বাংলাপিডিয়া জানায়, জেলার বেশির ভাগ এলাকা পদ্মার পলিমাটিতে গঠিত। প্রধান নদী পদ্মা, গড়াই, চন্দনা ও চিত্রা। ২০১১ সালের আদমশুমারিতে জেলার জনসংখ্যা ছিল ১০ লাখ ৪৯ হাজার ৭৭৮, আর ৬০ দশমিক ৮৪ শতাংশ পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি। অঞ্চলটির প্রশাসনিক ইতিহাসও দীর্ঘ: ১৮৭১ সালে রাজবাড়ীতে সদর দপ্তর রেখে গোয়ালন্দ মহকুমা গঠিত হয়, আর ১৯৮৪ সালের মার্চে গোয়ালন্দকে জেলায় উন্নীত করে নাম দেওয়া হয় রাজবাড়ী জেলা।
গোয়ালন্দ উপজেলা পদ্মা ও পুরাতন কুমার নদীর তীরে। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, গোয়ালন্দ থানা গঠিত হয় ১৯২০ সালে এবং উপজেলা হয় ১৯৮৪ সালে; এখানে একটি পৌরসভা ও দৌলতদিয়াসহ চারটি ইউনিয়ন আছে, আর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার মধ্যে আছে গোয়ালন্দ ফেরিঘাট ও লঞ্চঘাট। উপজেলার প্রধান ফসল হিসেবে ধান, পাট, আখ, ডাল ও চিনাবাদামের নাম আছে। গোয়ালন্দ ফেরিঘাট জেলার দর্শনীয় স্থানের তালিকাতেও রয়েছে।
মৌচাষিরা এসেছিলেন নারায়ণগঞ্জ জেলার বারদী থেকে; বাংলাপিডিয়া বারদীকে সোনারগাঁও উপজেলার দশটি ইউনিয়নের একটি হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে, যে উপজেলার প্রধান নদী মেঘনা ও শীতলক্ষ্যা। নিজের এলাকায় বাক্স রাখার বদলে দলটি ফুলের মৌসুম ধরে জেলা থেকে জেলায় ঘোরে।

মৌমাছি কীভাবে সরিষার ফলন বাড়ায়
বাংলাপিডিয়ার মৌমাছি পালন অধ্যায়ে বলা হয়েছে, মৌমাছির প্রধান মূল্য হলো ৬০টির বেশি কৃষিফসলে পরাগায়ন ঘটিয়ে ফল ও বীজের উৎপাদন বাড়ানোর ক্ষমতা; মধু ও পরাগের খোঁজে মৌমাছির ঘোরাঘুরিতে ফসলে পরপরাগায়ন ঘটে। বাংলাদেশে মাঠপর্যায়ের গবেষণায় সরিষার ওপর এর প্রভাব মাপা হয়েছে। শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা ২০১৬ সালের নভেম্বর থেকে ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত টাঙ্গাইলের নাগরপুরে একটি গবেষণা করেন, যা জার্নাল অব বায়োডাইভার্সিটি কনজারভেশন অ্যান্ড বায়োরিসোর্স ম্যানেজমেন্টে প্রকাশিত হয়। তারা দেখেন, সরিষার ফুল ফোটার মৌসুমে প্রধান পরাগায়নকারী পতঙ্গ হলো মৌমাছি এপিস মেলিফেরা। রাজবাড়ীতেও চাষ হওয়া টরি-৭ জাত নিয়ে কাজ করে তারা পান, মৌমাছি গাছপ্রতি শুঁটির সংখ্যা ১৪ শতাংশ এবং শুঁটিপ্রতি বীজের সংখ্যা ১১ শতাংশ বাড়িয়েছে, আর মৌমাছিসহ জাল দিয়ে ঘেরা গাছে গাছপ্রতি গড় বীজ ফলন বেড়েছে ১৫ শতাংশ, যদিও ফুল ফোটার সময় ৬ দিন কমে গেছে।
সরিষা অঞ্চলের প্রতিবেদনেও প্রায় একই কথা এসেছে। ২০২১ সালের জানুয়ারিতে দ্য ডেইলি স্টার বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) একটি মৌচাষ প্রকল্পের সাবেক প্রধানের বরাতে জানায়, সরিষা খেতে মৌচাষ বিঘাপ্রতি ফলন ১৫ শতাংশ বাড়ায়, এবং যেসব কৃষক আগে মৌচাষিদের জমিতে ঢুকতে দিতেন না, তাদের অনেকের ধারণা বদলেছে। পাবনার এক কৃষক পত্রিকাটিকে বলেন, আগে তিনি বিঘায় ৪ থেকে সাড়ে ৪ মণ সরিষা পেতেন, মৌচাষিদের জমি ইজারা দেওয়ার পর তা বেড়ে সাড়ে ৬ মণ হয়েছে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে সিরাজগঞ্জের একজন কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা একই পত্রিকাকে বলেন, অনেক কৃষক এখনো মৌমাছিকে ফসলের জন্য হুমকি মনে করেন, অথচ পরাগায়ন ফলন ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াতে পারে।
সরিষা ফুল মৌচাষিদের কাছে প্রিয় হওয়ার আরেকটি কারণ আছে। উত্তরবঙ্গের একটি মৌচাষি সমিতির সভাপতি ২০২১ সালে দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, সরিষার ফুল থাকে ৪০ থেকে ৬০ দিন, যা অন্য যেকোনো ফসলের চেয়ে বেশি; তাই অন্য ফসলের তুলনায় সরিষা মাঠ থেকে বেশি মধু পাওয়া যায় এবং বেশির ভাগ মৌচাষি সেখানেই বাক্স বসাতে চান।

বাক্সে মৌচাষ: মৌমাছি, বাক্স ও মধু সংগ্রহ
বাংলাপিডিয়া মৌমাছি পালনকে এমনভাবে মৌমাছির কলোনির যত্ন নেওয়া হিসেবে বর্ণনা করেছে, যাতে মৌমাছি নিজের প্রয়োজনের চেয়ে বেশি মধু জমায়। জ্ঞানকোষটির বর্ণনায় বাণিজ্যিক দিক থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রজাতি এপিস সেরানা ইন্ডিকা; আর বুনো প্রজাতি এপিস ডরসাটা বা বড় মৌমাছি বন, বড় গাছ এমনকি ঘরবাড়িতেও খোলা চাক বাঁধে, যার চাক থেকে সুন্দরবন ও মধুপুরের পেশাদার মৌয়ালরা মধু সংগ্রহ করেন। টাঙ্গাইলের গবেষণাটিতে অবশ্য পরীক্ষিত সরিষা মাঠে প্রধান পরাগায়নকারী হিসেবে পাওয়া গেছে ইউরোপীয় মৌমাছি এপিস মেলিফেরাকে।
মাঠে ব্যবহৃত বাক্সগুলো কাঠের তৈরি, ভেতরে চাকসহ খুলে নেওয়া যায় এমন ফ্রেম থাকে; ফ্রেমগুলোর মধ্যে এমন মাপের ফাঁক রাখা হয়, যাতে মৌমাছি চলাচল করতে পারে কিন্তু মোম দিয়ে দুটি চাক জুড়ে না দেয়। এই 'বি স্পেস' বা মৌ-ফাঁকের কারণেই মৌচাষি কলোনি নষ্ট না করে ফ্রেম তুলে মৌমাছি পরীক্ষা করতে এবং মধু নিতে পারেন। বাংলাপিডিয়া মধু সংগ্রহের ধাপগুলো এভাবে দিয়েছে:
- চাক মধুতে ভরে গিয়ে মুখ বন্ধ হলে ফ্রেমগুলো বাক্স থেকে তোলা হয় এবং সেগুলো থেকে মৌমাছি সরিয়ে দেওয়া হয়;
- কোষগুলোর ওপরের পাতলা মোমের আবরণ ধারালো ছুরি দিয়ে চেঁছে ফেলা হয়;
- আবরণমুক্ত চাক মধু নিষ্কাশন যন্ত্রে (এক্সট্রাক্টর) দ্রুত ঘোরানো হয়, কেন্দ্রাতিগ বলে মধু বেরিয়ে আসে; এরপর চাক উল্টে অন্য পাশও খালি করা হয়;
- চাকগুলো আবার বাক্সে ফিরিয়ে দেওয়া হয়, যাতে মৌমাছি সেগুলো আবার ভরে তোলে।
একই অধ্যায়ে বলা হয়েছে, কিছু সফল মৌচাষি মধু-উদ্ভিদ বেশি এমন এলাকায় ঘুরে বেড়ান, যেমনটি গোয়ালন্দের দলটি করে; আর বাংলাদেশের সবচেয়ে পরিচিত মধু হলো সরিষা ফুলের মধু। মৌচাষিদের যেসব সমস্যার কথা সেখানে আছে, তার মধ্যে রয়েছে ঠাসাঠাসি বা অতিরিক্ত গরম বাক্সে মৌমাছির ঝাঁক বেঁধে চলে যাওয়া, আমেরিকান ও ইউরোপীয় ফাউলব্রুড নামের মারাত্মক রোগ, এবং পিঁপড়া, মোমপোকা, পাখি ও ইঁদুরের চাক নষ্ট করা। মধুর অভাবের মাসগুলোতে মৌমাছিকে চিনির শরবত খাওয়ানো হয়। দ্য ডেইলি স্টারের ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে সিরাজগঞ্জের এক মৌচাষি জানান, মধুহীন মৌসুমে প্রতিটি বাক্সে সপ্তাহে এক কেজি চিনি লাগে, আর সেই সময়টা পার করতে তার খরচ হয় ৫০ হাজার থেকে ৭৫ হাজার টাকা। নতুন যারা শুরু করতে চান, কলোনির স্বাস্থ্য নিয়ে তাদের উপজেলা কৃষি কার্যালয় বা প্রশিক্ষিত মৌচাষির পরামর্শ নেওয়া উচিত।
প্রশিক্ষণের সুযোগও আছে। বাংলাপিডিয়া জানায়, ডিএই সময়ে সময়ে উপজেলা পর্যায়ে মৌচাষ প্রশিক্ষণ দেয় এবং প্রশিক্ষণার্থীদের মৌবাক্স সরবরাহ করে; বিসিক ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব এপিকালচারও বাণিজ্যিক ও শৌখিন মৌচাষিদের প্রশিক্ষণ দেয় এবং শীতকালে প্রধান সরিষা এলাকায় ভ্রাম্যমাণ মৌচাষের আয়োজন করে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিসিকের উন্নয়ন বিভাগের একজন ব্যবস্থাপক দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, করপোরেশনটি প্রতিবছর ৪৮০ জনকে প্রশিক্ষণ দেয় এবং শুরু করার জন্য প্রত্যেক প্রশিক্ষণার্থীকে দুয়েকটি মৌবাক্স দেয়।
কীটনাশক ও মধুর নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন
জাগো নিউজের প্রতিবেদনে উদ্ধৃত স্থানীয় বাসিন্দারা মধুর প্রশংসা করলেও একটি উদ্বেগের কথাও তোলেন। মো. মানিক পত্রিকাটিকে বলেন, 'এই সরিষা ফুলের মধু খুব ভালো। আমরা খেয়েছি। রোদ উঠলে মৌমাছিগুলো বাক্স থেকে বেরিয়ে গুনগুন শব্দে মাঠে ছড়িয়ে পড়ে। দেখতে ভালো লাগে, দূর-দূরান্ত থেকে অনেকেই দেখতে আসেন।'
আরেক স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল হালিম বলেন, 'গোয়ালন্দে অন্য জেলা থেকে মৌচাষিরা এসে মৌবাক্স বসিয়ে মধু সংগ্রহ করেন। এ মধু অরজিনাল হলেও কৃষকেরা ক্ষেতে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার করায় কতটুকু নিরাপদ তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তাই এ বিষয়ে কৃষি অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে কৃষকদের সচেতন করার উচিত।' এ বিষয়ে কৃষি বিভাগের কোনো বক্তব্য প্রতিবেদনে ছিল না, আর গোয়ালন্দের মধুর কোনো পরীক্ষার খবরও প্রতিবেদনে আসেনি।
ফুল ফোটা ফসলে কীটনাশক ব্যবহার মৌমাছির জন্য একটি জানা ঝুঁকি। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) তাদের কীটনাশক নিবন্ধন টুলকিটে উল্লেখ করেছে, মৌমাছি সাধারণত দিনের আলোয় সক্রিয় থাকে এবং রাতে বাক্স বা চাকে থাকে; তাই মৌমাছি সক্রিয় নয় এমন সময়ে, অর্থাৎ সন্ধ্যা বা রাতে স্প্রে করা ক্ষতি কমানোর একটি উপায়। সংস্থাটি এর সীমাও উল্লেখ করেছে: এই উপায় কেবল সেসব কীটনাশকের ক্ষেত্রে খাটে, যা ফসলের ওপর দ্রুত ভেঙে যায়; আর সন্ধ্যায় আন্তর্বাহী (সিস্টেমিক) কীটনাশক দিলেও পরে পরাগ বা ফুলের রসে তার অবশেষ থেকে যেতে পারে। ফুল ফোটা সরিষায় স্প্রে করতে হলে কোন ওষুধ কখন দেওয়া উপযুক্ত, তা কৃষকেরা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কাছ থেকে জেনে নিতে পারেন।

সারা দেশে মধু উৎপাদন ও সরিষা মৌসুম
দেশের মধু উৎপাদনের অনুমান নানা সূত্রে নানা রকম। ২০২১ সালের জানুয়ারিতে দ্য ডেইলি স্টার জানায়, বাংলাদেশে প্রায় ২৫ হাজার মৌচাষি সরিষা, ধনিয়া ও কালোজিরার মাঠ, লিচুবাগান এবং সুন্দরবন থেকে মধু সংগ্রহ করেন; দেশে বছরে প্রায় ১০ হাজার টন মধু উৎপাদিত হয় এবং মূল মৌসুম নভেম্বর থেকে এপ্রিল; বিসিকের মৌচাষ প্রকল্পের সাবেক প্রধানের মতে, মোট মধুর প্রায় ৮০ শতাংশ সংগ্রহ হয় সরিষা মৌসুমে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে একই পত্রিকা বিভিন্ন প্রতিবেদন ও জরিপের বরাতে জাতীয় উৎপাদন বছরে ৩০ হাজার থেকে ৪০ হাজার টন বলে উল্লেখ করে, যার বেশির ভাগ সুন্দরবনের বুনো মধু; অন্যদিকে বিসিকের একজন ব্যবস্থাপক জানান, আগের বছর মৌচাষিরা ৭ হাজার টনের প্রক্ষেপণ ছাড়িয়ে ৭ হাজার ৪৪৯ দশমিক ৪০ টন মধু সংগ্রহ করেছিলেন। বাংলাপিডিয়ার মধু অধ্যায়ে সুন্দরবনকে প্রধান উৎপাদক বলা হয়েছে, আর এক-ফুলের মধুর মধ্যে এর পরেই গুরুত্বপূর্ণ সরিষা, আম ও বরই ফুলের মধু।
দ্য ডেইলি স্টারের ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ডিএইর সরিষা আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ১১ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৬ হেক্টর বলে উল্লেখ করা হয়, যার মধ্যে প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার ১৭১ হেক্টর মধু সংগ্রহে ব্যবহৃত; সেই মৌসুমে ৯৩ হাজার ৪৭৮টি মৌবাক্স বসানো হয়েছিল, আর বিশেষজ্ঞদের অনুমান ছিল ১৫ লাখ কেজির বেশি মধু সংগ্রহ হতে পারে। মধুর অন্যতম প্রধান জেলা সিরাজগঞ্জে ২০২৫ সালে প্রত্যাশিত মধু সংগ্রহ ছিল ৪০০ টন, আগের বছর যা ছিল ৩৮২ টন। পত্রিকাটি আরও জানায়, বাংলাদেশে মাথাপিছু মধু খাওয়ার পরিমাণ বছরে প্রায় ১০০ গ্রাম, আর রপ্তানি মাত্র কয়েক শ টনে সীমিত, যার বড় বাধা মান ও মানসম্মতকরণের সমস্যা।
গোয়ালন্দের প্রতিবেদনের সমসময়ের খবরেও অন্য এলাকায় মৌসুম পুরোদমে চলার চিত্র মেলে। ২০২৬ সালের ২৫ জানুয়ারি ঢাকা ট্রিবিউন রাজশাহী থেকে জানায়, ডিএই সেই রবি মৌসুমে রাজশাহী বিভাগের আট জেলায় ৩ লাখ ৮৯ হাজার হেক্টর জমি থেকে প্রায় ৬ লাখ ৪৬ হাজার টন সরিষা আশা করছিল, আর রাজশাহী কৃষি অঞ্চল প্রায় সাত টন মধু উৎপাদনের লক্ষ্য ঠিক করেছিল। গোদাগাড়ী উপজেলার এক কৃষক পত্রিকাটিকে বলেন, মৌবাক্স বসিয়ে সেখানে বিঘাপ্রতি ৩ থেকে ৫ কেজি মধু সংগ্রহ করা যায়; আর ওই অঞ্চলের ডিএইর অতিরিক্ত পরিচালক বলেন, মধু সংগ্রহ প্রতিবছর নতুন নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে।
ছবি: Belayet2014 / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, দ্য ডেইলি স্টার, ঢাকা ট্রিবিউন, প্রথম আলো, বাংলা ট্রিবিউন, জার্নাল অব বায়োডাইভার্সিটি কনজারভেশন অ্যান্ড বায়োরিসোর্স ম্যানেজমেন্ট (শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা), বাংলাপিডিয়া, এফএও কীটনাশক নিবন্ধন টুলকিট





মন্তব্য
(০)