করোনা মহামারির শুরুতে ২০২০ সালে চাকরি হারানো নেত্রকোনার এক ব্যক্তি ২০২৬ সালের জানুয়ারির মধ্যে ১৫০টি মৌবাক্সের একটি মৌচাষ উদ্যোগ গড়ে তুলেছিলেন। সেই শীতে তিনি জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার সরিষা ক্ষেতের পাশে বাক্সগুলো বসিয়ে সরিষা ফুলের মধু সংগ্রহ করছিলেন। ২০২৬ সালের ২৩ জানুয়ারি জামালপুর থেকে পাঠানো এক প্রতিবেদনে জাগো নিউজ তার গল্প তুলে ধরে।
এই মৌচাষি নেত্রকোনার বারহাট্টা উপজেলার মধুপুর গ্রামের রমজান আলীর ছেলে মোহাম্মদ শাহ আলম। তার সংসারে স্ত্রী, দুই ছেলে ও দুই মেয়ে আছে। পত্রিকাটিকে তিনি জানান, করোনার আগে তিনি নারায়ণগঞ্জের একটি প্রতিষ্ঠানে মাসিক ৩০ হাজার টাকা বেতনে চাকরি করতেন। নিয়মিত বেতনের চাকরিতে সংসার মোটামুটি স্বচ্ছলভাবে চলছিল। ২০২০ সালে করোনা এসে সব হিসাব উল্টে দেয়, চাকরি হারিয়ে তিনি বেকার হয়ে পড়েন।
চাকরি হারানো থেকে প্রশিক্ষণ
তিনি জানান, চাকরি হারিয়ে প্রথমদিকে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। সংসারের খরচ আর সন্তানদের ভবিষ্যৎ মিলিয়ে গভীর অনিশ্চয়তায় পড়ে যান। তবে হাল ছাড়েননি; তার বিশ্বাস ছিল, পরিশ্রম করলে পথ বের হবেই। এমন সময় ইউটিউবে মৌবাক্স দিয়ে মধু উৎপাদনের ভিডিও দেখে তিনি নিজেও কিছু করতে আগ্রহী হন।
এরপর তিনি গাজীপুরে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) থেকে মৌমাছি ও মধু উৎপাদন বিষয়ে প্রশিক্ষণ নেন। সেখানে মৌমাছির জীবন, মধু সংগ্রহ ও মৌবাক্স ব্যবস্থাপনা ধাপে ধাপে শেখেন। প্রশিক্ষণ শেষে তিনি বুঝতে পারেন, মধুই হতে পারে তার নতুন জীবনের অবলম্বন। সাহস করে ১ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে ২৫টি মৌবাক্স কিনে তিনি কাজ শুরু করেন।
শুরুটা সহজ ছিল না। মৌমাছির যত্ন, আবহাওয়ার প্রভাব, ফুলের প্রাপ্যতা, সবই ছিল তার কাছে নতুন। ধৈর্য আর পরিশ্রম দিয়ে তিনি এগিয়ে যান, সময়ের সঙ্গে বাড়তে থাকে অভিজ্ঞতা ও আত্মবিশ্বাস। পত্রিকাটিকে তিনি বলেন, ‘প্রথম প্রথম মধু কম সংগ্রহ হলেও গত দুই বছর ধরে ভালো হচ্ছে।’
যে বছর তিনি চাকরি হারান, সেই বছরটি আগে থেকে এ পেশায় থাকা মৌচাষিদের জন্যও কঠিন ছিল। ২০২০ সালের এপ্রিলে শিল্প মন্ত্রণালয়ের এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে দেশের সর্বত্র গণপরিবহন সীমিত থাকায় মৌচাষি ও মৌয়ালরা মধু সংগ্রহে সমস্যায় পড়ছেন। বিশেষ করে সুন্দরবনে মধু সংগ্রহের মৌসুম শুরু হওয়ায় সেখানে যেতে মৌয়ালদের কোনো বাধা এলে বিসিক সর্বাত্মক সহায়তা দেবে বলে তখন জানানো হয়।
ইসলামপুরের সরিষা মাঠের পাশে ১৫০টি বাক্স
২০২৫-২৬ সালের শীত মৌসুমে সরিষা ফুলের মধুর জন্য শাহ আলম তার বাক্স নিয়ে আসেন জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলায়। বিস্তীর্ণ সরিষা ক্ষেতের পাশে সারি সারি বাক্স বসান। তখন তার মৌবাক্স ছিল ১৫০টি, আর প্রতিটি বাক্স থেকে দেড় থেকে ২ কেজি পর্যন্ত মধু পাওয়া যাচ্ছিল। তিনি বলেন, ‘সরিষা ফুলের মধুর জন্য জামালপুরে এসেছি। এখানে সরিষার আবাদ অনেক হয়। ১০ দিন পর পর বাক্স থেকে মধু সংগ্রহ করি। এই মৌসুমে ৩ থেকে ৫ লাখ টাকার সরিষার মধু বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছি।’
শুধু সরিষা নয়, একই বাক্স দিয়ে তিনি লিচু ফুলের মধু, কালোজিরার মধু এবং সুন্দরবনের মধুও সংগ্রহ করেন। বছরের ৬ থেকে ৮ মাস তিনি এ কাজে ব্যস্ত থাকেন; ফুলের মৌসুম ধরে বাক্স নিয়ে এক জেলা থেকে আরেক জেলায় যান। সংগ্রহ করা মধু তিনি মূলত পাইকারি বাজারে বিক্রি করেন। তার এই উদ্যোগে চারজন শ্রমিক কাজ করছেন।
তিনি বলেন, ‘সরিষা ও লিচু ফুলের মধু সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায়। পাইকারি প্রতিটি মণ ১২ হাজার টাকায় বিক্রি করি। কালোজিরার মধু এবং সুন্দরবনের খাঁটি মধু যদিও কম পরিমাণে পাওয়া যায়, তবে এর দাম তুলনামূলক বেশি।’ বিক্রির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ভালো মানের খাঁটি মধু হওয়ায় বিক্রি নিয়ে কোনো চিন্তা করতে হয় না। নিয়মিত ক্রেতারা আগেভাগেই অর্ডার দিয়ে রাখেন। ক্ষেত থেকেই বিভিন্ন কোম্পানি মধু নিয়ে যায়। এ ছাড়া খুচরাও অনেকেই কেনেন।’
তার বলা পাইকারি দাম সেই শীতে জেলার অন্যদের বক্তব্যের সঙ্গেও মেলে। ২০২৬ সালের ৪ জানুয়ারি জামালপুর থেকে পাঠানো এক প্রতিবেদনে রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা বাসস এক মধু ব্যবসায়ীর বক্তব্য তুলে ধরে; তিনি জানান, এক মণ (৪০ কেজি) মধুর বাজারমূল্য ১১ হাজার ৫০০ থেকে ১২ হাজার টাকা, তবে তার অভিযোগ, সিন্ডিকেটের কারণে তারা কম দাম পাচ্ছেন। পাঁচ বছর ধরে মধুর ব্যবসা করা আরেক ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের কথা অস্বীকার করে বলেন, জেলায় কোনো বড় ব্যবসায়ী নেই, আর এ মৌসুমে প্রতি মণ খাঁটি সরিষার মধু ১১ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। একই প্রতিবেদনে এক বিপণন কর্মকর্তা জানান, খুচরা বাজারে প্রতি কেজি সরিষার মধু ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

আয় দিয়ে বাড়ছে মৌবাক্স
শাহ আলম জানান, মধু থেকে পাওয়া আয়ের বড় অংশ তিনি সঞ্চয় করেন না; সংসার চালানোর পাশাপাশি তা পুঁজিতে পরিণত করেন। তার ভাষায়, ‘প্রতি বছর আয় থেকে নতুন করে মৌবাক্স কিনে সংখ্যা বৃদ্ধি করছি। একটি মৌবাক্সের দাম ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা। শুরুতে আমার ছিল মাত্র ২৫টি বাক্স, আজ ১৫০টি বাক্স। যা বর্তমানে আমার বিশাল পুঁজি।’
এ পেশার একটি অভাবের মৌসুমও আছে। তিনি বলেন, ‘বর্ষাকাল বা ফুলের মৌসুম না থাকলে মৌমাছিদের চিনি খাওয়াতে হয়। এতে ৩-৫ লাখ টাকার মতো খরচ হয়। এ ছাড়া পরিবহন, থাকা-খাওয়া ও অন্যান্য ব্যয় বাদ দিলেও প্রতি বছর মোটা অঙ্কের লাভ থাকে।’
প্রতিবেদনে বলা হয়, মৌচাষ তার পরিবারের আর্থিক অবস্থা বদলে দিয়েছে; ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি এখন আতঙ্ক নয়, আত্মবিশ্বাস নিয়ে ভাবেন। তিনি বলেন, ‘চাকরি হারানোটা তখন অনেক কষ্টের ছিল। কিন্তু এখন মনে হয়, ওই ঘটনাই আমাকে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সুযোগ করে দিয়েছে। যদি সাহস না করতাম, তাহলে আজ এই অবস্থানে আসতে পারতাম না।’ পত্রিকাটি তার গল্পকে বেকার যুবক ও কর্মহীন মানুষের জন্য একটি উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরে; সেখানে বলা হয়, সঠিক প্রশিক্ষণ, পরিশ্রম ও ধৈর্য থাকলে কৃষিভিত্তিক উদ্যোগ দিয়েও সম্মানজনক জীবন গড়া সম্ভব।
জামালপুরে ২০২৫-২৬ সালের সরিষার মধুর মৌসুম
সেই শীতে মৌচাষিরা যে জেলাগুলোতে গিয়েছিলেন, জামালপুর তার একটি। ২০২৬ সালের ৪ জানুয়ারি বাসসকে দেওয়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ সালে জেলায় কৃষকেরা ৪০ হাজার ৯৮২ হেক্টর জমিতে সরিষা চাষ করেন, যার ২ হাজার ৪০৫ হেক্টর সরিষা ক্ষেত থেকে মধু সংগ্রহ করা হচ্ছিল। ২২ জন মধু সংগ্রহকারী ৩ হাজার ৬৬৫টি মৌবাক্স বসিয়েছিলেন, আর ততদিনে ৫ হাজার ২৫৫ কেজি মধু সংগ্রহ হয়েছিল।
ডিএইর হিসাবে বাক্সগুলোর মধ্যে জামালপুর সদরে ২৪০টি, সরিষাবাড়ীতে ৫৫৫টি, মেলান্দহে ৭৮০টি, ইসলামপুরে ৩৬০টি, দেওয়ানগঞ্জে ৬৮০টি এবং বকশীগঞ্জে ১ হাজার ৫০টি বসানো হয়। একই সময় পর্যন্ত ইসলামপুরে ৩ জন সংগ্রহকারী ৩৭০ কেজি, মেলান্দহে ৩ জন ১ হাজার ৩২৫ কেজি এবং বকশীগঞ্জে ৬ জন ১ হাজার ৬৯০ কেজি মধু সংগ্রহ করেছিলেন।
মৌসুমের শুরুটা ধীর ছিল। জামালপুর ডিএইর উপপরিচালক বাসসকে জানান, এ বছর কয়েকটি উপজেলায় সরিষা দেরিতে বোনা হয়েছে, ফলে ফুলও দেরিতে আসছে; তা ছাড়া আবহাওয়া অনুকূলে না থাকায় মধু সংগ্রহকারীর সংখ্যা কমে গেছে। মেলান্দহে ২৫০টি বাক্স বসানো ফরিদপুরের এক মধু সংগ্রহকারী জানান, সূর্যের আলো কম থাকায় মধু সংগ্রহ সন্তোষজনক নয়; আরও ১০ দিন মধু সংগ্রহ করে তিনি অন্য জেলায় চলে যাবেন।
আগের শীতে ব্যস্ততা ছিল বেশি। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ২০২৫ সালের ৪ জানুয়ারি ডিএইর তথ্য উদ্ধৃত করে জানায়, ২০২৪-২৫ মৌসুমে জামালপুরে ৪১ হাজার ৫৫০ হেক্টর জমিতে সরিষা চাষ হয় এবং ৪ হাজার ৬১৫ হেক্টর থেকে মধু সংগ্রহ করা হচ্ছিল। বিভিন্ন জেলা থেকে আসা প্রায় ৪৫ জন মধু সংগ্রহকারী সাতটি উপজেলায় ৭ হাজার ২৮৭টি বাক্স বসান, যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি, ২ হাজার ৮১২টি, ছিল ইসলামপুরে। ২০২৪ সালের ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত ১০ হাজার ৫৩০ কেজি মধু সংগ্রহ হয়। ডিএইর উপপরিচালক তখন জানান, তার আগের মৌসুমে ৩৪ জন সংগ্রহকারী ৫ হাজার ৬৪৩টি বাক্স বসিয়ে ২৬ হাজার ৪৫০ কেজি মধু সংগ্রহ করেছিলেন। ওই প্রতিবেদনে গাজীপুর থেকে প্রায় ১৭৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে সরিষা মৌসুমে ইসলামপুরে আসা এক মৌচাষির কথাও ছিল।

ইসলামপুর ও বারহাট্টা
শাহ আলম যেখানে বাক্স বসিয়েছিলেন, সেই ইসলামপুর জামালপুর জেলার উত্তরে। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী উপজেলাটির আয়তন ৩৫৩.৩১ বর্গকিলোমিটার; এর উত্তরে দেওয়ানগঞ্জ ও বকশীগঞ্জ, দক্ষিণে মাদারগঞ্জ ও মেলান্দহ উপজেলা। প্রধান নদী যমুনা, পুরাতন ব্রহ্মপুত্র ও বাঙালি। ইসলামপুর থানা গঠিত হয় ১৯১৪ সালে, উপজেলা হয় ১৯৮৩ সালে। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী এখানকার ৬৮.৮৩ শতাংশ মানুষের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি; প্রধান ফসলের তালিকায় ধান, পাট, গম, আখ, আলু, ডাল, বেগুন ও সবজির সঙ্গে সরিষাও আছে। বাংলাপিডিয়ায় উল্লেখ আছে, সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমলে বাংলার সুবাদার ইসলাম খান কিছুদিন এ অঞ্চলে ছিলেন এবং ধারণা করা হয় তার নামেই ইসলামপুরের নাম।
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী পুরো জামালপুর জেলার আয়তন ২ হাজার ১১৫.১৬ বর্গকিলোমিটার; যমুনা, পুরাতন ব্রহ্মপুত্র, বানার ও ঝিনাই এর প্রধান নদী। ২০১১ সালের আদমশুমারিতে জেলার ৬৫.৫০ শতাংশ মানুষের আয়ের প্রধান উৎস ছিল কৃষি।
শাহ আলমের নিজের উপজেলা বারহাট্টা নেত্রকোনা জেলায়। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী এর আয়তন ২২০ বর্গকিলোমিটার; উত্তরে কলমাকান্দা ও ধর্মপাশা, দক্ষিণে আটপাড়া ও মোহনগঞ্জ উপজেলা। প্রধান নদী কংস, কাওনাই ও সোমেশ্বরী। বারহাট্টা থানা গঠিত হয় ১৯০৫ সালে, উপজেলা হয় ১৯৮৩ সালে। ২০১১ সালের আদমশুমারিতে এর জনসংখ্যা ছিল ১ লাখ ৮০ হাজার ৪৪৯ জন; ৭৩.৫৩ শতাংশ মানুষের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি, আর প্রধান ফসল ধান, পাট, আলু, কলাই, সরিষা ও সবজি।
মৌচাষিরা কেন সরিষার পেছনে ছোটেন
সরিষা রবি মৌসুমের তেলবীজ ফসল। বাংলাপিডিয়া জানায়, কয়েক দশক আগেও সরিষার তেলই ছিল বাংলাদেশের একমাত্র রান্নার তেল, আর প্রায় সব জেলাতেই সরিষার চাষ হয়। মৌচাষিদের কাছে এর আকর্ষণ দীর্ঘ ফুলের মৌসুম। ২০২১ সালের জানুয়ারিতে দ্য ডেইলি স্টারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সরিষা ফুল ফোটে ৪০ থেকে ৬০ দিন, যা অন্য যেকোনো ফসলের চেয়ে বেশি। ২০১৯ সাল পর্যন্ত সাত বছর বিসিকের একটি মৌচাষ প্রকল্পের নেতৃত্ব দেওয়া এক সাবেক কর্মকর্তা পত্রিকাটিকে জানান, দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ মধু সংগ্রহ হয় সরিষার মৌসুমে।
মৌমাছি ফসলেরও উপকার করে। বিসিকের ওই সাবেক প্রকল্পপ্রধান ডেইলি স্টারকে বলেন, সরিষা ক্ষেতে মৌচাষ করলে বিঘাপ্রতি ফলন ১৫ শতাংশ বাড়ে, যদিও আগে ফলন কমে যাওয়ার আশঙ্কায় অনেক কৃষক মৌচাষিদের ক্ষেতে ঢুকতে দিতে চাইতেন না। পাবনার এক কৃষক পত্রিকাটিকে জানান, জমিতে মৌচাষিদের বাক্স বসাতে দেওয়ার পর তার বিঘাপ্রতি ফলন ৪ থেকে সাড়ে ৪ মণ থেকে বেড়ে সাড়ে ৬ মণ হয়। অন্য জেলায় ডিএই কর্মকর্তারাও কাছাকাছি হিসাব দিয়েছেন: ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে টাঙ্গাইলের এক অতিরিক্ত উপপরিচালক ডেইলি স্টারকে বলেন, ক্ষেতের পাশে মৌ কলোনি বসালে উৎপাদন ১৫ থেকে ২০ শতাংশ বাড়ে; ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে মানিকগঞ্জের এক উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ইত্তেফাককে বলেন, পরাগায়নের ফলে সরিষার প্রায় ১০ শতাংশ ফলন বাড়ে; আর ২০২৬ সালের ৭ জানুয়ারি সিরাজগঞ্জের এক অতিরিক্ত উপপরিচালক দেশ রূপান্তরকে বলেন, এতে শস্যের উৎপাদন ১৫ শতাংশ বাড়ে।
দেশ রূপান্তরের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫-২৬ মৌসুমে সিরাজগঞ্জে ১ লাখ ৪৬ হাজার হেক্টর জমিতে সরিষা চাষ হচ্ছে, আর মধু সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ৪০৪ টন। মৌমাছি বাঁচাতে সরিষা ফুলে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার বন্ধে কৃষকদের সচেতন করার দাবি জানান সেখানকার মৌচাষিরা। জেলা ডিএই জানায়, মৌবাক্স স্থাপনের সঠিক দূরত্ব ও প্রতি একর জমিতে কতটি বাক্স বসানো উপযুক্ত, সে বিষয়ে মৌচাষিদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে এবং মৌমাছির যাতে ক্ষতি না হয়, সে জন্য কীটনাশক ব্যবহারে সতর্ক থাকতে কৃষকদের সচেতন করা হচ্ছে।
জাতীয় পর্যায়ে, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে দ্য ডেইলি স্টার জানায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ডিএই ১১ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৬ হেক্টর জমিতে সরিষা চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরেছিল, যার ১ লাখ ২৫ হাজার ১৭১ হেক্টরে মধু সংগ্রহের ব্যবস্থা রাখা হয়। সে বছর ৯৩ হাজার ৪৭৮টি মৌবাক্স বসানো হয়েছিল, আর বিশেষজ্ঞরা এ থেকে ১৫ লাখ কেজি মধু পাওয়ার আশা করছিলেন।
মৌমাছি, মৌবাক্স ও বিসিক
বাংলাপিডিয়ার ব্যাখ্যায়, মৌমাছি পালন হলো মৌমাছির কলোনির এমন পরিচর্যা, যাতে তারা নিজেদের প্রয়োজনের চেয়ে বেশি মধু জমা করে। বাংলাদেশে বাণিজ্যিক মৌচাষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রজাতি এশীয় মৌমাছি Apis cerana indica; আর বন্য বড় মৌমাছি Apis dorsata বনে ও উঁচু গাছে চাক বাঁধে, যার চাক থেকে সুন্দরবন, মধুপুর ও অন্যান্য বনাঞ্চলের পেশাদার মৌয়ালরা মধু সংগ্রহ করেন। পোষা মৌমাছি থাকে খোলা-লাগানো যায় এমন ফ্রেমওয়ালা কাঠের বাক্সে; ফ্রেমগুলোর মাঝে প্রায় ১.০ সেন্টিমিটার ফাঁক রাখা হয়, যাকে বলে ‘বি স্পেস’, যে ফাঁক মৌমাছি মোম দিয়ে জোড়া না দিয়ে চলাচলের জন্য খোলা রাখে। চাক মধুতে ভরে মুখ ঢাকা পড়লে ধারালো ছুরিতে মোমের পাতলা আবরণ চেঁছে ফেলে ফ্রেমগুলো এক্সট্রাক্টরে দ্রুত ঘোরানো হয়; কেন্দ্রবিমুখী বলে মধু বেরিয়ে আসে, আর খালি চাক আবার বাক্সে ফিরিয়ে দেওয়া হয় মৌমাছিদের ভরার জন্য।
২০২৪ সালের নভেম্বরে মালয়েশিয়ার ইউনিভার্সিটি মালয়েশিয়া সাবাহতে অনুষ্ঠিত টেকসই কৃষিবিষয়ক তৃতীয় আন্তর্জাতিক সম্মেলনে উপস্থাপিত বাংলাদেশের মৌচাষ বিষয়ক এক সারসংক্ষেপে এর ইতিহাস তুলে ধরা হয়: ১৯৭৭ সালে বিসিক Apis cerana দিয়ে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মৌচাষ শুরু করে; ১৯৯০ সালে দুজন মৌচাষি ভারত থেকে ইউরোপীয় মৌমাছি Apis mellifera আনেন; আর ১৯৯৬ সাল থেকে বিসিক সফলভাবে মেলিফেরা কলোনি পরিচালনা করে। সারসংক্ষেপটি বলছে, মেলিফেরা বেশি পরাগ বহন করে, কম আক্রমণাত্মক এবং সেরানার চেয়ে বেশি মধু দেয়, তাই পরাগায়নে এর কদর বেশি।
বাংলাপিডিয়া জানায়, বিসিকের যাত্রা ১৯৫৭ সালের এক আইনের অধীনে পূর্ব পাকিস্তান ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন হিসেবে; স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে এর নাম হয় বিসিক। ক্ষুদ্র, কুটির ও গ্রামীণ শিল্প প্রসারে এটিই প্রধান সরকারি প্রতিষ্ঠান। বাংলাপিডিয়া আরও জানায়, বিসিক, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব এপিকালচার ও ডিএই মৌচাষ প্রশিক্ষণ দেয়; ডিএই উপজেলা পর্যায়ে প্রশিক্ষণের সঙ্গে প্রশিক্ষণার্থীদের মৌবাক্সও দেয়, আর শীতে প্রধান সরিষা এলাকাগুলোতে ভ্রাম্যমাণ মৌচাষের আয়োজন করা হয়। ২০২০ সালের এপ্রিলে বিসিক জানায়, সারা দেশে তাদের ছয়টি মৌমাছি পালন কেন্দ্র আছে এবং দেশে প্রায় ৮ হাজার মৌচাষি রয়েছেন; বিসিকের মৌচাষ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক তখন বলেন, দেশে আড়াই হাজার মৌ খামার ও ১ লাখ ২০ হাজারের বেশি মৌবাক্স আছে, যেখান থেকে বছরে গড়ে ১০ হাজার মেট্রিক টন মধু উৎপাদিত হয়।
ঋণ একটি পুরোনো সমস্যা। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে বিসিকের টাঙ্গাইলের এক সহকারী মহাব্যবস্থাপক ডেইলি স্টারকে বলেন, কয়েক বছর আগে মৌচাষিদের প্রশিক্ষণ ও ২৫ হাজার টাকা করে ঋণ দেওয়া হয়েছিল, পরে সে কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায় এবং অনেকে ঋণ শোধ করতে পারেননি। মৌচাষিরা ঋণের পরিমাণ এক লাখ টাকা পর্যন্ত করার দাবি জানাচ্ছেন বলে তিনি জানান; সেই প্রস্তাব ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো হয়েছিল।
ফুলের পঞ্জিকা ধরে সারা বছর
শাহ আলমের মতো ভ্রাম্যমাণ মৌচাষিরা ফুলের পঞ্জিকা ধরে চলেন। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে মৌচাষিরা ডেইলি স্টারকে জানান, তারা বছরে পাঁচবার মধু সংগ্রহ করেন: নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে জানুয়ারির শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত সরিষা ফুল থেকে; জানুয়ারির শেষ সপ্তাহ থেকে মার্চের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত ধনিয়া ও কালোজিরা থেকে; মার্চে লিচু বাগান থেকে; মার্চ-এপ্রিলে সুন্দরবনের কেওড়া, খলিশা, গরান ও বাইন ফুল থেকে; আর মে-জুনে তিল থেকে। ২০২০ সালের এপ্রিলে বিসিক জানিয়েছিল, প্রতি বছর মার্চজুড়ে দিনাজপুর, নাটোর, মাগুরা, গাজীপুর, ঠাকুরগাঁও, রংপুরসহ বিভিন্ন জেলায় লিচু বাগানে মৌচাষ করে মধু সংগ্রহ করা হয়।
বাকি পাঁচ মাস ‘অফ সিজন’; মৌচাষিদের ভাষ্যে, তখন চিনি খাইয়ে মৌমাছিদের বাঁচিয়ে রাখা হয়। বাংলাপিডিয়া পদ্ধতিটি বর্ণনা করেছে: মৌমাছির মধুর ঘাটতি হলে দুই ভাগ চিনি ও এক ভাগ পানির সিরাপ দেওয়া যায়, ঢাকনায় কয়েকটি ছোট ছিদ্র করা উল্টানো কৌটায়। সেখানে প্রধান ব্যবস্থাপনা সমস্যার কথাও আছে, যেমন ভিড় ও গরম বাক্সে মৌমাছির ঝাঁক বেঁধে চলে যাওয়া, যা বাতাস চলাচল, বাক্সে বাড়তি জায়গা ও তরুণ রানি দিয়ে কমানো যায়; আর আমেরিকান ও ইউরোপিয়ান ফাউলব্রুড রোগ, যাকে বাংলাপিডিয়া বাংলাদেশে গুরুতর বলেছে। বাংলাপিডিয়া জানায়, ডিএইর উপজেলাভিত্তিক প্রশিক্ষণে মৌবাক্সের সঙ্গে এ ধরনের মৌমাছি ব্যবস্থাপনাও শেখানো হয়।
আবহাওয়া ও দাম এ পেশার বড় চাপ। ২০২২-২৩ মৌসুমে টাঙ্গাইলে কাজ করা সাতক্ষীরার এক মৌচাষি ডেইলি স্টারকে বলেন, শৈত্যপ্রবাহ ও ঘন কুয়াশায় তার মধু সংগ্রহ অর্ধেকে নেমেছে; তার ভাষ্য অনুযায়ী মধ্যস্বত্বভোগীরা আগের বছরের ৬ হাজার টাকার জায়গায় প্রতি মণ সরিষার মধুর দাম ৪ হাজার টাকার বেশি বলছিলেন না, আর চিনির দাম কেজিপ্রতি ৬০ টাকা থেকে বেড়ে ১২০ টাকা হয়েছিল। সেই প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে শাহ আলমের বলা প্রতি মণ ১২ হাজার টাকা এবং একই মাসে বাসসের প্রতিবেদনে আসা ১১ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকার দাম ২০২৫-২৬ মৌসুমে পাইকারি দামের অবস্থা দেখায়।

সুন্দরবনের মধু ও দেশের মধুর বাজার
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী মধু হলো ফুলের রস থেকে মৌমাছির তৈরি মিষ্টি ঘন তরল; এর রং, স্বাদ ও গন্ধ নির্ভর করে ফুলের ওপর, আর প্রধান উপাদান ফ্রুক্টোজ ও গ্লুকোজ। দেশে প্রাকৃতিক মধুর প্রধান উৎস সুন্দরবন, যেখানকার মধু মূলত গরান, গোলপাতা ও খলিশা ধরনের একফুলি মধু; খলিশার মধুর দাম বিশেষভাবে বেশি। একফুলি মধুর মধ্যে এর পরেই গুরুত্বপূর্ণ সরিষার মধু। শাহ আলম যে চার রকম মধু সংগ্রহ করেন, তার একটি সুন্দরবনের মধু বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছে: বাগেরহাটের জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে ২০১৭ সালের ৭ আগস্ট আবেদন করা হয়, ২০২৪ সালের জুনে পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর জার্নাল প্রকাশের জন্য পাঠায়, আর বিশ্ব মেধাসম্পদ দিবসের অনুষ্ঠানে সনদ তুলে দেওয়া হয় বলে ২০২৫ সালের ২ মে প্রথম আলো জানায়। তার আগে ২০২৪ সালে ভারত নিজেদের পণ্য হিসেবে সুন্দরবনের মধুর জিআই স্বীকৃতি নিয়েছিল।
দেশের মোট মধু উৎপাদনের হিসাব নানা রকম। ২০২১ সালের জানুয়ারিতে দ্য ডেইলি স্টার জানায়, দেশে বছরে প্রায় ১০ হাজার টন মধু উৎপাদিত হয় এবং মৌচাষি আছেন প্রায় ২৫ হাজার। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ঢাকায় পঞ্চম জাতীয় মৌমাছি ও মধু সম্মেলনে আয়োজক বি অ্যান্ড হানি অ্যাসোসিয়েশন জানায়, ২০২৪ সালে প্রাকৃতিক ও চাষের উৎস থেকে ২০ থেকে ২৫ হাজার টন মধু সংগ্রহ হয়েছে, যার ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ চাষের উৎস থেকে, আর দেশে মধুর বার্ষিক বাজার ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ডেইলি স্টারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে মাথাপিছু বছরে প্রায় ১০০ গ্রাম মধু খাওয়া হয়, আর প্রতি বছর মধুর ব্যবহার পাঁচ থেকে ১০ শতাংশ বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
২০২৩ সালে মৌচাষিরা ডেইলি স্টারকে জানান, মাঠের মধুর প্রধান ক্রেতা খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান; আর কিছু ব্যবসায়ী মৌচাষিদের কাছ থেকে মধু কিনে বিদেশে, বিশেষ করে ভারতে রপ্তানি করেন। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে শাহ আলম এই বাজারের কথাই বলেছিলেন: বিভিন্ন কোম্পানি ক্ষেত থেকেই মধু নিয়ে যায়, আর নিয়মিত ক্রেতারা আগেভাগে অর্ডার দিয়ে রাখেন।
ছবি: Shahnoor Habib Munmun / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 3.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, দ্য ডেইলি স্টার, দ্য ডেইলি স্টার বাংলা, দেশ রূপান্তর, দৈনিক ইত্তেফাক, ঢাকা টাইমস, প্রথম আলো, ঢাকা ট্রিবিউন, বাংলাপিডিয়া, ইউনিভার্সিটি মালয়েশিয়া সাবাহ (আইসিএসএ ২০২৪ সারসংক্ষেপ)





মন্তব্য
(০)