সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোনার বাটি আকৃতির বিশাল নিম্নভূমি হাওর বর্ষায় জলরাশি, শুষ্ক মৌসুমে কৃষিজমি, মাছের প্রজননক্ষেত্র আর পরিযায়ী পাখির আবাস। বাংলানিউজ২৪-এ প্রকাশিত কলামে জনসংযোগবিদ ও গবেষক এনামুল হক আরাফাত লিখেছেন, হাওরকে কেবল জলাবদ্ধ এলাকা বা কৃষিজমি হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত গুরুত্ব বোঝা যায় না; এর সুরক্ষা একই সঙ্গে কৃষি, মৎস্য, খাদ্যনিরাপত্তা ও গ্রামীণ অর্থনীতির প্রশ্ন।
লেখকের মতে, ২০২৬ সালে প্রণীত 'বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি সংরক্ষণ আইন' তালিকা, সীমানা নির্ধারণ, সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা ও ব্যবস্থাপনার আইনগত কাঠামো দিয়েছে, এমনকি পানি ধারণকারী স্তরের নিরাপদ সীমা ব্যাহত করে বা জলজ প্রাণী-উদ্ভিদের আবাস নষ্ট করে এমন পানি উত্তোলনও নিষিদ্ধ করেছে। এখন চ্যালেঞ্জ কার্যকর প্রয়োগ, পানিসম্পদ, পরিবেশ, কৃষি, মৎস্য, ভূমি ও স্থানীয় সরকারের মধ্যে সমন্বয় এবং স্থানীয় নজরদারি।
তিনি সতর্ক করেছেন, সড়ক, বাঁধ, অপরিকল্পিত স্থাপনা, জলাশয় ভরাট, অতিরিক্ত পানি উত্তোলন ও দূষণের সম্মিলিত প্রভাব পুরো হাওরে পড়ছে। বড় প্রকল্পের আগে পানিপ্রবাহ, মাছের প্রজনন, কৃষি ও জলবায়ুর ওপর প্রভাব বিবেচনা করতে হবে; জলাভূমিকে 'খালি জায়গা' ভাবার সংস্কৃতি বদলাতে হবে, কারণ তা বন্যার পানি ধরে, মাছের প্রজননক্ষেত্র জোগায়, মানুষের খাদ্য ও আয়ের উৎস হয়।
কলামের কেন্দ্রীয় প্রস্তাব গবেষণা। প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ হাওরের জন্য দীর্ঘমেয়াদি 'হাওর পরিবেশ পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা', যেখানে পানির গভীরতা ও মান, মাছের প্রজাতি ও প্রজনন, জলজ উদ্ভিদ ও পাখি, ভূমি ব্যবহার, পলি জমা, দূষণের উৎস ও আকস্মিক বন্যার ধরন নিয়মিত মাপা হবে। স্যাটেলাইট ছবি, জিআইএস, ড্রোন জরিপ ও মাঠের তথ্য মিলিয়ে একটি ডিজিটাল হাওর তথ্যভান্ডার গড়ার কথা বলেছেন তিনি, যাতে পরিবর্তন অনুমান নয়, তথ্যে বিশ্লেষণ করা যায়।
জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচির বাংলাদেশভিত্তিক নথিতে হাওরে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বন্যা, ক্ষয়, পলি জমা এবং কৃষি ও মৎস্যের ক্ষতির ঝুঁকির কথা এসেছে বলে লেখক উল্লেখ করেছেন। তাই শুধু বাঁধ নয়, কোথায় পানি থাকবে, কোথায় কৃষি, কোথায় মাছের অভয়াশ্রম, তা ঠিক করে অঞ্চলভিত্তিক জলবায়ু-সহনশীল পরিকল্পনা দরকার। জেলে, কৃষক, মাঝি ও নারীদের অংশীদার করা, প্রজনন মৌসুমে জেলেদের বিকল্প আয় এবং পরিবেশবান্ধব কৃষির কথাও বলেছেন তিনি।
জাতীয় পর্যায়ে একটি 'হাওর গবেষণা তহবিল' গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন লেখক, যার অগ্রাধিকার হবে জীববৈচিত্র্য, জলবায়ুর প্রভাব, নদী-হাওরের পানিপ্রবাহ, টেকসই মৎস্য ব্যবস্থাপনা, পরিবেশবান্ধব কৃষি, জিআইএস ও রিমোট সেন্সিংভিত্তিক পর্যবেক্ষণ এবং জলাভূমি পুনরুদ্ধার। প্রকল্পের সাফল্য কত টাকা খরচ বা কত কিলোমিটার সড়ক হলো তা দিয়ে নয়, পরিবেশগত ও সামাজিক ফল দিয়ে মাপার কথা বলেছেন তিনি। এ লেখার মত লেখকের নিজের।
লেখা: এনামুল হক আরাফাত, জনসংযোগবিদ ও গবেষক, হাওর রক্ষা, গবেষণা, উন্নয়ন ও জলাভূমি সংরক্ষণ ফোরাম; বাংলানিউজ২৪
ছবি: Priom Pritom / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0); সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর
সূত্র: বাংলা নিউজ ২৪





মন্তব্য
(০)