আয়োডিনযুক্ত লবণ আর ভিটামিন এ সমৃদ্ধ ভোজ্যতেলের পর এবার আটা ও ময়দায় ভিটামিন-খনিজ যোগ করার কথা ভাবা উচিত বলে মনে করেন খাদ্যবিজ্ঞানী, গবেষক ও খাদ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ড. শহীদুল ইসলাম। ঢাকা ট্রিবিউনে প্রকাশিত কলামে তিনি যুক্তরাজ্যের উদাহরণ টেনেছেন: সেখানে হোলমিল নয় এমন গমের আটায় আয়রন, ক্যালসিয়াম, থায়ামিন (ভিটামিন বি১) ও নিয়াসিন (বি৩) রাখা আইনত বাধ্যতামূলক, আর ১৩ ডিসেম্বর ২০২৬ থেকে ফলিক অ্যাসিডও বাধ্যতামূলক হওয়ার কথা।
লেখকের যুক্তি, বাংলাদেশের প্রধান খাদ্য চাল হলেও অনেক পরিবারে রান্নার আগে চাল কয়েকবার ধোয়া হয়, ভিজিয়ে রাখা হয় বা মাড় ফেলে দেওয়া হয়; এতে পানিতে দ্রবণীয় পুষ্টি কমে যেতে পারে। ফর্টিফাইড রাইস কার্নেল প্রযুক্তিগতভাবে সম্ভব, কিন্তু অসংখ্য ছোট চালকল, খরচ ও মান নিয়ন্ত্রণের কারণে জাতীয় পর্যায়ে তা জটিল। আটা-ময়দা সাধারণত ধোয়া হয় না, মিলেই নির্দিষ্ট মাত্রায় প্রিমিক্স মেশানো যায়, আর রুটি, পরোটা, বিস্কুট ও নুডলসের ব্যবহারও বাড়ছে।
তিনি ২০২৫ সালের বাংলাদেশ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে উদ্ধৃত করেছেন: ১২ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের প্রায় ৪৩.৯ শতাংশ এবং গর্ভবতী নারীদের প্রায় ৫৩.১ শতাংশ রক্তস্বল্পতায় ভুগছে। তবে রক্তস্বল্পতা মানেই আয়রনের ঘাটতি নয়; ফলিক অ্যাসিড ও বি১২-এর ঘাটতি, সংক্রমণ বা বংশগত হিমোগ্লোবিন সমস্যাও কারণ হতে পারে। গর্ভধারণের শুরুতে পর্যাপ্ত ফোলেট না থাকলে শিশুর নিউরাল টিউব ডিফেক্টের ঝুঁকি বাড়ে, আর অনেক নারী গর্ভধারণের কয়েক সপ্তাহ পর তা জানতে পারেন; তাই প্রতিদিনের খাবারে কিছু ফলিক অ্যাসিড পৌঁছানো কার্যকর হতে পারে।
কলামে জিঙ্ক ও ভিটামিন বি১২ অন্তর্ভুক্তির সম্ভাবনা বৈজ্ঞানিকভাবে যাচাইয়ের কথা বলা হয়েছে, কারণ আগের জাতীয় জরিপে শিশু ও নারীদের উল্লেখযোগ্য জিঙ্ক ঘাটতি পাওয়া গিয়েছিল। আয়রনের কোন যৌগ ব্যবহার হবে, শরীর কতটা শোষণ করবে, আটার স্বাদ-রঙ বদলাবে কি না, সংরক্ষণে পুষ্টি কতটা টিকবে, সেসবও বিবেচনায় নিতে হবে।
বাস্তবায়নে প্রিমিক্সের মান, ডোজিং যন্ত্রের নিয়মিত ক্যালিব্রেশন, মিশ্রণের সমতা পরীক্ষা এবং বাজার থেকে নমুনা যাচাই জরুরি। ছোট ও মাঝারি মিলগুলোকে সহজ প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা দিয়ে আনতে না পারলে সুফল সীমিত থাকবে। খরচ বাড়বে, তবে মাথাপিছু হিসাবে তা অপুষ্টির চিকিৎসা ব্যয় ও কর্মক্ষমতা হারানোর তুলনায় কম হতে পারে বলে লেখকের মত।
তাঁর প্রস্তাব, বাধ্যতামূলক করার আগে হালনাগাদ জাতীয় মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট জরিপ করে এবং অঞ্চল ও বয়সভেদে মানুষ কতটা আটা খায় তা জেনে বাংলাদেশের নিজস্ব মান ঠিক করা হোক; যুক্তরাজ্যের সূত্র হুবহু নকলের দরকার নেই। ফর্টিফিকেশন সুষম খাদ্যের বিকল্প নয়, বরং একটি বাড়তি পুষ্টি-নিরাপত্তা বেষ্টনী। এ লেখার মত লেখকের নিজের।
লেখা: ড. শহীদুল ইসলাম, খাদ্যবিজ্ঞানী ও খাদ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, ঢাকা ট্রিবিউন
ছবি: Mudd1 / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0); গমের আটা
সূত্র: ঢাকা ট্রিবিউন





মন্তব্য
(০)