কাঁচা আমের টুকরো দিয়ে টক করা আর শেষে ঘি, জিরা ও শুকনো মরিচের ফোড়ন দেওয়া ডাল, অর্থাৎ কাঁচা আমের ডাল ফ্রাই। গ্রীষ্মের আমের মৌসুমের মাঝামাঝি, ২০২৬ সালের ২৭ মে বাংলা সংবাদমাধ্যম জাগো নিউজ ২৪-এর লাইফস্টাইল ডেস্ক পাঠকদের জন্য এই রান্নার রেসিপি প্রকাশ করে। ডেস্কের পরামর্শ ছিল, মৌসুম শেষ হওয়ার আগেই, রান্নাঘরে কাঁচা আম থাকতে থাকতে পদটি রেঁধে ফেলা। গরম ভাতের সঙ্গে খাওয়ার সহজ একটি ঘরোয়া পদ হিসেবেই তারা এটি তুলে ধরে।
রেসিপিতে মসুর বা মুগ, যেকোনো একটি ডাল ব্যবহার করা যায়। ডাল ভিজিয়ে রেখে প্রেসার কুকারে লবণ, হলুদ ও কাঁচা আমের টুকরোর সঙ্গে সেদ্ধ করা হয়, তারপর তাতে গরম ফোড়ন মেশানো হয়। ডেস্কের ভাষায়, কাঁচা আমের হালকা টক স্বাদ আর ফোড়নের ঘ্রাণ মিলে পদটি রুচি বাড়ায়। তারা আরও লিখেছে, টক-মিষ্টি স্বাদের কাঁচা আম শুধু শরবত বা আচারেই নয়, ভাতের সঙ্গে খাওয়ার নানা পদেও ভিন্ন মাত্রা আনে। রান্না শেষে ডাল পাতলা ঝোলের মতো রাখা যায়, আবার ঘন ও মাখামাখা করেও খাওয়া যায়; ঘন রূপটি অনেকের কাছে ডাল মাখা নামে পরিচিত।
নিচে মূল রেসিপির উপকরণ ও রান্নার ধাপ তুলে দেওয়া হলো। এরপর আছে পদটির প্রতিটি অংশের পটভূমি: কাঁচা আম ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে ২০২৬ সালের আম সংগ্রহের মৌসুম, রেসিপির দুই ডাল এবং দেশে সেগুলোর চাষ, ফোড়নের মসলা ও ঘি, আর ডাল নিয়ে খাদ্য ও পুষ্টি বিষয়ক কর্তৃপক্ষ কী বলে।
উপকরণ
প্রকাশিত রেসিপিতে আটটি উপকরণের কথা বলা হয়েছে:
- ডাল (মসুর বা মুগ): ১ কাপ
- কাঁচা আম: ২টি
- হলুদগুঁড়া: ১ চা চামচ
- পানি: ২ কাপ
- ঘি: ২ টেবিল চামচ
- জিরা: ১ টেবিল চামচ
- শুকনো মরিচ: ২ থেকে ৩টি
- লবণ: স্বাদমতো
আমের খোসা ছাড়াতে হবে কি না, তালিকায় তা বলা নেই; রান্নার ধাপে শুধু বলা হয়েছে, আমের টুকরো আঁটিসহ কুকারে দিতে হবে। তালিকার পানির পরিমাণ শুরুর একটি মাপ; রান্নার ধাপে প্রয়োজনমতো পানি দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, আর ডাল কতটা ঘন হবে তা রাঁধুনির পছন্দের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
রান্নার ধাপ
- ডাল ভালো করে ধুয়ে ৩০ মিনিট পানিতে ভিজিয়ে রাখুন।
- প্রেসার কুকারে ভেজানো ডাল, প্রয়োজনমতো পানি, লবণ, হলুদ এবং আঁটিসহ কাঁচা আমের টুকরো দিন।
- ঢাকনা বন্ধ করে মাঝারি আঁচে বসিয়ে দিন। ৩ থেকে ৫টি সিটি হয়ে গেলে চুলা বন্ধ করুন।
- ভেতরের ভাপ স্বাভাবিকভাবে বের হয়ে যাওয়ার পর কুকারের ঢাকনা খুলুন।
- আলাদা একটি ছোট কড়াইয়ে ঘি গরম করে শুকনো মরিচ ও জিরা দিয়ে ফোড়ন তৈরি করুন।
- ফোড়নটি রান্না করা ডালে ঢেলে ভালোভাবে মিশিয়ে নিন।
- ডাল আরও ঘন চাইলে ঢাকনা ছাড়া অল্প আঁচে আরও কিছুক্ষণ রান্না করুন।
- গরম ভাত, আচার বা যেকোনো ভাজা পদের সঙ্গে পরিবেশন করুন।
ঘনত্ব পুরোপুরি রুচির ব্যাপার। ডেস্ক লিখেছে, ডাল হালকা পাতলা ঝোলের মতো রাখা যায়, আবার জ্বাল দিয়ে ঘন ও মাখামাখা করেও নেওয়া যায়; সাদা ভাতের মতোই আচার বা ভাজা পদের সঙ্গেও এটি ভালো মানায়।
ডাল ভিজিয়ে রাখার পেছনে বাস্তব কারণ আছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) ২০১৬ সালের আন্তর্জাতিক ডাল বর্ষ উপলক্ষে প্রকাশিত পুষ্টিবিষয়ক তথ্যপত্রে উল্লেখ করেছে, ডালকে খাটো করে দেখার একটি কারণ হলো, কয়েক ঘণ্টা না ভেজালে ডাল সেদ্ধ হতে অনেক সময় লাগে। একই তথ্যপত্র অনুযায়ী, ভেজানো, অঙ্কুরিত করা, গাঁজানো ও কোটার মতো প্রচলিত পদ্ধতি পেট ফাঁপা, বায়ু ও দীর্ঘ রান্নার সময়ের সমস্যা কাটাতে সাহায্য করে, আর অ্যান্টি-নিউট্রিয়েন্টের পরিমাণও কমাতে পারে। অ্যান্টি-নিউট্রিয়েন্ট হলো ডালের এমন কিছু উপাদান, যা ডালে থাকা খনিজ শরীরে শোষণের ক্ষমতা কমিয়ে দেয়।
বাঙালির রান্নাঘরে কাঁচা আম
আম গাছের বৈজ্ঞানিক নাম ম্যাঙ্গিফেরা ইন্ডিকা (Mangifera indica)। অ্যানাকার্ডিয়েসি পরিবারের এই চিরসবুজ গাছ উচ্চতায় ও বিস্তারে প্রায় ৩০ মিটার পর্যন্ত হতে পারে। বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া বলছে, চাষ করা আমের উৎপত্তি প্রাচীনকালের অতলে হারিয়ে গেছে, তবে উদ্যানজাত আমের রূপগুলো এম. ইন্ডিকা থেকে এসেছে বলে ধারণা করা হয়, যার আদি নিবাস ধরা হয় বাংলাদেশ, আসাম ও মিয়ানমারসহ ভারতীয় উপমহাদেশের পূর্বাঞ্চলকে। বাংলাপিডিয়ার বাংলা সংস্করণ জানায়, জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত আম গাছে মুকুল আসে।
পাকার আগেই আম রান্নায় ব্যবহারের অভ্যাস এ অঞ্চলে পুরোনো। বাংলাপিডিয়ার ভাষায়, "তরকারি বা ডালে বাড়তি স্বাদ আনার জন্যও কাঁচা আম ব্যবহৃত হয়।" কাঁচা ও পাকা উভয় প্রকার আম দিয়ে জ্যাম, জেলি, স্কোয়াশ, চাটনি ও আচার তৈরি হয় বলেও জ্ঞানকোষটি উল্লেখ করেছে। জাগো নিউজের রেসিপিও সেই ধারা মেনে চলে: শুরু থেকেই আম ডালের সঙ্গে হাঁড়িতে যায় এবং ডালের সঙ্গেই সেদ্ধ হয়।
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রায় ১০০ রকমের আমের জাত পাওয়া যায়। উন্নত জাত হিসেবে জ্ঞানকোষটি ফজলি, ল্যাংড়া, গোপালভোগ, হিমসাগর, ক্ষীরশাপাত, আশ্বিনা, কিষাণভোগ, কুয়াপাহাড়ি, লতা বোম্বাই, ফোরিয়া, বোম্বাই, কোহিতুর, লক্ষ্মণভোগ, মোহনভোগ ও মিশ্রিভোগের নাম দিয়েছে; আর বীজ থেকে জন্মানো স্থানীয় জাতগুলো দেশি বা গুটি আম নামে পরিচিত। উন্নত জাতগুলোর বেশির ভাগ জন্মে রাজশাহী, নবাবগঞ্জ (বর্তমান চাঁপাইনবাবগঞ্জ) ও দিনাজপুর এলাকায়।
বাংলাপিডিয়ায় জাতীয় উৎপাদনের যে হিসাব আছে তা ২০০৫-০৬ সালের: সে বছর দেশে প্রায় ৬ লাখ ৩৯ হাজার ৮২০ মেট্রিক টন আম উৎপাদিত হয়েছিল, প্রায় ৬ লাখ ৪১ হাজার ৫২৫ একর জমিতে। এরপর উৎপাদন অনেক বেড়েছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে দ্য ডেইলি স্টারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে বছরে ২৪ থেকে ২৫ লাখ টন আম উৎপাদিত হয়; বাণিজ্যিক আম চাষ হয় ২৩টি জেলায়, আর সারা দেশে চাষ হয় ৭২টি জাত।
কয়েকটি জাতের আইনি স্বীকৃতিও আছে। ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে চাঁপাইনবাবগঞ্জের ক্ষীরশাপাত আম, যা হিমসাগর নামেও জনপ্রিয়, পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর (ডিপিডিটি) থেকে ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি পায়। দ্য ডেইলি স্টার জানায়, ইলিশ ও জামদানির পর এটিই ছিল দেশের তৃতীয় জিআই পণ্য। চাঁপাইনবাবগঞ্জের চাষিদের পক্ষে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে আবেদন করেছিল। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, আশ্বিনার পরই ক্ষীরশাপাত দেশের দ্বিতীয় সর্বাধিক চাষ হওয়া জাত, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে যার আবাদ ছিল ১ লাখ ৩ হাজার একরে; আর আশ্বিনা, ল্যাংড়া ও হাঁড়িভাঙার জিআই স্বীকৃতির জন্যও বারি আবেদন করেছিল।
উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে ২০২৬ সালের আমের মৌসুম
রেসিপিটি যখন প্রকাশিত হয়, তখন আমের জেলাগুলোতে মূল সংগ্রহ মৌসুম শুরু হচ্ছিল। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১০ মে রাজশাহী জেলা প্রশাসন জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মেলনকক্ষে আম পরিবহন, বিপণন ও সংগ্রহবিষয়ক এক সভায় চলতি বছরের ম্যাঙ্গো ক্যালেন্ডার বা আম সংগ্রহের সময়সূচি ঘোষণা করে। আমচাষি, ব্যবসায়ী ও কৃষি বিভাগকে নিয়ে সময়সূচিটি তৈরি করা হয়েছিল, আর তা ভঙ্গ করলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানানো হয়।
রাজশাহীর সময়সূচি অনুযায়ী প্রধান জাতগুলো সংগ্রহের অনুমতি ছিল এই তারিখগুলো থেকে:
- সব ধরনের গুটি (স্থানীয়) আম: ১৫ মে
- গোপালভোগ: ২২ মে
- রানীপছন্দ ও লক্ষ্মণভোগ: ২৫ মে
- হিমসাগর বা ক্ষীরশাপাত: ৩০ মে
- বানানা ম্যাঙ্গো ও ল্যাংড়া: ১০ জুন
- আম্রপালি ও ফজলি: ১৫ জুন
- বারি আম-৪: ৫ জুলাই
- আশ্বিনা: ১০ জুলাই
- গৌড়মতি: ১৫ জুলাই
- কাটিমন ও বারি আম-১১: সারা বছর
রাজশাহীর জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম বলেন, নির্ধারিত তারিখের আগে কেউ যেন অপরিপক্ব আম সংগ্রহ ও বাজারজাত করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতেই সময়সূচিটি চালু করা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালে জেলায় আম চাষ হয়েছিল ১৯ হাজার ৬২ হেক্টর জমিতে, উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২ লাখ ৪৩ হাজার ৯৯৩ টন। কেজিপ্রতি আনুমানিক ৩২ টাকা দরে এই আমের বাজারমূল্য প্রায় ৭৮০ কোটি টাকা হবে বলে আশা করা হচ্ছিল।
পাশের জেলা নওগাঁ নিজস্ব সময়সূচি ঠিক করে। ইউএনবির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মে মাসে নওগাঁর জেলা প্রশাসক যে সময়সূচি ঘোষণা করেন, তাতে ২২ মে গুটি আম দিয়ে মৌসুম শুরু হয়; এরপর ২৮ মে গোপালভোগ, ২ জুন ক্ষীরশাপাত ও হিমসাগর, ৫ জুন জিআই স্বীকৃত নাক ফজলি, ১০ জুন ল্যাংড়া ও হাঁড়িভাঙা এবং ১৮ জুন জেলার সবচেয়ে বেশি চাষ হওয়া জাত রূপালী। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) নওগাঁর হিসাবে সে বছর জেলায় আমের আবাদ ছিল ৩০ হাজার ৩০০ হেক্টরে, আর সম্ভাব্য ফলন ৩ লাখ ৬৬ হাজার টন।
উৎপাদিত আমের সামান্য অংশই বিদেশে যায়। দ্য ডেইলি স্টার ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে জানায়, সেই মৌসুমে আম রপ্তানি দাঁড়িয়েছিল ২ হাজার ১৯৪ টনে; ডিএইর হিসাবে ২০২৪ সালে রপ্তানি ছিল ১ হাজার ৩২১ টন এবং ২০২৩ সালে ৩ হাজার ১০০ টন। সবচেয়ে বেশি, ৬৮৬ টন আম কিনেছিল যুক্তরাজ্য; এরপর ছিল সৌদি আরব, ইতালি, কুয়েত ও কাতার, আর বাংলাদেশের আম পৌঁছেছিল ২৬টি দেশে। পত্রিকাটির তথ্যমতে, রপ্তানি শুরু হয় মে মাসের শেষ দিকে এবং চলে সেপ্টেম্বরের শেষ পর্যন্ত।

মসুর ও মুগ: রেসিপির দুই ডাল
রেসিপির দুটি ডালই ডালজাতীয় শস্য বা পালস। এফএওর সংজ্ঞায় পালস হলো শিম্বগোত্রীয় বা লেগিউমিনোসি পরিবারের সেই উদ্ভিদ, যার শুকনো, খাওয়ার উপযোগী ও কম চর্বিযুক্ত বীজ মানুষ ও প্রাণী খায়। সবজি হিসেবে খাওয়া কাঁচা মটরশুঁটি বা শিম, কিংবা তেলের জন্য চাষ করা সয়াবিন ও চীনাবাদামকে সংস্থাটি পালস হিসেবে গণ্য করে না। সাধারণভাবে খাওয়া ডালের তালিকায় এফএও মসুর (লেন্স কুলিনারিস) ও মুগ (ভিগনা রেডিয়াটা) দুটিকেই রেখেছে। দক্ষিণ এশিয়ায় ডাল বলতে শুকনো ভাঙা দানা এবং তা দিয়ে রান্না করা পদ, দুটোকেই বোঝায়।
বাংলাপিডিয়া মসুরকে শীতকালীন ফসল হিসেবে বর্ণনা করেছে, যা মাঝারি মাত্রায় খরা সইতে পারে, কিন্তু জলাবদ্ধতায় খুবই সংবেদনশীল। আস্ত মসুর দানায় প্রায় ২৫ শতাংশ আমিষ, ১ শতাংশ চর্বি, ৫৫.৮ শতাংশ শর্করা, ৩.৭ শতাংশ আঁশ এবং ১১.২ শতাংশ পানি থাকে। ভাঙা দানা ডাল হিসেবে স্যুপে রান্না হয়, আর মসুরের আটা শস্যের আটার সঙ্গে মিশিয়ে পিঠা তৈরি হয়; অসুস্থ মানুষ ও শিশুর খাবার হিসেবেও মসুর ব্যবহৃত হয়।
বাংলাপিডিয়ার ডালশস্য বিষয়ক ভুক্তি অনুযায়ী, দেশে প্রধান ডাল ছয়টি: মসুর, মুগ, মাষকলাই, ছোলা, খেসারি ও মটর। সবগুলোই রবি বা শীত মৌসুমের ফসল, চাষ হয় মূলত পশ্চিম ও উত্তরাঞ্চলে। ডালে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ আমিষ থাকে, আর এর লাইসিনের পরিমাণ প্রাণিজ আমিষের সঙ্গে তুলনীয় হওয়ায় ডালকে "গরিবের মাংস" বলা হয়। ভুক্তিটি জানায়, মসুর সব শ্রেণির মানুষের কাছে জনপ্রিয় এবং প্রায় প্রতিবেলার খাবারেই থাকে।
মুগ ডালের উৎপত্তি দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়। বাংলাপিডিয়া বলছে, বাংলাদেশে মুগ প্রচলিতভাবে শীতের মাসগুলোতে চাষ হয়, প্রধান উৎপাদন এলাকা বরিশাল ও পটুয়াখালী; ভুক্তিটিতে আবাদের পরিমাণ প্রায় ৫৪ হাজার ৯৮২ হেক্টর এবং উৎপাদন প্রায় ৩৪ হাজার ৪০০ মেট্রিক টন দানা বলে উল্লেখ আছে। মুগ আস্ত বা ভাঙা অবস্থায় ডাল হিসেবে, মিষ্টান্নে ও ভাজা নাশতায় খাওয়া হয়, এর কচি চারা সবজি হিসেবে রান্না হয়, আর শুকনো কাণ্ড ও খোসা গবাদিপশুকে খাওয়ানো হয়। জ্ঞানকোষটি হলুদ দানার সোনামুগকে প্রধানত দানার জন্য চাষ হওয়া সবুজ দানার মুগ থেকে আলাদা করে দেখিয়েছে।

দেশে মসুর চাষের চিত্র
উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের হিসাব থেকে সেখানে এই ফসলের আকার বোঝা যায়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা বাসস জানায়, ডিএই সেই রবি মৌসুমে রাজশাহী বিভাগে ৩০ হাজার ৩১১ হেক্টর জমি থেকে প্রায় ৫২ হাজার ৩৮৬ টন মসুর পাওয়ার আশা করছিল। এর মধ্যে রাজশাহী কৃষি অঞ্চলের চার জেলায় ১৮ হাজার ৫৩৬ হেক্টর থেকে ৩০ হাজার ৬৭১ টন, আর বগুড়া অঞ্চলের চার জেলায় ১৩ হাজার ৭৭৫ হেক্টর থেকে ২১ হাজার ৭১৫ টন উৎপাদনের লক্ষ্য ছিল।
ডিএইর অতিরিক্ত পরিচালক ড. আজিজুর রহমান বাসসকে বলেন, অধিদপ্তর কৃষকদের বারি মসুর-১ থেকে বারি মসুর-৯ পর্যন্ত আধুনিক জাত সরবরাহ করছে। তাঁর কথায়, মসুরে খুব কম সেচ লাগে, আর এই ফসলে রাসায়নিক নাইট্রোজেন সার দিতে হয় না, কারণ মসুর পরের মৌসুমের জন্য মাটিতে নাইট্রোজেন রেখে যায়। বারির প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. শাখাওয়াত হোসেন বলেন, আমন ধান কাটার পর সাধারণত তিন মাসের বেশি পতিত পড়ে থাকা বরেন্দ্র অঞ্চলের প্রায় ৮০ হাজার হেক্টর জমিতে মসুর চাষ করা গেলে উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়তে পারে। প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ এখনো বিপুল পরিমাণ মসুর আমদানি করে।
ফসল তোলার সময়, ২০২৬ সালের মার্চে, ঢাকা ট্রিবিউন বরেন্দ্র অঞ্চল থেকে জানায়, ডিএইর হিসাবে সেই মৌসুমে শুধু রাজশাহী জেলাতেই ২৪ হাজার ১৩০ হেক্টর জমিতে মসুর চাষ হয়েছিল, যেখানে সরিষা ছিল ২১ হাজার ২৫২ হেক্টরে। তানোর ও গোদাগাড়ী উপজেলার কৃষকেরা ভালো ফলনের কথা জানান এবং বলেন, মসুর মণপ্রতি (৪০ কেজি) প্রায় ৩ হাজার ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল। তানোর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাইফুল্লাহ আহমেদ বলেন, অনুকূল আবহাওয়ায় বরেন্দ্র অঞ্চলে সরিষা, মসুর, মটর ও আলুর বাম্পার ফলন হয়েছে, আর মসুরের উৎপাদন বাড়ায় আমদানিনির্ভরতা কমছে।
বরেন্দ্র অঞ্চলে ডিএই সবচেয়ে বেশি জোর দিচ্ছিল বারি মসুর-৮ জাতের ওপর। জার্নাল অব প্ল্যান্ট রেজিস্ট্রেশনস-এ ২০২২ সালে প্রকাশিত মো. শাহীন উজ জামান ও সহকর্মীদের এক গবেষণাপত্রে উল্লেখ আছে, বারির ডাল গবেষণা কেন্দ্র ২০১৫ সালে উচ্চফলনশীল ও বায়োফর্টিফায়েড এই মসুর জাতটি অবমুক্ত করে। গবেষণাপত্র অনুযায়ী জাতটির ফলন সম্ভাবনা হেক্টরপ্রতি ১ হাজার ৯৭৩ কেজি, দানায় লৌহ কেজিপ্রতি ৭৪ মিলিগ্রাম ও দস্তা কেজিপ্রতি ৬১ মিলিগ্রাম, আর পাকতে সময় লাগে ১১৫ থেকে ১২০ দিন। ডিএইর কর্মকর্তারা বাসস ও ঢাকা ট্রিবিউনকে জাতটিকে দস্তা ও লৌহসমৃদ্ধ এবং ২৭.৮ শতাংশ আমিষযুক্ত বলে বর্ণনা করেন।
হলুদ, জিরা, শুকনো মরিচ ও ঘি
রেসিপিতে শুরু থেকে ডালের সঙ্গে সেদ্ধ হওয়া একমাত্র মসলা হলুদ। এটি আসে কারকুমা লংগা (Curcuma longa) থেকে, যা আদা পরিবারের বহুবর্ষজীবী উদ্ভিদ এবং ভারতীয় উপমহাদেশ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার স্থানীয় গাছ। এর কন্দ বা রাইজোম সাধারণত সেদ্ধ করে, শুকিয়ে গুঁড়া করা হয়; গাঢ় কমলা-হলুদ রঙের এই গুঁড়া অনেক দিন ভালো থাকে এবং এশিয়ার নানা রান্নায় তরকারির রং ও স্বাদের জন্য ব্যবহৃত হয়। এর স্বাদ উষ্ণ ও খানিকটা তেতো, ঘ্রাণ মাটির মতো।
জিরা (Cuminum cyminum) অ্যাপিয়েসি পরিবারের একটি সপুষ্পক উদ্ভিদ, যার আদি নিবাস ইরান-তুরান অঞ্চল। রান্নায় যাকে জিরার দানা বলা হয়, তা আসলে ছোট শুকনো ফল, যার প্রতিটির ভেতরে একটি বীজ থাকে; বহু দেশের রান্নায় তা আস্ত বা গুঁড়া করে ব্যবহার হয়। বাংলাপিডিয়ার মসলা বিষয়ক ভুক্তিতে জিরাকে দেশের সাধারণ মসলাগুলোর একটি বলা হয়েছে এবং উল্লেখ করা হয়েছে, বিপুল পরিমাণ মসলা ভারত, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া থেকে আমদানি হয়; দেশে সাধারণভাবে চাষ হওয়া মসলার মধ্যে আদা, রসুন, হলুদ, পেঁয়াজ, মরিচ ও ধনিয়ার নাম সেখানে আছে।
বাংলাদেশের রান্নাঘরের মরিচ, ক্যাপসিকাম ফ্রুটেসেন্স (Capsicum frutescens), সোলানেসি বা বেগুন পরিবারের উদ্ভিদ। বাংলাপিডিয়া জানায়, এটি প্রধানত কুমিল্লা, নোয়াখালী, ফরিদপুর, বরিশাল, পটুয়াখালী ও বগুড়ায় শীত মৌসুমে চাষ হয়; আবাদ প্রায় ৬৬ হাজার ২৩৫ হেক্টরে এবং বছরে উৎপাদন প্রায় ৫২ হাজার ২১৫ মেট্রিক টন। শুকনো মরিচ গুঁড়া করে তরকারির মসলা তৈরি হয়, সস ও আচারেও ব্যবহৃত হয়। এই রেসিপিতে শুকনো মরিচ আস্ত অবস্থায় ঘিয়ে অল্প ভেজে নেওয়া হয়।
ঘি হলো পরিশোধিত মাখন, ভারতীয় উপমহাদেশে উদ্ভূত একটি রান্নার চর্বি, যা সাধারণত গরু বা মহিষের দুধের মাখন থেকে তৈরি হয়। এর বাদামের মতো ঘ্রাণ এবং উচ্চ স্মোক পয়েন্টের কারণে ঘি পুড়ে না গিয়ে বেশি তাপে গরম করা যায়, তাই এর কদর। রেসিপিতে প্রথমে ঘি গরম করা হয়, তারপর তাতে মরিচ ও জিরা পড়ে, আর সেই গরম ফোড়ন ডালে ঢেলে নেড়ে মিশিয়ে দেওয়া হয়।

ডাল ও আমের পুষ্টি নিয়ে কর্তৃপক্ষ যা বলে
এফএওর ২০১৬ সালের তথ্যপত্র অনুযায়ী, ডালে সাধারণত গমের মতো গোটা দানাশস্যের প্রায় দ্বিগুণ আমিষ থাকে, আর উন্নয়নশীল দেশগুলোর বেশির ভাগ মানুষের কাছে দানাশস্যই আমিষের বড় উৎস। তথ্যপত্রে আরও বলা হয়েছে, দানাশস্যের সঙ্গে ডাল খেলে উদ্ভিদভিত্তিক খাদ্যের আমিষের মান উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে, যেমনটা ঘটে ভাতের সঙ্গে ডাল খেলে; আর শস্যের সঙ্গে খেলে শরীর ডালের লৌহ ও অন্যান্য খনিজ ভালোভাবে শোষণ করতে পারে।
একই তথ্যপত্র বলছে, ডালের গ্লাইসেমিক ইনডেক্স কম, চর্বি কম ও আঁশ বেশি; ডাল ফোলেটের মতো ভিটামিনের ভালো উৎস এবং গ্লুটেনমুক্ত। এফএওর মতে, উচ্চ লৌহের কারণে ডাল নারী ও শিশুদের লৌহের অভাবজনিত রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধে কার্যকর খাবার, বিশেষ করে ভিটামিন সি-যুক্ত খাবারের সঙ্গে খেলে লৌহ শোষণ বাড়ে; উদাহরণ হিসেবে সংস্থাটি মসুরের তরকারিতে লেবুর রস ছিটিয়ে দেওয়ার কথা বলেছে। অন্যদিকে খাবারের সঙ্গে চা বা কফি পান করলে উল্টো ফল হয় বলে তথ্যপত্রে উল্লেখ আছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) ফুডডেটা সেন্ট্রাল তথ্যভান্ডার অনুযায়ী, লবণ ছাড়া সেদ্ধ করা পরিপক্ব মসুরের ১০০ গ্রামে থাকে ১১৬ কিলোক্যালরি, ৯.০২ গ্রাম আমিষ, ০.৩৮ গ্রাম চর্বি, ৭.৯ গ্রাম খাদ্য আঁশ, ৩.৩৩ মিলিগ্রাম লৌহ এবং ১৮১ মাইক্রোগ্রাম ফোলেট। কাঁচা আমের ভুক্তিতে, যেখানে সবুজ ও পাকা আম আলাদা করা হয়নি, প্রতি ১০০ গ্রামে ৬০ কিলোক্যালরি, ১.৬ গ্রাম আঁশ এবং ৩৬.৪ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি দেখানো হয়েছে।
এগুলো সাধারণ হিসাব। এক হাঁড়ি ডালে কতটা লবণ ও ঘি পড়ল এবং কতটা খাওয়া হলো, তার ওপর এক বাটি ডালের পুষ্টিমান নির্ভর করে। ডায়াবেটিস, কিডনির রোগ বা অন্য কোনো শারীরিক সমস্যা থাকলে, কিংবা চিকিৎসকের দেওয়া খাদ্যতালিকা মেনে চললে, খাবারে পরিবর্তন আনার আগে চিকিৎসক বা যোগ্য পুষ্টিবিদের পরামর্শ নিন।

ছবি: Roboture / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বাংলাপিডিয়া, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, দ্য ডেইলি স্টার, ইউএনবি, বাসস, ঢাকা ট্রিবিউন, এফএও, ইউএসডিএ ফুডডেটা সেন্ট্রাল, জার্নাল অব প্ল্যান্ট রেজিস্ট্রেশনস





মন্তব্য
(০)