ফরিদপুর জেলার সদরপুর উপজেলা সদর বাজারের পাশের একটি খালের তীরজুড়ে ২০২৬ সালের এপ্রিলে প্রায় অর্ধশত বিশালাকৃতির গুইসাপ অবাধে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। বাজার, ময়লার ভাগাড়, ঝোপঝাড়, এমনকি বাড়ির উঠানেও প্রকাশ্যে চলাফেরা করছিল এগুলো, ২০২৬ সালের ২২ এপ্রিল এমন খবর দেয় জাগো নিউজ। ব্যবসায়ী ও বাসিন্দারা জানান, বাজারের বর্জ্য খেয়ে বেঁচে থাকা প্রাণীগুলো এত বছরে কারও ক্ষতি করেনি, বরং অনেকের কাছে এরা প্রায় বন্ধুর মতো হয়ে উঠেছে। উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা, ফরিদপুরের বন বিভাগ এবং উপজেলা প্রশাসন সবাই প্রাণীগুলো রক্ষার কথা বলেন।
আরটিভি ২০ এপ্রিল সোমবার সকালে খালপাড়ে সরেজমিনে গিয়ে ২১ এপ্রিল প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাদের ভাষায়, গুইসাপগুলো বাজারের এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। সংখ্যা নিয়ে দুই প্রতিবেদনে ভিন্নতা আছে: জাগো নিউজে উদ্ধৃত বাসিন্দা ও উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার হিসাবে সংখ্যাটি ৫০ থেকে ৬০টির মতো, আর আরটিভি লিখেছে, এলাকায় দুই শতাধিক গুইসাপের বসবাস। বন্যপ্রাণী জরিপের মাধ্যমে কোনো গণনার খবর পাওয়া যায়নি।
খালপাড়ে গুইসাপের জীবন
জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, উপজেলা সদর বাজার সংলগ্ন খালের তীরজুড়ে প্রায় দুই যুগ, অর্থাৎ প্রায় ২৪ বছর ধরে দলবদ্ধভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে বিশালাকৃতির গুইসাপগুলো। প্রথমে দুই থেকে চারটি দেখা গেলেও বংশবিস্তারের মাধ্যমে এখন এগুলোর সংখ্যা প্রায় ৫০ থেকে ৬০টি। বাসিন্দাদের ধারণা, একেকটির ওজন ৩০ থেকে ৪০ কেজির মতো; তবে কেউ কোনোটি ওজন করে দেখেছেন, এমন তথ্য প্রতিবেদনে নেই।
বাজার ও আশপাশের বাড়িঘর থেকে যা ফেলে দেওয়া হয়, সেটিই এদের খাবার: পচা মাছ, মরা মুরগি, জবাই করা গরু-ছাগলের হাড় ও নাড়িভুঁড়ি। আরটিভির প্রতিবেদকও একই দৃশ্য দেখেছেন; তিনি লিখেছেন, বাজারের দোকান থেকে ফেলে দেওয়া পচা মাছ, মরা মুরগি এবং জবাই করা গরুর হাড় ও ভুঁড়িই এদের প্রধান খাদ্য। বাসিন্দাদের মতে, এই আবর্জনা খেয়ে গুইসাপগুলো বাজার-ঘাট আর বাড়ির আঙিনা পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে।
এলাকার মানুষ জানান, প্রাণীগুলো শুধু ময়লা-আবর্জনা ও পচা-গলা খাবার খায়; সামনে দিয়ে হাঁস-মুরগি হেঁটে গেলেও গেরস্তের হাঁস-মুরগি বা অন্য কিছুর ক্ষতি করে না। স্থানীয়রা দেখলে এদের খাবার দেন। সদরপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা সব্যসাচী মজুমদার জাগো নিউজকে বলেন, আট থেকে দশটি মিলে দলবদ্ধভাবে এদের বিচরণ করতে দেখা যায়; এখানে পর্যাপ্ত খাবার থাকায় এরা অন্য কোথাও যায় না, আর মানুষ খাবার দেওয়ায় তাদের সঙ্গে এক ধরনের বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে।
ব্যবসায়ী ও বাসিন্দারা যা বললেন
বাজারের পরিচ্ছন্নতাকর্মী চন্দন জাগো নিউজকে বলেন, "বাজারের ময়লা ঝাড়ু দিয়ে পরিষ্কার করি। গুইসাপগুলো ময়লা-আবর্জনা খেয়ে আমার অনেকটা পরিশ্রম কমিয়ে দেয়।"
বাজারের ব্যবসায়ী মিজান হাওলাদার জানান, গুইসাপগুলো কোথা থেকে কীভাবে এসেছে, তা কারও জানা নেই। এরা মানুষের কোনো ক্ষতি করে না, বরং বাজারে জমে থাকা ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কারে সহায়ক ভূমিকা রাখে; এ কারণে কেউ তাদের তাড়িয়ে দেয় না, বরং নিরাপদে থাকতে সাহায্য করে। তাঁর ভাষায়, "অচেনা কোনো মানুষ দেখলে ভয় পাবে। প্রথমে আমরাও ভয় পেলেও এখন আর দেখে কেউ ভয় পায় না।" সবাই এদের উপকারী বন্ধু মনে করে, অনেকেই খেতে দেয়, আর এরা নিজেদের মতো করে সর্বত্র ঘুরে বেড়ায়।
বাজারের আরেক ব্যবসায়ী জিন্নাত আলী খান বলেন, দেখে মনে হয় আকারভেদে একেকটির ওজন এক থেকে দেড় মণের মতো। বাজারে, ঝোপঝাড়ে ও খোলা জায়গায় এদের বিচরণ; মাঝে মাঝে আশপাশের বাড়ির উঠানেও চলে আসে। তিনি বলেন, "তবে এগুলো সম্পূর্ণ নিরীহ প্রাণী। এখন পর্যন্ত কাউকে কামড়ানো বা কারও ক্ষতি করেছে শুনিনি।" ফলে এদের নিয়ে তেমন ভয় নেই, এলাকাবাসী এদের উপস্থিতি স্বাভাবিকভাবেই মেনে নিয়েছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. নুরুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, প্রায় দুই যুগ আগে দুই থেকে তিনটি গুইসাপ প্রথম দেখা যায়, এখন সংখ্যা প্রায় ৫০ থেকে ৬০টি। দেখতে বিশালাকৃতির, তাঁর ধারণায় একেকটির ওজন ৩০ থেকে ৪০ কেজি। মানুষের ফেলে দেওয়া পচা-গলা খাবার খায়, পাশ দিয়ে হাঁস-মুরগি ঘুরে বেড়ালেও খায় না; এ কারণেই মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠেছে বলে তিনি মনে করেন। প্রাণীগুলোকে বিলুপ্তপ্রায় উল্লেখ করে তিনি প্রশাসন ও সংশ্লিষ্টদের কাছে এদের অবাধ বিচরণ ও সংরক্ষণের দাবি জানান। তাঁর কথায়, "না হলে এক সময় প্রাণীগুলো হারিয়ে যাবে।"
নাম উল্লেখ না করে ব্যবসায়ী ও বাসিন্দাদের বরাতে আরটিভিও একই চিত্র তুলে ধরে: গুইসাপগুলো মানুষের ক্ষতি করে না, বাজারের ময়লা পরিষ্কারে সাহায্য করে, এখন আর কেউ এদের তাড়ায় না, আর মাঝেমধ্যে আশপাশের উঠানে গেলেও কেউ ভয় পায় না; এলাকাবাসী এদের উপস্থিতিকে জীবনের স্বাভাবিক অংশ হিসেবেই মেনে নিয়েছেন।
চিকিৎসা, সংরক্ষণ ও সরেজমিন পরিদর্শন নিয়ে কর্মকর্তারা
ফরিদপুর পরিবেশ উন্নয়ন ফোরামের সাধারণ সম্পাদক মনিরুজ্জামান মনির জাগো নিউজকে বলেন, গুইসাপ মানুষের জন্য ক্ষতিকর নয়, বরং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে। তাঁর মতে, প্রাণীটি এখন অনেকটাই কমে গেছে; এমন প্রাণীর উপস্থিতি একটি সুস্থ বাস্তুতন্ত্রের ইঙ্গিত বহন করে, তাই এই গুইসাপগুলো ও তাদের আবাসস্থল রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা সব্যসাচী মজুমদার বলেন, গুইসাপের সাপের মতো বিষ নেই। তবে শরীরে ব্যাকটেরিয়া থাকায় কাউকে কামড় দিলে বা লেজ দিয়ে আঘাত করলে সেই জায়গায় সংক্রমণ হতে পারে। তিনি জানান, ধানক্ষেতের ইঁদুর ও ফসলের ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে কৃষকের উপকার করে বলে গুইসাপকে কৃষকের বন্ধু বলা হয়; এরা সাঁতারে অত্যন্ত দক্ষ, তাই বেশির ভাগ ক্ষেত্রে জলাভূমির আশপাশে এদের আবাস দেখা যায়। তাঁর ভাষায়, "এগুলোর কোনো সমস্যা হলে আমরা চিকিৎসা দিতে পারি, কিন্তু সংরক্ষণের দায়িত্ব বন বিভাগের।"
ফরিদপুরের সহকারী বন সংরক্ষক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) তাওহীদ হোসেন জাগো নিউজকে জানান, তিনি বিষয়টি জেনেছেন এবং সেদিনই সরেজমিনে যাবেন। এরপর প্রাণীগুলো কীভাবে সংরক্ষণ করা যায়, সে বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত প্রস্তাব পাঠানো হবে। সদরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. শরিফ শাওন বলেন, প্রাণীগুলো যাতে নিজেদের মতো করে বেঁচে থাকতে পারে এবং কেউ যাতে এদের ক্ষতি করতে না পারে, সে বিষয়ে খেয়াল রাখা হবে।
আরটিভির প্রতিবেদনে বাংলাদেশ বন বিভাগের বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মকর্তা জোহরা মিলা উপকারী প্রাণী গুইসাপের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তোলার জন্য সদরপুরের মানুষের প্রশংসা করেন। তিনি জানান, গুইসাপ শান্ত স্বভাবের প্রাণী; সাধারণত মাটির গর্ত, গাছের কোটর, পুরোনো দেয়ালের ফাটল কিংবা পরিত্যক্ত ইটভাটায় থাকে; দিনে শিকার করে, রাতে বিশ্রাম নেয়; আর বিষধর সাপ ও সাপের ডিম, মৃত মাছ, ব্যাঙ, কাঁকড়া, শামুক ও পচা-গলা প্রাণী খায়। এরা দ্রুত গাছে উঠতে পারে এবং সাঁতারে দক্ষ, তাই জলাভূমির আশপাশে বেশি দেখা যায়। তাঁর মতে, গুইসাপ কমে গেলে ফসলের ক্ষতিকর পোকামাকড়, ইঁদুর আর বিষধর সাপ বাড়বে, আর পচা প্রাণিদেহ সরিয়ে রোগজীবাণু ছড়ানো ঠেকানোর কাজটিও কমে যাবে। তিনি আরও জানান, আইইউসিএন রামগদি বা কালো গুইকে সংকটাপন্ন হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে।
বাংলাদেশের তিন প্রজাতির গুইসাপ
দেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে চারটি গোত্রের ১৮ প্রজাতির টিকটিকি-জাতীয় সরীসৃপ (লিজার্ড) আছে, যার মধ্যে গুইসাপ ভেরানিডি (Varanidae) গোত্রের। গুইসাপ শুষ্ক চামড়ার বড় সরীসৃপ; এদের পাঁচ আঙুলের পায়ে ধারালো নখ, লম্বা ও অন্য টিকটিকির চেয়ে বেশি নমনীয় ঘাড়, এমন লেজ যা খসে পড়ে না, আর লম্বা সরু জিভ যার আগা দুই ভাগে চেরা। এরা মূলত মাটিতে চলাফেরা করে, দিনে সক্রিয় থাকে, ভালো গাছে চড়ে, কোনো কোনোটি আধা-জলচর ও দক্ষ সাঁতারু। এরা থাকে মূলত মাটির গর্ত, উইঢিবি, গাছের কোটর ও ফাটলে, আর খায় জীবন্ত প্রাণী ও মৃতদেহ।
বাংলাদেশে তিন প্রজাতির গুইসাপ আছে। জাগো নিউজ লিখেছে, এদের আলাদা করে চেনা কিছুটা কঠিন বলে মানুষ সব কটিকেই গুইসাপ বলে, আর এলাকাভেদে তারবেল, গুইল, ঘোড়েল ইত্যাদি নামও প্রচলিত। আইইউসিএন বাংলাদেশ ২০১৫ সালে যে বাংলাদেশের লাল তালিকা (রেড লিস্ট অব বাংলাদেশ) প্রকাশ করে, তার সরীসৃপ মূল্যায়নের নেতৃত্বে ছিলেন প্রাণিবিজ্ঞানী মো. ফরিদ আহসান। সেখানে তিন প্রজাতির বিবরণ এ রকম:
- গুইসাপ বা বেঙ্গল মনিটর (Varanus bengalensis), স্থানীয় নাম গুইসাপ, বাংলা গুইসাপ বা গুইল: দেশে সবচেয়ে বিস্তৃত গুইসাপ, উপকূলীয় দ্বীপসহ সারা দেশে পাওয়া যায়; বসতবাড়ির পেছনের আঙিনা থেকে ফসলের মাঠ ও সব ধরনের বনে এদের দেখা মেলে। এরা ভালো হাঁটে, দৌড়ায়, সাঁতার কাটে ও গাছে চড়ে; অমেরুদণ্ডী প্রাণী থেকে স্তন্যপায়ী পর্যন্ত সবই খায়, মৃতদেহও খায়। লাল তালিকায় উল্লেখ আছে, গ্রামে এরা নিয়মিত হাঁস-মুরগির ছানা মেরে খায়। স্ত্রী গুইসাপ আগস্ট থেকে অক্টোবরের মধ্যে ১০ থেকে ৩২টি, গড়ে ২১টি ডিম পাড়ে।
- কালো গুই বা রামগদি (Varanus salvator), ইংরেজিতে ওয়াটার মনিটর: বাংলাদেশে এর উপপ্রজাতি V. s. macromaculatus পাওয়া যায়। চট্টগ্রাম, খুলনা ও বরিশাল বিভাগের ম্যানগ্রোভ ও উপকূলীয় এলাকায় এটি সাধারণ, অন্যত্র বিরল। নদীর পাড় ও জলাশয়ের কিনারায় গর্তে থাকে; গিলতে পারে এমন প্রায় সবকিছুই খায়, মৃতদেহ এদের প্রিয়, এমনকি আবর্জনাও এদের খাদ্যতালিকায় আছে। এপ্রিল থেকে অক্টোবর এদের প্রজননকাল; বছরে দুই বা ততোধিক দফায় সব মিলিয়ে ৪০টি পর্যন্ত ডিম পাড়তে পারে।
- সোনা গুই বা হলদে গুই (Varanus flavescens), ইংরেজিতে ইয়েলো মনিটর: গভীর বন ও উপকূল বাদে দেশের প্রায় সব অঞ্চলে পাওয়া যায়, গ্রামাঞ্চল ও ফসলের মাঠ এদের পছন্দ। গর্তবাসী, ভালো সাঁতারু কিন্তু গাছে চড়তে পটু নয়; বর্ষায় এদের বেশি দেখা যায় পানিতে, আর গ্রামাঞ্চল ডুবে গেলে অনেকগুলোকে মহাসড়কের ধারে পাওয়া যায়। শীতকালে প্রায় পুরো জনগোষ্ঠী শীতনিদ্রায় যায়।
আকারের দিক থেকে, বেঙ্গল মনিটর লেজসহ প্রায় ১৭৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে, আর ভারী গুইসাপের ওজন প্রায় ৭.২ কেজি পর্যন্ত হয়। সোনা গুই তুলনায় ছোট, ৪৫ থেকে ৯৫ সেন্টিমিটার লম্বা, ওজন প্রায় ১.৪৫ কেজি পর্যন্ত। এশীয় জলগুই বা রামগদিকে কমোডো ড্রাগনের পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম টিকটিকি-জাতীয় সরীসৃপ হিসেবে ধরা হয়: প্রাপ্তবয়স্কগুলো সাধারণত দেড় থেকে দুই মিটারের বেশি হয় না, তবে শ্রীলঙ্কায় রেকর্ড করা সবচেয়ে বড়টি ছিল ৩.২১ মিটার, আর পূর্ণবয়স্কের সাধারণ ওজন প্রায় ১৯.৫ কেজি। বন বিভাগের জোহরা মিলা আরটিভিকে বলেছেন, রামগদি ৭ থেকে ৯ ফুট লম্বা ও ২৫ কেজির বেশি ওজনের হতে পারে; আর জাগো নিউজ প্রাণিসম্পদ বিভাগের বরাতে লিখেছে ৮ থেকে ৯ ফুট ও প্রায় এক মণ।

গুইসাপ কতটা বিপন্ন
সদরপুরের বাসিন্দা ও পরিবেশ ফোরাম প্রাণীগুলোকে বিলুপ্তপ্রায় বলেছেন। সরকারি জাতীয় মূল্যায়ন এতটা কঠোর নয়, তবে তিন প্রজাতিই কমছে। ২০১৪ সালের অক্টোবরে মূল্যায়ন করা ২০১৫ সালের বাংলাদেশের লাল তালিকায় গুইসাপ (বেঙ্গল মনিটর) ও সোনা গুইকে প্রায়-বিপদাপন্ন (নিয়ার থ্রেটেনড) এবং রামগদিকে সংকটাপন্ন (ভালনারেবল) হিসেবে দেখানো হয়েছে। তিন প্রজাতিরই সংখ্যা কমার প্রবণতা উল্লেখ করা হয়েছে।
বেঙ্গল মনিটর সম্পর্কে মূল্যায়নকারীরা লিখেছেন, নানা হুমকির কারণে দেশের কিছু এলাকা থেকে এটি ইতিমধ্যে হারিয়ে গেছে, জনসংখ্যার চাপ ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ড সামনে আরও তীব্র হতে পারে, আর কিছু এলাকায় এটি শিকার হয়। লাল তালিকায় এটিও উল্লেখ আছে যে ১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশকের বিপুল বৈদেশিক বাণিজ্যের পর এর ব্যবহারে সর্বাত্মক নিষেধাজ্ঞা আরোপের ফলে এর সংখ্যা আবার বেড়েছে। রামগদিকে সংকটাপন্ন বলার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, মানুষের কর্মকাণ্ড ও উন্নয়নের ফলে এর আবাসস্থল সংকুচিত হচ্ছে এবং সংখ্যা কমছে। সোনা গুইয়ের ক্ষেত্রে মূল্যায়নকারীরা বিক্ষিপ্ত বিস্তার, কিছু এলাকায় শিকার ও সংকুচিত বিচরণক্ষেত্রের কথা বলেছেন।
২০১৫ সালের এই শ্রেণিগুলো আইইউসিএন বাংলাদেশের আগের জাতীয় তালিকার (২০০০ সালে প্রকাশিত) চেয়ে কম কঠোর; সেই তালিকায় বেঙ্গল মনিটর ছিল সংকটাপন্ন, আর সোনা গুই ও রামগদি দুটিই ছিল বিপন্ন (এনডেঞ্জারড)। ২০১৫ সালের লাল তালিকার নিজস্ব সারণিতে রামগদির বৈশ্বিক অবস্থান দেখানো হয়েছে ন্যূনতম বিপদাপন্ন (লিস্ট কনসার্ন); এ কারণেই একই প্রাণী নিয়ে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মূল্যায়নে পার্থক্য দেখা যায়।
লাল তালিকায় আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বসতবাড়ির আশপাশ, এমনকি ঘরেও কিছু বন্যপ্রাণী টিকে থাকে, বিশেষ করে টিকটিকি, তক্ষক, গুইসাপ ও কিছু সাপ। সদরপুরের মতো বাজারের বর্জ্যের ওপর নির্ভর করে টিকে থাকা গুইসাপের দল মানুষের সঙ্গে জায়গা ভাগ করে নিতে শেখা প্রাণীর সেই চিত্রের সঙ্গেই মেলে।

আইন কী বলে
সদরপুরের প্রতিবেদনগুলো যখন প্রকাশিত হয়, তখন এই প্রাণীগুলোর সুরক্ষায় কার্যকর আইন ছিল বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০২৬ (২০২৬ সনের ৮৬ নং আইন), যার তারিখ ১০ এপ্রিল ২০২৬। আইনে বলা আছে, এটি ২০২৬ সালের ৭ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হয়েছে বলে গণ্য হবে; এই আইন বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২ রহিত করেছে। আরটিভির প্রতিবেদনে ২০১২ সালের আইনের উল্লেখ ছিল; ততদিনে সেই আইন রহিত হয়ে গিয়েছিল।
২০২৬ সালের আইনের তফসিল ১(খ), অর্থাৎ রক্ষিত বন্যপ্রাণীর তালিকায় তিন প্রজাতির গুইসাপই আছে: বেঙ্গল মনিটর 'গুইসাপ', ইয়েলো মনিটর 'সোনা গুঁই' এবং ওয়াটার মনিটর 'কালো গুঁই, রামগদি' নামে। তফসিলের শিরোনামে বলা আছে, গবেষণা বা বৈজ্ঞানিক প্রয়োজন ছাড়া অথবা লাইসেন্স বা পজেশন সার্টিফিকেট ছাড়া এসব বন্যপ্রাণী কোনো অবস্থাতেই শিকার, উত্তোলন, পরিবহন, ক্রয়, বিক্রয় অথবা আমদানি-রপ্তানি করা যাবে না।
আইনের ধারা ৪১(৩) অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি তফসিল ১(খ)-এ উল্লিখিত বন্যপ্রাণী শিকার করতে পারবেন না। আইনে 'শিকার'-এর সংজ্ঞা ব্যাপক: কোনো বন্যপ্রাণীকে হত্যা করা, ধরা, বিষ প্রয়োগ করা বা অনুরূপ উদ্যোগ; এসব উদ্দেশ্যে তাড়িয়ে নেওয়া; আহত বা ক্ষতিগ্রস্ত করা; প্রাণীর কোনো অংশ নেওয়া; কিংবা বন্য পাখি বা সরীসৃপের বাসা বা ডিম সংগ্রহ বা ধ্বংস করা। ধারা ৪৪ অনুযায়ী, তফসিল ১(খ)-এর বন্যপ্রাণী শিকারের শাস্তি সর্বোচ্চ তিন বছর কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ তিন লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড; একই অপরাধের পুনরাবৃত্তিতে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড। ধারা ৪১(৫) অনুযায়ী পারমিট ছাড়া এসব প্রাণীর ট্রফি, মাংস বা দেহের অংশ সংগ্রহ, দখলে রাখা, ক্রয় বা বিক্রয়ের শাস্তি সর্বোচ্চ এক বছর কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড, আর পুনরাবৃত্তিতে সর্বোচ্চ দুই বছর বা দুই লাখ টাকা।
ধারা ১০-এ সব বন্যপ্রাণীর জন্য প্রযোজ্য সাধারণ বিধান আছে। লাইসেন্স, পজেশন সার্টিফিকেট বা পারমিট ছাড়া কেউ কোনো বন্যপ্রাণী লালন-পালন বা আবদ্ধ রাখতে পারবেন না; সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজ্ঞাপন দিয়ে, হাট-বাজারে বা অন্য কোনো মাধ্যমে বন্যপ্রাণী কেনাবেচা করা যাবে না; সব বন্যপ্রাণী, এদের দেহের অংশ ও মাংস সরকারের সম্পত্তি হিসেবে বিবেচিত হবে; আর বন্যপ্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আইনের ব্যাখ্যায় নিষ্ঠুর আচরণের মধ্যে আছে বন্যপ্রাণীকে প্রহার, উত্ত্যক্ত করা, ভীতি প্রদর্শন, অপ্রয়োজনে আটক রাখা এবং বন্যপ্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা। ধারা ১১ অনুযায়ী, প্রধান বন্যপ্রাণী ওয়ার্ডেন বৈজ্ঞানিক কমিটির সঙ্গে পরামর্শ করে নির্ধারণ করবেন তফসিলভুক্ত কোন প্রজাতি বিপদাপন্ন, প্রায়-বিপদাপন্ন বা ন্যূনতম বিপদাপন্ন।
সদরপুর উপজেলা ও ফরিদপুর জেলা
সদরপুর ঢাকা বিভাগের ফরিদপুর জেলার একটি উপজেলা। বাংলাপিডিয়ার তথ্যমতে, এর আয়তন ২৬১.২৯ বর্গকিলোমিটার; উত্তরে চরভদ্রাসন ও দোহার উপজেলা, দক্ষিণে ভাঙ্গা, পূর্বে শিবচর ও শ্রীনগর এবং পশ্চিমে নগরকান্দা উপজেলা। প্রধান নদী পদ্মা, আড়িয়াল খাঁ ও ভুবনেশ্বর। সদরপুর থানা গঠিত হয় ১৮৬৩ সালে, উপজেলা হয় ১৯৮৪ সালে।
২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী উপজেলার নয়টি ইউনিয়নে জনসংখ্যা ছিল ১,৮৬,২৫৪ জন। ৬৭.৭৯ শতাংশ পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি; প্রধান ফসল ধান, পাট, তেলবীজ, ডাল ও সবজি। বাংলাপিডিয়ায় উপজেলায় ১৬টি হাট-বাজার ও তিনটি মেলার কথা আছে, যার মধ্যে কৃষ্ণপুর হাট, পিয়াজখালী হাট, সাড়ে সাতরশি হাট ও চৌদ্দরশি হাট উল্লেখযোগ্য; পুরোনো নিদর্শনের মধ্যে আছে বাইশরশি জমিদারবাড়ি।
পুরো ফরিদপুর জেলার আয়তন ২,০৫২.৮৬ বর্গকিলোমিটার। জেলার প্রধান নদী পদ্মা, পুরাতন কুমার, আড়িয়াল খাঁ ও গড়াই; উল্লেখযোগ্য বিলের মধ্যে আছে ঢোল সমুদ্র, রামকেলী, ঘোড়াদার ও শকুনের বিল। এটি কৃষিপ্রধান জেলা, ৫৮.৬০ শতাংশ পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি। এ ধরনের নদী, খাল, বিল ও ধানক্ষেতই বাংলাদেশের গুইসাপের জলাভূমি ও কৃষিজমির আবাস, আর ইঁদুর ও ফসলের পোকা খেয়ে গুইসাপের যে ভূমিকার কথা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা বলেছেন, তা এই পরিবেশের সঙ্গেই যুক্ত।

মানুষের পাশে বাস করা গুইসাপ
গুইসাপ সাধারণত মানুষকে এড়িয়ে চলে। বেঙ্গল মনিটর সাধারণত একা থাকে, লাজুক স্বভাবের, মানুষ এড়িয়ে চলে এবং অনেক দূর থেকে মানুষের নড়াচড়া টের পায়; ধরা পড়লে কোনো কোনোটি কামড়াতে পারে, তবে তা কমই ঘটে। প্রতিবেদক ও বাসিন্দাদের বর্ণনায় সদরপুরের গুইসাপগুলোর আচরণ ভিন্ন: যেখানে কেউ তাড়ায় না, শিকার করে না এবং খাবার প্রচুর, সেখানে এরা ব্যস্ত বাজার আর মানুষের উঠান দিয়ে হেঁটে বেড়ায়।
মানুষের গড়া পরিবেশে বিশেষ করে রামগদি বা এশীয় জলগুই ভালোভাবে খাপ খাইয়ে নেয়। কৃষিএলাকায় এবং খালব্যবস্থাসমৃদ্ধ শহরে, যেমন শ্রীলঙ্কায়, যেখানে এদের শিকার বা নিপীড়ন করা হয় না, সেখানে এরা ভালোভাবে টিকে থাকার নজির আছে; শহরাঞ্চলে এরা খাবারের উচ্ছিষ্ট ও মৃতদেহ খায়। কমোডো ড্রাগনের মতো এরাও প্রায়ই মৃত প্রাণী খায়, আর পচা মাংস খেয়ে পরিবেশ থেকে সংক্রামক উপাদান সরিয়ে দেয়। থাইল্যান্ডের ব্যাংককের লুম্পিনি পার্কে শহরের মাঝখানে প্রায় ৪০০ এশীয় জলগুই বাস করে; সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে ২০১৬ সালে একটি কর্মসূচির আওতায় এদের কিছু ধরে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়।
বাংলাদেশের অন্য অনেক জায়গায় অবশ্য মানুষ গুইসাপের আশ্রয়দাতার চেয়ে বিপদই বেশি। বাংলাপিডিয়া জানায়, কিছু জনগোষ্ঠী গুইসাপের মাংস খায়, আর ২০১৫ সালের লাল তালিকায় উল্লেখ আছে, কিছু এলাকায়, বিশেষ করে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর এলাকায়, বেঙ্গল মনিটর ও সোনা গুই শিকারের ঘটনা জানা যায়; পাশাপাশি উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ও ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা এদের বিচরণক্ষেত্র সংকুচিত করছে।
ছবি: Fabian Roudra Baroi / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, আরটিভি অনলাইন, বাংলাপিডিয়া (বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি), আইইউসিএন বাংলাদেশ: রেড লিস্ট অব বাংলাদেশ, খণ্ড ৪: সরীসৃপ ও উভচর (২০১৫), বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০২৬ (বাংলাদেশ আইন, লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগ), উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)