২০২৬ সালের এপ্রিলে মেহেরপুরের গাংনী উপজেলায় সাপের কামড়ে এক কৃষকের মৃত্যু হয়। সাপে কাটার পর বাড়িতে ওঝার দল তাকে ঝাড়ফুঁক করে ভালো হয়ে গেছেন বলে চলে যায়, এর কয়েক ঘণ্টা পর তার অবস্থার অবনতি হয়। মটমুড়া গ্রামের কৃষক রুহুল আমিনকে শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬, রাত সাড়ে ৯টার দিকে বাড়ির পাশের সড়কে সাপে কামড়ায়। রাত ২টার দিকে তিনি বেশি অসুস্থ হয়ে পড়লে স্বজনরা তাকে কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান, সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। জাগো নিউজ ২৪ ২০২৬ সালের ১৮ এপ্রিল মৃত্যুর খবরটি প্রকাশ করে; একই দিনে আমার সংবাদ ও সংবাদ সংস্থা এফএনএসও একই ঘটনার খবর দেয়।
মটমুড়া গ্রামে যা ঘটেছিল
জাগো নিউজ ২৪-কে স্থানীয়রা জানান, মটমুড়া গ্রামের আনসার আলীর ছেলে কৃষক রুহুল আমিন শুক্রবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে গরম থেকে একটু স্বস্তি পেতে বাড়ির পাশের সড়কে হাঁটতে বের হন। সেখানেই তাকে সাপে কামড়ায়। তিনি দ্রুত বাড়ি ফিরে পরিবারের সদস্যদের বিষয়টি জানান।
পরিবার তাকে সরাসরি হাসপাতালে নেয়নি। ওঝার একটি দল এসে তাকে চিকিৎসা দেয়, তিনি ভালো হয়ে গেছেন বলে জানিয়ে চলে যায়। রাত ২টার দিকে তিনি অনেক বেশি অসুস্থ বোধ করেন। স্বজনরা রাতেই তাকে পাশের জেলা কুষ্টিয়ার কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
১৮ এপ্রিল বিকেলে আমার সংবাদের মেহেরপুর প্রতিনিধির পাঠানো প্রতিবেদনে কৃষকের বয়স ৪৫ বছর বলা হয়। সেখানে ওঝার চিকিৎসাকে ঝাড়ফুঁক বলে বর্ণনা করা হয় এবং জানানো হয়, শনিবার ভোরের দিকে তার মৃত্যু হয়। প্রতিবেদনটিতে এই পরামর্শও তুলে ধরা হয় যে সাপে কাটা মানুষকে ওঝার কাছে সময় নষ্ট না করে সরাসরি হাসপাতালে নিতে হবে। একই দিনে মেহেরপুর থেকে ফারুক আহমেদের পাঠানো এফএনএসের প্রতিবেদনেও ঘটনার একই ক্রম পাওয়া যায়: রাত সাড়ে ৯টার দিকে সাপের কামড়, ওঝার ভালো হয়ে যাওয়ার কথা বলা, রাত ২টার দিকে অবস্থার অবনতি এবং কুষ্টিয়ার হাসপাতালে মৃত্যু।
গাংনী থানার ওসি উত্তম কুমার দাস জাগো নিউজ ২৪-কে জানান, উপজেলার মটমুড়া গ্রামের এক কৃষকের সাপের কামড়ে মৃত্যুর খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছে। এফএনএসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি বিষয়টি খতিয়ে দেখার কথাও বলেন। কোনো প্রতিবেদনেই তাকে কোন সাপ কামড়েছিল, তা জানানো হয়নি।
গাংনী, মটমুড়া ও কুষ্টিয়ার পথ
মেহেরপুর দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলাদেশের খুলনা বিভাগের একটি জেলা। এর পশ্চিমে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য, পূর্বে কুষ্টিয়া ও চুয়াডাঙ্গা জেলা। জেলার আয়তন ৭১৬.০৮ বর্গকিলোমিটার। ২০২২ সালের জনশুমারিতে জেলায় ১ লাখ ৯৫ হাজার ৩২২টি খানায় ৭ লাখ ৫ হাজার ৩৫৬ জন মানুষ গণনা করা হয়, যাদের প্রায় সাড়ে ২২ শতাংশ শহরে থাকেন। জেলার ৬৮.৯৫ শতাংশ খানার আয়ের প্রধান উৎস কৃষি, এরপর ব্যবসা ১৩.৮৩ শতাংশ। জেলায় তিনটি উপজেলা: মেহেরপুর সদর, মুজিবনগর ও গাংনী।
গাংনী উপজেলার আয়তন ৩৪১.৯৮ বর্গকিলোমিটার। ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী এখানে ৯২ হাজার ৭৬৮টি খানায় ৩ লাখ ২২ হাজার ৭০১ জন মানুষের বাস, যাদের ২০.৪০ শতাংশ শহরে থাকেন। উপজেলাটি গাংনী পৌরসভা ও নয়টি ইউনিয়ন পরিষদে বিভক্ত: বামন্দী, ধানখোলা, কাথুলী, কাজীপুর, মটমুড়া, রায়পুর, সাহারবাটি, ষোলটাকা ও তেঁতুলবাড়িয়া। নিহত কৃষকের গ্রাম মটমুড়ার নামেই এর একটি ইউনিয়নের নাম। উপজেলার প্রধান নদী ভৈরব ও কাজলা।
গাংনী মূলত কৃষিনির্ভর উপজেলা। বিশ্বকোষের তথ্যে দেখা যায়, এখানকার ৩৮.১৯ শতাংশ মানুষের প্রধান পেশা কৃষি, আরও ৩৩.৭৫ শতাংশ কৃষিশ্রমিক। আবাদি জমির ৬৭.৫ শতাংশ দুই ফসলি, ১৯.২ শতাংশ তিন ফসলি ও ১৩.৪ শতাংশ এক ফসলি, আর প্রায় ৫৪ শতাংশ জমি সেচের আওতায়। গাংনীর উত্তর ও পূর্ব সীমা ঘেঁষে কুষ্টিয়া জেলা: উত্তরে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলা, পূর্বে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর ও মিরপুর এবং চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলা। পশ্চিমে পশ্চিমবঙ্গের নদিয়া জেলা।
কৃষককে যেখানে নেওয়া হয়েছিল, সেই কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ ২০১১ সালে প্রতিষ্ঠিত একটি সরকারি মেডিকেল কলেজ, খুলনা মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত। প্রতি বছর এখানে এমবিবিএস কোর্সে ৬৫ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হন। কুষ্টিয়ার জেনারেল হাসপাতালের একাংশে এর শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়, কলেজটি ২৫০ শয্যার একটি হাসপাতাল নিয়ে চলে। ২০১৩ সালে ২৭৫ কোটি টাকা ব্যয়ে এর স্থায়ী ক্যাম্পাসের নির্মাণকাজ শুরু হয়।

বাংলাদেশে সাপের কামড় কতটা সাধারণ
সমস্যাটির সবচেয়ে বড় জনগোষ্ঠীভিত্তিক পরিমাপ একটি জাতীয় জরিপ, যা ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত চালানো হয় এবং ২০১০ সালের অক্টোবরে পিএলওএস নেগলেক্টেড ট্রপিক্যাল ডিজিজেস সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়। রিদওয়ানুর রহমান, এম এ ফয়েজ ও তাদের সহকর্মীরা দেশের ৬৪ জেলার ২৪টিতে ১৮ হাজার ৮৫৭ জন মানুষের ওপর জরিপ চালান। আগের এক বছরে তাদের মধ্যে ৯৮টি সাপের কামড়ের ঘটনা পাওয়া যায়, যার একটিতে মৃত্যু হয়। এ থেকে হিসাব দাঁড়ায়, প্রতি ১ লাখ ব্যক্তি-বছরে ৬২৩.৪টি কামড়, যার সম্ভাব্য পরিসর ৫১৩.৪ থেকে ৭৮৯.২।
এসব সংখ্যা থেকে গবেষকরা অনুমান করেন, গ্রামীণ বাংলাদেশে প্রতি বছর ৭ লাখ ১০ হাজার ১৫৯টি সাপের কামড়ের ঘটনা ঘটে, ৫ লাখ ৮৯ হাজার ৯১৯ জন মানুষ সাপের কামড় খান এবং ৬ হাজার ৪১ জন মারা যান। সবচেয়ে বেশি হার পাওয়া যায় দক্ষিণ-পশ্চিমের উপকূলীয় বরিশাল বিভাগে, এরপরই খুলনা বিভাগ, যে বিভাগে মেহেরপুরের অবস্থান। গবেষকরা বলেন, এই হার আগের অনুমানের চেয়ে অনেক বেশি।
জরিপে মানুষ কখন ও কীভাবে সাপের কামড় খায়, তা-ও উঠে আসে। বেশিরভাগ কামড়ের ঘটনা ঘটে কাজের সময়, আর ৭১ শতাংশ কামড় লাগে পায়ে বা শরীরের নিচের অংশে। প্রায় ৩৬ শতাংশ কামড় হয় রাতে, সকাল ও বিকেলে হয় প্রায় ৩২ শতাংশ করে। রাতের কামড় বেশি হয় বাড়িতে বা রাস্তার ধারে, এমন ঘটনা ৫৯ শতাংশ। কৃষকদের কামড়ের বেশিরভাগ (৭১ শতাংশ) হয় দিনে, আর গৃহিণীদের কামড় বেশি হয় রাতে। সবচেয়ে বেশি কামড়ের ঘটনা ঘটে অক্টোবরে (২২ শতাংশ) ও জুলাইয়ে (১৫ শতাংশ), এবং গবেষকরা জুন থেকে অক্টোবরের বর্ষা মৌসুমকে সাপের কামড়ের প্রধান মৌসুম হিসেবে পান।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে জার্নাল অব টক্সিকোলজিতে প্রকাশিত রুবাইত হাসান ও সহকর্মীদের একটি গবেষণাপত্রে ২০১৬ সালের একটি মহামারিতাত্ত্বিক গবেষণার উল্লেখ আছে, যাতে বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রতি ১ লাখ মানুষে ১০.৯৮ জনের শরীরে বিষক্রিয়া এবং প্রতি ১ লাখে ১.২২ জনের মৃত্যুর হার পাওয়া যায়। ২০২৩ সালে পিএলওএস নেগলেক্টেড ট্রপিক্যাল ডিজিজেসে প্রকাশিত আরেকটি গবেষণায় বলা হয়, এই অঞ্চলে পাওয়া ৮২ প্রজাতির সাপের মধ্যে ২৭টি বিষধর।
বিশ্বজুড়ে চিত্রটি আরও বড়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ২০২৩ সালের ১২ সেপ্টেম্বরের তথ্যপত্রে বলা হয়, প্রতি বছর আনুমানিক ৫৪ লাখ মানুষ সাপের কামড় খান, যার মধ্যে ১৮ লাখ থেকে ২৭ লাখ জনের শরীরে বিষক্রিয়া হয়। প্রতি বছর ৮১ হাজার ৪১০ থেকে ১ লাখ ৩৭ হাজার ৮৮০ জন মানুষ সাপের কামড়ে মারা যান, আর এর প্রায় তিন গুণ মানুষের অঙ্গহানি বা স্থায়ী প্রতিবন্ধিতা হয়। ডব্লিউএইচও বলছে, কৃষিশ্রমিক ও শিশুরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ২০১৯ সালে দ্য বিএমজেতে প্রকাশিত রবিকর রালফ ও সহকর্মীদের এক বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা মিলে বিশ্বের সাপের কামড়ে মৃত্যুর প্রায় ৭০ শতাংশ ঘটে।
এই অঞ্চলে কোন সাপের কামড় বেশি
২০১৯ সালের বিএমজে বিশ্লেষণে বলা হয়, বাংলাদেশে গোখরা জাতীয় সাপের কামড়ের বেশিরভাগের জন্য দায়ী মনোকেল্ড কোবরা, যা কেউটে বা পদ্ম গোখরা নামেও পরিচিত (Naja kaouthia), আর ক্রেইট বা কালাচ জাতীয় সাপের কামড়ের বেশিরভাগের জন্য দায়ী ওয়ালস ক্রেইট (Bungarus walli)। এখানে চন্দ্রবোড়া বা রাসেলস ভাইপারের চেয়ে সবুজ বোড়ার (গ্রিন পিট ভাইপার) কামড় বেশি ঘটে। দেশে স-স্কেলড ভাইপারের কোনো যাচাইকৃত প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি বলেও বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়। ২০২৫ সালের জার্নাল অব টক্সিকোলজির গবেষণাপত্র অনুযায়ী, বাংলাদেশে বিষধর সাপের কামড়ের প্রায় ৩০ শতাংশের জন্য দায়ী মনোকেল্ড কোবরা।
রাতের কামড়ের ক্ষেত্রে ক্রেইট বা কালাচ জাতীয় সাপ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ২০১০ সালের জরিপে বাড়িতে ও রাস্তার ধারে রাতের কামড়ের উচ্চ হারকে কালাচের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। গবেষকদের বর্ণনায়, কালাচ নিশাচর সাপ, মানুষের ঘরবাড়ির কাছাকাছি থাকে, গর্তে, কাঠের স্তূপে বা বসতবাড়ির বাগানে লুকিয়ে থাকে, আর রাতে, বিশেষ করে ভরা বর্ষায়, ছোট সাপ, ব্যাঙ, ইঁদুর ও টিকটিকির মতো শিকারের খোঁজে ঘরে ঢোকে। ওই জরিপে অনেক কামড়ের ঘটনা ঘটে মানুষ যখন মেঝেতে বিছানা পেতে শুয়ে ছিলেন।
চিকিৎসা সাহিত্যের ভিত্তিতে লেখা বিশ্বকোষের বর্ণনায় সাধারণ কালাচের (Bungarus caeruleus) কামড়ে প্রায়ই ব্যথা খুব কম বা একেবারেই হয় না, কামড়ের জায়গায় ফোলা বা রক্তপাতও তেমন থাকে না। ফলে কামড় নজর এড়িয়ে যেতে পারে বা রোগী ও স্বজনরা ভুল করে আশ্বস্ত হতে পারেন। আক্রান্তদের সাধারণত পেটে তীব্র ব্যথা, শ্বাসকষ্ট এবং ধীরে ধীরে বেড়ে চলা পক্ষাঘাত দেখা দেয়, আর চিকিৎসা না পেলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে শ্বাসযন্ত্র বিকল হয়ে মৃত্যু হতে পারে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চন্দ্রবোড়া বা রাসেলস ভাইপার (Daboia russelii) নিয়ে আলোচনা বেড়েছে। ২০২৫ সালের জার্নাল অব টক্সিকোলজির গবেষণাপত্র অনুযায়ী, বাংলাদেশে এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে এই সাপের উপস্থিতি জানা থাকলেও ২০১৩ সাল পর্যন্ত এটি বিরল ছিল; এরপর বিশেষ করে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে এটি আবার দেখা দিতে থাকে। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত জেলা ছিল চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহী, যেখানে ২০১৩ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে ২০ জনের মৃত্যু নথিভুক্ত হয়। গবেষকরা এর বিস্তারকে নিবিড় চাষাবাদের সঙ্গে যুক্ত করেন: সারা বছর ফসল থাকায় ইঁদুর বাড়ে, আর ইঁদুর এই সাপের খাবার। তাদের পরীক্ষাগারের পরীক্ষায় বাংলাদেশে ব্যবহৃত ভারতীয় পলিভ্যালেন্ট অ্যান্টিভেনম বাংলাদেশি চন্দ্রবোড়ার বিষের বিরুদ্ধে আংশিক কার্যকর পাওয়া যায়। এই সাপের বিষে রক্ত জমাট বাঁধার সমস্যা ও কিডনি বিকল হয়।
গাংনীর প্রতিবেদনগুলোতে রুহুল আমিনকে কোন সাপ কামড়েছিল, তা বলা হয়নি। এখানে এই বর্ণনাগুলো অঞ্চলের বিষধর সাপ সম্পর্কে পটভূমি হিসেবে দেওয়া হলো, তার ঘটনার বিবরণ হিসেবে নয়।

কেন পরিবারগুলো এখনো আগে ওঝার কাছে যায়
২০১০ সালের জাতীয় জরিপে দেখা যায়, সাপে কাটা মানুষের ৮৬ শতাংশ প্রথমে যান সাপুড়ে বা ওঝার কাছে। আরও ৬ শতাংশ প্রথমে যান গ্রাম্য চিকিৎসকের কাছে, মাত্র ৩ শতাংশ সরাসরি নিবন্ধিত চিকিৎসক বা হাসপাতালে যান, আর বাকি ৫ শতাংশ অন্য কোথাও যান, যেমন সরাসরি ওষুধের দোকানে। সবচেয়ে প্রচলিত চিকিৎসা ছিল ওঝার মন্ত্র পড়া, যা পেয়েছেন ৬০ শতাংশ আক্রান্ত। গবেষকদের প্রতিবেদনে বলা হয়, কামড়ের চারপাশে একাধিক কাটা, ভুলভাবে শক্ত বাঁধন দেওয়া এবং কাটা জায়গা থেকে মুখ দিয়ে রক্ত চুষে নেওয়ার মতো ক্ষতিকর পদ্ধতি উদ্বেগজনক হারে ব্যবহৃত হয়, অথচ মাত্র ৩১ শতাংশ ক্ষেত্রে কামড়ানো অঙ্গটি নড়াচড়া না করিয়ে স্থির রাখা হয়েছিল।
গবেষকরা সুপারিশ করেন, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সাপুড়েদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে, যাতে তারা এসব ঝুঁকিপূর্ণ পদ্ধতি বন্ধ করেন এবং রোগীকে সঙ্গে সঙ্গে নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পাঠান। তারা আরও সুপারিশ করেন, সরকারি হাসপাতালে, বিশেষ করে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে, বিনা মূল্যে অ্যান্টিভেনম সহজলভ্য করতে হবে।
২০২৩ সালে পিএলওএস নেগলেক্টেড ট্রপিক্যাল ডিজিজেসে প্রকাশিত কেন ইয়োশিমুরা, মোয়াজ্জেম হোসেন ও সহকর্মীদের গবেষণা বেদে সম্প্রদায় নিয়ে। ঐতিহ্যগতভাবে যাযাবর এই সম্প্রদায়ের অনেকে সাপ খেলা দেখিয়ে, সাপ ধরে ও ওঝাগিরি করে জীবিকা চালান। গবেষকরা ঢাকার কাছে সাভার উপজেলার পোড়া গ্রামে বিষধর সাপের কামড় থেকে বেঁচে যাওয়া ৩৮ জন বেদে সাপুড়ে এবং মারা যাওয়া ছয়জনের পরিবারের সাক্ষাৎকার নেন। তারা বলেন, সাপে কাটার চিকিৎসা করা ওঝাদের বেশিরভাগই বেদে সম্প্রদায়ের, এবং বাংলাদেশে বেদের সংখ্যা আনুমানিক ১২ লাখ বলে একটি হিসাব উদ্ধৃত করেন। তারা হোসেন ও সহকর্মীদের ২০০৩ সালের একটি গবেষণাও উদ্ধৃত করেন, যাতে দেখা যায় প্রায় ৬১ শতাংশ আক্রান্ত প্রথাগত চিকিৎসক বা ভেষজ চিকিৎসকের কাছে চিকিৎসা নেন।
গবেষণায় হাসপাতালের চিকিৎসা থেকে মানুষকে দূরে রাখা চারটি বাধা চিহ্নিত হয়: হাসপাতালে পৌঁছানোর সুযোগ, খরচ বহনের সামর্থ্য, চিকিৎসার প্রাপ্যতা এবং গ্রহণযোগ্যতা। ৩৮ জন সাপুড়ের মধ্যে ৩৩ জনই বলেন, সাপে কাটার সবচেয়ে ভালো চিকিৎসা হাসপাতালে, অথচ হাসপাতালে গিয়েছিলেন মাত্র পাঁচজন। এক ওঝা গবেষকদের বলেন, "বাংলাদেশ ও ভারতের হাসপাতালে আমরা কদাচিৎ অ্যান্টিভেনম ইনজেকশন পাই। বেশিরভাগ হাসপাতাল অ্যান্টিভেনম ইনজেকশন সরবরাহ করে না।" আরও দুজন হাসপাতালের খোলা থাকার সময়কে সমস্যা বলে উল্লেখ করেন; একজন বলেন, যেখানে তাকে সাপে কেটেছিল, সেখানকার হাসপাতাল রাতে বন্ধ ছিল।
প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে ভুল ধারণাও এখনো বড় সমস্যা। চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ ও পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলায় ২ হাজার ৯৫৪ জনের ওপর চালানো একটি জরিপ ২০২৫ সালের জুলাইয়ে ট্রানজ্যাকশনস অব দ্য রয়েল সোসাইটি অব ট্রপিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড হাইজিনে প্রকাশিত হয়। ফারহীন ও সহকর্মীদের এই গবেষণার জ্যেষ্ঠ লেখক এম এ ফয়েজ। এতে দেখা যায়, সাপের কামড় প্রতিরোধ সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান আছে মাত্র ১৫.৯ শতাংশ উত্তরদাতার, আর সঠিক চর্চা করেন ১৪.৫ শতাংশ। ৭৭ শতাংশের বেশি মানুষ মনে করেন কামড়ের ওপরে শক্ত বাঁধন দেওয়া কার্যকর প্রাথমিক চিকিৎসা, আর ৪৫.৪ শতাংশ মনে করেন ওঝার কাছে যাওয়া কার্যকর। কৃষক, জেলে, গৃহিণী ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর মধ্যে জ্ঞানের ঘাটতি বেশি পাওয়া যায়।
২০১৯ সালের বিএমজে বিশ্লেষণেও দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে একই চিত্র উঠে আসে: স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পৌঁছানোর সুযোগ কম হওয়ায় মানুষ প্রায়ই ঝাড়ফুঁককারীদের কাছে যান, যারা মন্ত্র পড়েন, ক্ষত কাটেন, বিষ চুষে বের করার চেষ্টা করেন, শক্ত বাঁধন দেন অথবা ভেষজ, গোবর বা তথাকথিত বিষপাথর লাগান। লেখকরা লেখেন, এসব পদ্ধতি চিকিৎসায় দেরি ঘটায় এবং মৃত্যু বাড়ায়; আর চিকিৎসায় দেরি প্রাণঘাতী হতে পারে, বিশেষ করে কামড়ের ছয় ঘণ্টা পার হয়ে গেলে।

অ্যান্টিভেনম: কার্যকর চিকিৎসা
ডব্লিউএইচও জোর দিয়ে বলে, অনেক গুরুতর রোগের বিপরীতে সাপের বিষক্রিয়ার একটি অত্যন্ত কার্যকর চিকিৎসা আছে। মানসম্পন্ন অ্যান্টিভেনম বিষের বেশিরভাগ প্রভাব ঠেকানো বা উল্টে দেওয়ার সবচেয়ে কার্যকর উপায়। এটি ডব্লিউএইচওর অত্যাবশ্যক ওষুধের তালিকায় আছে, এবং সংস্থাটির মতে যেখানে সাপের কামড়ের ঘটনা ঘটে, সেখানে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার অংশ হওয়া উচিত। নিরাপদ ও কার্যকর অ্যান্টিভেনম আরও সহজলভ্য করা গেলে বেশিরভাগ মৃত্যু ও গুরুতর পরিণতি পুরোপুরি এড়ানো সম্ভব। ডব্লিউএইচও আরও বলে, ক্লিনিক ও হাসপাতাল থেকে যে সংখ্যা জানানো হয়, তা প্রকৃত সংখ্যার ছোট একটি অংশ মাত্র, কারণ অনেক আক্রান্ত কখনো স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পৌঁছান না এবং হাসপাতালের বদলে প্রথাগত পদ্ধতি বেছে নেন।
অ্যান্টিভেনম দিতে হয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রে, প্রশিক্ষিত কর্মীর হাতে। ২০২৩ সালের বেদে গবেষণায় সাপে কাটার চিকিৎসাকে সময়-সংবেদনশীল বলা হয়, যার জন্য ভালোভাবে সজ্জিত হাসপাতালে যথাযথ প্রশিক্ষিত কর্মীর মাধ্যমে সঠিক অ্যান্টিভেনম দেওয়া দরকার। ২০১৯ সালের বিএমজে বিশ্লেষণে বলা হয়, দক্ষিণ এশিয়ার বেশিরভাগ গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যার ব্যবস্থা নেই, ফলে রোগীকে অন্যত্র পাঠাতে হয় এবং চিকিৎসায় দেরি হয়। বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর করা গবেষণায় শরীরে বিষ ছড়িয়ে পড়ার লক্ষণ চেনা ও অ্যান্টিভেনম দেওয়ার ক্ষেত্রে ঘাটতি পাওয়া গেছে। বিশ্লেষণে ২০১৮ সালে বাংলাদেশে শুরু হওয়া একটি প্রকল্পের কথাও উল্লেখ করা হয়, যার লক্ষ্য চট্টগ্রামে সাপের বিষ উৎপাদন, গবেষণা ও প্রাক-ক্লিনিক্যাল পরীক্ষার একটি কেন্দ্র গড়ে তোলা।
হাসপাতালে চিকিৎসকরা একটি সহজ শয্যাপার্শ্ব পরীক্ষায় দেখতে পারেন বিষের কারণে রক্ত জমাট বাঁধা বন্ধ হয়ে গেছে কি না। ২০২২ সালে দ্য বিএমজেতে প্রকাশিত একটি ক্লিনিক্যাল পর্যালোচনায় ২০ মিনিটের হোল ব্লাড ক্লটিং টেস্টের বর্ণনা আছে: শিরা থেকে কয়েক মিলিলিটার রক্ত একটি পরিষ্কার, শুকনো টেস্টটিউবে রেখে ২০ মিনিট নাড়াচাড়া না করে রাখা হয়; রক্ত জমাট না বাঁধলে বা টিউব কাত করলে জমাট ভেঙে গেলে তা রক্ত জমাট বাঁধার সমস্যার ইঙ্গিত দেয়। পর্যালোচনায় উদ্ধৃত ক্লিনিক্যাল যাচাই গবেষণাগুলোতে এই পরীক্ষার সংবেদনশীলতা ৮২ থেকে ৮৯ শতাংশ পাওয়া গেছে।
সাপের কামড় এখন বৈশ্বিক স্বাস্থ্য কর্মসূচিতে স্থান পেয়েছে। ২০১৭ সালের জুনে ডব্লিউএইচও সাপের বিষক্রিয়াকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের অবহেলিত গ্রীষ্মমণ্ডলীয় রোগের তালিকায় যুক্ত করে, আর ২০১৮ সালের মে মাসে বিশ্ব স্বাস্থ্য পরিষদ সদস্য দেশগুলোকে এ বিষয়ে প্রচেষ্টা জোরদারের আহ্বান জানিয়ে একটি প্রস্তাব পাস করে। ডব্লিউএইচওর রোডম্যাপের লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে সাপের কামড়ে মৃত্যু ও প্রতিবন্ধিতা অর্ধেকে নামানো। এর চারটি উদ্দেশ্য: জনগোষ্ঠীকে সক্ষম ও সম্পৃক্ত করা, নিরাপদ ও কার্যকর চিকিৎসা নিশ্চিত করা, স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং অংশীদারত্ব, সমন্বয় ও সম্পদ বাড়ানো।

হাসপাতালে নেওয়ার পথে প্রাথমিক চিকিৎসা
প্রাথমিক চিকিৎসা অ্যান্টিভেনমের বিকল্প নয়; এর উদ্দেশ্য বিষ ছড়ানোর গতি কমানো এবং মানুষটিকে দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়া। ২০২২ সালের বিএমজে পর্যালোচনায় নিচের ধাপগুলো দেওয়া আছে, আর বৃহত্তর চিকিৎসা সাহিত্যে কোন কাজগুলো এড়িয়ে চলতে হবে তা যোগ করা হয়েছে:
- আক্রান্ত মানুষটিকে অভয় দিন, যাতে তার আতঙ্ক কমে।
- দ্রুত নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নেওয়ার ব্যবস্থা করুন, সম্ভব হলে এমন জায়গায় যেখানে অ্যান্টিভেনম ও নিবিড় পরিচর্যার ব্যবস্থা আছে।
- বিষ ছড়ানোর গতি কমাতে মানুষটিকে, বিশেষ করে কামড়ানো অঙ্গটিকে, যতটা সম্ভব স্থির রাখুন।
- কামড়ানো অঙ্গ থেকে আংটি ও অন্য আঁটসাঁট জিনিস খুলে ফেলুন।
- শক্ত বাঁধন দেবেন না: এতে স্থানীয়ভাবে মারাত্মক ক্ষতি ও পচন (গ্যাংগ্রিন) হতে পারে, তাই এটি কখনোই দেওয়া উচিত নয়।
- কামড়ের জায়গা কাটবেন না বা বিষ চুষে বের করার চেষ্টা করবেন না: কাটলে আরও ক্ষতি ও সংক্রমণের ঝুঁকি হয়, চুষে যে পরিমাণ বিষ বের হয় তা চিকিৎসার দিক থেকে নগণ্য, আর দুটোতেই সময় নষ্ট হয়।
- লক্ষণ দেখা দেওয়ার বা ওঝার রায়ের অপেক্ষায় বাড়িতে বসে থাকবেন না: কালাচের মতো কিছু সাপের কামড়ে শুরুতে ব্যথা কম হয়, অথচ ভেতরে বিষ কাজ করতে থাকে।
সাপে কাটলে কামড় যত সামান্যই মনে হোক, সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে। এই প্রতিবেদন শুধু পটভূমি দেয়, চিকিৎসার বিকল্প নয়; চিকিৎসার সিদ্ধান্ত হাসপাতালের চিকিৎসকের।
বাড়ি ও মাঠ থেকে সাপ দূরে রাখা
প্রতিরোধ শুরু হয় বাড়ির চারপাশ থেকে। ২০১৯ সালের বিএমজে বিশ্লেষণে এমন কিছু ব্যবস্থার কথা বলা হয়, যা সচেতনতার অভাবে মানুষ প্রায়ই নেন না: বাড়ির আশপাশ আবর্জনা, ইট-পাথরের স্তূপ ও জ্বালানি কাঠমুক্ত রাখা, ইঁদুর ও অন্যান্য তীক্ষ্ণদন্তী প্রাণী নিয়ন্ত্রণ করা, এমনভাবে ঘর তৈরি করা যাতে সাপ সহজে ঢুকতে না পারে, এবং পায়ে সুরক্ষামূলক জুতা পরা। চিকিৎসা সাহিত্যের ভিত্তিতে লেখা বিশ্বকোষের সারাংশে এর সঙ্গে যোগ করা হয়েছে সাপের আবাসস্থল এড়িয়ে চলা এবং সাপ হাতে না ধরার কথা।
২০১০ সালের জরিপে রাতের অনেক কামড় বাড়িতে, রাস্তার ধারে বা মেঝেতে বিছানা পেতে শুয়ে থাকার সময় ঘটেছিল। এতে বোঝা যায়, যেসব এলাকায় কালাচ থাকে, সেখানে অন্ধকারে চলাফেরা বা মেঝেতে ঘুমানো ঝুঁকিপূর্ণ। ওই গবেষকরা এবং বিএমজের লেখকরা ঝুঁকিতে থাকা মানুষের জন্য সাপের কামড় প্রতিরোধ ও প্রাথমিক চিকিৎসার প্রশিক্ষণের আহ্বান জানান, পাশাপাশি প্রথাগত চিকিৎসকদের সঙ্গে কাজ করার কথা বলেন, যাতে তারা রোগীকে বাড়িতে আটকে না রেখে সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে পাঠান।
ছবি: Salim_Khandoker / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, আমার সংবাদ, এফএনএস, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, পিএলওএস নেগলেক্টেড ট্রপিক্যাল ডিজিজেস (রহমান ও সহকর্মী ২০১০; ইয়োশিমুরা ও সহকর্মী ২০২৩), দ্য বিএমজে (রালফ ও সহকর্মী ২০১৯ ও ২০২২), ট্রানজ্যাকশনস অব দ্য রয়েল সোসাইটি অব ট্রপিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড হাইজিন (ফারহীন ও সহকর্মী ২০২৫), জার্নাল অব টক্সিকোলজি (হাসান ও সহকর্মী ২০২৫), উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)