২০২৫ সালের ২৮ নভেম্বর, শুক্রবার সকালে রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলায় পদ্মা নদীর চরে ধানখেতে কাজ করার সময় মো. হেলাল বিশ্বাস (৩৫) নামের এক কৃষকের পায়ে একটি বিষধর রাসেলস ভাইপার ছোবল দেয়। আশপাশের কৃষকেরা সাপটিকে জীবিত ধরে একটি প্লাস্টিকের বয়ামে ভরেন এবং সাপসহ তাঁকে পাংশা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে সাপটি রাসেলস ভাইপার বলে শনাক্ত হয়। উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা জানান, চিকিৎসা চলছে এবং রোগী আশঙ্কামুক্ত।
পদ্মার চরের ধানখেতে ছোবল
ঘটনাটি ঘটে উপজেলার হাবাসপুর ইউনিয়নের শাহমীরপুর এলাকায় পদ্মার চরে। হেলাল বিশ্বাস শাহমীরপুর গ্রামের বাসিন্দা; বাড়ির পাশের চরের ধানখেতে কাজ করছিলেন তিনি। জাগো নিউজ জানায়, ছোবলের পর আশপাশে থাকা কৃষকেরা একত্র হয়ে সাপটি ধরে ফেলেন। বাংলা স্ট্রিমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কামড় খাওয়ার পর হেলাল ঘাবড়ে না গিয়ে অন্যদের বিষয়টি জানান। সাপটি কোন জাতের, তা নিশ্চিত না হওয়ায় সেটিকে সঙ্গে নিয়েই তিনি হাসপাতালে যান। হাসপাতালে চিকিৎসকেরা সাপটিকে রাসেলস ভাইপার বা চন্দ্রবোড়া বলে নিশ্চিত করেন।
হেলালের চাচাতো ভাই বাদশা বিশ্বাস জাগো নিউজকে জানান, খবর পেয়ে তাঁরা দ্রুত তাঁকে পাংশা হাসপাতালে নিয়ে আসেন। তিনি সেখানে চিকিৎসাধীন এবং চিকিৎসকেরা নিয়মিত তাঁর খোঁজখবর রাখছেন।

দ্রুত শনাক্ত হওয়ায় চিকিৎসা সহজ
পাংশা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. এবাদত হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, "সাপটি দ্রুত শনাক্ত করতে পারার কারণে আমাদের চিকিৎসা দিতে সহজ হয়েছে। তার চিকিৎসা চলছে এবং তার অবস্থা এখন আশঙ্কামুক্ত।" বাংলা স্ট্রিমকে তিনি জানান, রোগীকে অ্যান্টিভেনমসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে এবং তিনি নিবিড় পর্যবেক্ষণে আছেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া আঞ্চলিক কার্যালয়ের ২০১৬ সালের সাপের কামড় ব্যবস্থাপনা নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, কোন প্রজাতির সাপ কামড়েছে তা জানা সঠিক চিকিৎসার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষজ্ঞ মৃত সাপ বা মোবাইল ফোনে তোলা ছবি দেখে প্রজাতি চিনতে পারেন। নির্দেশিকা অনুযায়ী, প্রজাতিভিত্তিক অ্যান্টিভেনমই সাপের বিষক্রিয়ার একমাত্র কার্যকর প্রতিষেধক, যা ডব্লিউএইচও স্বীকৃত একটি জীবনরক্ষাকারী অপরিহার্য ওষুধ।

রাসেলস ভাইপার ও পদ্মা অববাহিকা
রাসেলস ভাইপারের বৈজ্ঞানিক নাম Daboia russelii, বাংলায় একে চন্দ্রবোড়াও বলা হয়। ডব্লিউএইচওর ওই নির্দেশিকায় বাংলাদেশের সর্বোচ্চ চিকিৎসাগত গুরুত্বের (প্রথম শ্রেণির) বিষধর সাপের তালিকায় এটি রয়েছে। নির্দেশিকায় বলা হয়, বাংলাদেশে প্রজাতিটি বিরল বলে মনে হয়, এর বিস্তার দেশের পশ্চিম ও দক্ষিণাঞ্চলে সীমিত এবং রাজশাহী এলাকায় এর কামড়ের সাম্প্রতিক খবর পাওয়া গেছে।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম ২০২৩ সালের জুলাইয়ে জানায়, এক দশক আগেও যে সাপকে বাংলাদেশে বিপন্ন মনে করা হতো, ২০১২ সাল থেকে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের পাশাপাশি রাজবাড়ী, ফরিদপুর, কুষ্টিয়া ও পটুয়াখালীর ফসলি জমিতে তার প্রাপ্তবয়স্ক সাপ ও বাচ্চা দেখা যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যার অধ্যাপক মোহাম্মদ ফিরোজ জামান সংবাদমাধ্যমটিকে বলেন, বর্ষায় বন্যার পানির সঙ্গে ভারত থেকে পদ্মা হয়ে এ সাপের বাচ্চা ভেসে আসে।

সাপে কাটলে করণীয়: ডব্লিউএইচওর পরামর্শ
ডব্লিউএইচওর হিসাবে, বিশ্বে প্রতিবছর আনুমানিক ৫৪ লাখ মানুষকে সাপে কাটে, বিষক্রিয়া হয় ১৮ থেকে ২৭ লাখ জনের এবং মারা যান ৮১ হাজার ৪১০ থেকে ১ লাখ ৩৭ হাজার ৮৮০ জন। সংস্থাটি বলছে, সাপের বিষক্রিয়ার শিকার বেশি হন নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশের গরিব গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর নারী, শিশু ও কৃষক। ডব্লিউএইচওর নির্দেশিকায় উদ্ধৃত ২০০৯ সালের এক জরিপের হিসাবে, বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে বছরে ৫ লাখ ৮৯ হাজার ৯১৯ জনকে সাপে কাটে এবং ৬ হাজার ৪১ জন মারা যান।
নির্দেশিকায় প্রাথমিক চিকিৎসার যে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে:
- আক্রান্ত ব্যক্তিকে আশ্বস্ত করুন। ভয় কমলে হৃৎস্পন্দন ধীর হয় এবং বিষ ছড়ানোও কমে।
- রোগীকে শুইয়ে পুরো শরীর স্থির রাখুন, কামড়ানো হাত বা পা স্প্লিন্ট বা স্লিং দিয়ে নড়াচড়াহীন রাখুন। হাঁটা বা যেকোনো পেশির নড়াচড়া বিষ ছড়িয়ে দেয়।
- ক্ষতস্থান কাটা, ঘষা, জোরে পরিষ্কার করা, মালিশ বা ভেষজ ও রাসায়নিক লাগানো থেকে বিরত থাকুন। নির্দেশিকা বলছে, প্রচলিত বেশির ভাগ ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতি উপকারের চেয়ে ক্ষতি বেশি করে।
- শক্ত বাঁধন (টর্নিকেট) দেবেন না; এতে অঙ্গে পচন ধরার ঝুঁকি থাকে। আগে থেকে বাঁধন দেওয়া থাকলে হাসপাতালে চিকিৎসা ও অ্যান্টিভেনম শুরু না হওয়া পর্যন্ত তা খোলা ঠিক নয়।
- যত দ্রুত সম্ভব, তবে নিরাপদে, রোগীকে হাসপাতাল বা চিকিৎসাকেন্দ্রে নিন। বমির ঝুঁকি থাকলে পথে তাঁকে পাশ ফিরিয়ে শুইয়ে রাখুন।
- সাপ মারার চেষ্টা করবেন না, তাতে বিপদ হতে পারে। সাপটি আগেই মারা পড়ে থাকলে খালি হাতে না ধরে সঙ্গে নিন, কারণ কাটা মাথাও কামড়াতে পারে। সম্ভব হলে মোবাইলে কাছ থেকে কয়েকটি ছবি তুলে রাখুন।
ছবি: Abhinav Chawla / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বাংলা স্ট্রিম, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (সাপের কামড় বিষয়ক ফ্যাক্টশিট), বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া আঞ্চলিক কার্যালয় (সাপের কামড় ব্যবস্থাপনা নির্দেশিকা, ২০১৬)





মন্তব্য
(০)