কৃষি বর্জ্য থেকে তৈরি বায়োচার প্রযুক্তি মাটির স্বাস্থ্য ফেরানো ও সার সাশ্রয়ের সম্ভাবনাময় পথ হতে পারে বলে জানিয়েছেন দেশের কৃষিবিজ্ঞানীরা। গবেষণায় সুষম রাসায়নিক সারের সঙ্গে বায়োচার প্রয়োগে ভুট্টার ফলন ২৯ শতাংশ, আউশ ধানের ২৩ শতাংশ এবং বোরো ধানের ২১ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। তবে কৃষকের কাছে পৌঁছাতে খরচের হিসাব, মান নিয়ন্ত্রণ ও জাতীয় মানদণ্ড দরকার বলে মত দিয়েছেন তাঁরা।
সমস্যাটা দুই দিকের। মাটির উর্বরতা কমছে, রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে; অন্যদিকে খড়, কাঠ ও ফসলের অবশিষ্টাংশের বড় অংশ নষ্ট হয় বা পুড়িয়ে ফেলা হয়। গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. জি কে এম মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, দেশের অনেক জমিতে জৈব পদার্থ ২ শতাংশের নিচে নেমে গেছে, আর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মাটি অম্লীয়।
বায়োচার তৈরি হয় এসব উদ্ভিজ্জ বর্জ্য প্রায় অক্সিজেনহীন অবস্থায় নির্দিষ্ট তাপে উত্তপ্ত করে, যাকে পাইরোলাইসিস বলে। এর ছিদ্রযুক্ত গঠন মাটিতে পানি ও পুষ্টি ধরে রাখে, আর স্থিতিশীল কার্বনের একটি অংশ দীর্ঘদিন মাটিতে থেকে যায়। উপাচার্যের ভাষায় এটি ‘থ্রি ইন ওয়ান’ প্রযুক্তি: মাটির গঠন উন্নত করে, পুষ্টির অপচয় কমায় এবং অম্লীয় মাটির পিএইচ বাড়াতে পারে।
রোববার (১৮ অক্টোবর) ঢাকায় বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (বিএআরসি) জাতীয় কর্মশালায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকাবিজ্ঞানের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মফিজুর রহমান জাহাঙ্গীর। তাঁর উপস্থাপিত ফলাফলে ভুট্টার ফলন হেক্টরপ্রতি ৯.২১ টন, আউশের ৪.৯৭ টন, বোরোর ৬.০২ টন এবং সরিষার ১.২৮ টনে (১৭ শতাংশ বেশি) পৌঁছেছে। বায়োচার প্রলেপ দেওয়া ইউরিয়ায় সুপারিশের ৭৫ শতাংশ নাইট্রোজেন দিয়েও পূর্ণমাত্রার সমান ফলন মিলেছে, অর্থাৎ ২৫ শতাংশ নাইট্রোজেন সাশ্রয়ের সম্ভাবনা।
উপস্থাপিত তথ্যে বায়োচার ও কম্পোস্টে অ্যামোনিয়ার অপচয় ৩৬ থেকে ৩৭ শতাংশ, মাটি থেকে নাইট্রাস অক্সাইড নির্গমন প্রায় ৩৮ শতাংশ কমেছে; মাটির আপাত ঘনত্ব গড়ে ১২ শতাংশ পর্যন্ত কমে রন্ধ্রতা ৪১ শতাংশ এবং গাছের ব্যবহারযোগ্য পানি ধারণক্ষমতা ১৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। তবে এসব ফল মাটির ধরন, বায়োচারের মান ও মাত্রার ওপর নির্ভর করে।
প্রয়োগের পরামর্শও আছে। অধ্যাপক জাহাঙ্গীর কাঁচা বায়োচার সরাসরি না দিয়ে কম্পোস্ট, গোবর বা জৈব সারের সঙ্গে মিশিয়ে (কো-কম্পোস্টিং) দিতে বলেন; গবেষণায় হেক্টরপ্রতি এক থেকে তিন টন সারিতে বা শিকড়ের কাছে দেওয়ার কথা এসেছে, যদিও স্থানীয়ভাবে যাচাই করা মাত্রাই নিতে হবে। বারির মহাপরিচালক ড. মোহাম্মদ মনজুরুল কাদির কাঁচামাল হিসেবে ভুট্টার অবশিষ্টাংশ ব্যবহারের প্রস্তাব দেন।
দেশে বছরে প্রায় ২৭ লাখ টন ইউরিয়া লাগে উল্লেখ করে বিএআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. মো. আব্দুছ ছালাম বলেন, ইউরিয়া কতটা কমবে আর কৃষকের প্রকৃত লাভ কত, তা উপাত্ত দিয়ে দেখাতে পারলে ভর্তুকি ও প্রণোদনার পথ খুলবে। তিনি সতর্ক করেন, ভারী ধাতুর ঝুঁকি এড়াতে বাজারে ‘বায়োচার’ নামে যা পাওয়া যায় তা যাচাই ছাড়া জমিতে দেওয়া ঠিক নয়; দরকার জাতীয় মানদণ্ড। ব্রির মহাপরিচালক ড. মো. রফিকুল ইসলাম কার্বন ক্রেডিট থেকে আয়ের সম্ভাবনার কথাও বলেন।
ছবি: Vbenjou / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: কৃষি সময়





মন্তব্য
(০)