সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ১৬ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা২৬°পরিষ্কার আকাশআর্দ্রতা ৭৪%বাতাস ৩ কিমি/ঘ

লিচু খান সাবধানে: ভারত ও বাংলাদেশের গবেষণায় যা পাওয়া গেছে

লিচু পুষ্টিকর গ্রীষ্মকালীন ফল। তবে ভারতের মুজাফফরপুরে শিশুমৃত্যুর গবেষণায় অপুষ্ট ও রাতের খাবার না খাওয়া শিশুদের অসুস্থতার সঙ্গে লিচুর প্রাকৃতিক বিষাক্ত যৌগের যোগ পাওয়া যায়, আর বাংলাদেশের দিনাজপুরে ২০১২ সালের প্রাদুর্ভাবের গবেষণা লিচু খাওয়া নয়, বাগানের কীটনাশকের সংস্পর্শকে দায়ী করে।

লিচু খান সাবধানে: ভারত ও বাংলাদেশের গবেষণায় যা পাওয়া গেছে
স্বাস্থ্য

২০২৬ সালের মে মাসে দেশের বাজারে লিচুর মৌসুম শুরু হলে ১৬ মে জাগো নিউজ ২৪ একটি লাইফস্টাইল প্রতিবেদনে পাঠকদের সাবধানে লিচু খাওয়ার পরামর্শ দেয়, বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে। টাইমস অব ইন্ডিয়ার তথ্য অবলম্বনে লেখা ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, পরিমাণমতো খেলে লিচু স্বাস্থ্যকর ফল, এটি কোনো বিষাক্ত ফল নয়; তবে অপুষ্ট শিশু, দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা শিশু এবং একসঙ্গে অনেক লিচু খেলে ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। এই প্রতিবেদনে সেই কথাগুলো প্রকাশিত গবেষণা ও স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের নির্দেশনার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়েছে, এবং ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত ভারত ও বাংলাদেশের লিচু উৎপাদনকারী এলাকায় শিশুদের অসুস্থতার প্রাদুর্ভাব নিয়ে যা জানা ছিল, তা তুলে ধরা হয়েছে।

গবেষণাগুলোর চিত্র মিশ্র, তবে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট। ভারতের ন্যাশনাল সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল (এনসিডিসি) এবং যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের (সিডিসি) গবেষকেরা ভারতের বিহার রাজ্যের মুজাফফরপুরে ছোট শিশুদের প্রাণঘাতী এক অসুস্থতার সঙ্গে লিচুতে থাকা দুটি প্রাকৃতিক বিষাক্ত যৌগের যোগ খুঁজে পান। তাঁরা দেখেন, যেসব শিশু লিচু খেয়েছিল এবং রাতের খাবার খায়নি, তাদের ঝুঁকি ছিল সবচেয়ে বেশি। অন্যদিকে বাংলাদেশের দিনাজপুরে ২০১২ সালের এক প্রাদুর্ভাবের আলাদা গবেষণায় লিচু খাওয়ার সঙ্গে অসুস্থতার কোনো সম্পর্ক পাওয়া যায়নি; বরং যেসব বাগানে প্রচুর কীটনাশক ছিটানো হতো, সেখানে যাওয়া বা সংস্পর্শে থাকার দিকে ইঙ্গিত মেলে। দুটি গবেষণাই ফসল তোলার মৌসুমে বাগান এলাকায় বসবাসকারী ছোট শিশুদের নিয়ে।

একটি লিচুতে কী থাকে


লিচুর বেশির ভাগই পানি ও শর্করা। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) পুষ্টি-তথ্য অনুযায়ী, ১০০ গ্রাম কাঁচা লিচুর শাঁসে প্রায় ৮২ গ্রাম পানি থাকে এবং এতে মেলে ৬৬ কিলোক্যালরি শক্তি; সঙ্গে প্রায় ১৫ গ্রাম চিনি, ১.৩ গ্রাম খাদ্য-আঁশ এবং ১৭১ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম। লিচুর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পুষ্টি উপাদান ভিটামিন সি: প্রতি ১০০ গ্রামে প্রায় ৭২ মিলিগ্রাম, যা যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য লেবেলে ব্যবহৃত দৈনিক মানের (ডেইলি ভ্যালু) ৭৯ শতাংশের সমান। অন্যান্য ভিটামিন ও খনিজ থাকে সামান্য পরিমাণে।

উদ্যানতত্ত্ববিদ জুলিয়া মর্টন তাঁর 'ফ্রুটস অব ওয়ার্ম ক্লাইমেটস' (১৯৮৭, যুক্তরাষ্ট্রের পারডু বিশ্ববিদ্যালয় অনলাইনে প্রকাশ করেছে) বইয়ে চীন, ভারত ও ফিলিপাইনে করা বিশ্লেষণ একত্র করেছেন। সেখানেও তাজা শাঁসের হিসাব প্রায় একই রকম: প্রতি ১০০ গ্রামে ৬৩ থেকে ৬৪ ক্যালরি, মোটামুটি ৮২ থেকে ৮৫ শতাংশ আর্দ্রতা এবং প্রায় ১৩ থেকে ১৬ গ্রাম শর্করা। বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া জানায়, লিচুর খাওয়ার উপযোগী অংশ ফলের ওজনের ৫০ থেকে ৭৫ শতাংশ; এতে মূলত শর্করা (চিনি) থাকে, সঙ্গে কিছু আমিষ, বি ও সি ভিটামিন, ক্যালসিয়াম ও আয়রন।

মূল প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, লিচু রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, ত্বক ভালো রাখে এবং শরীরকে আর্দ্র রাখে। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিনের মেডলাইনপ্লাস জানায়, ভিটামিন সি শরীরে কোলাজেন নামের একটি আমিষ তৈরিতে লাগে, যা দিয়ে ত্বক, টেন্ডন, লিগামেন্ট ও রক্তনালি গঠিত হয়; এটি ক্ষত সারাতে, তরুণাস্থি, হাড় ও দাঁত মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণে এবং শরীরে আয়রন শোষণে সাহায্য করে। ভিটামিন সি অনেক অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের একটিও। শরীর নিজে ভিটামিন সি তৈরি বা জমা রাখতে পারে না, তাই নিয়মিত খাবার থেকেই তা পেতে হয়, আর কাঁচা ফল ও সবজি এর সবচেয়ে ভালো উৎস। মেডলাইনপ্লাস আরও বলে, বেশির ভাগ মানুষের ক্ষেত্রে ভিটামিন সি-সমৃদ্ধ খাবার বা সাপ্লিমেন্ট সর্দি-কাশি হওয়ার ঝুঁকি কমায় না। তাই লিচু 'রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়' জাতীয় ঢালাও দাবি এই প্রতিবেদনে রাখা হয়নি।

মূল প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছিল, লিচুতে প্রাকৃতিকভাবে অনেক চিনি থাকে বলে খালি পেটে অনেক লিচু খেলে রক্তে শর্করা দ্রুত নেমে যেতে পারে। গবেষণায় ঝুঁকিটিকে এভাবে বর্ণনা করা হয়নি। মুজাফফরপুরের শিশুদের রক্তে শর্করা কমে যাওয়ার সঙ্গে যোগ পাওয়া গেছে ফলের সাধারণ চিনির নয়, বরং লিচুতে প্রাকৃতিকভাবে থাকা দুটি যৌগের: হাইপোগ্লাইসিন এ এবং মিথিলিনসাইক্লোপ্রোপাইলগ্লাইসিন (এমসিপিজি)। আর এই প্রভাব দেখা গেছে অপুষ্ট বা এক বেলার খাবার না খাওয়া শিশুদের মধ্যে। সেই গবেষণার বিস্তারিত নিচে দেওয়া হলো।

রাজশাহীর লিচু। ছবি: Nakib Ahmed / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 3.0)
রাজশাহীর লিচু। ছবি: Nakib Ahmed / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 3.0)

দক্ষিণ চীনের ফল, চাষ হয় সারা বাংলাদেশে


লিচু (বৈজ্ঞানিক নাম Litchi chinensis) সোপবেরি বা স্যাপিন্ডেসি পরিবারের উদ্ভিদ এবং নিজের গণে এটিই একমাত্র প্রজাতি। মর্টন লিখেছেন, লিচুর আদি নিবাস দক্ষিণ চীনের কুয়াংতুং (গুয়াংদং) ও ফুকিয়েন (ফুজিয়ান) প্রদেশের নিচু এলাকা; চীনা সাহিত্যে ১০৫৯ সাল থেকে এর উল্লেখ পাওয়া যায়। সপ্তদশ শতকের শেষ দিকে লিচু বার্মায় (মিয়ানমার) এবং প্রায় একশ বছর পরে ভারতে পৌঁছায়। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) ২০০২ সালের এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে লিচু উৎপাদন বিষয়ক প্রকাশনায় এস কে মিত্রের নিবন্ধে লিচুর উৎপত্তির প্রধান কেন্দ্র হিসেবে ২৩ থেকে ২৭ ডিগ্রি উত্তর অক্ষাংশের মধ্যে দক্ষিণ চীন, উত্তর ভিয়েতনাম ও মালয়েশিয়ার কথা বলা হয়েছে।

লিচু গাছ চিরসবুজ, পাতা চকচকে ও যৌগিক, আর ফল ঝোলে আলগা থোকায়। পাতলা, খসখসে লাল খোসার নিচে থাকে খাওয়ার অংশ, স্বচ্ছ সাদা শাঁস (অ্যারিল), যা একটি শক্ত, চকচকে বাদামি বীজকে ঘিরে রাখে। মর্টন উল্লেখ করেছেন, বীজটি খাওয়ার উপযোগী নয়; আর পরাগায়নের ত্রুটিতে যেসব ফলের বীজ চুপসে ছোট হয়ে যায়, সেগুলোকে 'চিকেন টাং' বলা হয় এবং শাঁস বেশি থাকায় সেগুলোর কদর বেশি। মার্কিন উদ্যানতত্ত্ববিদ জি ওয়েডম্যান গ্রফের বরাত দিয়ে তিনি লিখেছেন, যেখানে গ্রীষ্ম গরম ও বর্ষণমুখর এবং শীত শুষ্ক ও ঠান্ডা, সেখানে লিচু সবচেয়ে ভালো জন্মায়; আর ভারী তুষারপাতে কচি গাছ মারা যায়।

বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, বাংলাদেশের সব জেলাতেই লিচু চাষ করা যায়, তবে প্রধানত রাজশাহী, রংপুর, দিনাজপুর, যশোর, কুষ্টিয়া, ময়মনসিংহ ও নারায়ণগঞ্জে এর চাষ হয়; আর দেশের বৃক্ষজাত ফলের মধ্যে উৎপাদনে আমের পরেই লিচুর স্থান। বাংলাপিডিয়া স্থানীয় নির্বাচিত জাতগুলোকে দুটি প্রধান ধরনে ভাগ করে: দেশি ও বোম্বাই। এফএওর প্রকাশনায় মিত্রের নিবন্ধে উল্লেখ আছে, ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশে প্রধানত দিনাজপুর, রংপুর ও রাজশাহীতে প্রায় ৪ হাজার ৭৫০ হেক্টর জমিতে লিচু চাষ হয় এবং উৎপাদন ছিল ১২ হাজার ৭৫৫ টন। ভারত ও ভিয়েতনামের মতো বাংলাদেশের চাষিরাও তখন বাগানে ভূপৃষ্ঠ বা বেসিন পদ্ধতিতে সেচ দিতেন। একই নিবন্ধে বলা হয়, ফল সংরক্ষণ ও পরিবহনের শীতল শৃঙ্খল (কোল্ড চেইন) বাংলাদেশসহ এশিয়ার কয়েকটি উৎপাদক দেশে তখনও প্রাথমিক পর্যায়ে ছিল।

লিচুর মৌসুম স্বল্পস্থায়ী। ২০১২ সালে দিনাজপুরে সাক্ষাৎকার দেওয়া বাগান তত্ত্বাবধায়কেরা জানান, জাতভেদে মে থেকে জুনের মধ্যে ফুল আসা থেকে ফল তোলা পর্যন্ত মোটামুটি এক মাস সময় লাগে। তাঁরা জানান, দেশের নানা প্রান্তের পাইকারেরা কয়েক বছরের জন্য বাগান ইজারা নেন এবং গাছের দেখভালের জন্য স্থানীয় লোক নিয়োগ করেন। ছোট গাছের সরু ডালে সহজে উঠতে পারে এবং মজুরিও কম বলে কখনো কখনো ফল পাড়তে শিশুদেরও কাজে লাগানো হতো।

গাজীপুরে এক থোকা লিচু। ছবি: Mazhar Zarif / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
গাজীপুরে এক থোকা লিচু। ছবি: Mazhar Zarif / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

মুজাফফরপুর: প্রতি গ্রীষ্মে ফিরে আসা এক অসুস্থতা


বিহারের মুজাফফরপুর জেলা ভারতের সবচেয়ে বড় লিচু উৎপাদনকারী অঞ্চল। সিডিসির সাপ্তাহিক প্রকাশনা মরবিডিটি অ্যান্ড মর্টালিটি উইকলি রিপোর্টে (এমএমডব্লিউআর) ২০১৫ সালের ৩০ জানুয়ারি প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৯৫ সাল থেকে সেখানে ছোট শিশুদের মধ্যে ব্যাখ্যাহীন এক তীব্র স্নায়বিক অসুস্থতার প্রাদুর্ভাব দেখা যাচ্ছিল, যাতে মৃত্যুর হার ছিল উঁচু। প্রাদুর্ভাব সাধারণত জুনে চূড়ায় পৌঁছাত এবং কয়েক সপ্তাহ পরে বর্ষা শুরু হলে কমে যেত। বছরের পর বছর গবেষকেরা সংক্রামক এনকেফালাইটিস থেকে শুরু করে কীটনাশকের সংস্পর্শ পর্যন্ত নানা কারণের কথা বলেছেন; আর লিচু উৎপাদনকারী অঞ্চলে ফল তোলার মৌসুমে রোগটি দেখা দেওয়ায় লিচুর সঙ্গে এর যোগের কথাও ওঠে।

এনসিডিসি ও সিডিসি ২০১৩ ও ২০১৪ সালের প্রাদুর্ভাব তদন্ত করে। ২০১৩ সালের ১৭ মে থেকে ২২ জুলাইয়ের মধ্যে আকস্মিক খিঁচুনি বা মানসিক অবস্থার পরিবর্তন নিয়ে ১৩৩টি শিশু মুজাফফরপুরের প্রধান দুটি রেফারেল হাসপাতালে ভর্তি হয়। তাদের ৭১ শতাংশের বয়স ছিল এক থেকে পাঁচ বছর, ৯৪ শতাংশের সারা শরীরে খিঁচুনি হয়েছিল, বেশির ভাগের ভর্তির সময় জ্বর ছিল না, আর মারা যায় ৪৪ শতাংশ। জাপানি এনকেফালাইটিস ভাইরাসসহ ওই অঞ্চলে মস্তিষ্কে প্রদাহ ঘটায় এমন অন্যান্য ভাইরাসের পরীক্ষার ফল ছিল নেতিবাচক। যেসব শিশু মারা যায়, ভর্তির সময় তাদের মধ্যে রক্তে কম শর্করা বেশি দেখা গেছে; আর তুলনামূলক শিশুদের চেয়ে অসুস্থ শিশুরা ক্ষেত বা ফলবাগানে বেশি সময় কাটিয়েছিল।

২০১৪ সালে দলটি ২৬ মে থেকে ১৭ জুলাইয়ের মধ্যে একই দুই হাসপাতালে ভর্তি ৩৯০ জন রোগীকে মূল্যায়ন করে। তাদের বয়সের মধ্যমা ছিল চার বছর, আর ৭২ শতাংশের বয়স এক থেকে পাঁচ বছর। পরিচর্যাকারীরা জানান, আগে সুস্থ থাকা শিশুদের হঠাৎ খিঁচুনি শুরু হয়, প্রায়ই ভোর ৪টা থেকে সকাল ৮টার মধ্যে। ৮ থেকে ১৪ জুনের মধ্যে ১৪৭ জন রোগী নিয়ে প্রাদুর্ভাব চূড়ায় পৌঁছায় এবং ২১ জুন বর্ষা শুরুর পর রোগী উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। হাসপাতালে পৌঁছানোর পর যে ৩২৭ জনের রক্তে শর্করা মাপা হয়, তাদের মধ্যমা মাত্রা ছিল প্রতি ডেসিলিটারে ৪৮ মিলিগ্রাম, আর ৬২ শতাংশের মাত্রা ছিল ৭০ বা তার কম। মৃত্যুর হার ২০১৩ সালের ৪৪ শতাংশ থেকে ২০১৪ সালে ৩১ শতাংশে নামে; এমএমডব্লিউআরের প্রতিবেদনে বলা হয়, রক্তে কম শর্করা দ্রুত পরীক্ষা ও ঠিক করার ২০১৩ সালের সুপারিশ আংশিকভাবে এতে সাহায্য করে থাকতে পারে।

রোগটি এরপরও ফিরে এসেছে। ২০১৯ সালের ১৩ জুন বার্তা সংস্থা এএফপির যে প্রতিবেদন দ্য গার্ডিয়ান প্রকাশ করে, তাতে বলা হয়, আগের দশ দিনে মুজাফফরপুরের দুটি হাসপাতালে অন্তত ৩১টি শিশু মারা গেছে, তাদের বেশির ভাগের রক্তে হঠাৎ গ্লুকোজ কমে গিয়েছিল, আর স্থানীয়ভাবে রোগটি 'চমকি বুখার' নামে পরিচিত। রাজ্যের এক জ্যেষ্ঠ স্বাস্থ্য কর্মকর্তা জানান, প্রচণ্ড গরমের মৌসুমে শিশুদের যত্ন নিতে স্বাস্থ্য বিভাগ মানুষের জন্য একটি পরামর্শ জারি করেছে।

২০১৪ সালের গবেষণা ও ফলের ভেতরের বিষাক্ত যৌগ


২০১৪ সালের তদন্তের পূর্ণাঙ্গ ফল দ্য ল্যানসেট গ্লোবাল হেলথ সাময়িকীতে ২০১৭ সালের ৩১ জানুয়ারি অনলাইনে প্রকাশিত হয়। গবেষকেরা ১০৪টি অসুস্থ শিশুকে একই হাসপাতালে অন্য রোগে ভর্তি সমবয়সী ১০৪টি শিশুর সঙ্গে তুলনা করেন। অসুস্থতা শুরুর আগের ২৪ ঘণ্টায় লিচু খাওয়ার সঙ্গে অসুস্থ হওয়ার জোরালো সম্পর্ক পাওয়া যায়, রাতের খাবার না খাওয়ার সঙ্গেও। আর দুটি একসঙ্গে ঘটলে ঝুঁকি ছিল সবচেয়ে বেশি: যে শিশুরা রাতের খাবার খায়নি, তাদের মধ্যে লিচুর সঙ্গে সম্পর্ক (অডস রেশিও ৭.৮) রাতের খাবার খাওয়া শিশুদের (৩.৬) চেয়ে জোরালো ছিল। সংক্রামক জীবাণু ও কীটনাশকের পরীক্ষার ফল ছিল নেতিবাচক।

পরীক্ষাগারের ফল ইঙ্গিত দেয় ফলের নিজস্ব রসায়নের দিকে। অসুস্থ শিশুদের ৭৩টি প্রস্রাবের নমুনার ৪৮টিতে হাইপোগ্লাইসিন এ, এমসিপিজি বা দুটিরই ভাঙনজাত উপাদান পাওয়া যায়, তুলনামূলক শিশুদের ১৫টি নমুনার একটিতেও নয়। অসুস্থ শিশুদের ৮০টি নমুনার ৭২টিতে অ্যাসাইলকারনিটিনের অস্বাভাবিক চিত্র দেখা যায়, যা শরীর যেভাবে চর্বি পুড়িয়ে শক্তি পায় সেই প্রক্রিয়ায় গুরুতর বিঘ্নের লক্ষণ। মুজাফফরপুর থেকে নেওয়া ৩৬টি লিচুর শাঁস পরীক্ষা করে প্রতি গ্রামে হাইপোগ্লাইসিন এ পাওয়া যায় ১২.৪ থেকে ১৫২.০ মাইক্রোগ্রাম এবং এমসিপিজি ৪৪.৯ থেকে ২২০.০ মাইক্রোগ্রাম।

যৌগ দুটি বিজ্ঞানের কাছে নতুন নয়। ১৯৬২ সালে ব্রিটিশ জৈব রসায়নবিদ ডি ও গ্রে ও এল ফাউডেন বায়োকেমিক্যাল জার্নালে লিচুর বীজ থেকে এমসিপিজির বর্ণনা দেন। ২০১৫ সালের এমএমডব্লিউআর প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রাণীর ওপর গবেষণায় এমসিপিজি রক্তে শর্করা কমায় বলে জানা ছিল। প্রতিবেদনে ব্যাখ্যা করা হয়, ধারণা করা হয় এমসিপিজি হাইপোগ্লাইসিন এ-র মতো কাজ করে; হাইপোগ্লাইসিন এ এমন এক বিষাক্ত যৌগ, যা ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও পশ্চিম আফ্রিকায় কাঁচা অ্যাকি ফল খাওয়ার পর মানুষের তীব্র মস্তিষ্কজনিত অসুস্থতা ঘটিয়েছে। অ্যাকি লিচুর একই উদ্ভিদ পরিবারের ফল।

ল্যানসেটের গবেষকেরা জানান, ওই অঞ্চলে অসুস্থতা ঠেকাতে ও মৃত্যু কমাতে তাঁরা লিচু খাওয়া যতটা সম্ভব কমানো, শিশুরা যেন রাতের খাবার পায় তা নিশ্চিত করা, এবং রোগ সন্দেহ হলে দ্রুত রক্তের গ্লুকোজ ঠিক করার সুপারিশ করেছিলেন। ২০১৩ সালের প্রাদুর্ভাবের পরই তদন্তকারীরা হাসপাতাল ও প্রান্তিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে গ্লুকোমিটার সরবরাহের পরামর্শ দিয়েছিলেন। সাময়িকীটি গবেষণাটির সঙ্গে পিটার স্পেনসার ও ভ্যালেরি পামারের একটি ভাষ্যও প্রকাশ করে, যার শিরোনাম 'দ্য এনিগমা অব লিচি টক্সিসিটি: অ্যান ইমার্জিং হেলথ কনসার্ন ইন সাউদার্ন এশিয়া', অর্থাৎ লিচুর বিষাক্ততার রহস্য: দক্ষিণ এশিয়ায় স্বাস্থ্যের এক নতুন উদ্বেগ।

আস্ত ও খোসা ছাড়ানো লিচু; ডানে খাওয়ার উপযোগী সাদা শাঁস দেখা যাচ্ছে। ছবি: Peggy Greb, USDA ARS / উইকিমিডিয়া কমন্স (পাবলিক ডোমেইন)
আস্ত ও খোসা ছাড়ানো লিচু; ডানে খাওয়ার উপযোগী সাদা শাঁস দেখা যাচ্ছে। ছবি: Peggy Greb, USDA ARS / উইকিমিডিয়া কমন্স (পাবলিক ডোমেইন)

দিনাজপুর ২০১২: বাংলাদেশের গবেষণা বাগানের কীটনাশকের দিকে ইঙ্গিত দেয়


বাংলাদেশেও এমন প্রাদুর্ভাব ঘটেছে। ২০১২ সালের ১৬ জুন দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একজন চিকিৎসক রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানকে (আইইডিসিআর) উত্তরাঞ্চলে শিশুদের মধ্যে এনকেফালাইটিসের প্রাদুর্ভাবের খবর দেন। আইইডিসিআর এবং ঢাকাভিত্তিক আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর,বি) একটি দল ২০১২ সালের ১৭ জুন থেকে ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তদন্ত চালায়। আক্রান্ত হয় ১৪টি শিশু, মারা যায় ১৩টি। তাদের ১৩ জন দিনাজপুর জেলার চারটি উপজেলার ১৩টি গ্রামের এবং একজন পাশের ঠাকুরগাঁও জেলার একটি উপজেলার। আক্রান্তদের বয়সের মধ্যমা ছিল ৪.৬ বছর।

অসুস্থতা আসত খুব দ্রুত। ১৪টি শিশুর ১৩টি অচেতন হয়ে পড়ে, ১১টির খিঁচুনি হয়, ৮টির প্রচুর ঘাম হয় এবং ৭টির মুখ দিয়ে ফেনা বের হয়। যে ছয়টি শিশুর তথ্য পাওয়া যায়, তাদের ক্ষেত্রে অসুস্থতার প্রথম লক্ষণ থেকে অচেতন হওয়া পর্যন্ত সময়ের মধ্যমা ছিল আড়াই ঘণ্টা; আর যারা মারা যায়, তাদের ক্ষেত্রে অসুস্থতা শুরু থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সময়ের মধ্যমা ছিল ২০ ঘণ্টা। মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পৌঁছানোর আগে ৬৪ শতাংশ পরিবার কবিরাজ বা আধ্যাত্মিক চিকিৎসকের কাছে, ৫৭ শতাংশ গ্রাম্য চিকিৎসক বা প্যারামেডিকের কাছে এবং ২৯ শতাংশ উপজেলা হাসপাতালে গিয়েছিল।

দলটি ১৪টি শিশুকে প্রতিবেশী ৫৬টি শিশু এবং আশপাশের গ্রামের ৫৬টি শিশুর সঙ্গে তুলনা করে। আশপাশের গ্রামের শিশুদের তুলনায় অসুস্থ শিশুদের ক্ষেত্রে অসুস্থ হওয়ার আগের ২৪ ঘণ্টায় লিচুবাগানে যাওয়ার হার (৯১ শতাংশ বনাম ৫৪ শতাংশ), পরিবারের কারও লিচুবাগানে কাজ করার হার (৪৩ শতাংশ বনাম ৯ শতাংশ) এবং কীটনাশক ছিটানোর সময় কোনো বাগানে যাওয়ার হার (৩৮ শতাংশ বনাম ১৪ শতাংশ) বেশি ছিল। প্রতিবেশী শিশুদের তুলনায় আগের তিন দিনে কীটনাশক ব্যবহৃত বাগানে যাওয়ার হারও তাদের বেশি ছিল (২৯ শতাংশ বনাম ৫ শতাংশ)। কিন্তু অসুস্থতার আগের ২৪ ঘণ্টায় লিচু খাওয়ার সঙ্গে অসুস্থ হওয়ার কোনো সম্পর্ক পাওয়া যায়নি: অসুস্থ শিশুদের ৫৭ শতাংশ লিচু খেয়েছিল, যেখানে আশপাশের গ্রামের তুলনামূলক শিশুদের ৭১ শতাংশ এবং প্রতিবেশী শিশুদের ৬১ শতাংশ খেয়েছিল।

সাক্ষাৎকারে কৃষি রাসায়নিকের ব্যাপক ব্যবহারের চিত্র উঠে আসে। তত্ত্বাবধায়কেরা জানান, ফল পাকার সময় তাঁরা সপ্তাহে দুই থেকে তিনবার সাইপারমেথ্রিন, এন্ডোসালফান, আলফা-সাইপারমেথ্রিন ও ল্যাম্বডা-সাইহ্যালোথ্রিনসহ বিভিন্ন কীটনাশক এবং ছত্রাকনাশক ও বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রক ছিটাতেন। পাইকারেরা স্থানীয় বিক্রেতা এবং ভারত সীমান্তের কাছের নিবন্ধনহীন বিক্রেতাদের কাছ থেকে কীটনাশক কিনতেন, আর তত্ত্বাবধায়কদের হাতে দেওয়ার আগে কখনো কখনো বোতল বা প্যাকেটের লেবেল তুলে ফেলতেন। তত্ত্বাবধায়কেরা আরও জানান, ফলের রং ভালো করতে তাঁরা কার্বেন্ডাজিম নামের ছত্রাকনাশক ব্যবহার করতেন, আর ২০১২ সালের জুনের দ্বিতীয় সপ্তাহে পাঁচ দিনের দেশব্যাপী পরিবহন ধর্মঘটের সময় ফল পাকা দেরি করাতে প্রায় প্রতিদিন তা ছিটিয়েছেন। বাগান থেকে সংগ্রহ করা খালি বোতল ও প্যাকেটের লেবেলে উপাদান হিসেবে পাইরেথ্রয়েড, এন্ডোসালফান, ডাইথিওকার্বামেট, বেনজিমিডাজোল ও ট্রায়াজোলের নাম ছিল।

পরিবারগুলো জানায়, শিশুরা প্রায়ই বাগানের মাটিতে ঝরে পড়া ফাটা লিচু কুড়িয়ে নিত, না ধুয়েই দাঁত দিয়ে খোসা ছাড়িয়ে খেত। আইসিডিডিআর,বির মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামের নেতৃত্বে গবেষকেরা ২০১৭ সালের ২৭ জুলাই অনলাইনে প্রকাশিত দ্য আমেরিকান জার্নাল অব ট্রপিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড হাইজিনে লেখেন, প্রাদুর্ভাবটির সঙ্গে যোগ ছিল যেসব লিচুবাগানে নিয়মিত কৃষি রাসায়নিক ব্যবহৃত হতো সেখানকার সংস্পর্শের, লিচু খাওয়ার নয়। তাঁরা উল্লেখ করেন, ভারতের মতো এখানেও বর্ষা শুরু হলে প্রাদুর্ভাব থেমে যায়, যা ইঙ্গিত দেয় বিষাক্ত উপাদানটি ফলের ভেতরে নয়, বরং ওপরের অংশে ছিল। অসুস্থ থাকা অবস্থায় শিশুদের রক্ত বা প্রস্রাবের নমুনা নেওয়া হয়নি বলে কারণ নিশ্চিত করা যায়নি, আর এমসিপিজির ব্যাখ্যাও সরাসরি পরীক্ষা করা সম্ভব হয়নি। গবেষকেরা লেখেন, ২০০৮ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে আইসিডিডিআর,বি ও আইইডিসিআর বাংলাদেশে শিশুদের মধ্যে তীব্র এনকেফালাইটিস সিনড্রোমের নয়টি প্রাদুর্ভাব তদন্ত করে, যার সাতটি ঘটেছিল লিচু তোলার মৌসুমে; আর ২০১৫ সালে দিনাজপুরের একই লিচু এলাকায় আরেকটি প্রাদুর্ভাব হয়।

২০১৭ সালের ২৫ জুলাই গবেষণাটি নিয়ে প্রতিবেদনে ভয়েস অব আমেরিকা (ভিওএ) জানায়, ২০১১ সালে এন্ডোসালফানকে স্থায়ী জৈব দূষক বিষয়ক স্টকহোম কনভেনশনের তালিকায় যুক্ত করা হয়েছিল। সাইফুল ইসলাম ভিওএকে বলেন, বাংলাদেশে কিছু ফসলে এন্ডোসালফান ব্যবহারের অনুমতি আছে, তবে লিচুতে নয়। তিনি আরও বলেন, "কীটনাশকের ব্যবহারের ওপর নজরদারি খুবই দুর্বল।"

ভিয়েতনামেও একই ধরনের চিত্র


দক্ষিণ এশিয়ার বাইরেও এমন প্রাদুর্ভাব নথিভুক্ত হয়েছে। ফ্রান্সের ইনস্টিটিউট পাস্তুরের গবেষক ও ভিয়েতনামি সহকর্মীদের একটি গবেষণা ২০১২ সালের নভেম্বরে ইমার্জিং ইনফেকশাস ডিজিজেস সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়। তাতে বলা হয়, ১৯৯০-এর দশকের শেষ দিক থেকে উত্তর ভিয়েতনামের বাক জিয়াং প্রদেশে মে থেকে জুলাইয়ের লিচু তোলার মৌসুমে শিশুদের মধ্যে তীব্র এনকেফালাইটিসের প্রাদুর্ভাব দেখা যাচ্ছিল। ২০০৪ থেকে ২০০৯ সালের তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা দেখেন, কোনো এলাকার জমির যত বড় অংশে লিচুবাগান, সেখানে রোগের প্রকোপের সঙ্গে তার স্বাধীন সম্পর্ক রয়েছে। তাঁরা লেখেন, রোগীদের বৈশিষ্ট্য ভাইরাসজনিত কারণের ইঙ্গিত দেয়, এবং কারণটি শনাক্ত করতে আরও গবেষণার আহ্বান জানান। পরে ২০১৫ সালের এমএমডব্লিউআর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ভিয়েতনামের তদন্তে প্রাদুর্ভাব ব্যাখ্যা করার মতো কোনো সংক্রামক জীবাণু পাওয়া যায়নি।

বাংলাদেশের গবেষণাপত্রটি এসব প্রাদুর্ভাবকে বড় প্রেক্ষাপটে রাখে। এতে বলা হয়, এশিয়ায় প্রতিবছর প্রায় ১ লাখ ৩৩ হাজার শিশু তীব্র এনকেফালাইটিস সিনড্রোমে আক্রান্ত হয়; ভারত, বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডে শিশুদের মধ্যে অস্বাভাবিক প্রাদুর্ভাবের খবর পাওয়া গেছে; আর ২০১৪ সালে ভারতের ন্যাশনাল ভেক্টর বর্ন ডিজিজ কন্ট্রোল প্রোগ্রামের একটি দল প্রাদুর্ভাব এলাকার লিচুর নমুনায় মানুষের জন্য নির্ধারিত সীমার চেয়ে বেশি আলফা-সাইপারমেথ্রিন কীটনাশক পেয়েছিল। অন্যদিকে ল্যানসেটের গবেষণায় মুজাফফরপুরের শিশুদের নমুনায় কোনো কীটনাশক পাওয়া যায়নি। ফলে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত গবেষণা ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় একাধিক সম্ভাব্য কারণের দিকে ইঙ্গিত করছিল: মুজাফফরপুরে ক্ষুধার্ত ও অপুষ্ট শিশুদের ওপর ফলের প্রাকৃতিক বিষাক্ত যৌগের প্রভাব, আর বাংলাদেশের যেসব বাগান নিয়ে গবেষণা হয়েছে সেখানে কীটনাশকের ব্যাপক সংস্পর্শ।

রক্তে শর্করা কমে যাওয়া: লক্ষণ ও কখন চিকিৎসা নেবেন


মেডলাইনপ্লাসের সংজ্ঞা অনুযায়ী, রক্তে শর্করা প্রতি ডেসিলিটারে ৭০ মিলিগ্রামের (প্রতি লিটারে ৩.৯ মিলিমোল) নিচে নামলে তাকে কম শর্করা বা হাইপোগ্লাইসেমিয়া বলা হয়। এর লক্ষণের মধ্যে থাকতে পারে:

  • ক্ষুধা, শরীর কাঁপা এবং ঘাম হওয়া
  • হৃৎস্পন্দন দ্রুত বা ধড়ফড় করা, অস্থিরতা বা খিটখিটে মেজাজ
  • মাথাব্যথা, ক্লান্তি বা দুর্বলতা
  • ঝাপসা বা দুটি করে দেখা এবং চিন্তা অস্পষ্ট হয়ে যাওয়া
  • বেশি গুরুতর হলে খিঁচুনি

মেডলাইনপ্লাস বলে, রক্তে শর্করা প্রতি ডেসিলিটারে ৫৪ মিলিগ্রামের নিচে নামলে চিন্তা অস্পষ্ট হওয়া বা খিঁচুনির মতো গুরুতর লক্ষণ দেখা দিতে পারে, আর রক্তে শর্করার গুরুতর ঘাটতি একটি জরুরি চিকিৎসা পরিস্থিতি, যা খিঁচুনি ও মস্তিষ্কের ক্ষতি ঘটাতে পারে। যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা (এনএইচএস) জানায়, ডায়াবেটিস নেই এমন মানুষের রক্তে শর্করা কমে যাওয়া বিরল, তবে অপুষ্টিসহ কিছু অবস্থায় তা হতে পারে; আর গুরুতর ক্ষেত্রে মানুষের খিঁচুনি হতে পারে বা সে অচেতন হয়ে পড়তে পারে। এনএইচএসের পরামর্শ, অচেতন কাউকে কোনো খাবার বা পানীয় দেওয়া যাবে না, কারণ সে নিরাপদে গিলতে পারবে না; বরং তাকে রিকভারি পজিশনে (কাত করে) শুইয়ে দিয়ে জরুরি সহায়তা ডাকতে হবে।

মুজাফফরপুরে জনস্বাস্থ্য পরামর্শের মূল কথা ছিল দ্রুততা: আক্রান্ত শিশুদের পরিবারকে সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসা নিতে বলা হয়, আর হাসপাতালগুলোকে পৌঁছানোর পরপরই রক্তের গ্লুকোজ পরীক্ষা এবং রোগ সন্দেহ হলে শিরায় ডেক্সট্রোজ দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। দিনাজপুরের প্রাদুর্ভাবে অনেক পরিবার প্রথমে কবিরাজ বা গ্রাম্য চিকিৎসকের কাছে যায়, আর হাসপাতালে পৌঁছানোর সময় শিশুরা প্রায়ই গুরুতর অবস্থায় ছিল। কোনো শিশুর হঠাৎ খিঁচুনি হলে বা সে ঝিমিয়ে পড়লে কিংবা অচেতন হয়ে গেলে দেরি না করে হাসপাতালে নিতে হবে। ডায়াবেটিস থাকলে, কিংবা নিজের খাদ্যতালিকায় কতটা ফল মানানসই সে বিষয়ে প্রশ্ন থাকলে, সাধারণ টিপসের ওপর ভরসা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

ধুয়ে খাওয়া, খোসা ছাড়ানো ও কীটনাশক ছিটানোর সময় শিশুদের দূরে রাখা


বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) খাদ্যে কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ বিষয়ে তাদের তথ্যপত্রে (সেপ্টেম্বর ২০২২) জানায়, কীটনাশক মানুষের জন্য সম্ভাব্য বিষাক্ত এবং এর স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি দুই ধরনের প্রভাবই থাকতে পারে; আর সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন যাঁরা কাজের জায়গায়, বাড়িতে বা বাগানে কীটনাশকের সংস্পর্শে আসেন। সংস্থাটির পরামর্শ, যাঁরা সরাসরি কীটনাশক ছিটানোর কাজে যুক্ত নন, তাঁদের ছিটানোর সময় এবং এর পরে কিছুক্ষণ সেই এলাকা থেকে দূরে থাকা উচিত। ডব্লিউএইচও আরও বলে, ফল ও সবজি খোসা ছাড়িয়ে বা ধুয়ে খেলে ভোক্তারা কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ গ্রহণ আরও কমাতে পারেন, আর এতে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার মতো খাদ্যবাহিত অন্যান্য ঝুঁকিও কমে।

ডব্লিউএইচও ব্যাখ্যা করে, এফএও ও ডব্লিউএইচওর যৌথ কীটনাশক অবশিষ্টাংশ সভা (জেএমপিআর) খাদ্যে অবশিষ্টাংশের ঝুঁকি মূল্যায়ন করে নিরাপদ গ্রহণসীমা ঠিক করে, আর সেই সীমা ব্যবহার করে কোডেক্স অ্যালিমেন্টারিয়াস কমিশন আন্তর্জাতিক খাদ্য বাণিজ্যে কীটনাশক অবশিষ্টাংশের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করে। সংস্থাটি আরও বলে, ফসল রক্ষায় কৃষকদের যতটুকু প্রয়োজন তার বেশি কীটনাশক ব্যবহার করা উচিত নয়।

বাগানঘেরা গ্রামের শিশুরা কেন বিশেষভাবে সংস্পর্শে আসে, বাংলাদেশের গবেষকেরা তা ব্যাখ্যা করেছেন। শরীরের ওজনের তুলনায় শিশুরা বড়দের চেয়ে বেশি খায়, পান করে ও শ্বাস নেয়; খেলার সময় তারা প্রায়ই আঙুল ও নানা জিনিস মুখে দেয়; আর পরিবারের যে সদস্যরা বাগানে কাজ করেন বা কীটনাশক ছিটান, তাঁদের যন্ত্রপাতি, কাপড়, জুতা ও ত্বকে লেগে থাকা অবশিষ্টাংশ ঘরে চলে আসতে পারে। দিনাজপুরের গ্রামগুলোতে শিশুরা না ধুয়ে ঝরে পড়া লিচু খেত এবং দাঁত দিয়ে খোসা ছাড়াত। ফল ধুয়ে বা খোসা ছাড়িয়ে খাওয়া ও কীটনাশক ছিটানোর এলাকা থেকে দূরে থাকার বিষয়ে ডব্লিউএইচওর পরামর্শ, এবং শিশুরা যেন রাতের খাবার পায় সে বিষয়ে ল্যানসেটের গবেষকদের সুপারিশ, লিচু তোলার মৌসুমে লিচু এলাকার জন্য সরাসরি প্রযোজ্য।

ছবি: Sd Raihan / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

সূত্র: জাগো নিউজ ২৪ (টাইমস অব ইন্ডিয়ার বরাতে), দ্য ল্যানসেট গ্লোবাল হেলথ, সিডিসির মরবিডিটি অ্যান্ড মর্টালিটি উইকলি রিপোর্ট, দ্য আমেরিকান জার্নাল অব ট্রপিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড হাইজিন, ইমার্জিং ইনফেকশাস ডিজিজেস, বায়োকেমিক্যাল জার্নাল, ভয়েস অব আমেরিকা, দ্য গার্ডিয়ান (এএফপি), এফএও, বাংলাপিডিয়া, পারডু বিশ্ববিদ্যালয় (ফ্রুটস অব ওয়ার্ম ক্লাইমেটস), যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের পুষ্টি-তথ্য (উইকিপিডিয়ার মাধ্যমে), মেডলাইনপ্লাস (যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিন), এনএইচএস, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা

অনলাইন ডেস্কদা এগ্রো নিউজ

স্বাস্থ্য

সম্পর্কিত খবর

বিশ্ব

ভালো ফসলের বছরেও আফগানিস্তানে শীতে তীব্র খাদ্যসংকটে পড়বে ১ কোটি ৯২ লাখ মানুষ

অনুকূল বৃষ্টি ও ভালো ফসলের পরও নভেম্বর-এপ্রিলে আফগানিস্তানের ৩৮ শতাংশ মানুষ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় পড়বে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে এফএও ও ডব্লিউএফপি; গত বছর একই সময়ের পূর্বাভাস ছিল ১ কোটি ৭৪ লাখ।

ডব্লিউএফপি১৬ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
পরিবেশ

শব্দদূষণ ভারতের শহরে স্বাস্থ্যঝুঁকি, কিন্তু মাপাই কঠিন

মুম্বাইয়ে বাইরের শব্দের মাত্রা গড়ে ৬৫ থেকে ৮৫ ডেসিবেল, যেখানে সড়কের শব্দে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিকা ৫৪ ডেসিবেল। গবেষকেরা বলছেন, তথ্যের ঘাটতি ও ব্যয়বহুল শব্দ-মডেলের কারণে ভারতে এর স্বাস্থ্যপ্রভাব নিয়ে গবেষণা কঠিন।

Mongabay India১৬ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
স্বাস্থ্য

ক্যানসার অস্ত্রোপচারের রোগীর পুষ্টিসেবায় বৈশ্বিক নির্দেশিকা তৈরির উদ্যোগ

ওয়ার্ল্ড সোসাইটি অব সার্জিক্যাল অনকোলজি ও নেসলে বিশ্বের ১৫ জন চিকিৎসা বিশেষজ্ঞকে নিয়ে ক্যানসার অস্ত্রোপচারের আগে-পরে রোগীর অপুষ্টি শনাক্ত ও পুষ্টি সহায়তার বাস্তবসম্মত নির্দেশিকা তৈরি করবে।

FoodNavigator১৬ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)