সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ১৬ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা২৮°পরিষ্কার আকাশআর্দ্রতা ৬২%বাতাস ৫ কিমি/ঘ

ভেজাল সার, বালাইনাশক ও বীজ: কৃষি উপকরণে সংস্কারের পক্ষে এক বিশেষজ্ঞের যুক্তি

ভেজাল ও নিম্নমানের সার, বালাইনাশক ও বীজ দেশের কৃষিখাতের নীরব কিন্তু মারাত্মক সংকট বলে ২০২৬ সালের ৬ জানুয়ারি জাগো নিউজে প্রকাশিত বিশ্লেষণে যুক্তি দেন কৃষি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ সমীরণ বিশ্বাস; তিনি যৌথ অভিযান, ডিজিটাল যাচাই ও কৃষকের সচেতনতা বাড়ানোর প্রস্তাব দেন।

ভেজাল সার, বালাইনাশক ও বীজ: কৃষি উপকরণে সংস্কারের পক্ষে এক বিশেষজ্ঞের যুক্তি
পরিবেশ

ভেজাল, নকল, অবৈধ ও নিম্নমানের সার, বালাইনাশক ও বীজের অবাধ বিস্তার দেশের কৃষিখাতের একটি নীরব কিন্তু মারাত্মক সংকট হয়ে উঠেছে; এতে কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়ছে, ফলন কমছে, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে এবং সবচেয়ে বড় কথা, কৃষকের আস্থা ভেঙে যাচ্ছে। ২০২৬ সালের ৬ জানুয়ারি জাগো নিউজের কৃষি ও প্রকৃতি বিভাগে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে এ যুক্তি তুলে ধরেন কৃষি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ সমীরণ বিশ্বাস। তাঁর মতে, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) একা এই সমস্যার সমাধান করতে পারবে না; এ জন্য নিয়মিত যৌথ অভিযান, প্রতিটি অনুমোদিত উপকরণের ডিজিটাল যাচাইব্যবস্থা, শক্তিশালী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এবং সচেতন কৃষক সমাজ দরকার।

লেখক বিষয়টিকে জাতীয় সমস্যা হিসেবে দেখেছেন। তিনি লেখেন, বাংলাদেশ কৃষিনির্ভর দেশ; দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, গ্রামীণ অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও সামাজিক স্থিতিশীলতার অন্যতম ভিত্তি কৃষি। তাঁর মতে, অবৈধ ও নিম্নমানের উপকরণের বিস্তার এখন আর শুধু একজন কৃষকের ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, পরিবেশগত ভারসাম্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্য ও জীবনের ওপর গভীর হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

লেখকের চোখে সমস্যার গভীরতা


সমীরণ বিশ্বাস লেখেন, ফসল উৎপাদনের মূল ভিত্তি হলো মানসম্মত বীজ, সঠিক মাত্রার সার ও কার্যকর বালাইনাশক। বাজারে অবাধে ভেজাল ও অননুমোদিত উপকরণ ঢুকলে ফলন কমে, উৎপাদন খরচ বাড়ে এবং কৃষক ক্রমেই আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। তাঁর যুক্তি, নিম্নমানের ও ক্ষতিকর বালাইনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহার মাটি, পানি ও জীববৈচিত্র্যের মারাত্মক ক্ষতি করে, মাটির উর্বরতা নষ্ট করে এবং খাদ্যশস্যে বিষাক্ত অবশিষ্টাংশ রেখে যায়, যা মানবস্বাস্থ্যের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করে। ভেজাল বীজে প্রতারিত হন যে কৃষক কেনেন তিনি, কিন্তু লেখকের মতে এর প্রভাব পড়ে সামগ্রিক খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থার ওপর, যা ভবিষ্যতে খাদ্য ঘাটতি ও পুষ্টিহীনতার আশঙ্কা বাড়ায়।

লেখকের পর্যবেক্ষণ, দেশের অনেক কৃষকই জানেন না, তাঁরা যে সার, বীজ বা বালাইনাশক ব্যবহার করছেন সেটি আসল না নকল। একই পণ্যের নামে একাধিক ব্র্যান্ড, প্রায় একই রকম মোড়ক, বিভ্রান্তিকর লেবেল এবং অতিরঞ্জিত বিজ্ঞাপন কৃষকদের বিভ্রান্ত করছে। তিনি লেখেন, অনেক ক্ষেত্রে নিম্নমানের বা নিষিদ্ধ উপাদানযুক্ত বালাইনাশক যে রোগ দমনের জন্য কেনা হয় তা দমন করে না; বরং জমির উর্বরতা নষ্ট করে, উপকারী পোকা মেরে ফেলে এবং মানবস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে। এই প্রেক্ষাপটে তাঁর প্রশ্ন, এত বড় সমস্যা থাকা সত্ত্বেও ভেজাল, নকল ও অবৈধ কৃষি উপকরণের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা কেন দৃশ্যমান নয়?

ব্যবস্থার যে দুর্বলতাগুলো তিনি দেখেছেন, সেগুলোও তুলে ধরেন। কৃষি উপকরণ নিয়ন্ত্রণে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, উদ্ভিদ সঙ্গনিরোধ কর্তৃপক্ষ, জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, সবারই আংশিক ভূমিকা আছে, কিন্তু তাদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব বড় সমস্যা। অনেক ক্ষেত্রে জরিমানা কম এবং মামলা নিষ্পত্তি ধীর, ফলে অপরাধীরা নিরুৎসাহিত হয় না। ডিলার ও কোম্পানি নিবন্ধন ব্যবস্থা দুর্বল হওয়ায় অনেক অবৈধ বা অননুমোদিত প্রতিষ্ঠান সহজেই বাজারে ঢুকে পড়ছে। আর অধিকাংশ কৃষক ডিলারের কথার ওপর নির্ভর করেন; লেবেল পড়া, উপাদান বোঝা বা পণ্যটি অনুমোদিত কি না তা যাচাই করার সক্ষমতা অনেকেরই নেই।

আগের পরীক্ষাগুলোতে যা মিলেছিল


উদ্বেগটি নতুন নয়। ২০০৭ সালের জুলাইয়ে দ্য ডেইলি স্টার জানায়, মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট (এসআরডিআই) কৃষি মন্ত্রণালয়ে যে প্রতিবেদন জমা দিয়েছিল, তাতে বাজারে থাকা সারের ৫১ শতাংশই নিম্নমানের পাওয়া গিয়েছিল। আগের এক বছরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও ব্যক্তিপর্যায় থেকে পাওয়া নমুনা পরীক্ষা করে প্রতিবেদনটি তৈরি হয়। ধরন অনুযায়ী, ট্রিপল সুপার ফসফেটের (টিএসপি) ৪১ শতাংশ, সিঙ্গেল সুপার ফসফেটের ৮৫ শতাংশ, এনপিকেএস মিশ্র সারের ৮০ শতাংশ, সালফেট অব পটাশের ৬০ শতাংশ, জিংক সালফেটের ৫৭ শতাংশ, বোরনের ৬৮ শতাংশ, জিপসামের ৬৫ শতাংশ, ফিউজড ম্যাগনেশিয়াম ফসফেটের ৬০ শতাংশ এবং ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেটের (ডিএপি) ৫ শতাংশ নমুনা নিম্নমানের পাওয়া যায়। ইউরিয়া, অ্যামোনিয়াম সালফেট ও রক ফসফেটের নমুনায় কোনো ভেজাল মেলেনি। পত্রিকাটি ব্যাখ্যা করে, নিম্নমানের এসব সারে লেবেলে লেখা সরকারি মানের চেয়ে কম পুষ্টি উপাদান ছিল, আর বিশেষজ্ঞরা বলেছিলেন, কৃষকেরা মানসম্মত ও নিম্নমানের সারের পার্থক্য বুঝতে পারেন না।

২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে দ্য ডেইলি স্টারের এক সম্পাদকীয়তে একটি শীর্ষস্থানীয় বাংলা দৈনিকের বরাতে বলা হয়, এসআরডিআইয়ের পরীক্ষায় কৃষকের ব্যবহৃত সারের প্রায় ৪০ শতাংশ ভেজাল পাওয়া গেছে এবং রোপণ মৌসুমে অসাধু ব্যবসায়ীরা সারে ভেজাল মেশাতে বিশেষভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে। ২০১৯ সালের মে মাসে প্রথম আলো এক সম্পাদকীয়তে লেখে, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে দেওয়া বেশি ব্যবহৃত ৪৫টি জৈব সারের নমুনা পরীক্ষা করে এসআরডিআই ৩৯টিতে ভেজাল পেয়েছে; এগুলোর বেশির ভাগই বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদিত এবং এসব সারে ভারী ধাতুসহ নানা ক্ষতিকর উপাদান ছিল। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে দ্য ডেইলি স্টার বাংলা জানায়, রাজশাহীতে এসআরডিআইয়ের বিভাগীয় কার্যালয়ের পরীক্ষাগারে একটি রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানার টিএসপি সারের নমুনায় ভেজাল পাওয়া গেছে; প্রতিষ্ঠানটির রাজশাহীর প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা পত্রিকাটিকে বলেন, সারে রাসায়নিক উপাদানগুলো যথাযথভাবে মেশানো হয়নি এবং এর আগে সরকারি টিএসপি সারে কখনো ভেজাল পাওয়া যায়নি।

বীজের চিত্রও কাছাকাছি। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ইরি) লেখে, বাংলাদেশের স্থানীয় বাজারে নকল ও অযত্নে রাখা বীজের প্রাদুর্ভাবের কারণে অঙ্কুরোদগমের হার কম হয় ও ফলন খারাপ হয়, আর এতে কৃষকেরা আনুষ্ঠানিক বীজব্যবস্থা থেকে দূরে সরে যান। ইরির তথ্যমতে, দেশের অর্ধেকেরও কম কৃষক প্রত্যয়িত বীজ ব্যবহার করেন, অথচ প্রত্যয়িত বীজে ফলন ৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সম্ভাবনা আছে; বেশির ভাগ কৃষক অনানুষ্ঠানিক বীজব্যবস্থার ওপর নির্ভর করেন, যেখানে দুর্বল বাছাই, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণের কারণে রোপণ উপকরণ নিম্নমানের হতে পারে।

চট্টগ্রামে মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের একটি ভবন, ২০১৫ সালের মে মাসে তোলা। এসআরডিআইয়ের পরীক্ষাগারে সারের নমুনা পরীক্ষা করা হয়। ছবি: Moheen Reeyad / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
চট্টগ্রামে মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের একটি ভবন, ২০১৫ সালের মে মাসে তোলা। এসআরডিআইয়ের পরীক্ষাগারে সারের নমুনা পরীক্ষা করা হয়। ছবি: Moheen Reeyad / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

ফসলের জন্য সারের মান কেন জরুরি


জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া সারকে আধুনিক কৃষির ফসল উৎপাদন ব্যবস্থায় অপরিহার্য বলে বর্ণনা করেছে এবং দেশের মোট ফসল উৎপাদনের প্রায় অর্ধেকের কৃতিত্ব দিয়েছে অজৈব সারকে। পঞ্চাশের দশকের শুরুতে সম্পূরক পুষ্টির উৎস হিসেবে দেশে রাসায়নিক সার আসে, আর ষাটের দশকের মাঝামাঝি থেকে আধুনিক জাত ও সেচের বিস্তারের সঙ্গে এর ব্যবহার বাড়তে থাকে। ১৯৮০ সাল পর্যন্ত সার থেকে মূলত নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশিয়াম ও ক্যালসিয়াম সরবরাহ করা হতো; আশির দশকের শুরুতে বিশেষ করে ধানের জন্য সালফার ও জিংকের গুরুত্ব স্বীকৃত হয় এবং তখন জিপসাম, জিংক সালফেট ও জিংক অক্সি-সালফেট ব্যবহার শুরু হয়। ২০০৭ সালের এসআরডিআই পরীক্ষায় জিপসাম ও জিংক সালফেটের অর্ধেকেরও বেশি নমুনা নিম্নমানের পাওয়া গিয়েছিল।

বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, উদ্ভিদ তার প্রয়োজনীয় ১৭টি পুষ্টি উপাদানের ১৪টিই মাটি থেকে নেয়, কিন্তু উচ্চফলনশীল জাতের নিবিড় চাষ, জৈব পদার্থের স্বল্প ব্যবহার ও অযথাযথ ব্যবস্থাপনায় সময়ের সঙ্গে মাটির সেই সরবরাহক্ষমতা কমে যায়। এই ঘাটতি পূরণ করতেই কৃষক সার দেন: বাংলাদেশে ফসলের নাইট্রোজেনের প্রায় পুরোটাই আসে ইউরিয়া থেকে, আর ফসফরাস আসে মূলত টিএসপি ও ডিএপি থেকে। তাই লেবেলে যা লেখা তার চেয়ে কম পুষ্টি উপাদানযুক্ত এক বস্তা সার ফসলকে ঠিক সেই উপাদান থেকেই বঞ্চিত করে, যার জন্য কৃষক টাকা দিয়েছেন। লেখক যে ফলন ও অর্থের ক্ষতির কথা বলেছেন, তা এখান থেকেই আসে।

চট্টগ্রামে ইউরিয়া সার উৎপাদনকারী কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানির (কাফকো) কারখানা। ছবি: Sakib toni / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
চট্টগ্রামে ইউরিয়া সার উৎপাদনকারী কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানির (কাফকো) কারখানা। ছবি: Sakib toni / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও তার দায়িত্বের সীমা


সমীরণ বিশ্বাসের বর্ণনায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর মূলত একটি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ ও কৃষক সহায়তামূলক প্রতিষ্ঠান। তিনি লেখেন, এর প্রধান দায়িত্ব হলো কৃষকদের আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ও ভালো চাষাবাদ পদ্ধতির প্রশিক্ষণ দেওয়া, ফসলের রোগবালাই ব্যবস্থাপনায় পরামর্শ দেওয়া, সরকার ঘোষিত কৃষিনীতি মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নে সহায়তা করা এবং কৃষককেন্দ্রিক তথ্য ও সচেতনতা বাড়ানো। তাঁর যুক্তি, ভেজাল, নকল ও অবৈধ পণ্যের বিরুদ্ধে সরাসরি আইন প্রয়োগ এই অধিদপ্তরের মূল ম্যান্ডেট নয়; অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাদের পর্যাপ্ত ভ্রাম্যমাণ আদালতের ক্ষমতা, আধুনিক পরীক্ষাগার ও দ্রুত মান যাচাইয়ের সুবিধা, নিয়মিত বাজার তদারকির মতো জনবল এবং শক্তিশালী শাস্তিমূলক ক্ষমতা নেই। ফলে তারা প্রায়ই তথ্য সংগ্রহ বা সতর্কবার্তা দেওয়া পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকে, কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারে না।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি সরকারি দপ্তর। ১৯৮২ সালে কৃষি পরিদপ্তর (সম্প্রসারণ ও ব্যবস্থাপনা), পাট পরিদপ্তর, উদ্ভিদ সংরক্ষণ পরিদপ্তর, উদ্যান উন্নয়ন বোর্ড, তামাক উন্নয়ন বোর্ড এবং কেন্দ্রীয় সম্প্রসারণ সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট একীভূত করে অধিদপ্তরটি গঠিত হয়। উপকরণ-সংক্রান্ত আইনগুলো এর কর্মকর্তাদের নির্দিষ্ট ভূমিকাও দিয়েছে। সার (ব্যবস্থাপনা) বিধিমালা, ২০০৭ অনুযায়ী অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সারের নিবন্ধন কর্তৃপক্ষ; আর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা, অতিরিক্ত কৃষি কর্মকর্তা ও কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তারা সার পরিদর্শক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং আইন ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারেন। বালাইনাশক আইন, ২০১৮ অনুযায়ী অধিদপ্তরের উদ্ভিদ সংরক্ষণ উইংয়ের পরিচালক বালাইনাশকের নিবন্ধন কর্তৃপক্ষ এবং লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষ দুটোই; আর উদ্ভিদ সংরক্ষণের দায়িত্বে থাকা সরকারি কর্মচারীদের মধ্য থেকে পরিদর্শক নিয়োগ করা হয়।

তবে পরীক্ষার বড় অংশ অন্য প্রতিষ্ঠানের হাতে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে ১৯৮২ সালে প্রতিষ্ঠিত এসআরডিআই মাটি নিয়ে গবেষণা ও জরিপ করে এবং ওপরে বর্ণিত সারের পরীক্ষাগুলো এর পরীক্ষাগারেই হয়েছিল। বীজের মান দেখে বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সি, আর আমদানি করা সার বন্দরে পরিদর্শন কমিটি একাধিক পরীক্ষাগারের মাধ্যমে যাচাই করে।

সার আইনে যা বলা ছিল


সারের বিষয়টি নিয়ন্ত্রিত হতো ২০১৮ সালে সংশোধিত সার (ব্যবস্থাপনা) আইন, ২০০৬ এবং সার (ব্যবস্থাপনা) বিধিমালা, ২০০৭ দিয়ে। সরকার ২০২২ সালের জুলাইয়ে আইনটির যে প্রামাণিক ইংরেজি পাঠ প্রকাশ করে, তাতে প্রধান অপরাধগুলো এভাবে বলা আছে:

  • নিবন্ধন ছাড়া কেউ কোনো সার উৎপাদন, আমদানি, সংরক্ষণ, বিতরণ, বিপণন, পরিবহন বা বিক্রি করতে পারবেন না; এর শাস্তি দুই বছরের সশ্রম কারাদণ্ড বা অনধিক ৫ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড (ধারা ৮)।
  • সার ভেজাল বলে গণ্য হবে যদি তা বিনির্দেশের বাইরে হয়, পরীক্ষাগারে এতে মাটি, উদ্ভিদ, প্রাণী বা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর মাত্রায় কোনো পদার্থ পাওয়া যায়, লেবেলে যথেষ্ট সতর্কতা ও ব্যবহারবিধি না থাকে, লেবেলে লেখা রাসায়নিক গঠনের চেয়ে নিম্নমানের উপাদানে তৈরি হয়, অথবা এতে অপ্রয়োজনীয়, পরিবেশদূষক বা ক্ষতিকর পদার্থ থাকে; ভেজাল সার উৎপাদন, আমদানি, মজুত, বিক্রি বা বিতরণের শাস্তি অনধিক দুই বছরের সশ্রম কারাদণ্ড বা অনধিক ২ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড (ধারা ১৭)।
  • সারের লেবেল মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর হলে, আগে অনুমোদিত অন্য কোনো ব্র্যান্ডের নামে বিক্রি করা হলে, অথবা আইন অনুযায়ী লেবেল না থাকলে তা ভুল ব্র্যান্ডিং বা মিসব্র্যান্ডিং বলে গণ্য হবে (ধারা ১৬)।
  • বিধিমালায় নির্ধারিত অনুসন্ধানমূলক ছাড়ের চেয়ে বেশি পরিমাণে এক বা একাধিক নিশ্চিত পুষ্টি উপাদানের ঘাটতিযুক্ত সার যাঁর কাছে বিক্রির জন্য পাওয়া যাবে, তাঁর শাস্তি ছয় মাসের সশ্রম কারাদণ্ড বা অনধিক ৩০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড (ধারা ১৫)।
  • নিবন্ধিত কোনো ব্যক্তির হেফাজতে লেবেলে লেখা ওজনের চেয়ে ০.৫০ শতাংশ কম ওজনের প্যাকেট বা বস্তা পাওয়া গেলে তা আইন লঙ্ঘন; একাধিকবার হলে নিবন্ধন ৯০ দিনের জন্য স্থগিত এবং আবারও হলে স্থায়ীভাবে বাতিল হতে পারে (ধারা ১৯)।
  • আইন ভঙ্গ করে বিক্রির জন্য রাখা সারের বিক্রি বন্ধের আদেশ দিতে পারে সরকার; সেই আদেশ অমান্য করলে ছয় মাসের সশ্রম কারাদণ্ড বা অনধিক ৩০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড (ধারা ২০)।

এসব অপরাধের বিচার করেন প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট বা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট; আর কোনো সরকারি কর্মচারী, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক বা পরিদর্শক, কিংবা মহাপরিচালকের ক্ষমতাপ্রাপ্ত কোনো কর্মকর্তার লিখিত আবেদন ছাড়া আদালত অপরাধ আমলে নেন না (ধারা ২১)। ২০১৮ সালের সংশোধনীতে একটি ধারা যোগ হয়, যাতে জেনেশুনে এই আইনে মিথ্যা মামলা করলে অভিযুক্ত অপরাধের সমান শাস্তির বিধান রাখা হয়। দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস জানিয়েছিল, ২০১৮ সালের জুনে মন্ত্রিসভা সংশোধনীটি অনুমোদনের সময় নিবন্ধন ছাড়া সার ব্যবসার সর্বোচ্চ শাস্তি ছয় মাসের কারাদণ্ড বা ৩০ হাজার টাকা জরিমানা থেকে বাড়িয়ে দুই বছর বা ৫ লাখ টাকা করা হয়।

২০০৭ সালের বিধিমালায় কিছু কারিগরি সুরক্ষাও আছে। এতে সারে রাসায়নিক দূষকের সর্বোচ্চ মাত্রা বেঁধে দেওয়া হয়েছে, যেমন আর্সেনিক ৫০ পিপিএম, ক্যাডমিয়াম ১০ পিপিএম, সিসা ১০০ পিপিএম এবং পারদ ৫ পিপিএম; সেই সঙ্গে নিশ্চিত মাত্রার চেয়ে কতটা কম পুষ্টি থাকলে সারকে ঘাটতিযুক্ত ধরা হবে, তা-ও নির্ধারণ করা আছে। প্রতিটি বন্দরে সংশ্লিষ্ট জেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালকের নেতৃত্বে একটি পরিদর্শন কমিটি আমদানি করা সারের নমুনা অন্তত তিনটি সরকারি পরীক্ষাগারে পাঠায়, এবং অন্তত দুটির ফল সরকারি বিনির্দেশের সঙ্গে মিললে তবেই চালান ছাড়ের আদেশ দেয়।

বালাইনাশক আইনে যা বলা ছিল


বালাইনাশক নিয়ন্ত্রিত হতো বালাইনাশক আইন, ২০১৮ (২০১৮ সালের ২৪ নম্বর আইন) দিয়ে, যা বালাইনাশক অধ্যাদেশ, ১৯৭১ রহিত করে প্রণীত হয়; এর প্রামাণিক ইংরেজি পাঠ প্রকাশিত হয় ২০২২ সালে। নিবন্ধন ছাড়া কেউ কোনো বালাইনাশক ব্র্যান্ড আমদানি, উৎপাদন, ফর্মুলেশন, প্যাকেটজাত, বিক্রি, বিক্রির জন্য মজুত বা বিজ্ঞাপন করতে পারবেন না (ধারা ৪), আর নিবন্ধিত ব্র্যান্ডের জন্যও লাইসেন্স লাগবে (ধারা ৯)। নিবন্ধনের মেয়াদ তিন বছর, লাইসেন্সের দুই বছর। নিবন্ধন কর্তৃপক্ষকে নিশ্চিত হতে হয় যে ব্র্যান্ডটি ক্রেতাকে বিভ্রান্ত করবে না, অন্য নিবন্ধিত ব্র্যান্ডের নিশ্চয়তার সঙ্গে প্রতারণামূলকভাবে মিলে যাবে না, ঘোষিত কাজে কার্যকর হবে এবং নির্দেশনা মেনে ব্যবহার করলে আগাছা ছাড়া অন্য উদ্ভিদ, মানুষ বা প্রাণীর জন্য সাধারণভাবে ক্ষতিকর হবে না।

আইনে ভেজাল বালাইনাশক বলতে বোঝানো হয়েছে এমন বালাইনাশক, যার মান লেবেলে লেখা মানের চেয়ে কম অথবা যার কোনো গুরুত্বপূর্ণ উপাদান আংশিক বা পুরোপুরি সরিয়ে ফেলা হয়েছে। প্রতিটি পাত্রে টেকসই ট্যাগ বা লেবেল থাকতে হবে, যাতে ব্র্যান্ড ও অন্যান্য তথ্য স্পষ্ট বাংলা অক্ষরে ছাপা থাকবে (ধারা ১৬)। সরকার গেজেট প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে বালাইনাশকের সর্বোচ্চ বিক্রয়মূল্য এবং পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতার সর্বোচ্চ কমিশন নির্ধারণ করতে পারে (ধারা ১৭)। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের নির্বাহী চেয়ারম্যানের সভাপতিত্বে এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে সহসভাপতি করে গঠিত বালাইনাশক কারিগরি উপদেষ্টা কমিটি কারিগরি বিষয়ে সরকারকে পরামর্শ দেয়।

পরিদর্শক বালাইনাশক রাখা যেকোনো স্থানে প্রবেশ করে নমুনা নিতে পারেন, মালিকের উপস্থিতিতে নমুনা দুই ভাগ করে সিলমোহর করেন এবং এক ভাগ বিশ্লেষকের কাছে ও অন্য ভাগ বালাইনাশক পরীক্ষাগারে পাঠান; অপরাধের সন্দেহ থাকলে তল্লাশি ও জব্দও করতে পারেন। কৃষকের জন্য সরাসরি কাজের একটি বিধান হলো, কেনা বালাইনাশক নির্ধারিত ফি দিয়ে বিশ্লেষকের কাছে পরীক্ষার আবেদন করা যায় এবং বিশ্লেষক স্বাক্ষরিত প্রতিবেদন দেন (ধারা ২৮)।

  • লেবেলে যা লেখা তা নেই এমন নিবন্ধিত বালাইনাশক বিক্রি, মজুত বা বিজ্ঞাপন করা, অথবা বিজ্ঞাপনে বালাইনাশক সম্পর্কে ভুল তথ্য দেওয়া: অনধিক ১ লাখ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে অনধিক এক বছরের কারাদণ্ড; পুনরাবৃত্তিতে অনধিক ২ লাখ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে অনধিক দুই বছরের কারাদণ্ড (ধারা ২৯)।
  • নিবন্ধন নম্বরের অবৈধ ব্যবহার, বাজারে আসার পর ইচ্ছাকৃতভাবে বালাইনাশকে অন্য পদার্থ মেশানো, পরিদর্শকের কাজে বাধা দেওয়া বা নিবন্ধনের সময় মিথ্যা তথ্য দেওয়া: ৭৫ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা জরিমানা অথবা এক থেকে দুই বছরের কারাদণ্ড (ধারা ৩১)।
  • দণ্ডিত হলে সংশ্লিষ্ট বালাইনাশক ও সংশ্লিষ্ট মালামাল সরকারের অনুকূলে বাজেয়াপ্তের আদেশ দিতে পারেন আদালত (ধারা ৩২)।

পরিদর্শক বা উদ্ভিদ সংরক্ষণের দায়িত্বে থাকা সরকারি কর্মচারীর লিখিত অভিযোগ ছাড়া আদালত অপরাধ আমলে নেন না, আর বিচার করেন প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট বা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট। ধারা ৩৪ অনুযায়ী, মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯-এর তফসিলে অন্তর্ভুক্ত হলে এসব অপরাধের বিচার ভ্রাম্যমাণ আদালতেও করা যায়।

বীজ আইন ও বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সি


বীজ নিয়ন্ত্রিত হতো বীজ আইন, ২০১৮ (২০১৮ সালের ৬ নম্বর আইন) দিয়ে, যা বীজ অধ্যাদেশ, ১৯৭৭ রহিত করে প্রণীত হয়; এর প্রামাণিক ইংরেজি পাঠ প্রকাশিত হয় ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে। জাতীয় বীজ বোর্ডের নিবন্ধন সনদ ছাড়া কেউ বীজ ডিলার হিসেবে ব্যবসা করতে পারবেন না (ধারা ৮)। তবে যে কৃষক নিজের ব্যবহারের জন্য বীজ উৎপাদন বা মজুত করেন এবং নিজে বা অন্য কারও মাধ্যমে স্থানীয় হাটবাজারে বিক্রি করেন, তিনি ডিলারের সংজ্ঞার বাইরে।

নোটিফাইড বা ঘোষিত ফসল বা জাতের বীজ ডিলার তখনই বিক্রি করতে পারবেন, যখন জাতটি বোর্ডে নিবন্ধিত, বীজটি ফসল ও জাত অনুযায়ী শনাক্তযোগ্য, সরকার প্রজ্ঞাপনে অঙ্কুরোদগম, বিশুদ্ধতা ও আর্দ্রতার যে মান নির্ধারণ করেছে তা পূরণ করে, পাত্রটি সিলমোহর করা ও নির্ধারিত লেবেলযুক্ত, এবং নিবন্ধন সনদের শর্ত মানা হয়েছে (ধারা ১০ ও ১১)। কোনো ফসল বা জাতের বীজ কৃষির জন্য ক্ষতিকর প্রমাণিত হলে বোর্ড তার বিক্রি, বিতরণ, বিনিময় বা আমদানি নিষিদ্ধ করতে পারে।

প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ১৯৭৪ সালের ২২ জানুয়ারি বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সি প্রতিষ্ঠিত হয়। গাজীপুরে সদর দপ্তর থাকা এজেন্সিটির সাতটি আঞ্চলিক কার্যালয় এবং ৬৪টি জেলাতেই কার্যালয় আছে। ২০১৮ সালের আইন অনুযায়ী এর কাজের মধ্যে রয়েছে মান নিয়ন্ত্রণের জন্য বাজারজাত বীজ পরীক্ষা ও পরিদর্শন, লেবেলযুক্ত বীজের নমুনা সংগ্রহ করে ঘোষিত মান যাচাই, ঘোষিত ফসলের প্রজনন, ভিত্তি ও প্রত্যয়িত বীজ প্রত্যয়ন, এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা ও লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া (ধারা ১৩)।

বীজ পরিদর্শকের কাজে বাধা দেওয়া বা ঘোষিত ফসলের বীজ বিক্রির সরকারি শর্ত ভঙ্গ করার শাস্তি অনধিক ৯০ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড (ধারা ২৪)। অপরাধে সহায়তাকারীও একই শাস্তি পাবেন, আর একই অপরাধের পুনরাবৃত্তিতে সর্বোচ্চ শাস্তির দ্বিগুণ দণ্ড হবে (ধারা ২৫ ও ২৬)। বীজ পরিদর্শকের লিখিত অভিযোগ ছাড়া আদালত অপরাধ আমলে নেন না (ধারা ২৭), এবং মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯-এর তফসিলে অন্তর্ভুক্তি সাপেক্ষে এসব অপরাধের বিচার ওই আইনে হবে (ধারা ২৮)।

যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় প্লেসারভিল নার্সারির বীজ পরীক্ষাগারে অঙ্কুরোদগম পরীক্ষায় গজানো বীজ, ২০০৬ সালের নভেম্বরে তোলা; অঙ্কুরোদগমের হার বীজের মানের অন্যতম শর্ত। ছবি: USFS Region 5 / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 2.0)
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় প্লেসারভিল নার্সারির বীজ পরীক্ষাগারে অঙ্কুরোদগম পরীক্ষায় গজানো বীজ, ২০০৬ সালের নভেম্বরে তোলা; অঙ্কুরোদগমের হার বীজের মানের অন্যতম শর্ত। ছবি: USFS Region 5 / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 2.0)

স্বাস্থ্য ও পরিবেশের ঝুঁকি


খাদ্যে বালাইনাশকের অবশিষ্টাংশ নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ২০২২ সালের ১৫ সেপ্টেম্বরের তথ্যপত্রে বলা হয়েছে, বালাইনাশক মানুষের জন্য সম্ভাব্য বিষাক্ত এবং কতটা পরিমাণে ও কীভাবে সংস্পর্শে আসা হলো তার ওপর নির্ভর করে এর তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদি দুই ধরনের প্রভাবই হতে পারে। সংস্থাটির মতে, সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন তাঁরা, যাঁরা কাজের জায়গায়, ঘরে বা বাগানে বালাইনাশকের সংস্পর্শে আসেন, যেমন যে কৃষিশ্রমিকেরা তা ছিটান। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে আত্মবিষক্রিয়াজনিত মৃত্যুর প্রধান কারণগুলোর একটি বালাইনাশক। ডব্লিউএইচও বলছে, বালাইনাশক স্বভাবতই বিষাক্ত এবং ইচ্ছাকৃতভাবে পরিবেশে ছড়ানো হয় বলে এর উৎপাদন, বিতরণ ও ব্যবহারে কঠোর নিয়ন্ত্রণ দরকার, সেই সঙ্গে খাদ্য ও পরিবেশে অবশিষ্টাংশের নিয়মিত পর্যবেক্ষণও দরকার।

ডব্লিউএইচওর তথ্যপত্র অনুযায়ী, ডিডিটি ও লিনডেনের মতো কিছু পুরোনো ও সস্তা বালাইনাশক বছরের পর বছর মাটি ও পানিতে থেকে যেতে পারে; ২০০১ সালের স্টকহোম কনভেনশনে সই করা দেশগুলো এগুলো নিষিদ্ধ করেছে। সংস্থাটির পরামর্শ, যাঁরা বালাইনাশক ছিটান তাঁদের যথাযথ সুরক্ষা থাকা উচিত, অন্যদের ছিটানোর সময় ও তার পরে কিছু সময় এলাকা থেকে দূরে থাকা উচিত, আর কৃষকের উচিত ফসল রক্ষায় যতটুকু দরকার তার মধ্যেই বালাইনাশকের ব্যবহার সীমিত রাখা।

২০২৫ সালের মে মাসে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এবং ডব্লিউএইচও বালাইনাশক ব্যবস্থাপনার আন্তর্জাতিক আচরণবিধির আওতায় বালাইনাশকের অবৈধ বাণিজ্য নিয়ে একটি নির্দেশনা প্রকাশ করে। তাতে এই বাণিজ্যকে বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর জন্য বড় বৈশ্বিক উদ্বেগ বলা হয়েছে, যার প্রভাব পড়ে মানবস্বাস্থ্য, পরিবেশগত নিরাপত্তা, কৃষির শুদ্ধতা ও অর্থনীতিতে। নির্দেশনাটির মূল মনোযোগ বালাইনাশক বিতরণ ও খুচরা বিক্রিতে ভালো তদারকির কাঠামো গড়ার দিকে; লেখকের বর্ণনায় সরবরাহ শৃঙ্খলের এই স্তরেই কৃষক বিভ্রান্তিকর লেবেল ও একই রকম দেখতে ব্র্যান্ডের মুখোমুখি হন।

লেখকের প্রস্তাব


সমীরণ বিশ্বাসের যুক্তি, এই সংকট থেকে মুক্তির জন্য কেবল একটি প্রতিষ্ঠান নয়, বরং একটি সমন্বিত ও কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন। তাঁর প্রস্তাবগুলো হলো:

  • আইন প্রয়োগ ও নজরদারি জোরদার: কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসন ও ভোক্তা অধিকার কর্তৃপক্ষের নিয়মিত যৌথ অভিযান; ভ্রাম্যমাণ আদালতের সংখ্যা ও কার্যকারিতা বৃদ্ধি; অপরাধের পুনরাবৃত্তিতে লাইসেন্স বাতিল ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি।
  • ডিজিটাল ট্রেসেবিলিটি ও প্রযুক্তির ব্যবহার: প্রতিটি অনুমোদিত সার, বালাইনাশক ও বীজে কিউআর কোড বা ডিজিটাল আইডি, যাতে কৃষক মোবাইল অ্যাপে স্ক্যান করে পণ্যের সত্যতা যাচাই করতে পারেন; ব্লকচেইন বা কেন্দ্রীয় ডাটাবেজভিত্তিক সরবরাহ শৃঙ্খল।
  • কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সক্ষমতা বৃদ্ধি: সীমিত আইন প্রয়োগের ক্ষমতা, মাঠপর্যায়ে আধুনিক পরীক্ষণ কিট ও প্রশিক্ষণ, জনবল বৃদ্ধি ও প্রণোদনা।
  • কৃষক সচেতনতা ও ক্ষমতায়ন: কৃষক মাঠ স্কুল, গণমাধ্যম ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সচেতনতামূলক প্রচার; 'জেনে কিনুন' কর্মসূচি; কৃষক সংগঠন ও সমবায়ের মাধ্যমে যৌথ ক্রয়ব্যবস্থা।
  • সৎ ও মানসম্পন্ন কোম্পানিকে উৎসাহ: মান বজায় রাখা কোম্পানিকে প্রণোদনা ও স্বীকৃতি, আর নিম্নমানের পণ্য উৎপাদনকারীদের কালো তালিকাভুক্তি।

তিনি যে ব্যবস্থাগুলোর কথা বলেছেন, তার কিছু আগে থেকেই ছিল। জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ২০০৯ সালে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে গঠিত একটি আধা-বিচারিক দপ্তর, যা পণ্য ও সেবা নিয়ে ভোক্তার অভিযোগ শোনে এবং প্রতিটি বিভাগীয় শহরে এর কার্যালয় আছে। সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা (আইপিএম) শেখানোর দলভিত্তিক পদ্ধতি কৃষক মাঠ স্কুলের প্রথম নকশা করে এফএও, ১৯৮৯ সালে ইন্দোনেশিয়ায়। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, বাংলাদেশ ১৯৮১ সালে এফএওর আন্তদেশীয় আইপিএম কর্মসূচির সদস্য হয়; ১৯৮৮ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সঙ্গে মিলে কর্মসূচিটি ২ হাজার ২৫৭ জন সম্প্রসারণকর্মী, ৪০৭ জন এনজিও কর্মকর্তা ও ৪ হাজার ৫৫০ জন কৃষককে প্রশিক্ষণ দেয়, এবং প্রশিক্ষণ পাওয়া কৃষকেরা প্রশিক্ষণহীন প্রতিবেশীদের চেয়ে কম বালাইনাশকে ধান চাষ করতে পেরেছিলেন।

লেখকের মতে, ভেজাল, নকল ও নিম্নমানের সার, বালাইনাশক ও বীজ শুধু কৃষকের সমস্যা নয়, এটি দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য গুরুতর হুমকি। তিনি লেখেন, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর একা এ সংকট সমাধান করতে পারবে না, আবার তাদের দায়িত্ব এড়িয়েও যাওয়া যায় না; প্রয়োজন শক্তিশালী নীতি, কার্যকর আইন প্রয়োগ, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি এবং সচেতন কৃষক সমাজ। তাঁর ভাষায়, "কৃষক যদি নিরাপদ না হন, কৃষি টেকসই হবে না। আর কৃষি টেকসই না হলে, দেশের উন্নয়নও টেকসই হবে না।" সে কারণে ভেজালমুক্ত কৃষি উপকরণ নিশ্চিত করাকে তিনি বিলাসিতা নয়, জাতীয় অগ্রাধিকারের বিষয় বলে উল্লেখ করেন।

ছবি: T. R. Shankar Raman / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

সূত্র: জাগো নিউজ, সার (ব্যবস্থাপনা) আইন, ২০০৬ (প্রামাণিক ইংরেজি পাঠ, বাংলাদেশ গেজেট, ২০২২), সার (ব্যবস্থাপনা) বিধিমালা, ২০০৭ (বাংলাদেশ গেজেট, ২০২২), বালাইনাশক আইন, ২০১৮ (বাংলাদেশ গেজেট, ২০২২), বীজ আইন, ২০১৮ (বাংলাদেশ গেজেট, ২০২১), দ্য ডেইলি স্টার, প্রথম আলো, দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, এফএও ও ডব্লিউএইচও, বাংলাপিডিয়া, উইকিপিডিয়া

অনলাইন ডেস্কদা এগ্রো নিউজ

পরিবেশ

সম্পর্কিত খবর

পরিবেশ

শব্দদূষণ ভারতের শহরে স্বাস্থ্যঝুঁকি, কিন্তু মাপাই কঠিন

মুম্বাইয়ে বাইরের শব্দের মাত্রা গড়ে ৬৫ থেকে ৮৫ ডেসিবেল, যেখানে সড়কের শব্দে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিকা ৫৪ ডেসিবেল। গবেষকেরা বলছেন, তথ্যের ঘাটতি ও ব্যয়বহুল শব্দ-মডেলের কারণে ভারতে এর স্বাস্থ্যপ্রভাব নিয়ে গবেষণা কঠিন।

Mongabay India১৬ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
পরিবেশ

ব্যাংকক বাঁচাতে প্রতিবছর ডুবছে থাইল্যান্ডের গ্রাম

২০১১ সালের বন্যার পর থাইল্যান্ডে তৈরি বাঁধ ও জলকপাট ব্যাংকক ও শিল্পাঞ্চল থেকে পানি সরিয়ে দেয়, কিন্তু আয়ুথায়ার নদীতীরের গ্রামগুলো এখন মাসের পর মাস মাথার ওপর পানিতে ডুবে থাকে; ঘর উঁচু করতে সঞ্চয় খরচ করছেন বাসিন্দারা।

ইউরোনিউজ১৬ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
পরিবেশ

সুস্থ যমজের ছোঁয়ায় কয়েক সপ্তাহে প্রাণ ফিরে পেল বিবর্ণ প্রবাল

স্ট্যানফোর্ডের বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, একই কলোনির সুস্থ প্রবালের গায়ে বিবর্ণ প্রবালের টুকরা লাগিয়ে রাখলে দুটি জুড়ে যায় এবং বিবর্ণ প্রবাল আবার শৈবাল ফিরে পায়; পাঁচটি টুকরার সবকটি সাত সপ্তাহে সেরে উঠেছে।

ইউরোনিউজ১৬ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)