২০৩০ সালের মধ্যে দেশের বৃক্ষাচ্ছাদিত ভূমি ২৫ শতাংশে এবং বনাচ্ছাদন ১৬ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা সরকার নির্ধারণ করেছে বলে ২০২৩ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর, বুধবার জাতীয় সংসদকে জানিয়েছিলেন তৎকালীন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিন। সংসদ সদস্য নাসরিন জাহান রত্নার এক প্রশ্নের লিখিত জবাবে তিনি এ তথ্য দেন। সেদিন বিকেল ৪টায় স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সংসদের বৈঠক শুরু হয়।
একই জবাবে মন্ত্রী জানান দেশ তখন কোথায় দাঁড়িয়ে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এবং অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার আওতায় বন অধিদপ্তর কী কী বাগান সৃজনের পরিকল্পনা করেছে, আর ২০০৯-১০ সাল থেকে কত বাগান করা হয়েছে। সংসদ সদস্য নিজাম উদ্দিন হাজারীর আলাদা এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তীব্র গরম থেকে শিশুদের সুরক্ষায় পরিবেশ মন্ত্রণালয় সরাসরি কোনো কার্যক্রম তখনো নেয়নি, তবে জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (ন্যাশনাল অ্যাডাপটেশন প্ল্যান বা এনএপি) ২০২৩-২০৫০-এ তাপপ্রবাহ, তাপজনিত চাপ ও হিটস্ট্রোক মোকাবিলায় গবেষণা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত আছে।
দেশ কোথায় দাঁড়িয়ে: ২২.৩৭ ও ১৪.১ শতাংশ
মন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালের ভূ-উপগ্রহ চিত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বাংলাদেশের মোট আয়তনের ২২.৩৭ শতাংশ বৃক্ষাচ্ছাদিত, আর বনাচ্ছাদন দেশের ভূমির আয়তনের ১৪.১ শতাংশ। তিনি জানান, বন অধিদপ্তর বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় ব্লক, এনরিচমেন্ট, ম্যানগ্রোভ ও বসতবাড়ি বনায়নসহ নানা ধরনের বনায়ন কার্যক্রম চালাচ্ছে। এর উদ্দেশ্য হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলা, বায়ুমণ্ডলে নিঃসৃত ও বিদ্যমান কার্বন হ্রাস, উপকূলে সবুজ বেষ্টনী গড়ে তোলা, ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাসসহ সব প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে মানুষের জানমাল রক্ষা এবং বনায়ন বাড়ানো।
এই দুটি সংখ্যা আলাদা জিনিস মাপে। বৃক্ষাচ্ছাদন বলতে গাছ আছে এমন সব জমি বোঝায়, যার মধ্যে গ্রামের বাগান, সড়কের ধারের সারি, ফলবাগান ও বসতবাড়ির গাছও পড়ে; আর বনাচ্ছাদনে গোনা হয় কেবল সেই জমি, যা বনের আন্তর্জাতিক সংজ্ঞায় পড়ে। এ কারণেই লক্ষ্যমাত্রাও জোড়ায় জোড়ায়: ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের ২৫ শতাংশ গাছে ঢাকা এবং ১৬ শতাংশ বনভূমি।
এই ভিত্তি-পরিসংখ্যান আগেও দেওয়া হয়েছিল। ইউএনবির খবর অনুযায়ী, ২০২২ সালের ৪ এপ্রিল ঢাকা-২০ আসনের সংসদ সদস্য বেনজীর আহমদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী সংসদে বলেছিলেন, দেশের ভূমির ১৪.১০ শতাংশ বনাচ্ছাদিত ও ২২.৩৭ শতাংশ বৃক্ষাচ্ছাদিত, এবং অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৫ সালের মধ্যে বৃক্ষাচ্ছাদন ২৪ শতাংশে নিতে কয়েকটি প্রকল্প চলছে। ২০২৩ সালের মার্চে এক জ্যেষ্ঠ তথ্য কর্মকর্তাও ২২.৩৭ শতাংশের হিসাব এবং ২০২৫ সালের মধ্যে তা ২৪ শতাংশের বেশি করার পরিকল্পনার কথা বলেছিলেন বলে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম জানায়।
পরিসংখ্যানের পেছনে জাতীয় বন জরিপ
এই ভিত্তি-পরিসংখ্যান এসেছে বাংলাদেশ ফরেস্ট ইনভেন্টরি (বিএফআই) বা জাতীয় বন জরিপ থেকে। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অধীন বন অধিদপ্তর ২০১৫ সালে এর নকশা করে এবং ২০১৬ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত জরিপটি চালায়। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে ফরেস্ট ইকোসিস্টেমস সাময়িকীতে হেনরি ও সহকর্মীদের প্রকাশিত পিয়ার-রিভিউড নিবন্ধে বলা হয়েছে, জরিপের তিনটি অংশ ছিল: গাছের মাঠপর্যায়ের জরিপ, খানাভিত্তিক আর্থসামাজিক জরিপ এবং ভূ-উপগ্রহ চিত্র থেকে তৈরি ২০১৫ সালের জাতীয় ভূমি-আচ্ছাদন মানচিত্র। মাঠ দলগুলো সারা দেশে ১ হাজার ৭৮১টি প্লট পরিদর্শন করে এবং ৬ হাজার ৪০০ খানায় জরিপ চালায়। নিবন্ধ অনুযায়ী, এ কাজে ইউএসএআইডি ও জাতিসংঘের ইউএন-রেড কর্মসূচি আর্থিক সহায়তা এবং জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) কারিগরি সহায়তা দেয়।
জরিপে দেশকে পাঁচটি অঞ্চলে ভাগ করা হয়: শাল অঞ্চল, যেখানে শালগাছপ্রধান ছোট ছোট বন; সুন্দরবন অঞ্চল, যেখানে ম্যানগ্রোভ প্রজাতির প্রাধান্য; পূর্বাঞ্চলের পাহাড়ি অঞ্চল; উপকূলীয় অঞ্চল, অর্থাৎ সমুদ্রতীরের রোপিত ম্যানগ্রোভ বেষ্টনী; এবং গ্রাম অঞ্চল, অর্থাৎ বাকি সব জমি, যেখানে গাছ বেশির ভাগই লাগানো। ২০১৫ সালের ভূমি-আচ্ছাদন মানচিত্রটি মূলত ৬ মিটার রেজল্যুশনের স্পট ভূ-উপগ্রহ চিত্র দিয়ে তৈরি, আর বিভিন্ন মৌসুমের ল্যান্ডস্যাট ৮ ও সেন্টিনেল-২ চিত্র দিয়ে তা মিলিয়ে দেখা হয়।
এফএওর বৈশ্বিক বনসম্পদ মূল্যায়নের (এফআরএ) বনের সংজ্ঞা ধরে জরিপে ২০১৫ সালে দেশের বনাচ্ছাদন পাওয়া যায় ১৮ লাখ ৮৪ হাজার ১৯ হেক্টর, যা দেশের মোট আয়তনের ১২.৮ শতাংশ। নদী এলাকা বাদ দিয়ে কেবল স্থলভাগ ধরলে এই হার ১৪.১ শতাংশ, মন্ত্রী যে হিসাব দিয়েছেন। ধরন অনুযায়ী মানচিত্রে দেখা যায়:
- পাহাড়ি বন: ৬ লাখ ৮৩ হাজার ৮৫২ হেক্টর, দেশের ৪.৬৩ শতাংশ, আয়তনে সবচেয়ে বড় বনের ধরন
- বিক্ষিপ্ত গাছসহ ঝোপঝাড়: ৬ লাখ ১৪ হাজার ৫৩৭ হেক্টর, ৪.১৬ শতাংশ
- ম্যানগ্রোভ বন: ৪ লাখ ২ হাজার ১৮৫ হেক্টর, ২.৭৩ শতাংশ
- বন বাগান: ৭৯ হাজার ২৯৯ হেক্টর, ০.৫৪ শতাংশ
- ম্যানগ্রোভ বাগান: ৫৫ হাজার ৮৯ হেক্টর, ০.৩৭ শতাংশ
- রাবার বাগান: ২৩ হাজার ৬৮৪ হেক্টর, ০.১৬ শতাংশ
- সমতল ভূমির (শাল) বন: ১৮ হাজার ৯১৮ হেক্টর, ০.১৩ শতাংশ
- বাঁশবন: ৫ হাজার ৬৮৬ হেক্টর; জলাভূমির বাগান ৬২৮ হেক্টর; জলাবন ১৪০ হেক্টর
জরিপে আরও দেখা যায়, স্থায়ী ফসলের জমি দেশের অর্ধেক জুড়ে, আর সেখানেও গড়ে প্রায় ৭ শতাংশ বৃক্ষাচ্ছাদন আছে; ২০০০ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে দেশে বৃক্ষাচ্ছাদন নিট ৩.৪ শতাংশ কমেছে। গ্রামীণ বসতিসহ বনের বাইরের গাছে রয়েছে দেশের মোট বৃক্ষ-জৈববস্তুর ৬৬ শতাংশ, আর জাতীয় কাঠের মজুতের অর্ধেক জোগায় গ্রামীণ বসতি। গাছ, শিকড়, মৃত কাঠ, পাতার স্তর ও মাটি মিলিয়ে স্থলভাগে মোট কার্বন মজুত ধরা হয় ১ হাজার ২৭৫.৬ মিলিয়ন টন, যার বেশির ভাগ (৮০.৫ শতাংশ) মাটির ওপরের ৩০ সেন্টিমিটারে। সুন্দরবন অঞ্চলে গাছ সবচেয়ে ঘন এবং কার্বনের ঘনত্বও সবচেয়ে বেশি। মাঠ দলগুলো ৩৯২টি গাছের প্রজাতি নথিভুক্ত করে, যার সবচেয়ে বেশি পাহাড়ি অঞ্চলে; সেখানে আইইউসিএনের তালিকায় বিপন্ন বা মহাবিপন্ন দুটি প্রজাতিও পাওয়া যায়, আগর (Aquilaria agallocha) ও Anisoptera scaphula।
খানা জরিপে উঠে আসে মানুষ গাছের ওপর কতটা নির্ভরশীল। দেশের প্রায় ৬৪ শতাংশ মানুষ গাছ ও বনজ পণ্য সংগ্রহে যুক্ত, আর এসব পণ্যের মূল্য ২০১৭-১৮ অর্থবছরের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৩.০৭ শতাংশের সমান। গাছ ও বন ব্যবস্থাপনায় কোনো সহায়তা পেয়েছেন বলে জানান মাত্র ১.৩ শতাংশ উত্তরদাতা, তা-ও বেশির ভাগ বিনামূল্যের চারা বা প্রশিক্ষণ; আগের বছরে ৪৩ শতাংশ খানা নিজের টাকায় চারা কিনেছে। দেশের প্রায় ৯.৪ শতাংশ জমির মালিক বন অধিদপ্তর।
জরিপের অঞ্চলভিত্তিক হিসাবে দেশে প্রতি হেক্টরে গড়ে ১২৯টি গাছ (বুক-সমান উচ্চতায় ব্যাস ১০ সেন্টিমিটার বা তার বেশি) পাওয়া যায়, সুন্দরবন অঞ্চলে ৬৬১টি, উপকূলীয় অঞ্চলে ২২৯টি, শাল অঞ্চলে ১৬৯টি, পাহাড়ি অঞ্চলে ১৪৬টি এবং গ্রাম অঞ্চলে ৯৮টি। মোট কার্বন মজুতের সবচেয়ে বড় অংশ গ্রাম অঞ্চলে, ৮৯৯.০২ মিলিয়ন টন; এরপর পাহাড়ি অঞ্চলে ১৯৯.৮৩, সুন্দরবনে ৬৬.০৪, শাল অঞ্চলে ৬৩.২৩ এবং উপকূলীয় অঞ্চলে ৪৭.৪৩ মিলিয়ন টন। আয়ের দিক থেকে, গাছ ও বনজ পণ্য বিক্রি করে একটি খানা বছরে গড়ে ৯ হাজার ১৬০ টাকা আয় করে, যা ২০১৭-১৮ অর্থবছরের মোট জাতীয় আয়ের ১.২৯ শতাংশ; আর খানাগুলোর সংগ্রহ করা পণ্যের গড় মূল্য বছরে ১৯ হাজার ৫১৮ টাকা, যার বড় অংশ ফল (৪৭ শতাংশ) ও জ্বালানি (৪০ শতাংশ)।

২০২৩-২৪ অর্থবছর ও অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার লক্ষ্য
মন্ত্রী সংসদে জানান, বনায়ন বাড়াতে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১ হাজার ৮০০ হেক্টর ব্লক বাগান, ৭০০ কিলোমিটার স্ট্রিপ বাগান এবং ৩ হাজার ২৫০ হেক্টর ম্যানগ্রোভ বাগান সৃজনের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছে।
অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৫ সাল নাগাদ দেশের বৃক্ষাচ্ছাদন ২৪ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যে বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে যা করা হবে বলে তিনি জানান:
- প্রায় ৭ হাজার ২২০ হেক্টর সমতল ভূমি ও শালবন পুনরুদ্ধার
- ১ লাখ ৩০ হাজার ৫৮০ হেক্টর পাহাড়ি বন পুনরুদ্ধার
- ৫০০ হেক্টর আগর বন
- ১৫ হাজার কিলোমিটার স্ট্রিপ বাগান
- ৫০ হাজার হেক্টর ম্যানগ্রোভ বাগান
- ২ হাজার ৭০০ হেক্টর এনরিচমেন্টসহ অন্যান্য বাগান
২০২৩-২৪ অর্থবছরের এই লক্ষ্যমাত্রা একই মন্ত্রণালয়ের দেওয়া ২০২১-২২ অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম। ইউএনবির খবরে আসা ২০২২ সালের এপ্রিলের জবাবে মন্ত্রী বলেছিলেন, সে বছর বন অধিদপ্তরের আওতায় ২৯ হাজার ১২৪ হেক্টর ম্যানগ্রোভ ও ব্লক বাগান এবং ১ হাজার ৫৭৪ কিলোমিটার স্ট্রিপ বাগান সৃজনের লক্ষ্য ছিল।
২০০৯-১০ থেকে যা লাগানো হয়েছে
শাহাব উদ্দিন সংসদে জানান, ২০০৯-১০ থেকে ২০২২-২৩ অর্থবছর পর্যন্ত বিভিন্ন প্রকল্প ও রাজস্ব বাজেটের আওতায় মোট ১ লাখ ২৭ হাজার ৫৪৮ হেক্টর ব্লক বাগান, ৮৯ হাজার ৮৫৩ হেক্টর ম্যানগ্রোভ বাগান এবং ৩০ হাজার ২৫২ সিডলিং কিলোমিটার স্ট্রিপ বাগান সৃজন করা হয়েছে। একই সময়ে বিক্রয় ও বিতরণের মাধ্যমে ১১ কোটি ২১ লাখ চারা বিতরণ ও রোপণ করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী মুজিববর্ষ উপলক্ষে ২০২০ সালে পরিবেশ মন্ত্রণালয় সারা দেশে জনসাধারণের মধ্যে বিনামূল্যে এক কোটি গাছের চারা বিতরণ করে। প্রথম আলোর তখনকার খবর অনুযায়ী, ২০২০ সালের ১৬ জুলাই সারা দেশে এই চারা বিতরণ ও রোপণ কর্মসূচি এবং জাতীয় বৃক্ষরোপণ অভিযান ২০২০ একসঙ্গে উদ্বোধন করা হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় তিনটি করে চারা (একটি ফলদ, একটি বনজ ও একটি ঔষধি) রোপণ এবং ১৬ জুলাই থেকে ১৫ সেপ্টেম্বরের মৌসুমে ৪৯২টি উপজেলার প্রতিটিতে ২০ হাজার ৩২৫টি করে চারা লাগানোর কথা ছিল, করোনাভাইরাসের স্বাস্থ্যবিধি মেনে।
মন্ত্রণালয়ের আগের হিসাব দীর্ঘ সময়ের ছবি দেয়। ইউএনবির খবর অনুযায়ী, ২০২২ সালের এপ্রিলে মন্ত্রী জানিয়েছিলেন, ১৯৮০-৮১ থেকে ২০২০-২১ অর্থবছর পর্যন্ত সামাজিক বনায়নের মাধ্যমে বন অধিদপ্তরের জমিতে ১ লাখ ২ হাজার ২২৯ হেক্টর উডলট ও ব্লক বাগান এবং সড়ক, মহাসড়ক, রেললাইন ও বাঁধসহ অন্যান্য জমিতে ৭৬ হাজার ৭৫২ কিলোমিটার স্ট্রিপ বাগান করা হয়েছে। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম জানায়, ২০২৩ সালের ২৩ জুলাই ঢাকায় জাতীয় বৃক্ষমেলার সমাপনীতে শাহাব উদ্দিন বলেন, সরকার বছরে গড়ে প্রায় ৮ কোটি গাছ লাগায়, এবং প্রত্যেক নাগরিককে বছরে অন্তত একটি গাছ লাগানোর আহ্বান জানান। সে বছর ৫ জুন থেকে ১২ জুলাই শেরেবাংলা নগরে অনুষ্ঠিত ঢাকার মেলায় ২৯ লাখ ২ হাজার ৬১৪টি চারা বিক্রি হয়, যার দাম ১৪ কোটি ৮১ লাখ ৬৯ হাজার টাকা।
ব্লক, স্ট্রিপ, ম্যানগ্রোভ ও শালবন: বনায়নের ধরন
জবাবে যেসব বাগানের কথা এসেছে, তার বেশির ভাগের দীর্ঘ ইতিহাস আছে। এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া জানায়, বন বিভাগ ১৮৭১ সালে বার্মা (মিয়ানমার) থেকে আনা বীজে কাপ্তাইয়ের রামপাহাড়ে প্রায় আট একর জমিতে প্রথম সেগুন লাগানোর চেষ্টা করে। বাংলাপিডিয়ার উদ্ধৃত বন মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী, ১৯৯২ সাল পর্যন্ত পার্বত্য চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও সিলেট বিভাগের পাহাড়ি বনে প্রায় ৩ লাখ ১১ হাজার ৭৬৬ হেক্টর বাগান ছিল। ১৯৮০ সালের আগে এর বেশির ভাগই ছিল সেগুন, সঙ্গে জারুল ও গামার।
উপকূলীয় বনায়ন শুরু হয় ১৯৬০ সালের প্রবল ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের পর, যখন বন বিভাগ বেড়িবাঁধের বাইরে গাছ লাগাতে শুরু করে। পরে বঙ্গোপসাগরে নতুন জেগে ওঠা চর স্থিতিশীল করতে এবং ভূমি গঠন দ্রুত করতে ম্যানগ্রোভ বাগান শুরু হয়। প্রধান প্রজাতি কেওড়া (Sonneratia apetala) ও বাইন। বাংলাপিডিয়ার হিসাবে উপকূলীয় বাগান প্রায় দেড় লাখ হেক্টর, আর প্রতিবছর ৮ হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে নতুন বাগান হয়। এসব বাগান ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও জোয়ারের ঢেউ থেকে সুরক্ষা দেয়, মাটি ধরে রাখে এবং নতুন জমিকে চাষের উপযোগী করে।

স্ট্রিপ বাগান মানে সড়ক, রেললাইন ও বাঁধের ধারে সারি করে লাগানো গাছ, সাধারণত স্থানীয় মানুষকে অংশীদার করে। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, দেশে সামাজিক বনায়নের সূচনা ১৯৬২-৬৩ সালে, যখন রাজশাহী ও ঢাকায় দুটি বন সম্প্রসারণ বিভাগ গঠন করা হয় এবং ১ জুনকে বৃক্ষরোপণ দিবস হিসেবে চালু করা হয়। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের অর্থায়নে ১৯৮২ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের সাতটি জেলায় চলা প্রথম বড় কমিউনিটি বনায়ন প্রকল্পে সড়ক, রেললাইন ও খালের বাঁধের ধারে প্রায় ৪ হাজার ৮০০ কিলোমিটার স্ট্রিপ বাগান হয়, আর প্রথমবারের মতো নারীরা কমিউনিটি বনায়নে যুক্ত হন। ১৯৯৪-৯৫ সালে শুরু হওয়া উপকূলীয় সবুজ বেষ্টনী প্রকল্পে ঘূর্ণিঝড়ে জানমালের ক্ষতি কমাতে ১০টি উপকূলীয় জেলায় স্ট্রিপ বাগান করা হয়।
পরিকল্পনায় যে সমতল ভূমির শালবন পুনরুদ্ধারের কথা আছে, তা আছে গাজীপুর, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, জামালপুর, কুমিল্লা, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, রংপুর ও রাজশাহীতে। বাংলাপিডিয়া জানায়, এর সবচেয়ে বড় অংশ বৃহত্তর ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইলের মধুপুর গড়, যা উত্তর-দক্ষিণে প্রায় ৯৬ কিলোমিটার লম্বা এবং ৮ থেকে ২৪ কিলোমিটার চওড়া; অতিরিক্ত আহরণ, বন উজাড় ও জবরদখলকে এর হুমকি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। জাতীয় বন জরিপে ২০১৫ সালে মাত্র ১৮ হাজার ৯১৮ হেক্টর জমি সমতল ভূমির (শাল) বন হিসেবে মানচিত্রে এসেছে। লক্ষ্যের তালিকায় থাকা আগর হলো Aquilaria malaccensis প্রজাতির গাছ; বাংলাপিডিয়ার হিসাবে দেশের বনে প্রায় ৮০০ হেক্টর আগর বাগান আছে।

২০৩০ সাল পর্যন্ত প্রাকৃতিক বনে গাছ কাটা বন্ধ
বনায়নের লক্ষ্যমাত্রার পাশাপাশি দেশের প্রাকৃতিক বনে গাছ কাটার ওপর নিষেধাজ্ঞাও ছিল। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম ২০২৩ সালের ২০ মার্চ জানায়, জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সংরক্ষিত ও প্রাকৃতিক বনাঞ্চলে ২০২৩ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০৩০ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত গাছ কাটা নিষিদ্ধ করে পরিবেশ মন্ত্রণালয় গেজেট প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। মূল অঞ্চল রক্ষার জন্য বাফার জোনে স্থানীয় দরিদ্র মানুষকে নিয়ে কমিউনিটিভিত্তিক সামাজিক বনায়ন চালু থাকবে। ২০২২ সালের অক্টোবরে মন্ত্রিসভা ২০৩০ সাল পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখার সিদ্ধান্ত অনুমোদন করেছিল।
বাসসের বরাতে ঢাকা ট্রিবিউন জানায়, ২০২২ সালের ২৪ জুলাই জাতীয় বৃক্ষমেলার সমাপনীতে শাহাব উদ্দিন ২০৩০ সাল পর্যন্ত বনের গাছ না কাটার আহ্বান জানান এবং বলেন, অবৈধভাবে গাছ কাটা বন্ধ না হলে দেশের আন্তর্জাতিক লক্ষ্য পূরণ হবে না। মার্চ ২০২৩-এর ওই বিডিনিউজ প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ২০১৯ সালের জাতীয় বন জরিপে সুন্দরবনের মোট কার্বন মজুত ১৩ কোটি ৯০ লাখ টন পাওয়া গেছে, যা ২০০৯ সালের জরিপে ছিল ১০ কোটি ৭০ লাখ টন।
তাপপ্রবাহ, শিশু ও জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা
মন্ত্রীর জবাবের দ্বিতীয় প্রশ্নটি ছিল শিশু ও তীব্র গরম নিয়ে। শাহাব উদ্দিন বলেন, তীব্র গরম থেকে শিশুদের সুরক্ষা দিতে পরিবেশ মন্ত্রণালয় সরাসরি কোনো কার্যক্রম নেয়নি। তবে সরকারের পক্ষে মন্ত্রণালয়ের প্রণীত জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা ২০২৩-২০৫০-এ তাপপ্রবাহ, তাপজনিত চাপ ও হিটস্ট্রোক মোকাবিলায় গবেষণা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রমসহ বিভিন্ন কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস ২০২২ সালের ৯ অক্টোবর জানায়, মন্ত্রণালয়ের পক্ষে এনএপির খসড়া তৈরি করেছে সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেস (সিইজিআইএস); তখন এটি মন্ত্রিসভার অনুমোদনের অপেক্ষায় ছিল। খসড়ায় ২০২৩ থেকে ২০৫০ সাল পর্যন্ত ২৭ বছরে অভিযোজনের ব্যয় ধরা হয় ২৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার; চিহ্নিত করা হয় ১১টি জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা এবং চরম তাপপ্রবাহসহ জলবায়ুজনিত ১৪টি দুর্যোগ; আর লক্ষ্য রাখা হয় ছয়টি, যার একটি বন ও জীববৈচিত্র্যের জন্য পরিবেশবান্ধব অভিযোজন। ৩৫টির বেশি পরামর্শ কর্মশালা ও ১০০টির বেশি দলীয় আলোচনার মাধ্যমে পরিকল্পনাটি তৈরি হয়। ইউএনবির খবর অনুযায়ী, ২০২২ সালের ডিসেম্বরে ঢাকায় এক আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বলেন, পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দেশি-বিদেশি উৎস থেকে ২৩০ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন; তাঁর উল্লেখ করা পদক্ষেপের মধ্যে ছিল উপকূলীয় সবুজ বেষ্টনী ও বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে কৃত্রিম ম্যানগ্রোভ বন।
প্রশ্নটি এসেছিল অস্বাভাবিক গরম এক বসন্তের পর। প্রথম আলো আবহাওয়া অধিদপ্তরের বরাতে জানায়, ২০২৩ সালের ১৫ এপ্রিল ঢাকায় তাপমাত্রা ওঠে ৪০.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা ৫৮ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ; আর চুয়াডাঙ্গায় ওঠে ৪২.২ ডিগ্রি, যা নয় বছরের মধ্যে দেশের সর্বোচ্চ। আবহাওয়াবিদেরা তখন সতর্ক করেছিলেন, তীব্র গরম আরও কয়েক দিন থাকতে পারে।
ছবি: ডেভিড এম. / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই ৩.০)
সূত্র: জাগো নিউজ, ফরেস্ট ইকোসিস্টেমস সাময়িকীতে বাংলাদেশ ফরেস্ট ইনভেন্টরি নিয়ে হেনরি ও সহকর্মীদের নিবন্ধ (ফেব্রুয়ারি ২০২১), ইউএনবি (৪ এপ্রিল ২০২২ ও ১১ ডিসেম্বর ২০২২), বাসস ও ঢাকা ট্রিবিউন (২৪ জুলাই ২০২২), বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম (২০ মার্চ ২০২৩ ও ২৩ জুলাই ২০২৩), দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস (৯ অক্টোবর ২০২২), প্রথম আলো (১৬ জুলাই ২০২০ ও ১৫ এপ্রিল ২০২৩), বাংলাপিডিয়া





মন্তব্য
(০)