পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম বা পিসিওএস নারীদের হরমোনজনিত একটি সাধারণ সমস্যা। সুষম খাদ্যাভ্যাস ও ব্যায়াম দিয়ে এর উপসর্গ অনেকটা নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। ২০২৬ সালের ২৫ জানুয়ারি জাগো নিউজে প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে রাইয়ান হেলথ কেয়ার হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টারের পুষ্টিবিদ লিনা আকতার পিসিওএস রোগীদের খাদ্যাভ্যাস নিয়ে পরামর্শ দেন। তাঁর পরামর্শগুলো বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা (এনএইচএস) এবং ২০২৩ সালের আন্তর্জাতিক পিসিওএস নির্দেশিকার সঙ্গে মিলিয়ে এখানে তুলে ধরা হলো।
পিসিওএস কী, কতজন নারীর হয়
ডব্লিউএইচওর হিসাবে প্রজনন বয়সের আনুমানিক ১০ থেকে ১৩ শতাংশ নারীর পিসিওএস আছে, আর আক্রান্তদের প্রায় ৭০ শতাংশ জানেনই না যে তাঁদের এই সমস্যা আছে। লিনা আকতারও বলেন, প্রজনন বয়সের প্রতি ১০ জন নারীর মধ্যে প্রায় একজনের পিসিওএস থাকে। এর সঠিক কারণ এখনো অজানা; তবে পরিবারে কারও পিসিওএস বা টাইপ-২ ডায়াবেটিস থাকলে ঝুঁকি বেশি।
এনএইচএস জানায়, পিসিওএসের তিনটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো অনিয়মিত মাসিক (ডিম্বাশয় থেকে নিয়মিত ডিম্বাণু বের না হওয়া), শরীরে "পুরুষ" হরমোন বা অ্যান্ড্রোজেনের মাত্রা বেশি থাকা এবং ডিম্বাশয়ে অনেকগুলো তরলভরা ছোট থলি বা ফলিকল। নামে "সিস্ট" থাকলেও এগুলো আসলে সিস্ট নয়। এর অন্তত দুটি থাকলে পিসিওএস শনাক্ত হতে পারে। উপসর্গের মধ্যে আছে অনিয়মিত বা বন্ধ মাসিক, গর্ভধারণে সমস্যা, মুখে ও শরীরে অতিরিক্ত লোম, মাথার চুল পাতলা হওয়া, তৈলাক্ত ত্বক বা ব্রণ এবং ওজন বেড়ে যাওয়া।
ডব্লিউএইচও বলছে, দীর্ঘ মেয়াদে পিসিওএস থাকলে টাইপ-২ ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্রোগ এবং জরায়ুর ভেতরের আস্তরণের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ে। উদ্বেগ, বিষণ্নতা ও নিজের শরীর নিয়ে নেতিবাচক ধারণার মতো মানসিক সমস্যাও দেখা দিতে পারে। এনএইচএস রক্তে কোলেস্টেরল বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকির কথাও বলেছে।
ইনসুলিন, ওজন ও পিসিওএস
লিনা আকতার পিসিওএসের সঙ্গে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের গভীর সম্পর্কের কথা বলেন। এনএইচএস ব্যাখ্যা করে, পিসিওএস থাকা অনেক নারীর শরীর ইনসুলিনে ঠিকমতো সাড়া দেয় না; তা পুষিয়ে নিতে শরীর বেশি ইনসুলিন তৈরি করে, আর এতে টেস্টোস্টেরনের মতো হরমোনের উৎপাদন ও সক্রিয়তা বাড়ে। অতিরিক্ত ওজনও শরীরে ইনসুলিনের পরিমাণ বাড়ায়।
এ কারণে ওজন বেশি হলে তা কমানো উপকারী। এনএইচএসের তথ্য অনুযায়ী, ওজন বেশি এমন নারীরা শরীরের ওজনের মাত্র ৫ শতাংশ কমালেও পিসিওএসের উল্লেখযোগ্য উন্নতি হতে পারে। তবে ২০২৩ সালের আন্তর্জাতিক নির্দেশিকা মনে করিয়ে দেয়, ওজন না কমলেও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের উপকার আছে, তাই সব পিসিওএস রোগীর জন্যই স্বাস্থ্যকর খাবার ও শারীরিক পরিশ্রম জরুরি।
কোন খাবার বেশি খাবেন, কোনটি কমাবেন
লিনা আকতারের পরামর্শ, পিসিওএস রোগীরা জটিল শর্করাসমৃদ্ধ খাবার বেশি খাবেন, যেমন আস্ত শস্যদানা, বাদামি চাল, লাল চিড়া, যব, ওটস ও কিনোয়া। সঙ্গে পর্যাপ্ত প্রোটিন, আঁশ ও স্বাস্থ্যকর চর্বি থাকবে, আর ফাস্টফুড, চিনি, ভাজাপোড়া ও প্রক্রিয়াজাত খাবার বাদ দিতে হবে, কারণ এসব খাবার ওজন বাড়ায় এবং রক্তে শর্করা হঠাৎ বাড়িয়ে দেয়। এনএইচএসের পরামর্শও একই রকম: প্রচুর ফল ও সবজি, আস্ত শস্যের খাবার (যেমন আটার রুটি, গোটা শস্যের সিরিয়াল, বাদামি চাল), চর্বি কম মাংস, মাছ ও মুরগি।

ডব্লিউএইচওর স্বাস্থ্যকর খাদ্যতালিকার সাধারণ নির্দেশনা পিসিওএস রোগীদের জন্যও প্রযোজ্য:
- প্রতিদিন অন্তত ৪০০ গ্রাম (পাঁচ ভাগ) ফল ও সবজি;
- ডাল, বাদাম ও আস্ত শস্য, যেমন ওটস, গম, ভুট্টা, বাজরা ও বাদামি চাল;
- খাবারে যোগ করা চিনি এবং মধু ও ফলের রসের চিনি মিলিয়ে মোট শক্তির ১০ শতাংশের কম;
- মোট চর্বি মোট শক্তির ৩০ শতাংশের কম, স্যাচুরেটেড চর্বি ১০ শতাংশের কম;
- দিনে ৫ গ্রামের কম লবণ; অনেক দেশে লবণের বড় অংশ আসে প্রক্রিয়াজাত খাবার থেকে।

সবার জন্য এক ডায়েট নয়, পরামর্শ নিন চিকিৎসকের
লিনা আকতার বলেন, পিসিওএস রোগীর খাদ্যতালিকা ব্যক্তিভেদে আলাদা হয়: কারও ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স, কারও ওজন বেশি, কারও প্রদাহ, কারও গর্ভধারণে সমস্যা। ২০২৩ সালের আন্তর্জাতিক নির্দেশিকাও বলছে, কোনো একটি নির্দিষ্ট ধরনের ডায়েট অন্যগুলোর চেয়ে ভালো, এমন প্রমাণ নেই। সাধারণ মানুষের জন্য স্বাস্থ্যকর খাবারের নির্দেশনা মেনে চলা যেকোনো খাদ্যতালিকাই উপকারী; তা হতে হবে রোগীর পছন্দ ও লক্ষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন মেনে চলার মতো, আর অতিরিক্ত কড়াকড়ি বা অসম পুষ্টির ডায়েট এড়িয়ে।
নির্দেশিকা অনুযায়ী প্রাপ্তবয়স্কদের সপ্তাহে অন্তত ১৫০ থেকে ৩০০ মিনিট মাঝারি মাত্রার ব্যায়াম (অথবা ৭৫ থেকে ১৫০ মিনিট জোরালো ব্যায়াম) এবং সপ্তাহে দুই দিন পেশি মজবুত করার ব্যায়াম করা উচিত, আর বসে থাকার সময় কমানো উচিত।

পিসিওএস সারে না, তবে উপসর্গের চিকিৎসা করা যায়। অনিয়মিত মাসিক, অতিরিক্ত লোম বা গর্ভধারণের সমস্যার জন্য ওষুধ আছে, যা চিকিৎসকই ঠিক করবেন। তাই পিসিওএসের লক্ষণ মনে হলে নিজে নিজে ডায়েট বা ওষুধ শুরু না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন; প্রয়োজনে তিনি পুষ্টিবিদের কাছে পাঠাবেন।
ছবি: Dan McKay / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 2.0)
সূত্র: জাগো নিউজ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (পিসিওএস ও স্বাস্থ্যকর খাদ্য বিষয়ক তথ্যপত্র), যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা (এনএইচএস), জার্নাল অব ক্লিনিক্যাল এন্ডোক্রিনোলজি অ্যান্ড মেটাবলিজম (২০২৩ সালের আন্তর্জাতিক পিসিওএস নির্দেশিকা)




মন্তব্য
(০)